23/07/2026
কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলার পাহাড়ঘেরা মালভূমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মার্তণ্ড সূর্য মন্দির আজ আর শুধু একটি ধ্বংসাবশেষ নয়, বরং ভারতের প্রাচীন স্থাপত্য, শিল্পকলা এবং ইতিহাসের এক অনন্য সাক্ষী। অষ্টম শতকে কারকোট রাজবংশের রাজা ললিতাদিত্য মুক্তাপীড়ের উদ্যোগে নির্মিত এই মন্দির তার অসাধারণ স্থাপত্যশৈলীর জন্য আজও গবেষকদের বিস্মিত করে। নাগর, গান্ধার ও গুপ্ত শিল্পরীতির প্রভাব মিলিয়ে গড়ে ওঠা এই স্থাপত্য ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে পরিচিত।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আক্রমণ, ধ্বংস এবং সময়ের ক্ষয় সত্ত্বেও এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এই মন্দির অতীতের এক গৌরবময় অধ্যায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। কীভাবে নির্মিত হয়েছিল এই বিস্ময়কর স্থাপত্য, কেন এটি ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত মন্দিরে পরিণত হয়েছে, আর কোন ঘটনায় বদলে গিয়েছিল এর ভবিষ্যৎ—জানতে পড়ো আজকের সম্পূর্ণ প্রতিবেদন।
লেখা - সৃষ্টি
----
কাশ্মীরের বরফঢাকা পাহাড়ের মাঝখানে আজও দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল ধ্বংসাবশেষ। একসময় যেখানে সূর্যের প্রথম আলো পড়তেই শুরু হতো উপাসনা, আজ সেখানে বিরাজ করে নীরবতা। তবু কাশ্মীরের মার্তণ্ড সূর্য মন্দির শুধু একটি প্রাচীন স্থাপত্য নয়, বরং ভারতের ইতিহাস, শিল্প, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং মধ্যযুগীয় রাজনৈতিক পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই মন্দির ইতিহাসবিদ, প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং পর্যটকদের সমানভাবে আকৃষ্ট করে আসছে। কী কারণে এই মন্দিরের ইতিহাস ও স্থাপত্য তাকে ভারতের অন্যতম বিস্ময়কর প্রাচীন নিদর্শনে পরিণত করেছে?
কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলার মাট্টান এলাকার একটি মালভূমির ওপর অবস্থিত মার্তণ্ড সূর্য মন্দির। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,৭০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই স্থান থেকে কাশ্মীর উপত্যকার বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখা যায়। 'মার্তণ্ড' শব্দটি সংস্কৃত ভাষায় সূর্যদেবের একটি নাম। অর্থাৎ, এটি ছিল সূর্যদেবকে উৎসর্গ করা এক মহিমান্বিত উপাসনালয়। অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতে, অষ্টম শতকে কারকোট রাজবংশের শক্তিশালী শাসক রাজা ললিতাদিত্য মুক্তাপীড় এই মন্দির নির্মাণ করেন। তাঁর শাসনকালকে কাশ্মীরের ইতিহাসে এক স্বর্ণযুগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সামরিক সাফল্যের পাশাপাশি শিল্প, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। মার্তণ্ড সূর্য মন্দির সেই গৌরবের অন্যতম নিদর্শন।
মন্দিরটির স্থাপত্য আজও গবেষকদের বিস্মিত করে। এতে ভারতীয় নাগর শৈলীর পাশাপাশি গান্ধার ও গুপ্ত শিল্পরীতির প্রভাব এবং শাস্ত্রীয় স্থাপত্যের কিছু বৈশিষ্ট্যও লক্ষ করা যায়। এই মিশ্র স্থাপত্যরীতির কারণেই মার্তণ্ড সূর্য মন্দির ভারতীয় স্থাপত্য ইতিহাসে একটি অনন্য স্থান দখল করে আছে।
