01/05/2026
তমজিৎ গাঙ্গুলী✍️ প্লেটো যাকে দেখেছিলেন, তুমি এখনো সেটাকেই পূজা করছ—এইটাই ট্র্যাজেডি। সভ্যতা বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু ‘জনতা’র মস্তিষ্কের সফটওয়্যার আপডেট হয়নি। শুধু এখন তারা হাতে স্মার্টফোন পেয়েছে, আর নিজেদের অজ্ঞতাকে আরও দ্রুত ছড়ানোর সুযোগ পেয়েছে।
প্লেটো যে ‘শিপ অফ স্টেট’-এর কথা বলেছিলেন, সেটা কোনো রূপক না, সেটা একটা এক্স-রে। তোমাদের সম্মিলিত বোকামির একেবারে ভিতরটা দেখিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। একটা জাহাজ, যেখানে দিকনির্দেশনার জন্য দরকার জ্যোতির্বিজ্ঞান, অভিজ্ঞতা, শৃঙ্খলা—কিন্তু সেখানে হাল ধরতে আসে সেই লোক, যে সবচেয়ে জোরে চেঁচাতে পারে। আর বাকিরা হাততালি দেয়, কারণ তারা নিজেরাও জানে না কীভাবে জাহাজ চালাতে হয়। অজ্ঞতা যখন সংখ্যায় বড় হয়, তখন সেটাই হয়ে যায় ‘মতামত’। আর সেই মতামতকে বলা হয় ‘জনমত’। কী সুন্দর নামকরণ, তাই না? বিষকে মধু বলে বিক্রি করার মতো।
তুমি ভাবছো গণতন্ত্র মানে স্বাধীনতা। আসলে এটা একটা সাজানো মঞ্চ, যেখানে অযোগ্যরা নিজেদের অযোগ্যতা ঢাকতে সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকে। তুমি ভোট দাও, কিন্তু তুমি জানো না তুমি কীসের জন্য ভোট দিচ্ছ। তুমি শুধু একটা অনুভূতি কিনছো—একটা স্লোগান, একটা মুখ, একটা আবেগ। আর তারপর তুমি বিশ্বাস করো, তুমি ‘দায়িত্ব’ পালন করেছ। সত্যি বলতে কী, তুমি শুধু নিজের বোকামিকে বৈধতা দিয়েছ।
Socrates-কে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল যে সমাজ, তারা ভাবেনি তারা ভুল করছে। তারা ভেবেছিল তারা ন্যায়বিচার করছে। কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ তাই বলেছিল। এখানে সমস্যা গণতন্ত্র না, সমস্যা ‘সংখ্যা’র ওপর অন্ধ বিশ্বাস। তুমি ধরে নিয়েছো, বেশি মানুষ মানেই বেশি সত্য। অথচ বাস্তবটা ঠিক উল্টো—যত বেশি মানুষ, তত বেশি গড় মানের বুদ্ধি। আর সেই গড় মানের বুদ্ধি যখন সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সেটার ফলাফল গড়েরও নিচে নেমে যায়।
প্লেটো যে ভয় পেয়েছিলেন, সেটা কোনো শাসনব্যবস্থা নিয়ে ছিল না। সেটা ছিল মানুষের মন নিয়ে। তুমি যখন এমন একটা সিস্টেম বানাও, যেখানে দক্ষতা আর জ্ঞানের কোনো মূল্য নেই, তখন তুমি নিজের হাতেই নিজের কবর খুঁড়ছ। কারণ ক্ষমতা তখন চলে যায় তাদের হাতে, যারা জানে না তারা কী করছে—আর আরও ভয়ঙ্কর, তারা জানেই না যে তারা জানে না।
