01/05/2025
কৃষ্ণচূড়ার সাক্ষী
কলমে - Reha Arya
ফাল্গুনের প্রথম স্পর্শে প্রকৃতি যখন নবীন পাতায় সেজে ওঠে, ঠিক সেই সময় শহরের কোণে পুরনো দিনের এক বাড়িতে, আলমারির তাকে প্রায় তিন যুগের বেশি সময় ধরে বন্দি হওয়া একটা হলুদ শাড়ি নিরবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। খাঁটি সিল্কের শাড়ির উপর জরির হালকা কাজ। সময়ের স্রোতে উজ্জ্বল্য কিছুটা হয়তো ফিকে হয়ে গেছে, তবুও তার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে এক মায়াবী গল্প, একটা পুরো ইতিহাস।
শুভ্র প্রথম উপার্জন- ছাত্র পড়ানো টাকায় এই শাড়িটি কিনে দিয়েছিল সে তার বছর কুড়ির তরুণী প্রেমিকা মাধবীকে। এই শাড়িটি মাধবীরও প্রথম ভালোবাসার উপহার। সে ছিল শান্ত, স্নিগ্ধ তার চোখে ছিল স্বপ্ন ঠোটে ছিল মিষ্টি হাসি। এক সোনালী দুপুরে কৃষ্ণচূড়ার তলায় দাঁড়িয়ে শুভ্র তার হাতে তুলে দিয়েছিল এই উপহারটি।
শুভর কন্ঠে ছিল সুর, আর চোখে ছিল ভবিষ্যতের হাতছানি। এই হলুদ রং তাদের জীবনে এনে দিয়েছিল একরাশ সোনালী রোদ আর, ভালোবাসার উষ্ণতা। এই শাড়ি পরেই মাধবী অজস্র বসন্তের দুপুরে শুভ্রর হাত ধরে হেঁটেছে শহরের-অলি-গলি-পথে, নদীর ধারে। কত সন্ধ্যায় যে অসাবধানতায় তার আঁচলটা ছুঁয়েছে শুভ্রর উদাসী মুখ, তার কোন হিসেব নেই। শুভ্র বলতো, "মাধবী এই হলুদ রং তোমার হাসির মতো উজ্জ্বল। আমার জীবনের আলোর মতো মূল্যবান।"
তাদের এই সুন্দর ভালবাসার আকাশে হঠাৎ ঘনিয়ে এলো এক কালো মেঘ। এক দুরারোগ্য ব্যাধি দিনে দিনে গ্রাস করে চলেছে শুভ্রর সারাটা শরীর। বাঁচার আশা ক্ষীণ। এই ভয়ংকর সত্যটির সম্পূর্ণরূপে ভেঙে দিয়েছিল শুভ্রকে।
তবু সে মাধবীকে তার এই অসুস্থতার কথা জানাতে যথেষ্ট দ্বিধাবোধ করলো। এই কঠিন সত্যটা জানলে, মাধবী নিমেষেই শেষ হয়ে যাবে। তার কোমল হৃদয় এই আঘাত কিছুতেই সহ্য করতে পারবে না। তাই সেদিন শুভ্র এক ভীষণ কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। মাধবীকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত।
মাধবীকে সে জানালো, সম্পর্কটা আগে নিয়ে যাওয়া তার পক্ষে আর সম্ভব নয়। মিথ্যে অজুহাত দিল, অন্য কারো প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার ভান করলো সে। বলল, আগামী শীতে তার বিয়ে, বাড়ি থেকে ঠিক হয়েছে।
মাধবী সরল বিশ্বাসে আঘাত হানল শুভ্রর এই নিষ্ঠুর অভিনয়। স্বপ্ন ভেঙে গিয়ে তছনছ হয়ে গেল মাধবীর ভালোবাসার এই ছোট্ট বাগান। হলুদ সিল্কের শাড়িটি ও মুখ বুজে পড়ে রইল আলমারির এক কোনে, তার রং যেন আরো মলিন হয়ে গেল বেদনার ছোয়ায়।
বছর ৩৫ পার হয়ে গেছে। মাধবী চোখের কোনে পড়েছে ক্লান্তির ছাপ আর চুলে মিশেছে রুপোলি আভা। তার বুকের ভেতর সেই পুরনো ভালবাসার ক্ষত ভীষণ দগদগে আজও। সেদিন পুরনো আলমারি গোছাতে গিয়ে মাধবীর হাত পরল সেই হলুদ শাড়িটির উপর। বহুদিনের স্পর্শ না পাওয়া কাপড়টি যেন একটু কেঁপে উঠল তার ছোঁয়ায়।
