04/11/2018
গোধুলী বেলা। আমি একা একা আনমনে প্রতিদিনকার মতো ধানখেত গুলোর মধ্যে দিয়ে যাওয়া সবুজ ঘাসে আবৃত সরু মেঠো পথটা ধরে হাটছিলাম। আমার রীতিমতো একটা অভ্যাস যে হাঁটার সময় এদিক ওদিক চেখে দেখা, আর পাখি দেখলেই তাদের কন্ঠ নকল করার বৃথা চেস্টা। তো সেদিনও আমি শিস বাজাতে বাজাতে এদিক ওদিক চেয়ে চেয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ কোথা থেকে একটা পোকা এসে আমার চোখে পড়ে গেলো। ফাঁকা রাস্তা, চারপাশের কেউ নেই যে যাকে বলতে পারব যে চোখ থেকে পোকাটা বের করে দিতে। তাই আমি কাওকে না পেয়ে চোখের অসম্ভব জ্বালাতন নিয়েই দৌড়াতে শুরু করে দিলাম। চোখ দিয়ে অবিরাম অশ্রু ঝড়ছে আর আমি দৌড়াচ্ছি। হঠাৎ দেখলাম কে যেন রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছে। : এই যে শুনুন! : হ্যাঁ বলুন। (বিরক্তির স্বরে) : দেখেন তো আমার চোখে কি পড়েছে? : ও আচ্চা। (মধুর স্বরে)। মাথা নিচু করুন আর হাত দিয়ে চোখটাকে ভাল ভাবে ধরুন। : আচ্চা। : আপনার চোখে তো একটা বিষাক্ত পোকা পড়েছে। দাঁড়ান আমি বের করে দিচ্ছি! , ও এই কথা বলতে বলতে ওর ওড়নার কোণা দিয়ে আমার চোখ থেকে ধীরে ধীরে মনে হচ্ছিল যেন পরম মমতায় পোকাটা বের করে দিল। তারপর ও আমার চোখে হালকা ফুঁ দিয়ে বলল " দেখেন এখন ঠিক আছে কিনা?" ও যখন আমার চোখে ফুঁ দিয়েছিল তখন আমি আড়চোখে চেয়ে ছিলাম তার মুখের দিকে। দেখছিলাম ঐ ঠোট জোড়া দিয়ে কত অজানা মমতায় ফুঁ দিচ্ছে আমার চোখে। ও বলল- : এখন ঠিক আছে? : হুম। ঠিক আছে। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। : ঠিক আছে। আচ্চা আমি এখন যাই। ( সে মিস্টি একটা হাসি দিয়ে চলে গেল) : আচ্চা। ভালো থাকবেন। আমি তখনো সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম আর তার চলে যাওয়া চেয়ে চেয়ে দেখলাম। কিন্তু ওনার নামটা কি তা জানা হলোনা। দূর! . . তার সাথে আবার আমার দেখা হয়েছিল। তবে সেটা কোনো মেঠো পথের ধারে নয়। সেই দেখাটা হয়েছিল একটা বিয়ে বাড়িতে। যে বাড়িতে বিয়ে হচ্ছিল তারা আমাদের নিকটাত্নীয় ছিল। তাই বিয়ের আগের মানে গায়ে হলুদের দিনেই আমাদের সেখানে যেতে হয়েছিল। সেখানে গিয়ে দেখলাম সেই মেয়েটিও এসেছে। তারও নাকি কেমন আত্নীয় হয়৷ স্বাভাবিকভাবেই বিয়ে বাড়িতে অনেক লোকের মাঝে সবাই প্রায় অচেনা ছিল। তাই খুব একা একা লাগছিল৷ শুধু পরিচিত বলতে সেই মেয়েটিই ছিল যার সাথে আমার রাস্তায় দেখা হয়েছিল। আমি চুপচাপ বসে ছিলাম আর ফোন টাপ ছিলাম। হঠাৎ একটা মেয়েলী কন্ঠে চোখ ফিরালাম- : আপনি এই বিয়ে বাড়িতে? : হ্যাঁ। পাত্রি কি হয় আপনার? : আমার