06/07/2026
সিন্দুরমতির কাহিনী
অনেক কাল আগে বর্তমান লালমনিরহাট–কুড়িগ্রাম সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ভয়াবহ পানির সংকট দেখা দেয়। মানুষের পানীয় জল, কৃষিকাজ এবং দৈনন্দিন জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। তখন এলাকার প্রভাবশালী জমিদার রাম নারায়ণ চক্রবর্তী সিদ্ধান্ত নেন একটি বিশাল দিঘি খনন করবেন, যাতে এলাকার মানুষের পানির কষ্ট দূর হয়।
দীর্ঘ সময় ধরে শ্রমিকরা বিশাল দিঘি খনন করল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, দিঘি খনন শেষ হওয়ার পরও সেখানে পানি উঠল না। জমিদার খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন। এত অর্থ ও শ্রম ব্যয় করেও কোনো ফল হলো না।
কথিত আছে, এক রাতে জমিদার স্বপ্নে দেবীর কাছ থেকে নির্দেশ পেলেন। স্বপ্নে বলা হলো—বিশেষ পূজা ও ধর্মীয় আচার সম্পন্ন করলে দিঘিতে পানি আসবে। সেই অনুযায়ী এক শুভ দিনে, অনেকে বলেন রামনবমী বা নবমী তিথিতে, বিশাল পূজার আয়োজন করা হলো।
জমিদারের দুই অতি স্নেহের কন্যা ছিল—সিন্দুর ও মতি। পূজার সময় তারা দিঘির মাঝখানে নির্মিত একটি স্থানে উপস্থিত ছিল। পূজা চলছিল, চারদিকে ভক্ত ও গ্রামের মানুষ জড়ো হয়েছিল।
হঠাৎ এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটল।
দিঘির তলদেশ থেকে প্রচণ্ড বেগে পানি উঠতে শুরু করল। মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে পানি ছড়িয়ে পড়ল। উপস্থিত মানুষ আতঙ্কিত হয়ে তীরে উঠে এল। কিন্তু পানি এত দ্রুত বাড়তে লাগল যে সিন্দুর ও মতি আর নিরাপদে ফিরে আসতে পারল না। সবাইয়ের চোখের সামনে তারা গভীর জলের মধ্যে হারিয়ে গেল।
দুই কন্যার মৃত্যুশোকে জমিদার ভেঙে পড়লেন। পরে লোককথায় বলা হয়, তিনি স্বপ্নে দেখেন তাঁর দুই মেয়ে দেবত্ব লাভ করেছে এবং মানুষের কল্যাণের জন্য নিজেদের উৎসর্গ করেছে। সেই থেকে মানুষের বিশ্বাস জন্মায় যে তাদের আত্মত্যাগের ফলেই দিঘিটি পানিতে পূর্ণ হয়েছিল।
শোকস্মৃতি অমর করে রাখতে জমিদার তাঁর দুই কন্যার নাম একত্র করে দিঘির নাম রাখেন "সিন্দুরমতি দিঘি"— সিন্দুর + মতি = সিন্দুরমতি।
পরবর্তী বিশ্বাস ও ঐতিহ্য
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সিন্দুরমতি দিঘি একটি পবিত্র তীর্থস্থানে পরিণত হয়। বহু মানুষ বিশ্বাস করে যে এই দিঘিতে স্নান করলে মানসিক শান্তি লাভ হয় এবং পাপ মোচন হয়। প্রতিবছর এখানে বড় মেলা ও ধর্মীয় উৎসব অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে ভক্তরা আসেন।