15/06/2026
[সামুরাই ব্লুজদের প্রত্যাবর্তন: নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে জাপানের হৃদয়জয়ী ড্র]
—গাজী আহির হুদা
বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে একটি ড্র সাধারণত ইতিহাসে খুব বেশি জায়গা পায় না। কিন্তু কিছু ড্র আছে, যেগুলো ফলাফলের চেয়ে অনেক বড় গল্প বলে। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে জাপানের ২-২ ড্র ছিল ঠিক তেমনই একটি ম্যাচ।
স্কোরবোর্ড বলবে দুই দল একটি করে পয়েন্ট ভাগাভাগি করেছে।
কিন্তু মাঠে যারা ৯০ মিনিট দেখেছেন, তারা জানেন গল্পটা ভিন্ন।
এটি ছিল একটি ইউরোপীয় পরাশক্তির বিপক্ষে এশিয়ার অন্যতম সেরা দলের আত্মপ্রকাশ। এটি ছিল তারকানির্ভর ফুটবলের বিপক্ষে সংগঠিত ফুটবলের লড়াই। এটি ছিল ব্যক্তিগত প্রতিভার বিপক্ষে সমষ্টিগত বিশ্বাসের যুদ্ধ।
এবং সেই যুদ্ধে জাপান প্রমাণ করেছে যে, ২০২৬ বিশ্বকাপে তারা কেবল অংশ নিতে আসেনি, বরং তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে এসেছে।
⚫বিশ্বকাপে জাপানের নতুন পরিচয়
অনেক বছর ধরেই জাপানকে “ডার্ক হর্স”বলা হয়।
কিন্তু সমস্যা হলো, যখন কোনো দলকে টানা দুই দশক ধরে ডার্ক হর্স বলা হয়, তখন হয়তো তাদের নতুন পরিচয় দেওয়ার সময় এসে গেছে।
২০০২ সালে নিজেদের মাটিতে দ্বিতীয় রাউন্ড, ২০১০ সালে নকআউট, ২০১৮ সালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে হৃদয়ভাঙা পরাজয় এবং ২০২২ সালে জার্মানি ও স্পেনকে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া—সব মিলিয়ে জাপান আর কোনো বিস্ময়ের নাম নয়।
তারা এখন বিশ্ব ফুটবলের প্রতিষ্ঠিত শক্তি।
নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচটি সেই দাবিকেই আরও শক্তিশালী করেছে।
⚫মরিয়াসুর পরিকল্পনা: ঝুঁকি নয়, ধৈর্যের ফুটবল
রোনাল্ড কোম্যানের নেদারল্যান্ডস শুরু থেকেই নিজেদের স্বাভাবিক ৪-৩-৩ ফরমেশনে মাঠে নামে।
কাগজে-কলমে ডাচ মিডফিল্ড ছিল ম্যাচের সবচেয়ে শক্তিশালী ইউনিট।
ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ংয়ের বল নিয়ন্ত্রণ, গ্রাভেনবার্খের ডায়নামিক রান এবং আক্রমণভাগে সামারভিলের গতি—সবকিছুই নেদারল্যান্ডসকে ফেবারিট বানানোর জন্য যথেষ্ট ছিল।
অন্যদিকে হাজিমে মরিয়াসু বুঝতে পেরেছিলেন যে সরাসরি প্রেসিং করতে গেলে তার দলকে মূল্য দিতে হতে পারে।
তাই তিনি বেছে নেন ৩-৪-৩।
প্রথম এক ঘণ্টা জাপান কোনো বেপরোয়া ফুটবল খেলেনি।
তারা অপেক্ষা করেছে।
স্পেস বন্ধ করেছে।
পাসিং লেন কেটে দিয়েছে।
নেদারল্যান্ডসকে বল দিয়েছে, কিন্তু বিপজ্জনক জায়গায় ঢুকতে দেয়নি।
আধুনিক ফুটবলে এটিই সবচেয়ে কঠিন কাজ।
⚫টেকেফুসা কুবো: জাপানের সৃজনশীল হৃদস্পন্দন
ম্যাচের আগে আলোচনায় ছিল ডাচ তারকারা।
ম্যাচ শেষে আলোচনায় ছিলেন টেকেফুসা কুবো।
রিয়াল সোসিয়েদাদের এই প্লেমেকার পুরো ম্যাচে একাধিক ভূমিকা পালন করেছেন।
কখনো রাইট উইঙ্গার।
কখনো নম্বর টেন।
কখনো মিডফিল্ডে নেমে বল প্রগ্রেস করেছেন।
আবার কখনো লেফট হাফ-স্পেসে গিয়ে নাকামুরার সঙ্গে ত্রিভুজ তৈরি করেছেন।
নাকামুরার গোলের আগে তার ড্রিবল এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণই ছিল পুরো আক্রমণের ভিত্তি।
পরিসংখ্যান সব সময় ফুটবল ব্যাখ্যা করতে পারে না।
