08/09/2025
শিক্ষক দিবস -শেষ পর্ব
স্কুলে থাকতেই একটু আধটু অভিনয় করতাম, তবে যাদবপুরে পুনর্মিলন উৎসব উপলক্ষে মঞ্চস্থ হলো "ভুশুন্ডির মাঠ " যেখানে আমার প্রথম পরিচালক ছিলেন সুদর্শনদা। অসম্ভব ধৈর্য আর অধ্যাবসায় নিয়ে তিনি প্রতিটি অভিনেতাকে অভিনয় শেখাতেন। আমি ছিলাম নেত্যকালী আর যাঁরা এই গল্পটি পড়েছেন, তাঁরা জানেন, কি প্রবল প্রতাপের দজ্জাল চরিত্র এই নেত্যকালী। নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার পরে যে হাত তালির ঝড় বয়েছিল, আমি আনন্দে সুদর্শনদাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম আর তিনি পরম স্নেহে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন। ওই নাটকের রেশ আরও বেশ কিছু বছর ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের মধ্যে থেকে গেছিল; এমনকি প্রফেসররা আমায় নেত্যকালী বলেও সম্বোধন করতেন। আমি জানি, এর পুরো কৃতিত্ব আমার প্রথম গুরুর।
থিয়েটারে যখন হাতেখড়ি দিলাম তখন বিপ্লবদাকে (শ্রী বিপ্লব বোস) পেলাম। প্রথম দিন থেকেই দাদা আমাকে কেন জানিনা কন্যাসম দেখত যদিও তখন দাদা একেবারে যুবক। সেই যে পুঁচকি বলা শুরু করলো, আজও সেটাই বরাদ্দ আছে। নাহ্, বড় হওয়া আমার আর হলো না!! অথচ আমার প্রথম মঞ্চস্থ হওয়া নাটকে বিপ্লবদা আমাকে এক ৬০ বছরের মহিলার রোল দিয়েছিল। কারণ দাদা জানত , ১৮ বছরের আমি এটা পারবো। গুরুই হয়তো এগুলো বুঝতে পারে। এরপর এলো সৈকতদা (শ্রী সৈকত মুখোপাধ্যায়)। সৈকতদা আর পুরো গ্রুপ আমায় ছুটকি বলতো কিন্তু ভারী রোল দিত। কি অদ্ভুত ব্যবস্থা ভাবো একবার! কিন্তু ওই যে বললাম, গুরুই হয়তো বোঝেন কে কতটা পারবে।
আরও দুইজন মানুষের নাম নিয়ে এই প্রসঙ্গ শেষ করব। আমার আরও দুই পরিচালক শ্রী রূপঙ্কর সরকার আর শ্রী কাশীনাথ চক্রবর্তী। দুই জনেই অনেক সিনিয়র কিন্তু মাটির উপর দিয়ে চলা মানুষ। কাশীদাকে আমরা জুলাই মাসে হারিয়েছি। যোগাযোগ ছিল what's app এ, কখনও সুন্দর গান, কখনও বাড়ির সমস্যা, কখনও শরীরের গোলযোগ এইসব কথা দিয়ে। কিন্তু তেমন কিছু আর আসবে না জানি।
চাকরি থেকে ছুটি নেওয়ার পরেই সুযোগ এসে গেছিল bridal কলকা শেখার। শিক্ষিকা শ্রীমতি পূজা অধিকারী থাকেন সেই মহেশতলায়, আমার বাড়ি থেকে অনেক দূরে। তবু চলে যেতাম নিয়ম করে ক্লাস করতে। পূজা বয়সে আমার থেকে অনেকটাই ছোট কিন্তু আমার কাছে শিক্ষকের বয়স গুরুত্বপূর্ণ নয়। যাই হোক, আমার চেহারার কারণেই হয়তো, পূজা আমায় অনেক ছোট ভেবেছিল এবং আমায় নাম ধরেই ডাকত আর আমিও কিছু বলিনি। কোনো এক ক্লাসে আচমকাই সে জানতে পারে আমার আসল বয়স এবং সঙ্গে সঙ্গে আমার কাছে ক্ষমা চেয়ে দিদি বলে সম্বোধন করা শুরু করে। শিক্ষা যে মানুষকে বিনয়ী করে, পূজা তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। তার সাথে শিক্ষক আর ছাত্রের এই পারস্পরিক সম্মানও একটা সম্পর্কের ভিতকে অনেক মজবুত করে। পূজার কাছে পরে আমি অনলাইন রেসিনও শিখেছি। কি অসীম ধৈর্য আর আগ্রহ নিয়ে ও প্রতিটি ছাত্রকে কাজ শেখায় সেটাও শিক্ষণীয়।
