24/07/2026
💫💫কিছু দিন থাকে, যেগুলো ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ হয়ে হারিয়ে যায়। আর কিছু দিন থাকে, যেগুলো সময়ের বুক চিরে স্মৃতি হয়ে নয়, কিংবদন্তি হয়ে বেঁচে থাকে। আজকের যমুনা ভ্রমণ ছিল ঠিক তেমনই একটি দিন।
সকালের সূর্য যখন ধীরে ধীরে আকাশে উঠছিল, তখন আমাদের নৌকাটি ভেসে চলছিল অবারিত যমুনার বুকে। চারদিকে শুধু জলরাশি, দূরে দিগন্তের সঙ্গে মিশে যাওয়া আকাশ, আর মাঝখানে একদল প্রাণোচ্ছল মানুষ। মনে হচ্ছিল, আমরা কোনো ভ্রমণে নয়, বরং সভ্যতার কোলাহল ছেড়ে প্রকৃতির আদিম সৌন্দর্যের দিকে ফিরে যাচ্ছি।
যমুনার বুকজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ডুবে যাওয়া অসংখ্য চরের মাঝখানে কোথাও কোথাও জেগে থাকা সবুজ দ্বীপের মতো চর। সেই অচেনা এক চরে নেমে শুরু হলো হাডুডু। মুহূর্তেই আমরা ফিরে গেলাম শৈশবের উঠোনে। কে শিক্ষক, কে কর্মকর্তা, কে ছাত্র—সব পরিচয় মুছে গিয়ে আমরা হয়ে উঠলাম শুধুই একদল উচ্ছ্বসিত মানুষ। হাসির শব্দে কেঁপে উঠছিল চর, বাতাস আর নদীর বুক।
তারপর শুরু হলো যমুনার জলে সীমাহীন জলকেলি। নদী যেন তার বিশাল বুকে আমাদের আগলে নিল। পানির ছিটায় ছিটায় উড়ে যাচ্ছিল ক্লান্তি, দুশ্চিন্তা আর জীবনের সমস্ত ভার। মনে হচ্ছিল, আমরা আবার নতুন করে বাঁচতে শিখছি।
অবিরাম গান চলছে। হারমোনিয়াম তবলা আর কাহনের অপূর্ব এক মেলবন্ধন। এরপর আরেকটি চরে গিয়ে সবাই মিলে কচুর লতি আর কচুশাক তুললাম। প্রকৃতির বুক থেকে আহরণ করা সেই সামান্য সবুজ যেন আমাদের কাছে এক অনন্য আনন্দের উৎস হয়ে উঠল। তারপর শুরু হলো রান্নার আয়োজন। কেউ রান্না করছে, কেউ আগুনের পাশে ব্যস্ত, কেউ মাছের ব্যবস্থা করছে, কেউ মাংসের। নদীর বাতাস, চরাঞ্চলের নির্জনতা আর প্রিয় মানুষের হাসির মাঝে তৈরি হওয়া সেই ভোজ ছিল শুধু খাবার নয়—ছিল বন্ধুত্ব, সহযোগিতা, আনন্দ আর ভালোবাসার এক অনবদ্য উৎসব। সবাই মিলে বসে খাওয়ার সেই মুহূর্তগুলো যেন জীবনের সবচেয়ে সরল অথচ সবচেয়ে পরিপূর্ণ সুখের প্রতিচ্ছবি।
বিকেলের দিকে নৌকাটি ভাটির স্রোতে নিজেকে ছেড়ে দিল। চারদিকে উজাড় করা বাতাস, মাথার ওপর বিস্তীর্ণ আকাশ, আর নিচে বহমান যমুনা। তখন শুরু হলো গান। একের পর এক গান, একের পর এক স্মৃতি, একের পর এক উচ্ছ্বাস। ভাটিয়ালির সুর ভেসে বেড়াচ্ছিল নদীর বুকজুড়ে। মনে হচ্ছিল, যমুনা নিজেই যেন আমাদের সঙ্গে গাইছে।
আর ঠিক তখনই ঘটল এমন এক ঘটনা, যা এই দিনটিকে আরও বেশি স্মরণীয় করে দিল।
আমাদের গানের সুর ভেসে পৌঁছে গেল নদীর পাড়ে। সেখানে থাকা কয়েকজন অচেনা মেয়ে হঠাৎ করেই, সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে নেচে উঠল। কোনো মঞ্চ ছিল না, কোনো আয়োজন ছিল না, কোনো ঘোষণা ছিল না। ছিল শুধু গান, নদী, বাতাস আর আনন্দের অদৃশ্য এক জাদু। সেই নাচ ছিল মুক্তির, প্রাণের, উচ্ছ্বাসের। মুহূর্তের মধ্যেই পুরো নৌকা আনন্দে ফেটে পড়ল। শিক্ষার্থীদের মুখে যে উচ্ছ্বাস, যে বিস্ময় আর যে প্রাণখোলা হাসি দেখেছিলাম, তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। মনে হচ্ছিল, সেদিন আমাদের গান শুধু মানুষের কানে পৌঁছেনি; পৌঁছে গিয়েছিল মানুষের হৃদয়ে।
মাঝে মাঝে কোনো ছোট্ট লোকালয় কিংবা বাজারে নৌকা ভিড়েছে। ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা, কিছু গল্প, কিছু হাসি। আবার নৌকা ছেড়েছে। আবার গান। আবার নাচ। আবার প্রাণভরে বেঁচে থাকার উল্লাস। কেউ মাছ ধরছে, কেউ ছবি তুলছে, কেউ নদীর দিকে তাকিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে নিজের ভাবনায়।
দিনের শেষ প্রহরে যখন সূর্য অস্ত যাওয়ার আগে আকাশজুড়ে রক্তিম, সোনালি আর বেগুনি রঙের এক অপূর্ব ক্যানভাস এঁকে দিল, তখন হঠাৎ মনে হলো—জীবনের আসল সৌন্দর্য আসলে খুব সাধারণ কিছু জিনিসে লুকিয়ে থাকে। একটি নৌকা, একটি নদী, একখণ্ড চর, কিছু গান, কিছু প্রিয় মানুষ আর অফুরন্ত হাসি।
আজকের দিনটি শুধু একটি ভ্রমণ ছিল না। এটি ছিল বন্ধুত্বের উৎসব, প্রকৃতির সঙ্গে পুনর্মিলন, শৈশবকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ, আর হৃদয়ভরে বেঁচে থাকার এক মহাকাব্য।
বহু বছর পর হয়তো এই দিনের তারিখ মনে থাকবে না, কিন্তু মনে থাকবে যমুনার বাতাস। মনে থাকবে চর জেগে ওঠা সবুজ দ্বীপগুলো। মনে থাকবে নিজেদের হাতে তোলা কচুর লতি। মনে থাকবে নদীর পাড়ে অচেনা মানুষের সেই স্বতঃস্ফূর্ত নাচ। মনে থাকবে ভাটিয়ালির সুরে ভেসে যাওয়া বিকেল। আর মনে থাকবে একদল মানুষের সীমাহীন আনন্দে ভেসে ওঠা মুখ।
সত্যি বলতে, আজ যারা আমাদের সঙ্গে ছিল না, তারা শুধু একটি নৌকা ভ্রমণ মিস করেনি; তারা হারিয়েছে এমন একটি দিন, যার গল্প একদিন স্মৃতি হবে, তারপর স্মৃতি থেকে কিংবদন্তি হয়ে যাবে।
যমুনা আজ শুধু আমাদের বহন করেনি; যমুনা আজ আমাদের হৃদয় ভরে দিয়েছে।