04/08/2026
বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে বর্ষা ঋতুর বিশেষত আষাঢ় , শ্রাবন , ভাদ্র মাসে নাগকুলের উপদ্রব হয় তাই সর্প দংশন থেকে রক্ষা পেতে এবং বলা হয় বর্ষা হল প্রজননের মাস কারণ নতুন ফসলের বীজ এই মাসেই বপন করা হয় তাই সেই সময় চাষের উন্নতিকল্পেও এই বঙ্গভূমিতে নাগকুলের অধিষ্টাত্রী দেবী বিষহরির আবাহন করা হয় ।প্রজননের সাথে মনে করা হয় নাগকুলের এক যোগ রয়েছে , তাই নতুন শস্যের কল্যানে কল্যাণী দেবী মনসার আহ্বান করা হয় গ্রামবাংলার বিভিন্ন স্থানে । দেবী বিষহরির থান রয়েছে সেই সব থানে আষাঢ়ের , শ্রাবনের ও ভাদ্রের কৃষ্ণপক্ষের নাগপঞ্চমী তিথিতে দেবীর পূজা হয়ে থাকে । এমনি এক দেবীর থান রয়েছে হুগলী জেলার পোলবার রথতলায় । এই অঞ্চলের স্থানীয় বোস পরিবারের দুশো প্রাচীন দেবী বিষহরির বেদী জানা যায়না । কবে শুরু হয়েছিল দেবীর এই বেদী নির্মাণ তাও জানা যায়না স্থানীয় মতে খুবই প্রাচীন এই দেবীর থান । এই স্থানটি এক সময়ে ছিল বন জঙ্গলে পরিবৃত আর সেখানে উন্মুক্ত প্রকৃতিতে স্বাধীন ভাবে বিচরণ করতো সর্পকুল , এখনো মন্দির প্রাঙ্গনে গেলে সেই ঢিবি ও নাগকুলের উপস্থিতির আভাস পাওয়া যায় ।হয়তো এমনি প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণ মা বিষহরি তাঁর বিচরণ ক্ষেত্র নির্বাচন করেছিলেন । মায়ের এই থানে বর্তমানে নিত্য সেবা পূজাদি হলেও বিগত কিছু সময়ে মায়ের পূজাতে অবহেলা দেখা দেয় , কারণ বন জঙ্গলে ঘেরা এই স্থানে তেমন ভাবে কেউ সব সময় যেতে পারতো না । তাই আজ থেকে প্রায় আনুমানিক দেড়শো বছর পূর্বে পোলবা পোষ্ট অফিস অঞ্চলের স্থানীয় ভক্তপ্রাণ ব্রাহ্মণ শ্রী সতীশ চক্রবর্তী মহাশয় কে দেবী বিষহরি একদিন স্বপ্নাদেশ দেন দেবীর প্রাচীন থানে তিনি অবহেলিত হয়ে রয়েছেন , পূজাদি তাঁর হচ্ছেনা ঠিকমতো ভাবে কারণ ওই গহন বনভূমিতে কেউ তেমন ভাবে আসেনা তাই জনবসতিপূর্ণ কোনো স্থানে দেবীর মন্দির স্থাপন করে মায়ের পূজার ব্যবস্থা করতে যাতে দেবীর ভক্তরা সহজেই দেবীর পূজা দিতে পারেন ও দেবীর আদি স্থানে মায়ের বাৎসরিক পূজার সময়ে ভক্তরা গিয়ে পূজা দেবে । বাকী সময়ে এই মায়ের অপর মন্দিরে পূজা দেবেন । মায়ের আদেশ পেয়ে মহানন্দে শ্রী সতীশ চক্রবর্তী মহাশয় মায়ের স্বপ্নদৃষ্ট মূর্তি অনুসারে মৃন্ময়ী মূর্তি গড়িয়ে শ্রী শ্রী বিষহরি মায়ের নাটমন্দির সহ আটচলা মন্দির নির্মাণ করে দেবীর পূজা করতে থাকলেন । এই ভাবেই মা