পুরো মন্দিরটি একটি বিশাল আয়তাকার প্রাঙ্গণের মধ্যে নির্মিত। প্রায় ২২০ ফুট লম্বা এবং ১৪২ ফুট চওড়া এই প্রাঙ্গণের চারপাশে সারিবদ্ধভাবে নির্মিত ছিল মোট ৮৪টি প্রকোষ্ঠ। গবেষকদের ধারণা, এগুলি উপাসনা, ধর্মীয় আচার বা অন্যান্য আনুষ্ঠানিক কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। মন্দিরের কেন্দ্রে ছিল মূল গর্ভগৃহ, যেখানে সূর্যদেবের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত ছিল। বিশাল প্রবেশদ্বার, সুউচ্চ স্তম্ভ এবং সূক্ষ্ম পাথরের কারুকাজ আজও সেই সময়ের শিল্পকুশলতার সাক্ষ্য বহন করে। এত শতাব্দী পরেও যে অংশগুলি অটুট রয়েছে, তা সেই যুগের উন্নত প্রকৌশল দক্ষতার পরিচয় দেয়।
তবে এই মহিমান্বিত মন্দিরের ইতিহাস শুধু গৌরবের নয়, ধ্বংসের ইতিহাসও। মধ্যযুগীয় ইতিহাসগ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে, চতুর্দশ শতকের শেষ দিকে কাশ্মীরের শাসক সুলতান সিকান্দার শাহ, যিনি 'সিকান্দার বুতশিকন' নামেও পরিচিত, বহু হিন্দু মন্দির ধ্বংসের নির্দেশ দিয়েছিলেন। মার্তণ্ড সূর্য মন্দিরও সেই সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে অধিকাংশ ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। লোকপ্রচলিত বিবরণে বলা হয়, মন্দিরটির বিশাল ও শক্তিশালী পাথরের কাঠামো ধ্বংস করতে দীর্ঘ সময় লেগেছিল। তবে এই দাবির প্রত্যক্ষ সমসাময়িক প্রমাণ সীমিত। আধুনিক ইতিহাসবিদদের মধ্যে ধ্বংসের বিভিন্ন দিক নিয়ে কিছু মতভেদ থাকলেও অধিকাংশ গবেষক মনে করেন, বর্তমান ধ্বংসাবশেষ মূলত মানবসৃষ্ট ধ্বংসের ফল।
বর্তমানে মন্দিরটি আর উপাসনার জন্য ব্যবহৃত হয় না। তবে এটি ভারতের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে সংরক্ষিত। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (এএসআই) এই ঐতিহাসিক স্থানের সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছে।
মার্তণ্ড সূর্য মন্দিরকে ঘিরে বহু প্রচলিত কাহিনিও রয়েছে। অনেকের বিশ্বাস, সূর্যের প্রথম কিরণ এমনভাবে মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ করত, যা বিশেষ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার ফল। যদিও এ বিষয়ে গবেষকদের মধ্যে চূড়ান্ত ঐকমত্য নেই, তবু প্রাচীন ভারতীয় স্থাপত্যে সূর্যের গতিপথ বিবেচনা করে মন্দির নির্মাণের একাধিক উদাহরণ পাওয়া যায়। তাই এই ধারণাকে সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেওয়াও যায় না। এছাড়া মন্দিরটি এমন একটি উঁচু স্থানে নির্মিত, যেখান থেকে চারপাশের বিস্তীর্ণ উপত্যকা স্পষ্ট দেখা যায়। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, স্থান নির্বাচনের পেছনে ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি নান্দনিকতা, প্রতীকী তাৎপর্য এবং কৌশলগত চিন্তাভাবনাও কাজ করেছে। আজ এই ধ্বংসাবশেষ শুধু পর্যটকদের নয়, চলচ্চিত্র নির্মাতাদেরও আকর্ষণ করে। বিশাল পাথরের স্তম্ভ, খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন কাঠামো এবং চারপাশের পাহাড়ি প্রাকৃতিক দৃশ্য মিলিয়ে এটি আজও ভারতের অন্যতম স্মরণীয় ঐতিহাসিক স্থাপত্য।