14/06/2026
মুঘল দরবারে শ্রীরাম ও রামায়ণ
(লেখাটি বিশেষভাবে সেসকল অসুরদের উদ্দেশ্যেই উৎসর্গ করা হলো, যারা মনপ্রাণ দিয়ে শ্রীরামকে অসম্মান করতে ও বাংলার মাটি থেকে শ্রীরামের পদচিহ্ন অপসারণে তৎপর হয়েছে)
শ্রীরাম হলেন আত্মা, অব্যক্ত পরমেশ্বর। রাম অজর, অমর, অক্ষর। রাম সনাতন, নিত্য, সকলের আত্মা ও অন্তর্যামী। যুগে যুগে যত অসুর দ্বারাই এই ভূখণ্ড শাসিত হোক না কেনো, রামকে কেউ অস্বীকার করতে পারেনি। ইতিহাস সাক্ষী, রামকে কেউ অগ্রাহ্য করতে পারেনি, তা ভক্তি থেকেই হোক, বা ভীতি থেকেই হোক, কিংবা সে রাবণের মতো কোনো রাক্ষসবংশীয়ই হোক না কেনো। যুগের পরিবর্তনের সাথে তাই রামায়ণ একটি মাত্র ভূখণ্ডে বা একটি ভাষায় আবদ্ধ থাকেনি। রামায়ণ পৌঁছে গিয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন খন্ডে, অনূদিত হয়েছে বিভিন্ন ভাষায়। সেরকমই শ্রীরামের সঙ্গে মুঘলদের সংযোগের এক নিদর্শন হলো ফারসী রামায়ণ।
আবুল ফজলের ভাষায়, মুঘল সম্রাট আকবর লক্ষ্য করেছিলেন যে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে যে তীব্র বৈরিতা বিরাজ করছে, তার মূল কারণ পরস্পরের সম্পর্কে অজ্ঞতা। তাই তিনি মনে করেছিলেন, হিন্দুদের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলো মুসলমানদের কাছে সহজলভ্য করে দিলে এই বিভেদ অনেকাংশে দূর হবে। এ উদ্দেশ্যে তিনি প্রথমে মহাভারতকে নির্বাচন করেন, কারণ এটি ছিল হিন্দুদের মধ্যে সর্বাধিক প্রামাণ্য ও সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ গ্রন্থ।
আবদুল কাদির বদায়ুনীর বর্ণনা অনুযায়ী, আকবরের এই সিদ্ধান্তের পেছনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা কাজ করেছিল। শাহনামা এবং আমির হামজার কাহিনির বহু খণ্ড লিপিবদ্ধ ও অলংকৃত করার পর আকবর উপলব্ধি করেন যে এসব গ্রন্থের অনেকাংশই কাব্য ও কল্পকাহিনি। তখন তার মনে হয়, হিন্দুদের সেইসব গ্রন্থ অনুবাদ করা উচিত যেগুলো তাদের ধর্ম, বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতার মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। তিনি তাই এসকল শাস্ত্র গ্রন্থ ভারতীয় ভাষা থেকে ফারসিতে অনূদিত করার নির্দেশ দেন।
এই সিদ্ধান্তের ফলস্বরূপ ৯৯০ হিজরি (১৫৮২ খ্রিস্টাব্দ) সালে মহাভারত অনুবাদের দায়িত্ব প্রথমে নকীব খানকে এবং পরে আবদুল কাদির বদায়ুনী, মুল্লা শেরী ও সুলতান হাজ্জী থানেসরীর ওপর অর্পণ করা হয়। অনুবাদ কার্যক্রম আঠারো মাসের মধ্যে সম্পন্ন হয়। ফারসীতে “রজমনামা” নামে মহাভারত অনুবাদ সম্পন্ন করে ১৫৮৫ সালে তিনি রামায়ণ অনুবাদ শুরু করেন। চার বছর পরে, ১৫৮৯ সালে তিনি পদ্যে রামায়ণের ফারসী অনুবাদ সম্পন্ন করলে আকবর চিত্রশিল্পীদের দ্বারা সেই অনুবাদকৃত রামায়ণটি সুসজ্জিত করে নিজের পুস্তকালয়ে রেখে দেন এবং সম্রাটের তৎকালীন আমীর ও সভাসদরা প্রত্যেকে সেই রামায়ণের এক এক খন্ড গ্রহণ করেন।