বিষহরির দুটি থানেই দেবী নির্দেশিত ভাবে পূজা চলতে থাকে । বর্তমানে এক বছর পূর্বে মায়ের আদি থানে বেদীর পাশেই নির্মিত হয়েছে ছোট নাটমন্দির আটচলা মন্দির ও গভগৃহে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মা বিষহরির শ্বেত মার্বেল পাথরের দ্বিভুজা , হংসবাহিনী , নাগায়ুধ , নাগেরভূষণ ধারিনী দেবীর দুই পাশে বেহুলা ও লখিন্দরের মূর্তি । বর্তমানে আদি মন্দিরে পূজার দ্বায়িত্বে রয়েছেন ব্রাহ্মণ হালদার পরিবার । অপর দিকে মা বিষহরির স্বপ্নাদেশে মন্দিরের পূজারী স্বর্গীয় শ্রী সুব্রত চক্রবর্তী মহাশয় আনুমানিক কুড়ি বছর পূর্বে মৃন্ময়ী প্রতিমা ধুমধামের সাথে বিসর্জিত করেন ও দেবী পাকাপাকি ভাবে সিমেন্টের নির্মিত প্রতিমা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন । তারপর থেকে প্রতি তিন বছর অন্তর দেবী প্রতিমার অঙ্গরাগ হয় । দেবী বিষহরি এখানে দ্বিভুজা দেবীর দুই কাঁধে দুইটি নাগ রয়েছে মায়ের সুন্দর মুকুট, বেনারসী শাড়ি পরিহিতা, সালঙ্কারা দেবীর দুহাতে দুটি নাগ ও সিংহাসনে অধিষ্ঠিতা ও পদতলে হংস বাহন মায়ের দুই পাশে সতী বেহুলা ও বণিককুমার লখিন্দর । পোলবার মা বিষহরির মন্দির ও মায়ের আদি থানে বাৎসরিক পূজা হয় শ্রাবন মাসে কৃষ্ণপক্ষের নাগপঞ্চমী তিথিতে । ওই দিন সকাল থেকেই মায়ের পূজা চলে , অগণিত ভক্ত সমাগম ঘটে মন্দিরে । এই দিন মা কে অন্নভোগ দেওয়া হয় ও বছরের এই একদিনই দুই জায়গাতেই মায়ের কাছে অন্নভোগ হয় । ফল, মিষ্টি , দুধ, কলার সাথে খিচুরী , ল্যাবড়া , পাঁচ ভাজা, আলুরদম , চাটনী, পায়েস সহযোগে মা কে ভোগ নিবেদন করা হয়। তবে কোন প্রকার আমিষ ভোগ মা কে দেওয়া হয় না । মায়ের মন্দিরে আগত সকল ভক্তরা মায়ের ভোগ গ্রহণ করেন । এই দিন মায়ের কাছে ছাগ বলিও প্রদত্ত হয় । ভক্তরা তাদের মনোস্কামনা পূর্তিতে মায়ের কাছে ছাগ বলি উৎসর্গীকৃত করে । এছাড়া জ্যৈষ্ঠে দশহরা, জয়মঙ্গলবার , আষাঢ় মাসের কৃষ্ণপক্ষের নাগপঞ্চমী তিথি , বিপত্তারিনী ব্রত, শ্রাবণ মাসের সংক্রান্তি ও ভাদ্র সংক্রান্তিতেও অরন্ধনের দিনেও মায়ের বিশেষ পূজা হয়। শ্রাবণ মাসের সংক্রান্তির দিনে মা বিষহরির প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে পোলবার মা বিষহরির মন্দিরে বিশেষ পূজানুষ্ঠান ও হোমযজ্ঞ হয় । মা বিষহরির আদি থানে চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের শনি বা মঙ্গলবার তিথি ধরে চিঁড়ে ভিজা নাম এক বিশেষ উৎসব হয় । এই