18/04/2026
অন্তরা চ্যাটার্জী....
নাটককার/প্রাবন্ধিক/কাব্যকলা মনন
নাট্যগোষ্ঠীর অন্যতম স্তম্ভ
"মেঘে ঢাকা ঘটক" এর ৪ টা এপ্রিলর
অভিনয় দেখে লিখলেন..
পরবর্তী অভিনয়
৩১ মে রবিবার,একাডেমি, দুপুর ৩টে আসুন বন্ধুরা ✊ 💜
টিকিট অনলাইনে (লিঙ্ক কমেন্টে)
ফোন বুকিং ৯০০৭০০০১৪১
এই পৃথিবীতে যে সব মানুষগুলো খুব হিসেব কষে চলেছে,গুছিয়ে জড়ো করে গড়েছে বাড়ি,গাড়ি,ব্যাংক ব্যালেন্স, পরিবার ও সমাজপরিচয়ের পারফেক্ট পিরামিড,তাদেরকে আমরা সফল মানুষ বলে থাকি বটে,কিন্তু মনে রাখি কি?কিন্তু যে মানুষগুলো নড়বড়ে,টালমাটাল পায়ে ছকভাঙ্গা পথে চলে, ঝুঁকি নিয়ে নিজের শর্তে বাঁচে,বুকের ভেতর লাগামছাড়া,বেপরোয়া স্বপ্নগুলো যাদের শান্তির ঘুম কেড়ে নেয় কিংবা অন্তঃস্থ সৃজনশীল প্রতিভার আগুনে যারা নিজেরা পুড়ে মরে,তাদেরই কথা আমরা বলি বেশি,ভাবি বেশি,মনে রাখি বেশি,তাই না?শুধুমাত্র তাই নয়,তাদের যাবতীয় না পাওয়া,
,অসফলতা,অস্বীকৃতি ও বঞ্চনার যন্ত্রণা নিয়েই তাঁরা হয়ে ওঠেন একটি যুগের বিবেক,একটি জাতির আত্মার কন্ঠস্বর।দিন দুয়েক আগেই প্রগতি নাট্যদলের নাটক "সন্দীপনী" দেখে লিখলাম চে গেভারা ও তাঁর স্ত্রী এলাইডাকে নিয়ে।আজ সেই একই মনোভাব নিয়ে লিখতে চলেছি জন্মশতবর্ষে চেতনা নাট্যদলের ঋত্বিকস্মরণ "মেঘে ঢাকা ঘটক"দেখার পর।
ক্ষণজন্মা ঋত্বিক ঘটকের নির্মিত চলচ্চিত্রগুলি যেমন শুধু দেখা নয়,অনন্য এক গভীর উপলব্ধির বিষয়,তাঁর জীবনটাও ঠিক তাই। শুধুমাত্র তাঁর সম্পর্কেই জানা নয়,জীবন ও জগৎকেও একটা অন্য আলোয় দেখতে শেখা, বুঝতে শেখা।তিনি যখন নাটক থেকে সরে এসে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন,তখন ভারতীয় সিনেমা সবে একটু সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বিকাশের পথে যাত্রা শুরু করেছে।সিনেমার স্বতন্ত্র ভাষা যখনও সঠিক সংজ্ঞা পায়নি,সেই যুগে "নাগরিক" নির্মাণ করে চলচ্চিত্রের নতুন সম্ভাবনাময় পরিভাষা তৈরি করেছিলেন ঋত্বিক।সত্যজিৎ রাযের 'পথের পাঁচালি' সিনেমার নতুন সংজ্ঞা তৈরি করেছিল একথা চিরসত্য কিন্তু সিনেমার জগতে তাঁর সেই বৈপ্লবিক ও ভিন্নমাত্রিক নন্দনতত্ত্ব নির্মাণের পথে আগেই হাঁটা শুরু করেছিলেন ঋত্বিক।কিন্তু আন্তর্জাতিক স্তরে তাঁর ছবিগুলির মুক্তি ও প্রচার সংক্রান্ত অমনোযোগ ও জটিলতার ফলে দেশ ও বিশ্ব বেঁচে থাকাকালীন তাঁর প্রতিভার ঝলকানি দেখেছিল মাত্র,পূর্ণ প্রভা দেখতে পায়নি।তাছাড়া চলচ্চিত্রবাজার নিয়ন্ত্রণকারী ছবি তিনি করতে চাননি।ছিন্নমূল মধ্যবিত্ত মানুষ, শ্রমিক,দেহপসারিনী,অচল গাড়ি...এসব বিষয় নিয়ে কোন প্রযোজক আগ্রহী হবে টাকা ঢালতে?সিনেমার ব্যবসায়ীরা রূপকথা হাতড়ে স্বপ্ন দেখাতে চায়।