24/05/2026
রম্যরস : আম যুদ্ধ
গ্রীষ্মকাল এলেই বাঙালির ঘরে ঘরে একটা নিঃশব্দ যুদ্ধ শুরু হয়। বিশ্বযুদ্ধ বা গৃহযুদ্ধ নয়—একে বলা যায় "আম যুদ্ধ"। আমাদের মধ্যবিত্ত লতিফ সাহেবের বাড়িতেও এর ব্যতিক্রম হলো না।
লতিফ সাহেব বাজার থেকে চার কেজি ল্যাংড়া আম কিনে এনেছেন। আমের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে যেন সদ্য বিউটি পার্লার থেকে ফেসিয়াল করে বের হয়েছে—একেবারে নিখুঁত, হলদে-সবুজ আভা, সুবাসে পুরো ড্রয়িংরুম মাতোয়ারা।
লতিফ সাহেব সোফায় বসে বুক ফুলিয়ে বললেন, "বেছে বেছে একদম 'অরিজিনাল' ল্যাংড়া এনেছি। এক ফোঁটা ফরমালিন নেই। খেয়ে দেখিস, অমৃত!"
লতিফ সাহেবের স্ত্রী মাজেদা বেগম আমগুলো ধুয়ে ফ্রিজে তুলতে তুলতে গম্ভীর গলায় বললেন, "আম তো আনলে। কিন্তু খবরদার, তোমার ওই বাটু মামা আর পল্টু ভাগ্নে আসার আগে যেন আমে হাত না পড়ে। জামাই ষষ্ঠী উপলক্ষে ওরা কাল বাড়িতে পা রাখছে। মেহমানের সামনে ইজ্জত বলে তো একটা কথা আছে!"
লতিফ সাহেবের বড় ছেলে রনি আর ছোট মেয়ে টুনি দরজার আড়াল থেকে আমগুলোর দিকে তাকিয়েছিল। মাজেদা বেগমের এই ‘আম-লকডাউন’ ঘোষণার পর তাদের মুখগুলো ল্যাংড়া আমের চেয়েও বেশি তিতকুটে হয়ে গেল।
রাত ১২টা। পুরো বাড়ি নিঝুম।
হঠাৎ ফ্রিজের দরজা খোলার একটা মৃদু আওয়াজ হলো—ক্যাঁচচচ।
অন্ধকারে টর্চের আলো ফেলে রনি ফ্রিজের দিকে এগোচ্ছিল। ঠিক তখনই তার পায়ের ওপর অন্য একটা পা পড়ল।
"ওরে বাবাগো! ভূত!" রনি চিৎকার করতে গিয়েও মুখ চেপে ধরল।
"আরে ভাইয়া, আমি টুনি! চেঁচাইস না, আম্মু জেগে যাবে।"
"তুই এখানে কী করিস?" রনি ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল।
"যে কাজে তুমি আসছ, আমিও সেই কাজেই আসছি। চলো, একটা অপারেশন চালাই।"
দুই ভাই-বোন মিলে ফ্রিজ থেকে সবচেয়ে বড় আর পাকা আমটা নিখুঁত অপরাধীর মতো চুরি করল। এরপর বাথরুমের লাইট জ্বালিয়ে, গামছা দিয়ে দরজার ফাঁক বন্ধ করে, পরম তৃপ্তিতে তারা আমটা সাবাড় করল। আঁটি আর খোসাগুলো কমোডে ফ্লাশ করে দিয়ে ভাবল—পারফেক্ট ক্রাইম!
পরদিন দুপুরে বাটু মামা আর পল্টু ভাগ্নে এসে হাজির। বাইরে তখন জ্যৈষ্ঠ মাসের খাঁ খাঁ রোদ।
মাজেদা বেগম ফ্রিজ থেকে বাকি আমগুলো বের করে প্লেটে সুন্দর করে কেটে সাজিয়ে ড্রয়িংরুমে আনলেন। লতিফ সাহেব গর্বিত হাসিমুখে বললেন, "নিন মামা, ল্যাংড়া আম। খেয়ে বলুন কেমন।"
বাটু মামা নিজেকে আমের মস্ত বড় ‘বিশেষজ্ঞ’ মনে করেন। তিনি একটা টুকরো কাঁটাচামচ দিয়ে তুলে, চোখে চশমাটা ঠিক করে, আমের টেক্সচার পরীক্ষা করলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "হুম... লতিফ, তুমি তো আম চিনতে ভুল করেছ হে।"
লতিফ সাহেবের হাসিটা মাঝপথে আটকে গেল, "মানে? ভুল করেছি মানে?"
