09/25/2026
বাংলাদেশে জ্বালানী তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও এর প্রভাব:
ফেব্রুয়ারী ২০২৬ থেকে দাম বাড়ল পেট্রল ৩৭.৯%, অকটেন ৩৭.৫%, কেরোসিন ৩৮.৪%, এবং সবচেয়ে বেশী ব্যবহৃত ডিজেল এর দাম বাড়ল ৩৫%।সর্বশেষ দাম বাড়ায় BPC এর বার্ষিক লোকসান কমবে প্রায় ১০,০০০ কোটি টাকা, তবে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় তাও নাকি লোকসান থাকবে আরও ৩০,০০০ কোটি টাকার মত! আবার এই জ্বালানী তেলের দামে সরকারী বিভিন্ন ট্যাক্স, ভ্যাট ও শুল্ক আছে প্রায় ৩২% এর মত, কিন্তু LNG তে যা ৭.৫% এর মত।
প্রশ্ন হচ্ছে- সর্বশেষ একলাফে ২০ টাকা দাম না বাড়িয়ে শুল্ক কিছুটা কমিয়ে কি এই লোড কমানো যেত না?!
BPC-এর FY2016-FY2025 হিসাব অনুযায়ী গত দশ বছরের মধ্যে ৯ বছর লাভ করেছে এবং মোট cumulative net profit প্রায় ৪৮,৬১৮ কোটি টাকা। সেই লাভের টাকা থেকে কি এক বছরের ভর্তুকি ম্যানেজ করা যেত না?!!
মন্ত্রী বললেন- বিভিন্ন কার্ড প্রকল্পের জন্য খরচ বেড়ে গেয়েছে, সেটা ম্যানেজ করতে তেলের দাম বাড়াতে হয়েছে! কিন্তু প্রতিশ্রুতি মত এই ফান্ড তো ম্যানেজ করার কথা ছিল বিভিন্ন সামাজিক ফান্ডের বাজেট থেকে! ৪১ লাখ মহিলাকে ফ্যামিলি কার্ড দিতে বাজেট ধরা হয়েছে ১৪,৫০০ কোট টাকা। কিন্তু তেলের দাম বাড়িয়ে কেন এটা ম্যানেজ করতে হবে?!
একটা ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষি কার্ড এ দিবেন মাসে ২,৫০০ টাকা, তাও আবার হাতে গোনা কিছু পরিবার পাবে। কিন্তু এই জ্বালানীর দাম বৃদ্ধির ফলে সেই পরিবার সহ অন্যান্য সকল পরিবারের মাসিক খরচ বাড়বে এর থেকে অনেক বেশী। তাতে যারা এই কার্ডের সুবিধাভোগী, তারা পেল দিন শেষে শুভংকরের ফাঁকি, আর যারা এটা পাচ্ছে না- তারা পেল বাড়তি খরচের বোঝা!
