17/08/2024
‘অন্বেষা ক্রীড়া চক্র’ – জন্ম ও ইতিহাস
+++++++++++++++++++++++
১৯৭২ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত কেওয়াটখালী রেলওয়ে কলোনীতে নতুন আলোর সন্ধানে সৃষ্টি সুখের উল্লাসে প্রথম আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে আমাদের ছোটদের প্রিয় সংগঠন, প্রাণের সংগঠন ‘জাগ্রত কিশোর সংঘ’ সংক্ষেপে ‘জাকিস’ । এর নেতৃত্বে ছিলাম আমরা মাত্র শৈশব পেরুনো ক’জন দুরন্ত কিশোর- আমি, কামাল, বকুল, কমল, ফেরদৌস, খালেদ, দুই ইব্রাহিম সহ আরও কয়েকজন । সবচেয়ে মজার ব্যাপার এই নামকরনটা হয়েছিলো অনেকগুলো নাম থেকে বাছাই করে এবং যা ছিলো আমার দেয়া নাম । জাগ্রত কিশোর সংঘের সভাপতি হন মুক্তা ভাই, সাধারণ সম্পাদক বকুল, সাহিত্য সম্পাদক আমি, সাংস্কৃতিক সম্পাদক ফেরদৌস, সমাজকল্যাণ সম্পাদক কমল, দপ্তর সম্পাদক ইবরাহিম, ক্রীড়া সম্পাদক খালেদ । এখানে অনস্বীকার্য্য, আমাদের ছোটদের মাথায় এই সংগঠন গড়ার মহতী চিন্তা উসকে দেন প্রিয় মুক্তা ভাই (ডঃ সলিমুল্লাহ খান ইউসুফজাই) । আর আমরা ছোটরা তা নির্দ্বিধায় লুফে নেই । কারন আমরা ছোট হলেও মুক্তিযুদ্ধ ইতিমধ্যে আমাদের সবার মনোজগতে বিরাট পরিবর্তনের সূচনা করেছে । তাই তখন আমরা ছোট হয়েও যেন বড় হয়ে গিয়েছিলাম । ভাবতাম, দেশ ও সমাজের জন্য আমাদেরও অনেক কিছু করার আছে । মুক্তিযুদ্ধ আমাদের দেশপ্রেম, মানসিক শক্তি আর ইচ্ছা শক্তিকে অনেক অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিলো যেন ।
এসডিও সাহেবের অনুমতিক্রমে ডাক্তার সাহেবের বাংলোর পিছনে লোকোসেড লাগোয়া পরিত্যক্ত পোস্ট অফিসটাই ছিলো আমাদের জাগ্রত কিশোর সংঘের ক্লাব ঘর, যার সামনের রুমটা আইওডব্লিও সাহেবের সহযোগীতায় সংস্কার করে আমাদের কার্য্যক্রম শুরু হয় । ঐখানেই আমরা প্রথম টেবিল টেনিস খেলা শুরু করি । এছাড়া ওখানে ছিলো লুডু, ক্যারম সহ বেশ কয়েকটি খেলার সুব্যবস্থা । আর ফুটবল, ভলিবল খেলার ব্যবস্থা ছিলো পার্কের মাঠে । আমাদের এই পথচলায় আমরা সর্বতোভাবে সমর্থন ও সহযোগীতা পেয়েছিলাম প্রায় সব অভিভাবকের, যা ভুলবার নয় । ওখানে আমরা স্বাধীনতা দিবসে প্রথম দেয়াল পত্রিকা ’জাগরণ’ বের করেছিলাম, যার সম্পাদক ছিলাম আমি এবং ঐ অনুষ্ঠান উদ্ভোধন করেছিলেন তৎকালীন এসডিও সাহেব, বিশেষ অতিথি ছিলেন তৎকালীন আইওডব্লিও সাহেব ও ডাক্তার সাহেব । ওখানে আমরা টেবিল টেনিস টুর্ণামেন্টও করেছিলাম ঐসময়ই । উল্লেখ্য, তখন ওখানে ডাক্তার সাহেব ও আইওডব্লিউ সাহেবের পদমর্যাদা সমান ছিল । কিন্তু পরবর্তীতে ডাক্তার সাহেবের পদমর্যাদা উন্নত করে এসডিও (যা পরবর্তীতে এ ই এন)র পদমর্যাদার সমতুল্য করা হয় ।