"আরে ভাই, এটা ল্যাংড়া হতেই পারে না! ল্যাংড়া আমের বোঁটার চারপাশটা একটু দেবে থাকে, আর এর সুবাসে একটা হালকা টক-মিষ্টি ঝাঁঝ থাকে। এটা আসলে 'হাড়িভাঙ্গা' আম। তবে চাষী একে হরমোন ইনজেকশন দিয়ে সাইজ বড় করেছে।" বাটু মামা বেশ বিজ্ঞের মতো রায় দিলেন।
পল্টু ভাগ্নে ততক্ষণে চার টুকরো আম মুখে পুরে দিয়ে বলল, "মামা, হাড়িভাঙ্গা হোক আর কলসিভাঙ্গা হোক, আমটা কিন্তু হেব্বি মিষ্টি!"
বাটু মামা পল্টুর দিকে চোখ রাঙিয়ে বললেন, "তুই আমের কী বুঝিস রে হাঁদা? আম খাওয়া একটা আর্ট। আমের জাত না চিনে খাওয়া মানে সাহিত্যের রস না বুঝে বইয়ের পাতা চিবানো!"
ঠিক এই জ্ঞানগর্ভ আলোচনার মাঝখানে কাজের মেয়ে জরিনা ড্রয়িংরুমে ঢুকল। তার হাতে একটা বালতি আর প্লাস্টিকের প্যাকেট।
সে মাজেদা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল, "খালাম্মা, বাথরুমের কমোড তো জ্যাম হয়া গেছে। পানি নামতাছে না। আমি পাম্পার দিয়া গুতা দিতেই এইডি উইঠা আইল।"
জরিনা বালতি থেকে প্লাস্টিকের প্যাকেটের ওপর যা রাখল, তা দেখে রনি আর টুনির কলিজা শুকিয়ে গেল। সেখানে জ্বলজ্বল করছে একটা বিশাল আমের আঁটি আর কিছু সবুজ-হলদে খোসা!
পুরো ড্রয়িংরুমে পিনপতন নীরবতা।
বাটু মামা চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে আঁটিটার দিকে তাকালেন। তারপর হঠাৎ সোজা হয়ে বসে বললেন, "উঁহু! আমি যা ভেবেছিলাম তা নয়। এই আঁটির গড়ন আর খোসার ভেতরের আশের বিন্যাস দেখে আমি শতভাগ নিশ্চিত—এটিই ছিল আসল ল্যাংড়া আম! লতিফ, তুমি ল্যাংড়াই এনেছিলে। কিন্তু আফসোস, আসল জিনিসটা তো কমোডে চলে গেছে!"
মাজেদা বেগম জ্বলন্ত দৃষ্টিতে রনি আর টুনির দিকে তাকালেন। রনি আমতা-আমতা করে বলল, "আম্মু, আসলে কাল রাতে আমটার গায়ে একটা কালো দাগ দেখছিলাম... ভাবলাম নষ্ট হয়ে যাবে, তাই..."
লতিফ সাহেব মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন। তিনি বুঝলেন না—আমের জাত চিনতে না পারার আফসোস করবেন, নাকি বাথরুমের প্লাম্বার ডাকার খরচ নিয়ে চিন্তা করবেন!
আর বাটু মামা? তিনি প্লেটের শেষ টুকরো আমটা মুখে পুরে দিয়ে বললেন, "যা-ই বলো লতিফ, কমোডের ল্যাংড়াটার সাইজ কিন্তু এই হাড়িভাঙ্গার চেয়ে ঢের ভালো ছিল!"
-চব্বিশ || পাঁচ || ছাব্বিশ, সকাল সাড়ে ছ'টা-
অনুভূতি - Emotion