বাবার বন্ধুর মেয়ে। খুব একা লাগছে। : আমারও। আপনার নামটাই তো জানা হলোনা। কি নাম আপনার? : আমার নাম অপরিচিতা। আপনার? : আমার নাম জয়। অপরিচিতা আমার প্রিয় নাম। : ও তাই নাকি! ধন্যবাদ। : যাই হোক একজন তো পাওয়া গেলো যার সাথে গল্প করা যাবে। কথা বলা যাবে। : হুম। অবশ্যই! এভাবেই কথা চলতে লাগল। আমরা একে অন্যজনের সাথে ফ্রি হয়ে গেলাম। : বিকালে কি করছেন? : তেমন কিছুনা। কেন? : শুনলাম গ্রামটা নাকি অনেক সুন্দর। চলেন বিকালে সবাই মিলে ঘুরে আসি। : আচ্চা ঠিক আছে। সবাই যাবো কিন্তু। : আচ্চা। ঠিক আছে। : আচ্চা আমরা এখনো আপনি আপনি করছি কেন? আমরা তো একে অপরকে তুমি করেই বলতে পারি। : তা বলা যায়। সেদিন বিকালে আমি ও আরও অনেকে মিলে গ্রামে ঘুরতে গেলাম। মাঠ ঘাট ঘুরলাম। দৌড়া দৌড়ি হাসি ঠাট্রা করে সন্ধায় সবাই বাড়ি ফিরলাম। রাতে যখন সবাই বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত তখন আমরা উঠানে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। সে আমায় হঠাৎ বলে ওঠল- : তুমি তো বেশ মজার লোক! : হুম সবাই বলে। তুমিও কিন্তু কম না। : আচ্চা তোমার কি গার্লফ্রেন্ড আছে? : না। : কি বলো। তোমার মতো ছেলের গার্লফ্রেন্ড নেই। বিশ্বাস হয় না। : সত্যি নেই। : কিন্তু কেন? : আমার মতো অগোছালো ছেলের সাথে কে প্রেম করবে? : করবে করবে ঠিক কেউ একজন করবে। আমার কিন্তু অগোছালো ছেলেদের ভালোই লাগে৷ : তাই নাকি? : হুম। সেদিন রাত্রে সেটুকুই কথা হয়েছিল ওর সাথে। কারন পরের দিন বিয়ে ছিল তাই সবার সকাল সকাল ওঠতে হবে। . বিয়ের দিন সকালটা আমার পুরো নিরামিষ ভাবে কাটল। ঘুম থেকে ওঠে দুপুর পর্যন্ত অনেক সুযোগ খুজেছি ওর সাথে কথা বলার জন্য। কিন্তু বিয়ে বাড়ির ব্যস্ততার জন্য আর কথা হয়ে ওঠেনি। তাই আমি একা একা বসে ফোন চাপছিলাম। হঠাৎ করে - : এই জয়! তুমি এখানে এভাবে বসে আছো কেন? বর চলে আসছে যাবে না? : হা যাবো। কি করছিলে এতক্ষন? : তেমন কিছুনা। চল জলদি চল। আমি আর ও একসাথে বর দেখতে গেলাম। : জয়! : হা বলো : তোমার ফোনে চার্জ আছে? : হুম কেন? : কিছু ছবি তুলতাম। এই দেখোনা আমার ফোনের চার্জ শেষ হয়ে অফ হয়ে গেছে। চার্জারও আনিনি। : এই নাও। : ধন্যবাদ। আরে বাবা তোমি কোথায় যাচ্ছো দাঁড়াও তোমার সাথেও কয়েকটা ছবি তুলি। : আচ্চা ঠিক আছে। তুমি ছবি তোলে আমি আশপাশেই আছি। : আচ্চা ঠিক আছে। . আমি ওর থেকে একটু দূরে গিয়ে একা একা দাঁড়িয়ে মনে মনে ভাবি, কি ভালো একটা মেয়ে! কোনো অহংকার নেই, হিংসা নেই, সবার সাথে কি করে মিলে যায় আর অন্যের অজান্তেই তার সাথে সকলকে মিলিয়ে নেয়। এই সময়ে