12/08/2026
Plassey fell silent, but its betrayal still echoes through Bengal’s history.
*পলাশীর ছায়া*
(একটি হারিয়ে যাওয়া বাংলার দীর্ঘশ্বাস)
✍️ সেখ আব্দুল জব্বার।
লন্ডন, ২২ নভেম্বর ১৭৭৪।
কুয়াশায় ঢাকা এক বিষণ্ণ শীতের সকাল।
ইংল্যান্ডের আকাশে সেদিন হয়তো সূর্য উঠেছিল, কিন্তু ইতিহাসের এক অদ্ভুত পরিহাস, যে মানুষ একদিন বাংলার আকাশে নিজের বিজয়ের পতাকা উড়িয়েছিলেন, তাঁর নিজের জীবনের আকাশ তখন ক্রমশ অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছিল।
মাত্র ৪৯ বছর বয়সে থেমে গেল রবার্ট ক্লাইভের জীবন।
একসময় যার নাম ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছে ছিল বীরত্ব, বিজয় ও সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রতীক, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই মানুষটিই দাঁড়িয়ে ছিলেন বিতর্ক, অভিযোগ, বিপুল সম্পদ এবং নৈতিক প্রশ্নের নির্মম কাঠগড়ায়।
তাঁর মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরে আত্মহত্যার বর্ণনা প্রচলিত। তবে শেষ মুহূর্তের সঠিক পরিস্থিতি নিয়ে কিছু অনিশ্চয়তা ও বিতর্ক আজও রয়ে গেছে।
কিন্তু ক্লাইভের মৃত্যুর চেয়েও দীর্ঘ ছিল তাঁর রেখে যাওয়া ছায়া।
কারণ একজন মানুষের জীবন শেষ হয়ে যেতে পারে,
কিন্তু কখনও কখনও তার কর্মকাণ্ডের প্রতিধ্বনি একটি ভূখণ্ডের ইতিহাসে শতাব্দীর পর শতাব্দী বেঁচে থাকে।
রবার্ট ক্লাইভের গল্প তাই কেবল একজন ইংরেজ সেনানায়কের গল্প নয়।
এটি বাংলার এক হারিয়ে যাওয়া বিকেলের গল্প।
এটি বিশ্বাসঘাতকতার গল্প।
এটি ক্ষমতার গল্প।
এটি লোভ ও সাম্রাজ্যের গল্প।
আর সবচেয়ে বেশি,
এটি এক তরুণ নবাবের করুণ পরিণতির গল্প।
পলাশীর আগে,
একসময় বাংলা ছিল সমৃদ্ধির এক বিস্ময়কর ভূখণ্ড।
গঙ্গা-পদ্মা-মেঘনার জলধারায় ভেসে যেত নৌকা।
গ্রামের মাঠে দুলত ধানের শীষ।
তাঁতির আঙুলে জন্ম নিত সূক্ষ্ম মসলিন।
বাজারে জমত দেশি-বিদেশি বণিকের ভিড়।
বাংলার সম্পদ বহু দূরের ইউরোপীয় বণিকদের চোখে লোভের আলো জ্বেলে দিয়েছিল।
পর্তুগিজ এসেছিল, ডাচ এসেছিল, ফরাসি এসেছিল, ইংরেজও এসেছিল।
তারা এসেছিল বাণিজ্যের নামে।
কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম অধ্যায়গুলো কখনও কখনও শুরু হয় খুব নিরীহ একটি শব্দ দিয়ে,
ব্যবসা।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও এসেছিল ব্যবসা করতে।
কিন্তু ধীরে ধীরে তারা বুঝতে শুরু করল,
বাংলার সম্পদ শুধু কেনাবেচার জন্য নয়,
বাংলার রাজনৈতিক দুর্বলতা ব্যবহার করেও অর্জন করা যায়।
আর সেই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন রবার্ট ক্লাইভ।
সিরাজ,এক তরুণ নবাবের স্বপ্ন,
১৭৫৬ সালে বাংলার সিংহাসনে বসেন সিরাজউদ্দৌলা।
তিনি ছিলেন তরুণ।
তাঁর বয়সের সঙ্গে নবাবির ভার যেন অসম্ভব ভারী হয়ে এসেছিল।
চারদিকে ষড়যন্ত্র।
