23/08/2026
গল্প :- ানা_এলাচ
পরিসংখ্যান :- ৭
লেখক :- #সাদনান_আল_আরাফ
আমি বললাম,
-- আমি যদি তোমাকে রক্ষা না করতাম। তাহলে হয়তো এতদিনে তাঁরা আরো জঘন্য পরিকল্পনা করতো। আব্বা তো দেখেও না দেখার ভান করে চলে যায়। একজন ভালো সন্তান হওয়া খুবই সহজ। তবে কখনো একজন ভালো স্বামী হওয়া যায় না।
আম্মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। তিনি এখন নিরব হয়ে যায়। আজকে সারাদিন ছিল একটা যুদ্ধের মতো। যেখানে চারদিকেই শত্রু বাহিনীর আখড়া। একটু ভুল হলেই নিজের জীবনের যতটুকু সম্মান ছিল তা এক নিমিষেই শেষ করে দিবে।
আমি আম্মার হাতটা ধরে মাথা থেকে সরিয়ে দিয়ে উঠে বসে যায়। আম্মার চোখে ঘুমের আবরণ জড়ো হচ্ছে। তিনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ঘুমিয়ে যাচ্ছিল।
আমি আম্মাকে আলতো করে ধাক্কা দিয়ে বলে উঠলাম,
-- আম্মা, তুমি তো ঘুমিয়ে যাচ্ছো! আমার মাথা ব্যথা একদমই কমে গেছে। তুমি গিয়ে এখন ঘুমিয়ে পড়ো।
আম্মা বলে উঠলো,
-- তুই ও ঘুমিয়ে যা, বাজান। কালকে সকালে উঠতে হবে তো। কালকে সকালে কিন্তু অনেক কাজ।
আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম,
-- আম্মা, কালকে সকালে তো আব্বা দোকানে যাবে। তাহলে আমার কাজ কি?
আম্মা বিছানা থেকে নেমে দরজা ধারে দাঁড়িয়ে বলল,
-- কালকে একটু তোর নানীর বাড়িতে যেতে হবে। তোর নানুর শরীরটা খারাপ। তোকে তোর নানু একবার যেতে বলছে।
আমি একটু অবাক হলাম। আমি আজকে থেকে ২ বছর আগে নানুর বাড়িতে গিয়ে ছিলাম। আমার নানাবাড়ি বেশি দূরে নয়। আমাদের পাশের উপজেলার মধ্যে যেতে সময় লাগে ৪০ মিনিটের মতো।
আমি ওই বাড়িতে যেতে চাই না। সেখানে সবাই ছোট করে দেখে। সবসময় আমাদের গরিব বলে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। আমার আব্বা কোনো সম্মান করে না। যেখানে আমার বাপের সম্মান নেই। সেখানে আমি সন্তান হয়ে যাওয়া প্রশ্নেই আসে না।
আমি বলে উঠলাম,
-- আমি ওইখানে যেতে পারবো না। তোমার বাপের বাড়ির লোক, মানুষকে মানুষ বলেই মনে করে না।
আম্মা মাথা নিচু করে বলল,
-- সবাই যেমনি হোক, তোর নানু তো তোকে খুব আদর করে। তুই তাঁর আদরের কদর তো করবি।
আমি শান্ত কন্ঠে বললাম,
-- আমি যেতে পারি, কিন্তু তোমার পরিবারের কেউ কটুক্তিমূলক কথা বলে। তাহলে কিন্তু আমি কাউকে ছেড়ে কথা বলবো না। সেটা যদি তোমার বাপ হয় তা-ও না।
আম্মা আমাকে বলে উঠলো,
-- আমি তোর নানুকে বলে দিবো নি। তোর সাথে কেউ উল্টো পাল্টা কথা বলবে না। তুই শুধু যাবি ?
আমি বললাম,
-- আমি জানি, তোমার মায়ের কিছুই হয় নাই। কিসের জন্য যেতে হবে। সেইটা আমাকে একবারে বলে দাও।
আম্মা বলে উঠলো,
-- আসলে, আমি তোদের না জানিয়ে। তোদের দুই মামার কাছ থেকে এক কাঠা করে জমি বন্ধক রাখছি। এখন তো আমাদের ঘরের চাউল শেষ হয়ে গেছে। তাই যে ধান পাইছি, সেটাই আনতে যাবি।
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। আম্মা জমি বন্ধক রেখে দিছে। এত টাকা আম্মার কাছে আসলো কিভাবে। আব্বা তাঁর বাপের কাছ থেকে জমি কিনে রাখছে। আসলে আমার সাথে হচ্ছেটা কি?
আমি অবাক হয়ে বলে উঠলাম,
-- তুমি এত টাকা কোথায় পেলে। তোমার বড় ভাই ( হারুনুর রশীদ ) সে তো বড় মাছের হ্যাচারির মালিক। তোমার ছোট ভাই ( তাজুল ইসলাম ) সে তো হার্ডওয়্যারের দোকান। তাহলে তাঁরা কেনো জমি বন্ধক দিতে যাবে?