কিন্তু কুবোর প্রভাব বোঝার জন্য পরিসংখ্যানের প্রয়োজনও হয় না।
ম্যাচটি দেখলেই বোঝা যায়—জাপানের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু তিনিই।
⚫জায়ন সুজুকি: যে কারণে জাপান ম্যাচে টিকে ছিল
ফুটবলে কখনো কখনো ড্রয়ের সবচেয়ে বড় নায়ক গোলদাতা নয়, গোলরক্ষক।
জায়ন সুজুকি ঠিক সেই কাজটিই করেছেন।
বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে তার কয়েকটি সেভ ম্যাচের গতিপথ পাল্টে দিয়েছে।
নেদারল্যান্ডস যখন জাপানের উপর চাপ সৃষ্টি করছিল, তখন সুজুকিই ছিলেন শেষ প্রাচীর।
বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে সফল হতে চাইলে বড় গোলরক্ষক দরকার হয়।
জাপান হয়তো তাদের সেই গোলরক্ষককে খুঁজে পেয়েছে।
⚫ম্যাচের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত
৬৪ মিনিটে সামারভিল গোল করার পর মনে হচ্ছিল ম্যাচটি ডাচদের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে।
সেখানেই আসে মরিয়াসুর আসল পরীক্ষা।
তিনি অপেক্ষা করেননি।
সাবস্টিটিউশন করেছেন।
প্রেসিং বাড়িয়েছেন।
টেম্পো বাড়িয়েছেন।
আর ঠিক বিপরীত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কোম্যান।
ডাচ কোচ আক্রমণ কমিয়ে রক্ষণ মজবুত করতে চেয়েছিলেন।
ফলাফল?
মিডফিল্ডের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে জাপানের হাতে চলে যায়।
ফুটবল ইতিহাসে বহু ম্যাচে দেখা গেছে—লিড রক্ষা করতে গিয়ে দল নিজেদের শক্তিই হারিয়ে ফেলে।
নেদারল্যান্ডসও সেই ফাঁদে পড়েছিল।
⚫কামাডার গোল: চরিত্রের প্রতীক
৮৮ মিনিটের কর্নারটি শুধুই একটি সেট-পিস ছিল না।
এটি ছিল পুরো ম্যাচে জাপানের মানসিকতার প্রতিফলন।
দুইবার পিছিয়ে পড়া।
শারীরিক ক্লান্তি।
সময়ের চাপ।
সবকিছুর পরও হাল না ছাড়া।
ডাইচি কামাডার হেডার শুধু স্কোরলাইন সমান করেনি।
এটি জাপানের বিশ্বাসকে পুরস্কৃত করেছে।
বিশ্বকাপে অনেক সুন্দর গোল হয়।
কিন্তু কিছু গোল থাকে, যেগুলোর মূল্য স্কোরবোর্ডের চেয়ে অনেক বেশি।
এটি ছিল তেমনই একটি গোল।
⚫জাপানের জন্য এর অর্থ কী?
এই ড্রয়ের সবচেয়ে বড় মূল্য পয়েন্ট টেবিলে নয়।
মূল্যটা মানসিকতায়।
জাপান এখন জানে তারা ইউরোপের সেরা দলগুলোর সঙ্গে সমানে লড়তে পারে।
তারা জানে পিছিয়ে পড়লেও ফিরে আসা সম্ভব।
তারা জানে তাদের কৌশল কাজ করছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—গ্রুপের সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তারা ব্যর্থ হয়নি।
ফলে পরবর্তী ম্যাচগুলোতে আত্মবিশ্বাস তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হবে।
⚫ম্যাচশেষে আবারও জাপান
শেষ বাঁশি বাজার পর হাজারো সমর্থক যখন গ্যালারি ছাড়ছিলেন, তখন দেখা গেলো পরিচিত এক দৃশ্য।
তারা নিজেদের বসার জায়গা পরিষ্কার করছেন।
এটি কোনো সংবাদ নয়।
এটি কোনো প্রচারণাও নয়।
এটি জাপানের সংস্কৃতি।
বিশ্বকাপের মঞ্চে তারা শুধু ফুটবল খেলতে আসে না।
তারা মূল্যবোধও প্রদর্শন করে।
আর হয়তো এ কারণেই জাপানকে ভালো না বেসে থাকা কঠিন।
স্কোরলাইন বলছে ২-২।
কিন্তু এই ম্যাচের আসল বার্তা ছিল আরও বড়—
জাপান এখনও এগিয়ে যাচ্ছে।
এবং বিশ্ব ফুটবলকে তাদের দিকে নজর রাখতেই হবে।
Japan Study Club—DUIRJSC
Kazi Bushra Ahmed Tithi
Embassy of Japan in Bangladesh