দরবারে অসন্তোষ।
ক্ষমতালোভী অভিজাত।
বিদেশি বণিকের বাড়তে থাকা দুঃসাহস।
সিরাজ বুঝেছিলেন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আর কেবল ব্যবসায়ী নেই।
তারা নিজেদের দুর্গ শক্তিশালী করছে, অস্ত্র জমাচ্ছে, রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াচ্ছে এবং নবাবের কর্তৃত্বকে অগ্রাহ্য করছে।
সিরাজ সেই অবাধ্যতা মেনে নেননি।
কলকাতা দখল করলেন তিনি।
কিন্তু সেই বিজয় বেশিদিন স্থায়ী হলো না।
রবার্ট ক্লাইভ ফিরে এলেন।
আর এবার তাঁর হাতে শুধু সৈন্য ও কামান ছিল না,
ছিল মানুষের দুর্বলতা বোঝার এক ভয়ংকর রাজনৈতিক দক্ষতা।
পলাশীর সেই দিন
২৩ জুন ১৭৫৭।
পলাশীর প্রান্তর।
বর্ষার আকাশে মেঘ জমেছিল।
মাটিতে ছিল যুদ্ধের উত্তেজনা।
নবাবের বাহিনী ছিল বিপুল।
ক্লাইভের বাহিনী তুলনায় অনেক ছোট।
সংখ্যার বিচারে পলাশীর যুদ্ধ যেন অসম যুদ্ধ হওয়ার কথা।
কিন্তু ইতিহাস কখনও শুধু সংখ্যায় লেখা হয় না।
পলাশীর যুদ্ধের আসল অস্ত্র ছিল,
বিশ্বাসঘাতকতা।
নবাবের শিবিরের ভেতরেই তখন জন্ম নিয়েছে সন্দেহের অন্ধকার।
মীরজাফর, জগৎশেঠসহ প্রভাবশালী মহলের নানা স্বার্থ ও ষড়যন্ত্র পরিস্থিতিকে এমন এক পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়, যার ফল বাংলা আর আগের মতো থাকেনি।
সিরাজ হয়তো তখনও জানতেন না, যে সৈন্যবাহিনীকে তিনি নিজের বলে বিশ্বাস করছেন,
তারই একাংশের আনুগত্য ইতিমধ্যে অন্য কারও কাছে বন্ধক পড়ে গেছে।
যুদ্ধ শুরু হলো।
কামান গর্জে উঠল।
ধোঁয়ায় ঢেকে গেল পলাশীর আকাশ।
কিন্তু যে যুদ্ধ সাহস ও অস্ত্রের শক্তিতে জেতার কথা ছিল, তা ধীরে ধীরে পরিণত হলো নীরব বিশ্বাসঘাতকতার এক নিষ্ঠুর নাটকে।
নবাবের শক্তি ছিল বিপুল।
কিন্তু সেই শক্তির হৃদয়ের ভেতরেই ছিল ফাটল।
আর সেই ফাটল দিয়েই ঢুকে পড়ল ক্লাইভের বিজয়।
হারলেন সিরাজ, জিতল কারা?
পলাশীর যুদ্ধ শেষ হলো।
কিন্তু সত্যিকার অর্থে সেদিন শুধু সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হননি।
পরাজিত হয়েছিল বাংলার রাজনৈতিক স্বাধীনতার এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
মীরজাফর সিংহাসনে বসলেন।
কিন্তু সেই সিংহাসনের প্রকৃত ক্ষমতা ধীরে ধীরে অন্য কারও হাতে চলে যেতে লাগল।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বুঝে গেল,
বাংলাকে শাসন করতে সবসময় নিজের মুকুট দরকার হয় না।
কখনও একটি দুর্বল নবাবই যথেষ্ট।
আর তার পেছনে যদি থাকে কামান, অর্থ এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র,
তাহলে একটি বাণিজ্যিক কোম্পানিও রাজদণ্ড হাতে নিতে পারে।
সিরাজের শেষ রাত
কিন্তু পলাশীর সবচেয়ে বিষাদময় অধ্যায় তখনও শেষ হয়নি।
পরাজিত সিরাজ পলাশীর মাটি ছেড়ে পালিয়ে গেলেন।
যে তরুণ কিছুদিন আগেও ছিলেন বাংলার নবাব, সেই মানুষটি তখন নিজের রাজ্যেই হয়ে গেলেন এক পলাতক মানুষ।
কোথায় যাবেন?