আমাদের এই সফল প্রচেষ্টায় অনুপ্রাণিত হয়ে আমাদের বড়ভাইরা বৃহত্তর পরিসরে নতুন আরেকটি সংগঠন গড়ার উদ্যোগ নেন এবং আমাদেরকে ঐ সংগঠনে একত্রিত হতে অনুরোধ করেন । এলাকার সার্বিক কল্যাণ চিন্তা করে অনেক বৈঠক শেষে আমরা সবাই মিলে নতুন সংগঠন ‘সুর্য্য সন্ধানী ক্লাব’ গঠন করি ১৯৭৩ সালে । নতুন এই সংগঠনের মূল নেতৃত্বে ছিলেন খোকন ভাই, মনির ভাই, লুলু ভাই, কাশেম ভাই, মিলন ভাই, তাজুল ভাই, মুসন ভাই, আফসার ভাই, চমক ভাই, জসিম সহ আমরা জাকিসের প্রায় সবাই, যেমন আমি, বকুল, কামাল, দুই ইব্রাহিম, কমল, ফেরদৌস, ও অন্যান্যরা, যাদের নাম আমি এই মুহুর্তে মনে করতে পারছি না । ওখানে আমি ছিলাম সাহিত্য সম্পাদক, মোহসিন ভাই অথবা বাবুল ভাই ছিলেন প্রথম সভাপতি, খোকন ভাই ছিলেন সহ সভাপতি, মনির ছিলেন সাধারন সম্পাদক, বকুল দপ্তর সম্পাদক, কাশেম ভাই সাংস্কৃতিক সম্পাদক, মিলন ভাই ক্রীড়া সম্পাদক, জসিম সমাজকল্যাণ সম্পাদক, লুলু ভাই ছিলেন ক্যাশিয়ার । আর `সূর্য্য সন্ধানী’ নামটা দেন আমাদের স্কুলের এক প্রিয় শিক্ষক সত্যেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী । এর ক্লাবঘরটা নির্মিত হয় এম রহমান মিলনায়তন ও পার্কের মাঝে নদীর পাড়ে সুন্দর এক মনোরম পরিবেশে, যা অনেক দূর থেকেও সবার দৃষ্টি কাড়তো । সারা বছরই নানারকম খেলাধূলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে এলাকার কিশোর-তরুণদের সবসময় মাতিয়ে রাখতো ক্লাবটি।
পরে নানা ঘটনার পর, বিশেষ করে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারনে ১৯৭৫ সালের শেষ ভাগে আরও ব্যপক পরিকল্পনা ও উদ্যোমে সূর্য্য সন্ধানী ক্লাব নামটা পরিবর্তন করে ‘অন্বেষা ক্রীড়া চক্র’ নামে নবযাত্রা শুরু হয় । প্রথম থেকেই যার নেতৃত্বে ছিলেন মনির, খোকন, কাশেম, মিলন, লুলুভাই সহ আমরা বেশ ক’জন, যেমন, আমি, কামাল, বকুল, চমক, কমল, মার্শাল, সোহেল, রঞ্জু, দুই ইব্রাহিম ও অন্যরা । অন্বেষার প্রথম সভাপতি হন বুলবুল ভাই, সাধারণ সম্পাদক মনির ভাই, সহসভাপতি খোকন ভাই, সাংস্কৃতিক সম্পাদক কাশেম ভাই, ক্যাশিয়ার লুলু ভাই । আর আমি ছিলাম অন্বেষারও প্রথম সাহিত্য সম্পাদক অর্থাৎ তিনটা সংগঠনেরই প্রতিষ্ঠাতা সাহিত্য সম্পাদক আমি । অবশ্য অন্বেষায় আমার সাথে কামাল ছিলো যুগ্ম সাহিত্য সম্পাদক । আগের ধারাবাহিকতায় এই সংগঠনটিও নানারকম সাহিত্য, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে এলাকায় সবার মন জয় করে । আর জাগ্রত কিশোর সংঘকে আদি সংগঠন বিবেচনা করলে তো ‘অন্বেষা’র জন্ম ১৯৭২-ই বটে । কারন আগের দুই সংগঠনের ধারাবাহিকতারই ফসল আমাদের প্রাণের সংগঠন ‘অন্বেষা ক্রীড়া চক্র’ ।