তারা কেন ঝুঁকি নেবে মানুষের মূল্যবোধ,বাঁচার লড়াই,দেশভাগের যন্ত্রণা এসব নিয়ে ছবি করে দর্শকের হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে?কিন্তু ঋত্বিক সমঝোতা করেননি,"শিল্পকে কোলবালিশ করে" বেঁচে থাকতে চান নি।অসংখ্য ছবি তাঁর না করা,অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।কিন্তু যে আটটি ছবি এবং কিছু তথ্যচিত্র তিনি নির্মাণ করে গেছেন,যতদিন সিনেমা থাকবে,ততদিন চলচ্চিত্র জগতের অমূল্য ঐশ্বর্য হয়ে সেগুলি রয়ে যাবে।
আসি নাটকের কথায়।সত্যি বলতে কি,নাটক নিয়ে খুব বেশি কিছু বলার নেই,কারণ এ নাটক বাকরুদ্ধ হয়ে দেখার,মন্থন করার,শেখার।নীল এর প্রায় সব নাটকই দেখি,সব চরিত্রেই ও নিজেকে উজাড় করে দেয়,তার অভিনেতাসত্তাকে নিংড়ে অভিনয় করে।নাটকের পর তাকে রীতিমতো হাঁফাতে দেখি,চোখ মুখ দেখে অপ্রকৃতিস্থ লাগে ওকে।কিন্তু 'মেঘে ঢাকা ঘটক' এ ঋত্বিক ঘটকের ভূমিকায় নীল বোধহয় নিজের প্রাণটা দিতে বাকি রেখেছে।এ নাটকে ঋত্বিকের জীবন ও সংগ্রামের কাহিনীর সূত্রধর মূলত তাঁর স্ত্রী সুরমা ঘটক।দীর্ঘ ন্যারেশনের মধ্যে মধ্যে দেখি ঋত্বিক সুরমার প্রেম,বিয়ে,দাম্পত্য,অশান্তি,ঋত্বিকের অসুস্থতা,ঋত্বিকের 'বিসর্জন' নাটকের দৃশ্য,প্রজেকশন এর দ্বারা তাঁর ছবিগুলির টুকরো দৃশ্য,গান সহযোগে নাচ,তার সৃষ্ট বিভিন্ন চরিত্রের অঘোষিত আগমন ও কথোপকথন...সব মিলিয়ে নাটকটি কখনো ক্যালাইডোস্কোপিক,কখনো একটি নিখুঁত কোলাজচিত্র।প্রায়ই দীর্ঘায়িত মনে হয়,কিন্তু ঋত্বিকজীবনীর নির্যাসই এই স্লো বার্নিং বৈশিষ্ট্য।ঋত্বিকের সৃষ্টির অনিঃশেষ খিদে, নিজের মতো করে কাজ করার তাড়না,তাঁর জেদ ও আনকম্প্রমাইজিং স্বভাব,তাঁর বিপর্যস্ততা,তাঁর জীবনের অবিন্যস্ততা,তাঁর মানসিক অসুস্থতা ও শারীরিক ক্ষয়িষ্ণুতা,পানাসক্তি,হতাশা,দুঃখ,রাগ,খেদ...সব,সব নীল অভিব্যক্ত করেছে ওর পারগতার উচ্চতম বিন্দুতে নিজেকে নিয়ে গিয়ে এবং নাটকের শেষে নীলের অভিনীত ঋত্বিক হয়ে উঠেছেন কর্ণের মতো এক মহাকাব্যিক বীর যাঁর রথের চাকা মাটিতে বসে গেলেও যে বীর নিরস্ত্র অবস্থাতেও যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যাননি,যাঁর রথের সারথি ছিল নিজের আত্মবিশ্বাস আর কাজের প্রতি নিষ্ঠা।
নীলের থেকেও অনেক অনেক কঠিন ছিল স্ত্রী সুরমা ঘটকের ভূমিকায় নিবেদিতার কাজ।প্রথম থেকে শেষ অবধি এতটুকু না থেমে স্বামীর কথা বলে যাওয়া,তাঁর কর্মজীবন নিয়ে বিশদ তথ্য দেওয়া,তরুণ বোহেমিয়ান ঋত্বিকের প্রতি গভীর প্রেম ও তারপর মুখের হাসিটি বজায় রেখে অনিশ্চিত দাম্পত্য জীবনের অভাব অনটন কষ্ট যন্ত্রণা,অনুযোগ ফুটিয়ে তোলা,তাড়া খাওয়া বাঘিনীর মতো দেশের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরে বেড়ানো এবং সন্তান আগলানো,মানুষ করা,একটা ঐশ্বরিক প্রতিভাধর সাধক,প্রেমিক,পাগল মানুষের পাশে সহযোদ্ধার মতো দাঁড়িয়ে সুস্থ ভাবে,প্রকৃতিস্থ থেকে তাঁকে ও সংসারকে কান্না গিলতে গিলতে সামাল দেওয়া.... মঞ্চে এ চরিত্রের বাস্তবায়ন ঘটানো যে কি অকল্পনীয় স্তরের সুকঠিন তা ভাবা যায়না।