কাকে বিশ্বাস করবেন?
কার দরজায় আশ্রয় চাইবেন?
যে দরবারে একদিন তাঁর সামনে মাথা নত করত অসংখ্য মানুষ, সেই দরবারই তখন তাঁর জন্য হয়ে উঠেছিল মৃত্যুর ফাঁদ।
সিরাজ মুর্শিদাবাদ থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
ইতিহাসের নির্মম পরিহাস,
একসময় যিনি ছিলেন বাংলার সিংহাসনের অধিকারী, শেষ পর্যন্ত তাঁকে আশ্রয়ের জন্য ঘুরতে হয়েছিল অচেনা পথের ধুলোয়।
তিনি ধরা পড়লেন।
আর তারপর,
বাংলার ইতিহাসে নেমে এল এক গভীরতম রাত।
১৭৫৭ সালের জুলাই মাসে, মুর্শিদাবাদে সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করা হয়। তাঁর মৃত্যুর পেছনে মীরজাফরের পুত্র মীরনের নির্দেশ ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা ছিল।
এক তরুণ জীবন,
যে জীবন হয়তো ভুল করেছে,
যে জীবন হয়তো আবেগে সিদ্ধান্ত নিয়েছে,
যে জীবন হয়তো রাজনীতির কঠিন খেলায় পরাজিত হয়েছিল,
কিন্তু তার শেষটা ছিল ভয়াবহ।
সিংহাসন হারানোর পর তিনি হারালেন আশ্রয়।
আশ্রয় হারানোর পর হারালেন জীবন।
আর জীবন হারানোর পর তিনি হয়ে রইলেন ইতিহাসের এক অমোচনীয় বেদনা।
কত রাত বাংলার আকাশে চাঁদ উঠেছিল তাঁর মৃত্যুর পর!
কত নদী তখনও আগের মতো বয়ে গেছে!
কত কৃষক পরদিন সকালে মাঠে গিয়েছেন!
কত ঘরে চুলায় ভাত বসেছে!
কিন্তু কেউ কি জানত,
একটি যুগ শেষ হয়ে গেছে?
পলাশীর পর ক্লাইভ
অন্যদিকে ইতিহাসের অন্য প্রান্তে তখন উঠছে এক নতুন নক্ষত্র।
রবার্ট ক্লাইভ।
পলাশী তাঁকে শুধু বিজয় দেয়নি,
দিয়েছিল বিপুল ক্ষমতা, সম্পদ এবং রাজনৈতিক প্রভাব।
তিনি বুঝেছিলেন, বাংলার অর্থনৈতিক শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে রাজনৈতিক ক্ষমতাও ধীরে ধীরে হাতের মুঠোয় চলে আসবে।
১৭৬৫ সালে তাঁর দ্বিতীয় ভারত-অভিযানের সময় মুঘল সম্রাট শাহ আলম দ্বিতীয়ের কাছ থেকে কোম্পানি বাংলার দেওয়ানি লাভ করে।
বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার রাজস্ব আদায়ের অধিকার কোম্পানির হাতে চলে গেল।
এটি ছিল ইতিহাসের এক ভয়ংকর মোড়।
কারণ এখন কোম্পানির হাতে শুধু বন্দুক ছিল না,
ছিল বাংলার রাজস্বের চাবিকাঠি।
দূরের কোনো শহরের প্রাসাদে বসে নেওয়া সিদ্ধান্তের অভিঘাত এবার পৌঁছে গেল বাংলার গ্রামের কুঁড়েঘর পর্যন্ত।
কৃষকের ঘাম থেকে উঠে আসা অর্থ প্রবাহিত হতে লাগল কোম্পানির কোষাগারের দিকে।
একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে হয়ে উঠল রাজস্ব সংগ্রাহক।
তারপর রাজনৈতিক শক্তি।
তারপর শাসক।
আর বাংলার স্বাধীন আকাশে নেমে এল উপনিবেশের দীর্ঘ ছায়া।
সম্পদের পাহাড় , প্রশ্নের ঝড় এবং
ক্লাইভের ব্যক্তিগত সম্পদ নিয়েও ব্রিটেনে তীব্র প্রশ্ন উঠেছিল।
ভারত থেকে বিপুল সম্পদ অর্জন তাঁকে যেমন ধনী করেছিল, তেমনই তাঁকে পরিণত করেছিল বিতর্কের কেন্দ্রে।
নিজের সম্পদের প্রসঙ্গে তাঁর বহুল আলোচিত মন্তব্য,
“At this moment I stand astonished at my own moderation!”
