25/07/2026
প্রথিতযশা চিকিৎসক,অসামান্য লেখক, সংস্কৃতি প্রেমী মানুষ কৌশিক লাহিড়ী।
যদিও তাকে কোন বিশেষণে বোধহয় আবদ্ধ করা যায় না।
তার "মেঘে ঢাকা ঘটক" নিয়ে এই বিশ্লেষণ যেন আলাদা এক সাহিত্য, আলাদা এক বিস্ফোরণ..
এমনকি উনি সুরমা ঘটক ও মীরা ভট্টাচার্য ' র যে অসাধারণ এক তুলনামূলক রসায়ন অনুভব করেছেন, সেটা অতুলনীয়..
একটি থিয়েটার একজন গুণী মানুষের থেকে এরকম একটি লেখার সৃষ্টি করায় যখন,তখন মনে হয়,আমরা বেঁচে আছি,মরে যাইনি।
চেতনার পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা আপনাকে,আমরা আপ্লুত
এই লেখা চেতনার ইতিহাস কে সমৃদ্ধ করবে...
ঋত্বিকধ্বনি আরো ছড়িয়ে পড়ুক
এই আশায় পরবর্তী অভিনয়
১ আগষ্ট
খড়দহ, রবীন্দ্র ভবন
( আমন্ত্রিত)
২৫ আগষ্ট একাডেমি
সন্ধ্যা ৬:৩০
( নিজস্ব)
টিকিট অনলাইনে (লিঙ্ক কমেন্টে)
ফোন বুকিং ৯০০৭০০০১৪১
আসুন বন্ধুরা 💜 🙏✊
লেখাটি পড়বেন...🙏
ঋত্বিকধ্বনি
ইমন নয়, বেহাগ, বসন্ত এমনকি মালকোষ বা দরবারীও নয়, হংসধ্বনিই একমাত্র রাগ যা আমি নির্ভুল ভাবে চিনতে পারি।
আর তার কারণ, মেঘে ঢাকা তারা!
সেই লাগি লগন…
সঠিক লগন না এলে বোধ হয় এমন সৃষ্টি আস্বাদন করাও হয়ে ওঠে না । আজ ছিলো সেই পরম লগন।
আমি যে নাটকের খুব নিয়মিত দর্শক তা তো নই, অনেক না দেখা নাটকের মত এটাও হয়ত দেখা হত না যদি না শ্রীমান অগ্নিজিৎ মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে নিয়ে যেতেন ।
ঋত্বিকের তো নয়ই, চেতনারও কিস্যু ক্ষতি হত না, আমি না গেলে। ক্ষতি হত আমার। আমার চেতনার।
চার দশক আগে একটা সময় মেতে ছিলাম ফিল্ম আন্দোলন নিয়ে । অজস্র ছবি দেখতাম দেশ-বিদেশের। ঋত্বিকও দেখতাম। খুব যে বুঝতাম তা নয়! তখন শুধু দেখে যাওয়ার বেলা। ভাবা প্র্যাক্টিস হয় নি তখনও।
আজ বুঝলাম, এতদিন ঋত্বিকের ছবি দেখেছি, কিন্তু মানুষটাকে দেখিনি।
এই নাটক সেই মানুষটার সঙ্গে আমার নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিল।
জিৎ সত্রাগ্নীর নাট্যরচনা এবং Sujan Neel Mukhopadhyay এর পরিচালনায় ‘মেঘে ঢাকা ঘটক’ প্রচলিত অর্থে কোনও জীবনীমূলক নাটক নয়। বরং অনেকটাই যেন প্রবন্ধের মত।
এটি একজন শিল্পীর জীবনী নয়; বরং তাঁর অন্তর্জগতের মরমী অথচ নির্মম খনন। প্রেম, শিল্পসাধনা, রাজনৈতিক আদর্শ, পেশাগত বঞ্চনা, দেশভাগের ক্ষত, আত্মবিধ্বংসী প্রবণতা এবং এক অসীম সৃষ্টিশীলতার জটিল সংশ্লেষ এই নাটকের মূল উপাদান।
নাটকের কেন্দ্রে রয়েছেন ঋত্বিক এবং তাঁর স্ত্রী সুরমা। শুধু সুজনের ঋত্বিক নয়, সুরমা ঘটককে মঞ্চে জীবন্ত তুলে এনেছেন নিবেদিতা! এক বিপন্ন প্রতিভার সবচেয়ে কাছের মানুষ হিসেবে এমন সংযম ও গভীরতায় নির্মাণ করেছেন, যা অবিশ্বাস্য ।
ঋত্বিক ঘটকের চরিত্রে সুজন মুখোপাধ্যায় সম্ভবত তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম সেরা কাজটি করেছেন। তিনি ঋত্বিককে কোথাও অনুকরণ করেননি; বরং ছুঁতে চেয়েছেন ঋত্বিকের আত্মাকে। তাঁর হাঁটা, কথা বলা, দৃষ্টির অস্থিরতা, আত্মবিশ্বাস, হতাশা, ক্রোধ, মদ্যপ অবস্থার ভাঙন সব মিলিয়ে এক ভেঙ্গে চুরে যেতে থাকা জীবন্ত মানুষ মঞ্চে উপস্থিত হন।