কিন্তু রক্তে,মজ্জায়,চেতনায় অভিনয় বইছে বাংলা মঞ্চের পরম সম্পদ এই অভিনেত্রীর,স্বভাবজাত দক্ষতায় অনায়াসে এবং চূড়ান্ত বিশ্বাস্যভাবে সুরমার চরিত্রের রূপদান করেছে নিবেদিতা।বিশেষ করে স্বামীকে ছেড়ে সন্তানদের নিয়ে সুরমার সাঁইথিয়া চলে যাওয়ার সময় "বেঁচে থেকো" বলতে বলতে তার ভেঙ্গে পড়ার দৃশ্যটি ভোলার মতো নয়।সবচেয়ে বড় কথা এ নাটকে নীলের সঙ্গে সহ পরিচালনাতেও ছিল নিবেদিতা(সঙ্গে আমার খুব প্রিয় অভিনেতা রাজু বেরা)।
নাটকের টিমওয়ার্ক প্রশংসনীয়।সবাই এত সুন্দর কাজ করেছে,আলাদাভাবে কারো কথা বলা সম্ভব নয়, ঠিকও হবেনা(তবে ম্যানিকিনরূপী মেরি আচার্য্য র নামটি না উল্লেখ করে পারছিনা)।সৌরেন চক্রবর্তীর আলো ও সঞ্চয়ন ঘোষের মঞ্চ মুগ্ধ করেছে।তবে প্রবুদ্ধ ব্যানার্জীর আরো ভালো আরো যথাযথ সঙ্গীত আগে পেয়েছি,বিশেষ করে 'মহাত্মা বনাম গান্ধী' ও 'রানী ক্রেউসা' নাটকে।
জিত-সত্রাগ্নি রচিত এই নাটকে নাট্যকার ঋত্বিকের আরেকটু ছোঁয়া পেলে ভালো হতো,কিন্তু নীল জানালো এতে নাটক আরো দীর্ঘ হতো,বরং এ বিষয়েই আরেকটি নাটক হতে পারে।এ ব্যাপারে ওর সঙ্গে সহমত হয়েছি।
নীরবতার মধ্যে দিয়ে নাটকের মধ্যান্তর এবং সঙ্গীতময় শেষ দৃশ্য যেখানে আত্মমগ্ন নীল দর্শকদের সামনে দিয়ে ফিল্মের রিল হাতে নিয়ে এলোমেলো পায়ে চলে আর মঞ্চের চরিত্ররা তাঁর ছবিগুলির পোস্টার হাতে দাঁড়িয়ে থাকে,তা আমাদের আকুল করে তোলে,হাততালিতে সরব হয়ে ওঠে প্রেক্ষাগৃহ,চমক ভাঙে।আমরা বুঝতে পারি এতক্ষণ আমরা একাত্ম হয়েছিলাম ঋত্বিক,সুরমা,নীতা,বঙ্গবালা,কাঞ্চনদের সঙ্গে,হারিয়ে গিয়েছিলাম ঋত্বিকের সৃষ্টির জগতে,ভেঙ্গে পড়ে চতুর্থ দেওয়াল।
এ নাটক দেখে অনেকেই কেঁদেছেন,ভীষণভাবে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছেন।আমি কাঁদিনি,আমার চোখে জল আসেনি।আমি শুধু বিপন্ন বোধ করেছি একজন স্রষ্টা ও তাঁর সহধর্মিনীর বিপন্নতায়।এ নাটক আমায় নিয়ে গেছে একটি নাটকের অভিনয় দেখে মুগ্ধ হওয়ার শেষ সীমায়।নাটকের শুরুতে অন্ধকার মঞ্চে জ্বলতে থাকা ঋত্বিকের বিড়ির বা সিগারেটের আগুনের বিন্দুর মতোই চিরকাল এ নাটক জ্বলুক দর্শকদের চেতনার গভীরে।নাটকের একটি পর্যায়ে ঋত্বিক যখন বম্বের স্টুডিওর কাজ ও আর্থিক নিরাপত্তা ছেড়ে কলকাতায় চলে আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ছেন সুরমার সঙ্গে, তখন বলছেন,দেখো,টাকা থাকবে না কিন্তু কাজটা তো থাকবে!
এই একটি মাত্র বাক্যকে সম্বল করে চলা যায় জীবনের অনেক,অনেকখানি পথ।
চলমান পোস্টার : শাশ্বত সৌভিক