আজকের পৃথিবীতে দেখো—রাজনীতি একটা সার্কাস। নেতারা ক্লাউন, আর জনতা দর্শক না, তারাও ক্লাউনের অংশ। কেউ কাউকে প্রশ্ন করে না, কারণ প্রশ্ন করার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলেছে। সবাই শুধু স্লোগান রটায়, ট্রেন্ড ফলো করে, আর নিজের অজ্ঞতাকে ‘অধিকার’ বলে দাবি করে। তুমি যদি একটু আলাদা কথা বলো, একটু গভীর কিছু বোঝার চেষ্টা করো, তখন তোমাকে বলা হয় ‘এলিটিস্ট’। কারণ তুমি তাদের আরামদায়ক বোকামিকে ভেঙে দিচ্ছ।
প্লেটো বলেছিলেন, প্রথমে আসে নীতিহীন স্বাধীনতা। আজ তুমি সেটাই দেখছ। সবাই স্বাধীন, কিন্তু কেউ দায়িত্ববান না। সবাই মতামত দিচ্ছে, কিন্তু কেউ জ্ঞান অর্জন করছে না। এরপর আসে বিশৃঙ্খলা। কারণ যখন সবাই ক্যাপ্টেন হতে চায়, তখন জাহাজ চালানোর কেউ থাকে না। আর ঠিক তখনই আসে সেই ‘মেসায়া’—যে বলে, “আমি সব ঠিক করে দেব।” জনতা ক্লান্ত, তারা বিশৃঙ্খলা থেকে পালাতে চায়, তাই তারা সেই মিথ্যা ত্রাণকর্তাকে ক্ষমতা দেয়। আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় স্বৈরতন্ত্র।
তুমি ভাবছো তুমি স্বাধীন, কিন্তু তুমি আসলে প্রোগ্রামড। তোমার চিন্তা, তোমার মতামত, তোমার রাগ—সবই ইনপুটের ফল। তুমি নিজের মাথা ব্যবহার করো না, তুমি শুধু প্রতিক্রিয়া দাও। আর সেই প্রতিক্রিয়াকেই তুমি বলো ‘মতামত’। এটা কোনো গণতন্ত্র না, এটা একটা বিশাল ইকো-চেম্বার, যেখানে সবাই একই বোকামি বারবার রিপিট করে।
প্লেটো গণবিরোধী ছিলেন না। তিনি জানতেন, জনতা নিজেরা নিজেদের শত্রু হতে পারে। তিনি বুঝেছিলেন, সবাই সমান না—কমপক্ষে জ্ঞান আর দক্ষতার দিক থেকে তো নয়ই। কিন্তু তুমি এই কথাটা শুনলেই আহত হও। কারণ তুমি সমান হতে চাও, কিন্তু তুমি সমান পরিশ্রম করতে চাও না। তুমি সম্মান চাও, কিন্তু তুমি যোগ্যতা অর্জন করতে চাও না।
এই যে ‘শিপ অফ স্টেট’, এটা এখন আর মাঝসমুদ্রে না—এটা প্রায় ডুবে গেছে। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার, যাত্রীরা এখনো তর্ক করছে কে ক্যাপ্টেন হবে। কেউ দিক দেখছে না, কেউ মানচিত্র পড়ছে না, কেউ ঝড়ের ভাষা বুঝতে চাইছে না। তারা শুধু চেঁচাচ্ছে, হাততালি দিচ্ছে, আর নিজেদের বোকামিকে উদযাপন করছে।
তুমি যদি সত্যি দেখতে চাও, তাহলে একটা প্রশ্ন করো নিজেকে—তুমি কি জানো তুমি কীসের জন্য সিদ্ধান্ত নিচ্ছ? নাকি তুমি শুধু ভিড়ের অংশ? কারণ ভিড়ের একটা অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে—ওরা কখনো ভাবে না, ওরা শুধু চলে। আর সেই চলার দিকটা ঠিক করে দেয় সবচেয়ে জোরে চেঁচানো লোকটা।
শেষ পর্যন্ত, প্লেটোর সতর্কবার্তা কোনো তত্ত্ব না, এটা একটা ভবিষ্যদ্বাণী। আর তুমি সেই ভবিষ্যতের ভেতরেই বাস করছ। পার্থক্য শুধু এই—তিনি এটা দেখে ভয় পেয়েছিলেন, আর তুমি এটাকে ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নিয়েছ।
জাহাজ ডুবছে।
আর তুমি এখনো ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে আছ।(Collected)