আম্মা আমাকে বলে উঠলো,
-- তোকে এত কথা জানতে হবে না। তুই কি রাত পোহালেই আমাকে ছাড়বি। সেই কখন থেকে পুলিশের মতো জিজ্ঞাসাবাদ করে যাচ্ছিস?
আমি আর কিছু বললাম না। আমার কাছে কেমন জানি লাগছে।
আমি যদি কোনো ভাবে জানতে পারি। নানার বাড়ি থেকে সাহায্য করছে। তাহলে আম্মার খবর আছে। যদি দরকার হয়, তাহলে এক বেলা খাবো, দুই বেলা না খেয়ে থাকবো। তবুও কারো সাহায্য আমাদের দরকার নেই।
আমি বাহির থেকে অজু ইস্তেন্দা শেষ করে। এসেই লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ি। আল্লাহ যদি বাঁচিয়ে রাখে। তাহলে কাল সকালে দেখা যাবে।
_______
আমি ঘরের দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি, সকাল সাড়ে আটটা বাজে গেছে। আমার মাথায় বাজ পড়ে। আমি এত সময় পর্যন্ত কখনোই ঘুমায় না। আজকে ফজরের নামাজটাও মিস করে ফেললাম।
আমি উঠে বাহিরে গিয়ে উঠানে দাঁড়ায়। আম্মা রান্না ঘরে রান্না করতেছে। আব্বা হয় তো দোকানে চলে গেছে।
আবিদ কোথা থেকে দৌড়ে আমার কাছে আসে।
আবিদ এসেই বলে উঠলো,
-- ভাইয়া, আমরা কি গরুর গোশত খাবো না?
আমি একটু অবাক হলাম। আবিদ আর ফাবিহা সচরাচর এমন কথা বলে না। আজ হঠাৎ এই কথা বলছে।
আমি আবিদকে নিজের কাছে নিয়ে বললাম,
-- আমরা গরু গোশত খাবো না কেনো? আব্বার কাছে যখন টাকা হবে। তখন তো আমাদের জন্য আনবেই। তুই হঠাৎ এই কথা বলছিস কেনো?
আবিদ দাদুর রান্না ঘর দিকে দেখিয়ে দিয়ে বলল,
-- আজকে দাদুর ঘরে গরু গোশত রান্না করতেছে। আমরা সেই বড় ঈদের সময় গোশত খেয়ে ছিলাম। আব্বা তো আর গরু গোশত আনলো না?
আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। আসলে, এক কেজি গরুর গোশত আনলে ৭০০ টাকা লাগে। অথচ, এই টাকা দিয়ে আমাদের ডিম, ডাল বাকি টুকটাক সংসারের জিনিস আনলে অনায়াসে এক সপ্তাহ চলে যাবে।
আমি বললাম,
-- আরেকটু ধৈর্য্য রাখ ভাই আমার। আমার কাছে যদি টাকা হয়। তাহলে আমি তোদের জন্য অল্প হলেও আনবো।
আবিদ এতটুকু শুনেই খুশি হয়ে চলে যায়। তাঁর মুখে খুশির বন্যা বয়ে যাচ্ছে।
আমি রান্না ঘরের এইখানে গিয়ে একটা কয়লা নিয়ে দাঁত মেজে নেয়। আসলে, অভাব আছে বলে এতটাও নেই। আমি ট্রুটপেস্ট দিয়ে খুব একটা ব্রাশ করি না।
আমি ফাবিহার কাছে যায়। সে এখনো বসে পড়াশোনা করছে। আমার বোনটার ইচ্ছে সে একদিন খুব বড় ডাক্তার হবে। সে ডাক্তার হয়ে বিনামূল্যে মানুষের সেবা করবে।
আমি বললাম,
-- বোন, এখনো তুই এই পড়াশোনা নিয়ে পড়ে আছিস। সকালে কি কিছু খেয়েছিস?
ফাবিহা বসা থেকে উঠে চেয়ারটা টেনে আমাকে দিয়ে। সে আমার পাশেই দাঁড়িয়ে যায়। আসলে, এইটা আমার পরিবারের সদস্যদের নিয়ম। বড়রা যখন আসবে, তখন ছোটরা তাঁর আসন ছেড়ে দিবে।
ফাবিহা বলে উঠলো,
-- ভাই, তুমি খালি এই কথা বলো। আমি যদি পড়াশোনা না করি। তাহলে ডাক্তার হবো কিভাবে?
আমি একটা হাঁসি দিয়ে তাঁর হাতটা ধরে বিছানায় বসিয়ে দেয়।
আমি তাঁকে বললাম,
-- তোর পায়ের ব্যথা কি কমেছে! নাকি ওষুধ আনতে হবে?
ফাবিহা বলে উঠলো,
-- না না, তোমার ওষুধ আনতে হবে না। কালকে, কালো কইত্তা গাছের পাতার রস দিয়ে রাখছিলাম। এখন ঠিক হয়ে গেছে, এই যে আমি ঠিকঠাক ভাবে চলাফেরা করছি।
আমি তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম,
-- আচ্ছা আচ্ছা, আমি খুব বুঝতে পারছি। এখন তোর চোখ বন্ধ কর?