দিন ভক্তরা তাদের আত্মীয় পরিজনদের নিয়ে মায়ের মন্দিরে এসে পূজা দিয়ে মন্দির প্রাঙ্গনে চিঁড়ে ভিজিয়ে ফলাহার করেন ও মন্দির প্রাঙ্গনে নানা রকমের তরকারী রান্না করে বন ভোজনের মতো করে উৎসব পালন করে। তবে কোনো প্রকারের অন্ন বা আমিষ খাবার রান্না হয় না । এই মন্দিরের অনেক অলৌকিক কাহিনী আছে , একবার মা বিষহরির আদি থান থেকে মায়ের বাহন কিছু নাগ কে এক সাপুড়ে তুলে নিয়ে যায়, সেই রাত্রেই দেবী তাকে স্বপ্নাদেশ দেন যে তার বাহনদের দেবীর থানে রেখে আসতে ও দেবীর কোপে পরার ভয়ে সেই রাতেই সাপুড়ে সেই সাপেদের দেবী থানে নিয়ে এসে মুক্ত করে । একবার এক রাখাল বালক দেবীর থানের পাশের এক আলু ক্ষেতে আলু তুলছিল তাকে এক সাপ দংশন করে , তাকে তার সঙ্গীরা সবাই দেবীর থানে তক্ষুনি নিয়ে আসে ও দেবীর পবিত্র বেদীর মাটি লাগিয়ে দেয় তাকে পূজারী ও দেবীর কৃপায় সে সুস্থ হয়ে ওঠে । এমনই অনেক মাহাত্ম্য কাহিনী রয়েছে পোলবার দেবী বিষহরির । মা বিষহরির মন্দির খোলে সকাল সাড়ে ছয় টা তে ও বন্ধ হয় দুপুর ১ টা নাগাদ ও বিকেলে সন্ধ্যা সাড়ে ছয় টা তে খোলে সন্ধ্যা সাড়ে সাত টায় সন্ধ্যারতির পরে রাত সাড়ে আট টায় মন্দির বন্ধ হয় ও মায়ের আদি থানের মন্দির খোলে সকাল সাড়ে আট টা তে ও বন্ধ হয় সকল ১১ টা নাগাদ তবে শনি ও মঙ্গলবারে ১ টা অবধি খোলা থাকে । ওই দিন বেশী ভক্ত সমাগম হয় মন্দিরে । বিকেলে সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচ টা তে খোলে সন্ধ্যা ছয় টায় সন্ধ্যারতির পরে সাড়ে ছয় টায় মন্দির বন্ধ হয় । দুই থানেই প্রতিদিন মায়ের কাছে অন্নভোগ হয় না ।প্রতিদিন সকালে দুধ, কলা, ফল, মিষ্টি, চালের নৈবেদ্য দিয়ে পূজা ও ভোগরাগ হয় । সন্ধ্যায় মিষ্টি জল দিয়ে মায়ের শীতলভোগ হয় । এই মন্দিরে আসতে গেলে হাওড়া থেকে বর্ধমান , কাটোয়া ও ব্যান্ডেলগামী রেলযোগে চুঁচুড়া স্টেশন নেমে সেখান থেকে পোলবাগামী টেকার ধরে সরাসরি মায়ের মন্দিরে ও মায়ের আদি থানে পৌঁছানো যায় । এই ভাবেই যুগ যুগ ধরে পোলবার মা বিষহরি ভক্তদের তাঁর কৃপা প্রদান করে চলেছেন ।
🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷🪷
🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏
শুভ নাগপঞ্চমী ১৪৩৩
শুভ নাগপঞ্চমী ১৪৩৩ এ পোলবার দেবী বিষহরী মাতার মহাপুন্য দর্শন
স্থান : মা বিষহরী মন্দির ( পোলবা )
©Koushick Banerjee
Do not post these picture without prior permission