এই বাক্য আজও ইতিহাসের পাতায় এক অদ্ভুত প্রতিধ্বনি হয়ে আছে।
কেউ সেখানে দেখেন তাঁর আত্মপক্ষসমর্থন।
কেউ দেখেন ক্ষমতার যুগে সম্পদের নৈতিক সংকট।
আর কেউ দেখেন, একটি দেশের সম্পদ অন্য দেশের ক্ষমতার ভিত নির্মাণে কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল তার প্রতীক।
তারপর ফিরে আসে পলাশী
বছর কেটে গেল।
পলাশীর মাঠে ঘাস গজাল।
বর্ষা এল, শরৎ এল, হেমন্ত এল।
কিন্তু ইতিহাসের ক্ষত শুকোল না।
আজ সিরাজ নেই,
মীরজাফরও ইতিহাসের পাতায় এক কলঙ্কিত নাম হয়ে রইলেন।
আর ক্লাইভ?
তিনি ফিরে গেলেন ইংল্যান্ডে।
সাম্রাজ্যের কাছে তিনি ছিলেন বিজয়ী।
কিন্তু তাঁর বিজয়ের পেছনে যে রক্ত, ষড়যন্ত্র, সম্পদ ও বিতর্ক জমে ছিল, সেগুলো তাঁকে শেষ পর্যন্ত অনুসরণ করেছিল।
জীবনের শেষদিকে তিনি সমালোচিত হলেন।
তাঁর সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন উঠল।
তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠল।
আর একদিন,
২২ নভেম্বর ১৭৭৪।
লন্ডনে তাঁর জীবন থেমে গেল।
একজন মানুষ চলে গেলেন।
কিন্তু পলাশীর গল্প রয়ে গেল।
লন্ডনের কুয়াশা থেকে পলাশীর মাটি, ভাবতে বড়ো অবাক লাগে,
এক প্রান্তে লন্ডনের শীতল কুয়াশা।
অন্য প্রান্তে বাংলার উষ্ণ, সোঁদা মাটি।
দুই ভূখণ্ডের মাঝখানে পড়ে আছে ইতিহাসের এক দীর্ঘ সেতু।
সেই সেতুর এক প্রান্তে রবার্ট ক্লাইভ।
অন্য প্রান্তে সিরাজউদ্দৌলা।
একজনের জীবনে পলাশী এনে দিল উত্থান।
অন্যজনের জীবনে পলাশী এনে দিল পতন।
একজনের নাম ইতিহাসে বিজয়ের সঙ্গে লেখা হলো।
অন্যজনের নাম লেখা হলো পরাজয় ও করুণ পরিণতির পাশে।
কিন্তু ইতিহাস কি এত সরল?
বিজয়ী হলেই কি কেউ ন্যায়বান?
পরাজিত হলেই কি কেউ অপরাধী?
নাকি ইতিহাসের সত্য কখনও বিজয়ীর ভাষায় লেখা হয়, আর পরাজিতের কান্না চাপা পড়ে যায় কামানের শব্দে?