এই পাণ্ডুলিপিটি হিজরি ৯৯৭ সনের ২৮ জিলহজ্জ (নভেম্বর, ১৫৮৮) তারিখে সম্পন্ন হয়েছিল। এই "রামায়ণ"- এর সঙ্গে রাজদরবারের সম্পর্ক নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয় পাণ্ডুলিপির প্রথম পৃষ্ঠার উল্টো পাশে সম্রাট জাহাঙ্গীরের নিজ হাতে লেখা একটি নোট দ্বারা। সেখানে লেখা আছে যে আজার মাসের ৫ তারিখে, জুলুসের প্রথম বছরে, সম্রাট নূরউদ্দীন জাহাঙ্গীরের আদেশে এই গ্রন্থটি রাজকীয় গ্রন্থাগারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তিনি উল্লেখ করেন যে "রামায়ণ" হিন্দুদের অন্যতম প্রসিদ্ধ গ্রন্থ এবং তার পিতা সম্রাট আকবর রামায়ণের ফারসি অনুবাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
পাণ্ডুলিপিতে চারটি রাজমোহরের ছাপ রয়েছে। এর মধ্যে একটি শাহজাহানের আমলের, দুটি ঔরঙ্গজেবের আমলের, এবং চতুর্থটি অস্পষ্ট হওয়ায় পড়া যায় না। এছাড়া আরও কিছু মন্তব্য ও নোট ছিল, কিন্তু পরবর্তী সময়ে স্বর্ণের প্রলেপ দেওয়া চিত্রাঙ্কনের কারণে সেগুলো অপাঠ্য হয়ে গেছে। লাইব্রেরিয়ানদের কিছু নোটও সংযোজিত হয়েছে পাণ্ডুলিপিতে, যেগুলোর তারিখ শাহজাহানের ২৬তম জুলুস (১৬৫৪), ১০৬৯ হিজরি (১৬৫৮) এবং ঔরঙ্গজেবের তৃতীয় জুলুস (১৬৬১) সালের। এসব নোট ও সিলমোহর থেকে জানা যায় যে পাণ্ডুলিপিটি কীভাবে সংরক্ষিত, স্থানান্তরিত, পরিদর্শিত এবং সম্রাটদের দ্বারা দেখা হতো, এমনকি কখনও কখনও মেরামতও করা হতো।
মুহাম্মদ আলী শাহ জাহানীর লেখা তিন লাইনের একটি নোট থেকে জানা যায় যে শাহজাহানের শাসনের ২৪তম বছরে, অর্থাৎ ১৬৫২ খ্রিস্টাব্দে, ১৫ মহররম তারিখে পাণ্ডুলিপিটির কিছু ক্ষতিগ্রস্ত পৃষ্ঠায় কাগজের ফালি লাগিয়ে মেরামত করা হয়েছিল। এটি স্পষ্ট করে যে পাণ্ডুলিপিটি দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। অন্যান্য নোট থেকেও বোঝা যায় যে এটি মুঘল সম্রাটদের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বহন করা হতো এবং সম্রাটরা লাহোর, শ্রীনগর, আগ্রা প্রভৃতি স্থানে অবস্থানকালে এটি অধ্যয়ন করতেন। বিভিন্ন সময়ে রাজকীয় গ্রন্থাগারের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের নামও এসব নোটে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফারসীতে রামায়ণের দ্বিতীয় অনুবাদের নাম- “রামায়ণ ফৈজী” । এর অনুবাদক কে, তা জানা যায়না। তবে এটি বদায়ুনীর অনুবাদ থেকে একদম পৃথক ছিল। যেখানে বদায়ুনীর অনুবাদ সম্পূর্ণ পদ্যে ছিল, সেখানে এই “রামায়ণ ফৈজী” ছিল বেশিরভাগই গদ্যে এবং আংশিক পদ্যে।
রামায়ণের তৃতীয় অনুবাদক মোল্লা মসীহ। তিনি পানিপথের নিবাসী ছিলেন এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে রামায়ণের ফারসী অনুবাদ করেন। তাঁর অনুবাদ ছিল পদ্যে, এবং নাম ছিল “রামায়ণ মসীহী”।
তবে ফারসী ভাষায় যে শুধু মুসলিমরাই রামায়ণ অনুবাদ করেছিলেন, এমন নয়। ফারসী রাজভাষা বা দাপ্তরিক ভাষা হওয়ার কারণে হিন্দুদেরও এই ভাষা শিখতে হত, এবং অনেক হিন্দু ব্যক্তিও ফারসীতে রামায়ণ অনুবাদ করেছেন। এমন একজন হলেন শ্রী চন্দ্রভাল বেদিল। উনাকে রামায়ণের চতুর্থ অনুবাদক হিসেবে বলা যায়। তিনি ১৬৯৩ সালে, আওরঙ্গজেবের আমলে পদ্যে রামায়ণ অনুবাদ করেছিলেন। তবে ভিন্নমতানুসারে, তিনি ১৬৮৫ সালে প্রথমে গদ্যে রামায়ণ অনুবাদ করেন যা পরবর্তীতে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