ঋত্বিকের নিজের ছবিগুলি ছাড়াও চার্লি চ্যাপলিনের The Great Dictator-এর বা আইজেনস্টাইনের Battleship Potemkin-এর Odessa Steps মন্তাজের মঞ্চ-রূপায়ণ এবং সেই প্যারাম্বুলেটরের প্রতীকী ব্যবহার—এসব কেবল নাট্যনির্মাণ নয়, চলচ্চিত্র-ভাবনার সঙ্গে নাট্য-ভাষার এক অনন্য সংশ্লেষ ।
অগ্নিজিৎ সেন তাঁর সহজাত প্রতিভা এবং অপরিসীম পরিশ্রমে এই নাটকে অন্য মাত্রা জুড়ে দিয়েছেন। ম্যানিকিনের ভেঙে পড়ার দৃশ্যটি অসামান্য।
দ্বিতীয়ার্ধে নাটক আরও গভীর অন্ধকারে প্রবেশ করে। বিষণ্নতা, মদ্যপান, হতাশা এবং আত্মধ্বংসের দীর্ঘ পথচলা যেন দর্শকের নিজের শরীরেও ছড়িয়ে পড়ে। চোখ ঝাপসা হয়ে যায়। গলার ভেতরে দলা পাকিয়ে ওঠে ।
চেতনার সমগ্র দল মঞ্চ জুড়ে বিশ্বকাপ জয়ী স্পেনের পারফর্মেন্স দিয়ে এই নির্মাণকে পূর্ণতা দিয়েছেন। প্রত্যেক শিল্পী যেন জানতেন তাঁরা ঠিক কী কাজ কখন করছেন। কোথাও কোনও তাড়াহুড়ো নেই, কোথাও অকারণ নাটকীয়তা নেই। সংলাপের মতোই নীরবতাগুলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের সন্ধ্যায় আর-একটি ব্যক্তিগত অনুভূতি আমাকে বারবার স্পর্শ করেছে।
ঋত্বিক মানে তো পুরোহিত। এ নাটক বাংলা ছবির ভগীরথ, পুরোধা পুরোহিত কে নিয়ে।
আবার ভব মানে যে সত্য, শিব, সুন্দর সেটাও যেন এই প্রথম উপলব্ধি করলাম। ব্যক্তিগতভাবে এও এক পিতৃপরিচয় লাভ।
ঋত্বিক ছিলেন ঋজু মেরুদণ্ড এক আপোষহীন বামপন্থী! আদর্শের জন্য এক মুহূর্তের জন্যও আপোষ করেন নি আর সেই জন্যই যেন তাঁর সততা আর মেধাদীপ্ত মননের মূল্য সেভাবে পান নি। অসমাপ্ত থেকে গেছে তাঁর অনেক কাজ ক্ষতি হয়েছে আমাদের।
স্বপ্নদ্রষ্টা, আপাদমস্তক শুভ্র নিষ্কলঙ্ক, সর্বজনশ্রদ্ধেয় প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রীর পাশে বসে নাটক দেখতে দেখতে মনে হলো তিনিও যেন আর এক ঋত্বিকের সহধর্মিণী যাঁকে যথাযোগ্য সম্মান আমরা দিতে পারি নি। অসমাপ্ত থেকে গেছে তাঁরও অনেক কাজ। আর এক্ষেত্রেও ক্ষতি হয়েছে আমাদের।হয়তো তাঁর সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতাই বেশি আলোচিত, অথচ তাঁর আপাত ব্যর্থতার মধ্যেও যে কী অপরিসীম জয় লুকিয়ে ছিল, তা আমরা আজ টের পাচ্ছি।
ঋত্বিককে দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে হচ্ছিল, ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আসেন, যাঁরা ক্ষমতা বা প্রতিষ্ঠার চেয়ে আদর্শকে বড় করে দেখেন। জীবদ্দশায় তাঁদের অনেক স্বপ্নই পূর্ণতা পায় না। অনেক কাজ অসমাপ্ত থেকে যায়।
সেই মুহূর্তে আমার মনে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জীবনের মধ্যে এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পেলাম। আদর্শের সঙ্গে আপস না করার মূল্য কখনও কখনও ব্যক্তি দেন, কিন্তু ক্ষতিটা শেষ পর্যন্ত সমাজেরই হয়।
বাড়ি ফিরে এসেছি। অনেক রাত হয়েছে।
তবু এখনও কানে বাজছে মেঘে ঢাকা তারায় অনিল চট্টোপাধ্যায়ের ঠোঁটে কানন সাহেবের সেই অবিস্মরণীয় “লাগি লগন…”
হংসধ্বনি নয়, রাগটির আজ থেকে নতুন নাম দিলাম।
ঋত্বিকধ্বনি।
যাঁরা এখনও দেখেন নি এবার তাঁদের মাথায় আমার বন্দুক ধরার পালা।
পরের শো একাডেমিতে।
২৫ আগস্ট ।
সন্ধে ৬.৩০ এ।