আজ পলাশীর প্রান্তরে দাঁড়ালে হয়তো আর কিছুই দেখা যায় না সেই ১৭৫৭-এর মতো।
নেই নবাবের বিশাল শিবির, নেই সৈন্যদের পদধ্বনি।
নেই যুদ্ধের ধোঁয়া, নেই কামানের গর্জন।
শুধু বাতাস আছে, ঘাস আছে, আকাশ আছে।
আর আছে এক অদৃশ্য স্মৃতি।
মনে হয়,
এই মাটির নিচে হয়তো এখনও ঘুমিয়ে আছে সেই দিনের অসংখ্য অশ্রু।
কোনো বাতাস এসে কানে কানে বলে,
“সেদিন শুধু একটি নবাব হারেননি।”
সেদিন হারিয়েছিল একটি সম্ভাবনা।
একটি রাজনৈতিক স্বাধীনতার সম্ভাবনা।
একটি নিজস্ব ভবিষ্যতের সম্ভাবনা।
সিরাজের জন্য এক দীর্ঘশ্বাস
সিরাজউদ্দৌলা ইতিহাসের কাছে হয়তো, নিখুঁত কোনো চরিত্র ছিলেন না।
তাঁর ভুল ছিল, তাঁর দুর্বলতা ছিল।
তাঁর সিদ্ধান্তের সীমাবদ্ধতাও ছিল।
কিন্তু তাঁর মৃত্যুর করুণতা অস্বীকার করার উপায় নেই।
একজন তরুণ নবাব,
যার মাথায় একদিন ছিল রাজমুকুট।
শেষে যার পায়ের নিচে ছিল কেবল পথের ধুলো।
যে মানুষ একদিন হাজার মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করতেন,
শেষে নিজের জীবনটুকুও রক্ষা করতে পারলেন না।
রাজপ্রাসাদ থেকে পলায়ন,
আশ্রয়ের সন্ধান,
বিশ্বাসের মানুষদের হারিয়ে ফেলা,
ধরা পড়া,
আর শেষে নির্মম মৃত্যু,
সিরাজের জীবন যেন ইতিহাসের এক অসমাপ্ত বিষাদগাথা।
কখনও কখনও মনে হয়,
পলাশীর মাটিতে আজও সন্ধ্যা নামলে
দূর কোনো অন্ধকার থেকে এক তরুণ কণ্ঠ ভেসে আসে,
“আমার অপরাধ কী ছিল, আমি কি শুধু আমার বাংলাকে নিজের মতো রাখতে চেয়েছিলাম?”
ইতিহাস তার উত্তর দেয় না।
শুধু নীরব থাকে।
ক্লাইভ—এক মানুষের নাম, নাকি এক যুগের প্রতীক?
রবার্ট ক্লাইভকে তাই শুধু একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখলে পলাশীর ইতিহাস সম্পূর্ণ হয় না।
তিনি ছিলেন সেই সময়ের সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষার এক শক্তিশালী প্রতীক।
তিনি বুঝেছিলেন,
যেখানে রাজনৈতিক বিভাজন আছে, সেখানে বাইরের শক্তি প্রবেশ করতে পারে।
যেখানে ক্ষমতার জন্য মানুষ নিজের মানুষকে বিশ্বাসঘাতকতা করে, সেখানে সাম্রাজ্যের দরজা খুলে যায়।
আর যেখানে বাণিজ্য ও রাজনীতি এক হয়ে যায়, সেখানে একটি কোম্পানিও একদিন রাষ্ট্রের চেহারা নিতে পারে।
ক্লাইভ চলে গেলেন।
কিন্তু তাঁর তৈরি রাজনৈতিক বাস্তবতা আরও বহু বছর বেঁচে রইল।
পলাশীর পর কোম্পানির ক্ষমতা বাড়ল।
দেওয়ানি এল।
রাজস্বের নিয়ন্ত্রণ এল।
তারপর এল আরও বিস্তৃত ব্রিটিশ শাসন।
বাংলার ইতিহাসের আকাশে যে ছায়া পলাশীতে জন্মেছিল,
তা আর সহজে সরে গেল না।
ইতিহাসের শেষ প্রশ্ন
আজ এত বছর পর আমরা যখন পলাশীর দিকে ফিরে তাকাই, তখন সেখানে শুধু একটি যুদ্ধ দেখি না।
দেখি মানুষের দুর্বলতা।
দেখি ক্ষমতার লোভ।
দেখি বিশ্বাসঘাতকতার মূল্য।
দেখি একজন তরুণ নবাবের পতন।
দেখি একজন ইংরেজ সেনানায়কের উত্থান।
দেখি একটি বাণিজ্যিক কোম্পানির সাম্রাজ্যে পরিণত হওয়ার সূচনা।
আর দেখি,
একটি সমৃদ্ধ ভূখণ্ডের আকাশে ধীরে ধীরে নেমে আসা দীর্ঘ উপনিবেশিক অন্ধকার।
ইতিহাস তাই আমাদের কাছে শুধু অতীতের গল্প নয়।
ইতিহাস এক আয়না।
সেই আয়নায় আমরা নিজেদেরও দেখতে পাই।
কারণ সাম্রাজ্য শুধু কামান দিয়ে তৈরি হয় না।
সাম্রাজ্য তৈরি হয় মানুষের বিভক্তি দিয়ে, বিশ্বাসঘাতকতা দিয়ে,লোভ দিয়ে, নীরবতা দিয়ে।
আর কখনও কখনও
নিজেদের ঘরের দরজা নিজেরাই খুলে দিয়ে।
ক্লাইভের মৃত্যু হয়েছিল লন্ডনে।
কিন্তু তাঁর ইতিহাসের একটি অংশ পড়ে রইল বাংলার মাটিতে।
সিরাজের জীবন শেষ হয়েছিল মুর্শিদাবাদের অন্ধকারে।
কিন্তু তাঁর করুণ পরিণতির স্মৃতি বেঁচে রইল বাংলার মানুষের ইতিহাসে।
মীরজাফর ইতিহাসে রেখে গেলেন বিশ্বাসঘাতকতার এক কালো প্রতীক।
আর পলাশী?