অনেক কিছু লিখে ফেললাম আবার হয়তো কেউ বাদ গেলেন। শেষটুকু বলে যাই, কে বলতে পারে হয়তো এটাই show stopper হয়ে যাবে।
ছোট থেকেই আমার এক "বিটকেল" স্বভাব, কিছুতেই আমি সব প্রশ্নের উত্তর লিখতাম না। উত্তর জানি, প্রশ্ন common তবু লিখব না। কারণ আমার ভালো লাগছিল না বা আমার হাত ব্যথা করছিল ইত্যাদি ইত্যাদি। নিচু ক্লাসে বুদ্ধি যখন কাঁচা, তখন শুধু যে যে প্রশ্ন লিখেছি তাতে tick mark দিতাম। স্কুল থেকে বেরোলে বা বাড়ি ফিরলেই মাতৃদেবীর interrogation শুরু। প্রশ্ন কেমন ছিল, কত উত্তর দিয়েছি ইত্যাদি ইত্যাদি। এই বার যখন প্রশ্নপত্র মিলাতে বসেছে, tick mark আর আমার দেওয়া উত্তরে গোঁজামিল ধরা পড়ে গেছে। ব্যস, হাড়ে মজ্জায় টের পাওয়া সেই প্রবচন " চুরি বিদ্যা মহা বিদ্যা, যদি না পড় ধরা"। যখন বুদ্ধির চুল পাকলো, তখন উত্তর লেখার অভ্যেস বজায় রেখে tick mark দেওয়ার কায়দা পাল্টে ফেললাম। অর্থাৎ, সব উত্তর দিয়েছি। ব্যস এবার কত জেরা করবে করো। কিন্তু ভুলে যেতাম, একে ইনি আমার জন্মদাত্রী, আমি ওনার নই, তার ওপর আবার উনি সম্ভবত শার্লক হোমসের দত্তক প্রপৌত্রী। তাই স্কুলে খাতা দেখালে, বাবা বা মায়ের সই করে নিয়ে যাওয়ার বা রেজাল্ট বেরোনোর সময় মা আরামসে ধরে ফেলতেন আমার গুলগুলো। ভাগ্যিস তখন আলাদা গুল কেনা হত উনুন জ্বালানোর জন্য আর কেরোসিন স্টোভেও রান্না হত নাহলে যে কি হতো!
এছাড়াও ছিল মায়ের পড়া ধরা। বিশ্বাস করবে তোমরা, মাস্টার ডিগ্রী পর্যন্ত মা আমার পড়া ধরতেন। সেটা ক্লাস টেস্ট না ফাইনাল, দেখার দরকার নেই। রাতের বেলায় সমস্ত পড়া মাকে দিতে হতো। ছোট, মেজো, সেজো, কুটটি এমনকি রচনাভিত্তিক। শুধু MBA-র সময় আমি রেহাই পেয়েছিলাম আর মা দুঃখ। তাও মা আমায় বারবার জিজ্ঞাসা করেছিল, ওই বিষয়ে পড়া ধরা যাবে কিনা। বলেছিলাম, মা এবারটা ছেড়ে দাও, আমি ম্যানেজ করে নেবো! কিন্তু ওই যে সব প্রশ্নের উত্তর না দেওয়ার আমার অভ্যেস মাকে যে মানসিক ভাবে কত ভীত করে দিয়েছিল সেটা আগে বুঝিনি। তাই মা আমার উচ্চ মাধ্যমিকের পরেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ বছর, MBA এর ১ বছর এবং গানের পরীক্ষার ৮ (৫+৩) বছর, প্রতিটা পরীক্ষা দিয়ে বেরোনোর পর প্রথম প্রশ্ন করে," সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিস? কোনোটা ছাড়িসনি তো?" তার পরে জিজ্ঞেস করে পরীক্ষা কেমন হয়েছে। তোমরাই বুঝে দেখ, এইভাবে কি ছাত্রদশা ঘোচানো যায়!!!!
**অনিল স্যার,বোচনদি আর সুদর্শনদার ছবিও আমার কাছে নেই। সৈকতদা আর রূপঙ্করদার ছবি fb থেকে ধার করলাম, আশা করি ওনারা মার্জনা করবেন ।
শেষ!!