শাড়িটি বের করে আনলো। মলিন হয়ে আসা হলুদ রঙে তারুণ্যের দিনের ছবি যেন ভেসে উঠলো। শুভর মুখের হাসি, কৃষ্ণচূড়ার লাল রং, সব যেন জীবন্ত হয়ে উঠল তার চোখের সামনে। বুকের ভিতর চিনচিনে ব্যথা অনুভব করল মাধবী। কেন যে শুভ্র তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল, এতো ভালোবাসা সত্বেও, সেই রহস্য আজও তার মনে কাঁটার মত বিঁধে আছে- "হয়তো স্ত্রী সন্তান নিয়ে ভালোই আছো শুভ্র, তাদের জীবন অক্ষয় হোক।"
মাধবী অবশ্য বিয়ে করেছিল বাড়ির Only। আজ তার সংসার, সন্তান, নাতি-নাতনি সবই আছে।
হঠাৎ তার দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। তার নাতি"ঐতিহ্য" এসেছে। সঙ্গে একটি বয়েস কুড়ির মেয়ে, নাম - মধুশ্রী।
মাধবী নামটি শুনে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। সে আর শুভ্র ঠিক করেছিল তাদের কন্যা সন্তান হলে নাম রাখবে মধুশ্রী।
মিষ্টি স্বভাবের মেয়েটির হাতে কয়েকটি কৃষ্ণচূড়া ফুল। মেয়েটি ও মাধবীকে দেখে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। মাধবীর মুখের আদল অনেকটা তার দাদুর ঘরে রাখা ছবিটির মতোই। তবে কি শুভ্র বিয়ে করেছিল? না মধুশ্রী তার নিজের নাতনী নয়, তার বোনের ঘরের নাতনি। সেই বোন যে সবটা জানতো। সেই বোন, যার শেষ যত্নে শুভ্র শান্তিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পেরেছিল। খালি যাওয়ার আগে একবার বলে গিয়েছিল মেয়ে হলে নাম রাখিস মধুশ্রী। বোনের মেয়ে তো হয়নি, হয়েছিল ছেলে। তবুও সে কথা রেখেছিল, ছেলের ঘরে মেয়ে হলে নাম রেখেছে মধুশ্রী। শুভ্রর বোন তনিমা, গুছিয়ে রেখেছিল শুভ্রর সমস্ত স্মৃতি, টুকরো টুকরো আবেগ। আর সেই স্মৃতিরই একটা অংশ ছিল মাধবীর একটা ফটো।
মেয়েটি অস্ফুটসরে বলে উঠেছিল মধু দিদা না? তাইতো, শুভ্র ভালবেসে মাধবীকে মধুই তো ডাকতো।
জানো তো মধু দিদা, মা বলেছে আমার দাদুর শেষের ইচ্ছে ছিল বাড়িতে একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ লাগানো। তাই দাদু যেদিন চলে গেল সেদিনই মা একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ লাগিয়েছিল বাড়ির পেছনের বাগানে। সেই গাছের তলায় রোজ অজস্র ফুল পড়ে থাকে। এই ফুল কটা সেখান থেকেই তোলা।
এই বলে মধুশ্রী মাধবীর শাড়ির কোচে ফুল কটা অগোছালো ভাবে ফেলে দিল।
শুনেছি দাদু শেষ দিন পর্যন্ত তোমাকে ভালবেসেছিল।
মাধবীর চোখে বাঁধ ভাঙলো , এত বছর পর শুভ্রের ভালবাসার গভীরতা সে উপলব্ধি করতে পারল। যে হলুদ শাড়ি এতদিন বেদনার প্রতীক ছিল, আজ থেকে সেই শাড়ি শুভ্রর নীরব ভালোবাসার বার্তা বহন করবে।
তাই শাড়িটি উজ্জ্বল না হলেও তার মায়া কিন্তু আজও অমলিন। এখানে জড়িয়ে আছে এক গভীর ভালবাসার আত্মত্যাগের গল্প। ফাল্গুনের রঙিন স্মৃতিতে জড়িয়ে আছে মধুর ক্লান্তি। আজ থেকে সেই মায়া, সেই ক্লান্তি বহন করে চলবে মাধবী, তার অশ্রুসিক্ত হৃদয়ের গভীরে।
আজ এই হলুদ শাড়িটি তার কাছে এক নীরব স্বীকারোক্তি, "সত্যিকারের ভালোবাসা কখনো শেষ হয় না, শুধু পরিস্থিতি তাকে ভিন্ন রূপ দেয়।"
সমাপ্ত
#হলুদস্মৃতি #বিরহীভালোবাসা #কৃষ্ণচূড়ারগান #ফাল্গুনেরমায়া #অসমাপ্তপ্রেম #নীরবতা #গভীরঅনুভূতি #বাংলাগল্প #ভালোবাসা #স্মৃতি