রামায়ণের পঞ্চম অনুবাদক হলেন লালা অমরসিংহ। তিনি ১৭৮৩ বা মতান্তরে ১৭০৫ সালে গদ্যে রামায়ণের ফারসী অনুবাদ করেন। নাম দেন – “রামায়ণ অমর প্রকাশ”। ষষ্ঠ অনুবাদক হিসেবে পাই লালা অমানত রায়কে। নবাব আমজাদ আলী ও তার পরিবারের সহযোগিতা এবং পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি প্রথমে শ্রীমদ্ভাগবতপুরাণ ফারসীতে অনুবাদ করেন। সেটি যথেষ্ট সমাদৃত হলে ১৭৫৪ সালে তিনি পদ্যে রামায়ণের ফারসী অনুবাদ করেন। এই অনুবাদ এতই সুন্দর ও অনবদ্য ছিল যে একে তৎকালীন সময়ে ফিরদৌসীর মহাকাব্য “শাহনামা”-র সাথে তুলনা করা হত। এছাড়াও গোবিন্দের পুত্র গোপাল “তরজুমা-ই-রামায়ণ” নামে ১৭ শতকের প্রথমার্ধে রামায়ণ অনুবাদ করেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে, শ্রীতুলসীরাম দাসের সমসাময়িক গিরিধরদাস পদ্যে রামায়ণের ফারসী অনুবাদ করেন।
রামায়ণের আরেকটি ফারসী অনুবাদ সম্পর্কে জানা যায়, যার অনুবাদক লাহোরের বিখ্যাত পন্ডিত বেলীরাম মিশ্রের পুত্র পন্ডিত রামদাস। তিনি ১৮৬৪ সালে রামায়ণের ফারসী অনুবাদ করেন, তবে সেই অনুবাদ এখনো মুদ্রিত হয়নি। এমন আরো অনেক অনেক অনুবাদের পাণ্ডুলিপি এখনো অমুদ্রিত অবস্থায় পড়ে আছে ভারতবর্ষের বিভিন্ন পাঠাগারে। কোনোদিন সেগুলোকে মুদ্রণের ব্যবস্থা করা হলে বা সেগুলোর ওপর গবেষণা হলে হয়ত আমরা মধ্যযুগীয় সাহিত্যের ওপর ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রভাব ও অবদান সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে পারবো।
উর্দু ভাষায় রামায়ণ অনুবাদ বা রাম-সাহিত্য খুব একটা দেখা যায়না। অল্প কিছু সাহিত্যের মধ্যে ১৯ শতকের প্রথমার্ধে রচিত চারটি রামায়ণের কথাই উল্লেখযোগ্য।
মুন্সী জগন্নাথ খুস্তারা রচিত – “রামায়ণ খুস্তারা” (১৮৬৪) (সকল উর্দু রামায়ণের মধ্যে এটিকেই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং জনপ্রিয় বলা হয়), মুন্সী শঙ্কর দয়াল ফরহাত রচিত “রামায়ণ ফরহাত”, বাঁকেবিহারী লাল বহার রচিত “রামায়ণ বহার”, সুরজ নারায়ণ মেহের রচিত “রামায়ণ মেহের” ।
উক্ত রামায়ণগুলো সরাসরি অনুবাদ নয়, বরং এগুলো একক সাহিত্য এবং এগুলোতে বাল্মিকি রামায়ণ, রামচরিতমানস সহ অন্যান্য রামায়ণের প্রভাব বিদ্যমান। উর্দু রামায়ণগুলোকে রামায়ণের অনুবাদ না বলে রামায়ণ-আশ্রিত সাহিত্য বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত।
এই লেখার উদ্দেশ্য একটাই- আজকে যারা বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে শ্রীরামের বিরোধিতা করছে, শ্রীরামকে অসম্মান করছে, সেসব জন্মপরিচয়হীন অশিক্ষিত, পেডোফাইলদের বলছি, দেখ..যেসব মুঘলদের তোরা বাপ ডাকিস, তোদের সেই বাপরাও পারেনি শ্রীরামকে অগ্রাহ্য ও অপসারণ করে শাসন করতে। তোদের বাপরাও শ্রীরামকে পিতৃজ্ঞান করতো, সে ভক্তি থেকেই হোক, বা ভয় থেকেই হোক। আর তোরা কোথাকার কোন *** যে এসে শ্রীরামকে অপমান করবি? রাম চাইলে প্রতিটি জেলায় রামের প্রতিমা হবে, বাংলার আকাশে রামের বিজয়ধজ উড়বে, প্রতিটি ঘরে ঘরে, পাড়া মহল্লায় রামের পুজোও হবে। তোরা অভিশপ্ত অসুরের জাত কিছুদিন হাউকাউ করে ক্ষণস্থায়ী জয়ের স্বাদ নিয়ে নে ততদিন!
জয় শ্রীরাম