ফাবিহা বলে উঠলো,
-- ভাইয়া, চোখ বন্ধ করবো কেনো?
আমি একটু রাগ দেখিয়ে বললাম,
-- তোকে যেটা বলছি সেটাই করবি। তোকে এতকিছু জানতে হবে না।
ফাবিহা চোখ বন্ধ করতেই। আমি কোমড়ের খুজ থেকে, এক জোড়া নূপুর বের করে তাঁর হাতে দেয়।
আমি বলে উঠলাম,
-- এইবার তোর চোখ খোলে ফেল।
ফাবিহা তাঁর পছন্দের নূপুর জোড়া দেখেই। আমাকে বসা থেকে উঠেই জড়িয়ে ধরে। আমি হাসতেছি, এই তৃপ্তির হাসি। যার ভিতরে ভাই-বোনের ভালোবাসা। যেখানে অনুপাত আর সমানুপাতিক কোনো কিছু নেই।
ফাবিহা কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করে,
-- এই নূপুর গুলো আমার খুব পছন্দের। তুমি কিভাবে জানলে ভাইয়া?
আমি বলে উঠলাম,
-- তোর এতকিছু জানা লাগবে না। আমি এনে দিবো, তুই শুধু পরবি।
আমি একটু বলেই তাঁর ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। আম্মার রান্না করা শেষ। আমি ঘরে গিয়ে একেবারে রেডি হয়ে যায়। যত যাই বলি না কেনো, আম্মা বলছে আর আমি যাবো না। তা দুনিয়ার বুকে কিয়ামত হয়ে গেলেও সম্ভব না।
আম্মার ডাক শুনে পাশের রুমে গেলাম। আম্মা ভাত বেড়ে দেয়। আমি খাবার খেতে থাকি।
আম্মা বলে উঠলো,
-- তুই কি তোর নানার বাড়ি যাবি?
আমি বললাম,
-- এই যে আমি রেডি হয়ে আসলাম। খাবার শেষ করেই বেড়িয়ে যাবো।
আম্মা বলে উঠলো,
-- বলছিলাম কি, আবিদ তোর সাথে যেতে চাই ছিল। এখন কি তাঁকে সঙ্গে নিবি?
আমি বলে উঠলাম,
-- আবিদের যেতে হবে না। আজকে তো তাঁর স্কুল আছে। পরে আরেকদিন নিয়ে যাবো।
আম্মা আর কিছু বলে নাই। জানে, আমি না করার পর আর কাজ হবে না।
আম্মা আমার হাতে ১০০ টাকা দিয়ে বলল,
-- এই টাকা নিয়ে গাড়ি ভাড়া দিয়ে যাবি।
আমি বললাম,
-- আমার কাছে তো গাড়ি ভাড়া আছে। তোমার কাছে রেখে দাও।
আম্মা আমাকে বলে উঠলো,
-- হয়েছে আর বলতে হবে না। তোর কাছে টাকা থাকলে তোর নানু জন্য কিছু নিয়ে যাস।
আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। আমি দোকানে চলে যায়।
আব্বা আমাকে দেখে বলে উঠলো,
-- তুই এইভাবে রেডি হয়ে কোথায় যাচ্ছিস?
আমি বললাম,
-- তোমার শশুর বাড়ী যাবো, তোমার শাশুড়ি আর বাঁচবে না বলতেছে। আমাকে শেষবারের মতো দেখতে চাইছে?
আমার কথা শুনে আব্বা হেঁসে দেয়। তিনি জানান আমি মজা করছি।
আব্বা ক্যাশ থেকে ২০০ টাকা দিয়ে বলল,
-- তাহলে তো তুই রোগী দেখতে যাচ্ছিস। এক কাজ করিস, ব্রিজ মোড় থেকে কয়েক হালি কলা আর কিছু টাকা বড়ে এক কেজি মিষ্টি নিয়ে নিস।
আমি দোকানের ভিতরে গিয়ে একটা বড় রুটির প্যাকেট , একটা এনার্জি বিস্কুটের প্যাক, আরেকটা জুস নিয়ে নেয়।
আমি আব্বাকে বলে উঠলাম,
-- আজ যদি তোমার শশুর কিছু বলে তাহলে তোমার শশুরের একদিন আমার যে কয়দিন লাগে।
আব্বা বলে উঠলো,
-- তুই আর ভালো হবি না। বারবার তোর নানার সাথেই লেগে থাকিস। আমি তোদের মাঝে যাবো না। তোরা নানা নাতি বুঝবি। তুই আস......?
চলবে......?
একটা পারিবারিক গল্পের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত গুলো আজকে যেনো প্রকাশ করতে পারলাম। আমার খুব পছন্দের একটা গল্প এইটা?
হ্যাপি রিডিং 🙂