জ্বালানী ও বিদ্যুৎ যে কোন দেশের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি ব্যাপার। তাই সকল দেশই স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের পাশাপাশি জ্বালানী খাতে ভর্তুকি দিয়ে থাকে। কারন এটা শরীরের রক্তের মত, দেশের সকল অঙ্গে প্রবাহিত ও বিদ্যমান। যেমন: পরিবহন, উৎপাদন, শিল্পায়ন, বিনিয়োগ এবং ফলাফল মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব।
এবার দেখা যাক এক খাতে দাম বাড়ার প্রভাব কী কী হতে পারে-
সাধারণ পরিবহন ব্যায়: বাস, টেক্সি ইত্যাদির ভাড়া ইতোমধ্যে বেড়ে গিয়েছে, সাধারণ দৈনন্দিক কাজে গাড়ি ব্যবহারর বা যাতায়াত খরচ এখন অনেক বেড়ে যাবে। ফলে সংসার চালাতে একজন সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠবে।
পণ্য পরিবহন ব্যায়: ডিজেলের সাথে এটা সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে ট্রাক, বাস, কাভার্ড ভ্যান, লঞ্চ, ট্রলার সহ সকল পণ্য পরিবহন ব্যায় অনেক বাড়বে।এছাড়া বাঁচতে হলে অন্তত খেতে হবে। ভাল বা মন্দ, দামি বা সস্তা যেটাই হোক না কেন! কিন্তু এর ফলে খাদ্যপণ্য বাজারজাত করা পর্যন্ত প্রতিটি স্থরে বাড়তি দাম যুক্ত হবে, ফলে সংসার বাজেটে টান পড়বে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের।
কৃষি ও সেচ ব্যায়: এমনিতেই বাংলাদেশের কৃষক ন্যায্য মূল্য পায় না, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কৃষক যে সামান্য টাকা পায়, একই পণ্য থেকে তার চেয়ে কয়েকগুন লাভ করে মধ্যস্বত্বভোগীরা বিদ্যমান বাজার ব্যবস্থার কারনে। আর প্রাকৃতিক দূর্যোগ হলে তো কৃষকদের পথে বসতে হয়। এতে কৃষি কাজে দিন দিন মানুষ নিরুৎসাহিত হচ্ছে। এই মূল্য বৃদ্ধির ফলে কৃষি উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাবে, খাদ্য পণ্যের দাম বাড়বে, কৃষক লাভে না থাকলে নিরুৎসাহিত হবার মাত্রা অনেক বাড়বে- যা দেশের খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বিশাল হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
শিল্প ও উৎপাদন: এমনিতেই গ্যাস, বিদ্যুৎ ও দূর্নীতির কারনে শিল্প উৎপাদন নিরবিচ্ছিন্ন হচ্ছে না। এই দাম বাড়ার ফলে উৎপাদন, কাঁচামাল পরিবহন, রেডি পণ্য পরিবহন সহ কয়েক ধাপে খরচ বাড়বে। ফলে ভোক্তার পকেট কাটা যাবে আরেকবার, আর ভয়ংকর ব্যপার হল- রপ্তানিমূখী শিল্পে এই খরচের ফলে পণ্যার দাম বাড়বে, ফলে অর্ডার অন্য দেশে চলে যেতে পারে, কারখানা বন্ধ হলে বেকারত্ব ও বৈদেশিক মুদ্রার উপর চাপ বাড়বে বহুগুন।
নির্মাণ ও অবকাঠামো খাত: আবাসন একটি মৌলিক চাহিদার অন্যতম বিষয়। জ্বালানীর এই দাম বৃদ্ধির ফলে নির্মাণ সামগ্রীর উৎপাদন থেকে পরিবহন, সব ক্ষেত্রে খরচ বাড়বে এবং এর দাম বেড়ে যাবে অনেকগুন, ফলে এই খাতে মন্দা দেখা দিতে পারে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত: ডিজেল ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, ব্যাক-আপ জেনারেটর সাপোর্ট সহ এই খাতের খরচ অনেক বাড়বে, যা ভোক্তাকেই দিতে হবে।