দাঁড়িয়ে রকম মেয়ে খুঁজে পাওয়া সত্যিই কস্টকর। : এই জয়! একা একা দাঁড়িয়ে কি ভাবছো? : না কিছুনা। ছবি তোলা কি শেষ? : হুম। ছবি গুলো কিভাবে নেই বলোতো? : তোমার কি ফেইসবুক আইডি আছে? থাকলে আমি সেন্ড দিচ্ছি। : হ্যাঁ আছে তো। আমার ফেইসবুক আইডির নাম ______! তুমি দিয়ে দাও। : আচ্চা আমি দিয়ে দিচ্ছি। এভাবেই তার ফেইসবুক আইডি পেলাম। সেদিন বিয়ে শেষ হওয়ার পর পরেই সন্ধ্যা বেলায় ওরা ওদের বাড়িতে চলে যায় আর আমরা আমাদের বাড়িতে চলে আসি। বাড়িতে এসে আমি খুব মিস করছিলাম তাকে। দুদিন আমি মেসেঞ্জারে আসিনি। মেসেঞ্জার ওপেন করেই দেখি অপরিচিতার একটা মেসেস- : ধন্যবাদ ছবিগুলো সেন্ড করার জন্য। : এতে এমন ভাবে ধন্যবাদ দেওয়ার কি আছে? কি করছো?? এভাবেই আমাদের কথার শুরু হয়েছিল মেসেঞ্জারে। কিন্তু এই সামান্য কথা বলা যে আমাদের এমন পরিস্থিতিতে নিয়ে যাবে তা আমি কখনো ভাবিনি। . এভাবে মেসেঞ্জারে প্রায় ১ মাস যাবত কথা হলো আমাদের মাঝে। দুজন দুজনকে নিয়ে কিছুটা ভাবতে শুরু করলাম। একে অন্যকে হয়তো কিছুটা মিসও করতাম। হঠাৎ একদিন- : একটা কথা বলব? : আমার সাথে কথা বললে এমন ভাবে অনুমতি নেওয়ার কি আছে। কি বলতে চাও বলে ফেলো। : তোমার ফোন নাম্বারটা দাও। ফোন দেবো। আসলে এভাবে লিখে চ্যাট করতে করতে খুব বোরিং লাগছে। তোমার গলার স্বর শুনতে চাই। : ও এই কথা। এই নাও আমার নাম্বার ০২৭০৭০৫২৭১৭ : ধন্যবাদ। আমি কল দিচ্ছি। ধরো কিন্তু। : আচ্চা দাও! এভাবে আমাদের মাঝে প্রথম ফোনে কথা বলা শুরু হয়েছিল। প্রথম বার ফোন করেই প্রায় ২০ মিনিট কথা বলেছিলাম। খুবই রোমাঞ্চকর লাগছিল কথা বলার সময়টুকু। ফোনে কথা বলতে গিয়েও নার্ভাস হয়ে যাচ্ছিলাম। কথার মাঝে জট বেঁধে যাচ্ছিল। কিন্তু সেই কথা বলার সময়টুকু পরবর্তি ১ সপ্তাহ আমাকে যে আরেক জগতে রেখেছিল তার কোনো সন্দেহ নেই। ৬ মাস যাবত আমাদের নিয়মিতই ফোনে কথা হচ্ছিল। আমি ওকে ফোন দিতাম। মাঝে মধ্যে ও আমায় ফোন দিয়ে খুঁজ খবর নিতো। বেশ ভালোই চলছিল দিনগুলো। কিন্তু আমাদের ঐ বিয়ের অনুষ্ঠানের পরে আর কখনো সামনা সামনি কথা হয়নি, অবশ্য মেসেঞ্জারে ভিডিও কলে কথা হয়েছে কয়েকবার। আমরা একদিন দেখা করার প্লাণ করলাম এবং কোনো জায়গায় একসাথে ঘুরতে যাওয়ার প্লাণ করলাম। কিন্তু তা আর হলো না। সব কিছু নিমিশেই পালটে গেল। ওর সাথে আমার ১৫ দিন যাবত যোগাযোগ বন্ধ। ওকে ফোনেও পাচ্ছিনা, মেসেঞ্জারেও আসছে না। ওর পরিচিত বন্ধু বান্ধবদের সাথে আমার যোগাযোগ না থাকার কারনে আমি ওর কোনো খুজেই নিতে পারছিলাম না। আমার চারদিক কেমন যেন অন্ধকার হয়ে আসছিল। সবুজ গাছপালাকেও কেমন যেন দূসর লাগতো। ঠিক ২৮ দিন পর আমার ফোনে একটা কল এলো- : হ্যাঁলো! কে জয় বলছো? : হুম বলছি। আপনি কে? : আমি অপরিচিতা। কেমন আছো? : যেমন তুমি রেখেছো। কোথায় ছিলে এতদিন? কোনো খুজ পাইনি কেন?? জানো তোমার সাথে আমি কত যোগাযোগ করার চেস্টা করেছি। কি হয়েছিল তোমার? : সরি জয়! আমার ফোনটা চুরি হয়ে গিয়েছিল। আজকেই এই ফোনটা কিনলাম। : অন্য ফোন দিয়েও তো খুজ নিতে পারতে। : আমি ভাবছিলাম শীগ্রই ফোন কিনে নেব। : আচ্চা ঠিক আছে। তোমার সাথে আমার দেখা করার কথা ছিল। মনে আছে? : হা আছে। কবে কোথায় দেখা করছো? : কাল বিকালে আমাদের নদীর ধারে এসো। : আচ্চা ঠিক আছে। আমি পরের দিন তাকে দেওয়া কথার ঠিক ৩০ মিনিট আগে নদীর ধারে গিয়ে পৌছে ছিলাম। সে নির্দিষ্ট টাইমের এসেছিল। : কতক্ষণ যাবত দাঁড়িয়ে আছো? : বেশি না এই কিছুক্ষন। তারপর কি অবস্থা বলো : হা এই চলছে৷ তোমার...... কথা চলছে তো চলতে। আমি আর ও নদীর ধার ধরে হাটছিলাম। সে আমায় বলেছিল- : তোমার সাথে এভাবে হাটতে কিন্তু খুব ভালই লাগছে। যদি প্রতিদিন এভাবে হাটতে পারতাম! : কে মানা করেছে। আচ্চা হেঁটো। : আচ্ছা একটা কথা বলব? তুমি কি এখনো তোমার গার্লফেন্ড খুজে পাওনি? : না। তোমার মতো কেউ আমায় বুঝার চেস্টা করেনা তো। তাই গার্লফেন্ড ও না। : আমার মতো? : হুম। : আচ্চা তুমি কি আমাকে ভালোবাসো? : হুম অনেক। :তাহলে কখনো বলনি যে। : ভয় হয়। যদি ভুল বুঝ। : আরে না পাগল। তোমাকে ভুল বুঝার কি আছে? প্রপোজ করো আমায়। : আচ্চা ঠিক আছে। একটু অপেক্ষা করো। আমি নদীর ধারের সরিষা ক্ষেত থেকে কিছু সরিষা ফুল তুলে এনে সেই ফুল দিয়ে তাকে প্রপোজ করেছিলাম। শীতের সন্ধ্যা, কিছুটা শীত শীত করাই আমরা সেদিন বাড়ি ফিরে এসেছিলাম। কিন্তু আজও আমরা দেখে করছি৷ কিন্তু এটা শীতের সন্ধ্যা নয়, শরৎতের সন্ধ্যা, কিন্তু জায়গাটা ঠিক একই আছে। সেই নদীর পাড়। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। শরৎতের পরিস্কার আকাশে মস্ত বড় একটা চাঁদ ওঠেছে। তার পাশে অসংখ্য তারা। নদীর থেকে হালকা একটা মৃদু বাতাস এসে মনকে প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিয়েছে। তার পাশে আবার অপরিচিতার চুলের একটা জাদুকরী গন্ধ আমায় ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে৷ কারন অপরিচিতা এখন চিরপরিচিতা হয়ে আমার কাঁধে মাথা রেখে বসে আছে। আমার হাত দুটু হাত হাতে! কিছু আনমনেই তার সাথে সেই মেঠো পথের ধারে দেখা হওয়ার মুহূর্তটা মনে জেগে ওঠল!!!!!!!!!!
গোধুলী বেলা। আমি একা একা আনমনে প্রতিদিনকার মতো ধানখেত গুলোর মধ্যে দিয়ে যাওয়া সবুজ ঘাসে আবৃত সরু মেঠো পথটা ধরে হাট....