পলাশী হয়ে রইল,
একটি শব্দ।
একটি ক্ষত।
একটি দীর্ঘশ্বাস।
একটি হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনার নাম।
আজও যদি কোনো বর্ষার বিকেলে পলাশীর মাঠে বাতাস একটু ধীরে বয়ে যায়, যদি মেঘের আড়াল থেকে সূর্যের আলো হঠাৎ ম্লান হয়ে আসে, যদি ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরে অতীতের কোনো অশ্রুর মতো ঝিলিক দেখা যায় ।
তবে মনে হয়,
ইতিহাস এখনও কথা বলছে।
হয়তো সিরাজের পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে দূরের কোনো অন্ধকার পথে।
হয়তো পলাশীর মাটিতে এখনও ঘুমিয়ে আছে সেই অসমাপ্ত আর্তনাদ।
হয়তো লন্ডনের কুয়াশার ওপার থেকেও ক্লাইভের ছায়া ফিরে তাকাচ্ছে বাংলার দিকে।
আর বাংলা,
চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।
নদী এখনও বয়ে যায়।
ধানের মাঠে এখনও বাতাস খেলে যায়।
মসলিনের গল্প এখনও মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে আছে।
কিন্তু পলাশী আমাদের মনে করিয়ে দেয়,
একটি দেশের স্বাধীনতা হারানোর আগে তার আকাশে সবসময় যুদ্ধের মেঘ জমে না।
কখনও কখনও তার আগে আসে
বিশ্বাসঘাতকতার নিঃশব্দ রাত।
তারপর একটি সকাল আসে,
যে সকালে সূর্য ওঠে ঠিকই,
কিন্তু একটি যুগ আর ফিরে আসে না।
পলাশীর সেই সকালও তেমনই ছিল।
সেদিন সূর্য উঠেছিল।
পাখি ডেকেছিল।
নদী বয়ে গিয়েছিল।
বাংলার মাটিতে মানুষ বেঁচে ছিল।
শুধু ইতিহাসের এক অদৃশ্য দরজা সেদিন চিরতরে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
আর তার ওপারে পড়ে রইল,
এক তরুণ নবাবের অসমাপ্ত স্বপ্ন,
এক বাংলার হারানো স্বাধীন আকাশ,
আর রবার্ট ক্লাইভের দীর্ঘ, অন্ধকার ছায়া।
পলাশীর কামান থেমে গেছে বহুদিন।
কিন্তু তার প্রতিধ্বনি আজও থামেনি।
কারণ কিছু পরাজয় যুদ্ধের ময়দানে শেষ হয় না,
তারা মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকে।
আর কিছু ইতিহাস বইয়ের পাতায় শেষ হয় না,
তারা মাটির গন্ধে, নদীর স্রোতে, বাতাসের দীর্ঘশ্বাসে
শতাব্দীর পর শতাব্দী ফিরে ফিরে আসে।
পলাশী তাই শুধু অতীত নয়,
পলাশী বাংলার স্মৃতিতে এখনও এক দীর্ঘশ্বাস।