স্বাস্থ্যসেবা খাত: এমনিতেই বাংলাদেশে অন্যতম নাজুক ও ব্যয়বহুল খাত হল স্বাস্থ্যসেবা খাত। বেসরকারী ক্ষেত্রে চিকিৎসক ফি, হাসপাতালের খরচ, বিভিন্ন টেস্ট ফি এবং জীবন রক্ষাকারী ঔষধের ব্যায় বাড়বে, ফলে সেটা সাধারণের আরও নাগালের বাইরে চলে যাবে।
পর্যটন খাত: গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের পর্যটন খাত অনেক বেশী সমৃদ্ধ হয়েছে দেশীয় পর্যটকদের কারনে। দেশের আনাচে কানাচে বেড়েছে এই খাত সম্পর্কিত বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। কিন্তু এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে খরচের চাপ সামাল দিতে অনেকেই ভ্রমণ বাজেট কাট করবেন, এই খাতে খরচ বাড়বে, ফলে স্থবির হবে এই খাত।
নতুন বৈদেশিক বিনিয়োগ: যেকোন ব্যবসায় বিনিয়োগের আগে ইনভেস্টর তার ROI ক্যালকুলেশন করে থাকে। এই দাম বাড়ার কারনে একটা ফ্যাক্টরি নির্মান থেকে পণ্য বাজারজাতের প্রতিটি ক্ষেত্রে খরচ বাড়বে, ফলে তুলনামূলক কম খরচের দেশে তারা আগ্রহী হবে, এতে বৈদেশিক বিনিয়োগ স্থবির হবে এবং তা অন্য দেশে চলে যাবে।
এবার আসা যাক GDP তে এর প্রভাব নিয়ে-
বর্তমান FY2025-26 বাংলাদেশের Nominal GDP প্রায় ৬১.২০ লাখ কোটি। CPD-এর সাম্প্রতিক Structural VAR analysis-এ এর আগের তুলনামূলক ছোট fuel-price shock-এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে মুল GDP প্রায় 0.27–0.34% নিচে থাকার এবং peak impact প্রায় 0.353% হওয়ার হিসাব পাওয়া গেছে।
উৎপাদন কমে যাওয়া, পরিবহন ব্যয়, কৃষি ব্যয়, শিল্পের উৎপাদন খরচ, ভোগ কমে যাওয়া এবং বিনিয়োগ কমে যাওয়ার ফলে যদি মাঝারী output ক্ষতি 0.40% ধরা হয়, তবে তা দাঁড়ায় ২৪,৪৮০ কোটি টাকার মত! BPC এর ১০,০০০ কোটির ভর্তুকি কমানোর জন্য ২০ কোটি মানুষের উপর ২৪,৪৮০ কোটির চাপ তুলে দেয়া কতটা শুভকর হবে, সময়ই হয়তো বলে দিবে।
এখন যদি মুল্যস্ফিতির কথায় আসি- বর্তমানে তা প্রায় ৮.২৬%, জ্বালানী তেলের দাম বাড়ার ফলে তা বেড়ে ৯.৩০% এ যেতে পারে! যা ১.০৪% বেশী, আর এই অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতির কারনে বাংলাদেশের পরিবারগুলোকে বছরে প্রায় ৪৮,০০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হতে পারে! এই দেশের সকল জনগণের এই ব্যয় সামলানোর মত কি অবস্থা আছে?!
আগেই বলেছিলাম জ্বালানী হচ্ছে অর্থনীতিতে রক্তের মত, এর দাম বৃদ্ধির প্রভাব সব ক্ষেত্রে পড়বে। আমি অর্থনীতিবিদ নয়, উনারা হয়তো আরও ভাল বলতে পারবেন। তবে হুট করে এত দাম বাড়ানোর আগে দেশের সনামধন্য অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ নিয়ে, দেশের সাধারণ মানুষের আয় ও সক্ষমতা বিবেচনা করে কতটা বাড়ালে যৌক্তিক হবে, তার প্রভাব কি কি পড়বে, সেটা প্রাক্কলন করলে ভাল হত। অবশ্য যে দেশে অর্থনীতিবিদদের জায়গা ব্যবসায়ীরা দখল করে বসেন, সেই দেশে এমন সহজ সমাধানের সিদ্ধান্ত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। একটি নতুন সরকারের সিদ্ধান্তগুলো আরও বেশী বিচক্ষণ হওয়া উচিৎ।
এই লিখা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত মতামত, সকল তথ্য উপাত্ত ইন্টারনেট থেকে নেয়া। যদি কোন হিসাবে ভুল থাকে, মার্জনা করে নিবেন।
-রুকন ইমরান
সেন্ট জন্স, নিউফাউন্ডল্যান্ড, কানাডা