এখানে একটা কথা উল্লেখ করা অত্যন্ত জরুরী, অন্বেষা’র জন্মের এই পথচলায় (১৯৭২-১৯৭৬) এলাকার সিনিয়র বড় ভাইরা অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে জড়িত না থাকলেও তাদের উপদেশ, পরামর্শ, সাহায্য, সহযোগীতা থেকে আমরা কখনোই বঞ্চিত হইনি, নিরাশ হইনি । অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে না থাকলেও তারা, বিশেষ করে মোবারক ভাই, সাইফুল ভাই, কুতুব ভাই, বেলাল ভাই, হৃদয় ভাই, বুলবুল ভাই, স্বপন ভাই, জাহাঙ্গীর ভাই, মোহসিন ভাই, দুই বাবুল ভাই(বাবুল মিত্র ও বাবুল ব্যানার্জি), আলী হোসেন ভাই, নাসির ভাই, মুক্তা ভাই, হেলাল ভাই, সেলিম ভাই, ইবরাহিম ভাই, শাহজাহান মামা সহ বেশ ক’জন বড়ভাই সভাপতি, উপদেষ্টা হিসেবে কিংবা ফুটবল, ভলিবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় হিসেবে সর্বদাই আমাদের সঙ্গ দিয়েছেন, ছায়া দিয়েছেন । তবে এটাও সত্য, তাদের চাকুরী, উচ্চশিক্ষা, সক্রিয় ছাত্ররাজনীতি (মুজিববাদী ছাত্রলীগ, জাসদ ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নে বিভাজিত), ঢাকার বাইরে অবস্থান ইত্যাদি নানা কারনে তখন সিনিয়র বড় ভাইরা এলাকা ভিত্তিক স্থানীয় এই সব ছোট ছোট সংগঠনে যথেষ্ট সময় দিতে অপারগ ছিলেন । তাই আমাদের বা আমাদের কাছাকাছি বড় ভাইদের নিয়েই ছিল এই পথচলা ।
পরে ১৯৭৬ সালের শেষে আমরা (আমি, মনির) সপরিবারে ঢাকায় চলে আসি বাবার বদলীর কারনে । এরপর আমার আর তেমন কিছু জানা নেই অন্বেষার ব্যাপারে । আজ আবার এটা সম্বন্ধে নতুন করে জেনে খুবই ভালো লাগছে । বেশী ভালো লাগছে আমাদের হাতে গড়া সংগঠনটি জন্মের এতো বছর পরে আজও সগৌরবে টিকে আছে জেনে ।
নতুন-পুরোনো সব ‘অন্বেষিয়ান’কে আমার হৃদয় মথিত শুভেচ্ছা, অভিনন্দন ও ভালোবাসা । যুগ যুগ টিকে থাকুক আমাদের হৃদয়ের ‘অন্বেষা’ ।
--------------------
(খুরশীদ জামান ফটিক)
ঢাকা : ৮ই মে,২০১৮ ইং ।
--------------------------------------
(গত ৮ই মে, ২০১৮ ইং তারিখে একটা ভিডিও ক্লিপ দেখে আমি বিষ্মিত ও আপ্লুত হই । কেওয়াটখালীর এক বড় ভাই, আলী হোসেন ভাইয়ের শেয়ার করা সেই ভিডিও ক্লিপে ওখানকার এক ক্লাব, ‘অন্বেষা ক্রীড়া চক্র’ এর কর্মকান্ড তুলে ধরা হয়েছে । আর সেটাই আমার আবেগ তাড়িত হওয়ার মূল কারন । এটা তো ধ্রুব সত্য, অন্বেষার জন্মের সাথে আমার ছোটবেলা নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে । তাই তাৎক্ষণিকভাবে আমি ‘অন্বেষা ক্রীড়া চক্র-জন্ম ও ইতিহাস’ নামে ছোটবেলার একটা মায়াবী স্মৃতিচারণের চেষ্টা করি । আজ প্রিয় ‘অন্বেষা’র বর্তমান প্রজন্মের জন্য লেখাটা রি-পোস্ট করছি ।)
পোস্ট --- Khurshid Zaman