20/01/2023
গল্প:মিষ্টি ভালোবাসা 3
লেখক: জাফর ভিপি।
কিছু বই একবার পড়ার জন্য নয়। বারবার পড়তে, বারবার ভাবতে এবং ব্যক্তি সত্তাকে অনন্য এক উচ্চতায় নিতেই লেখা হয়।
আদিব এমনই একটি বই স্নেহার হাতে দিয়ে পড়তে বলল। কিন্তু সে এখন পড়বে না। ভালো লাগছে না। শুধুই শুয়ে শুয়ে এটা সেটা করে সময় কাটাচ্ছে। আদিব হাসতে হাসতে আলতো করে কয়েকটি কেনু(কনুই দিয়ে গুতো দেয়াকে কেনু বলে) দিয়ে বলল,,, "ইসস পড়তেই হবে"
কিন্তু স্নেহা রাজি না এখন সে পড়বেই না। দিল আম্মুকে ডাক "আম্মু কইতরটা শুধু শুধু সময় নষ্ট করছে, পড়ে না।
আদিব রাগ করে স্নেহাকে মাঝে মাঝে কইতর বলে ডাকে। যেটার ভদ্র রূপ হলো কবুতর।স্নেহার সাথে কবুতরের বেজায় মিল। কবুতর ঠোকর মেরে খায় আর স্নেহা সবসময় আদিবের হাতে খায়। এই পার্থক্য।না হয় ওরা উরি ছোটাছুটি বুদ্ধিমত্তা কিউটনেসের দিক থেকে কবুতরকে স্নেহার ছোটবেলায় মেলায় হারিয়ে যাওয়া বোন বললে খুব একটা অতুক্তি বোধহয় হবে না। এই যাহ,, ভাইওতো হতে পারে। আচ্ছা সে যাকগে।
স্নেহা ওর শাশুড়ি আম্মু আসার আগেই চট করে বইটি হাতে নিয়ে গুনগুনিয়ে পড়া শুরু করে দিল। আদিবও অন্য একটি বই নিয়ে পড়তে লাগলো। কিছুক্ষণ পর,,,,
না আদিব পড়তে পারছে না। স্নেহা গুনগুনিয়ে পড়ছে। গুনগুন শব্দ কানে গেলে পড়া যায়..? মনে মনে পড়তে বলল। কিন্তু হু কেয়ারস..! সে শব্দ করেই পড়বে। না হয় পড়বেই না।কি মুশকিল। আদিব আম্মুকে ডেকে বলল,,, আম্মু কইতরটা আমাকে পড়তে দিচ্ছে না। একটু আস্তে পড়তে বলেন। আম্মু বলল,,,," নালিশ করা পছন্দ করি না"
আম্মুর এ কথা বলতে দেরি, এদিকে স্নেহা কেমন যেন ভুতুড়ে টাইপের একটা হাসি দিয়ে উঠলো। কেমনটা লাগে..!!!!
এমন সময় হাবিবের ছোট ভাই জিয়াদ বাজার নিয়ে হাজির। আম্মুকে ডেকে বাজারের কথা বলায় স্নেহা বইটা রেখে আর চোখে জব্বর একখান টিপ্পনি কেটে উঠে গেল।
জিয়াদ মাছ এনেছে আরও টুকিটাকি কিছু এনেছে। ওর এখন ছুটি চলছে।তাই সুযোগ পেলে ওকে বাজারে পাঠায়। ওর আম্মু আবার জিয়াদকে পাঠাতে চায় না। টাকা নাকি বেশি দিয়ে আসে। রাজিবের কথা হলো এখন দুই টাকা বেশি দিয়ে আসলেও অনেক কিছু শিখবে। এখন না শিখলে শিখবে কখন....? আর এখন শিখে রাখলে আগামীতে চার টাকা বাঁচাতে পারবে। লাভ না..?
আম্মু আর কিচ্ছু বলে না। স্নেহা মাছ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আজ পাঙ্গাস এনেছে। ওর যা ইচ্ছা আনতে বলেছিল। বসে বসে মাছটা ঘষে সাদা করে ফেলেছ। আদিব জানালার দিয়ে দেখে বলল,,, "গুড এভাবে পরিষ্কার করে এরপর ভেজে ভুনা করলে দারুন লাগে" আদিবের আম্মু মেশিনে বসে টুকিটাকি সেলাই করছিল। সেলাই থামিয়ে মাথা নাড়িয়ে আদিবের কথায় সাই দিয়ে বলল...
চাষের মাছের চেয়ে নদীর মাছের স্বাদ বেশি।কেন বলতো...? কারণ নদীর মাছের সুখ বেশি,স্বাধীনভাবে চলতে পারে, খেতে পারে, জোয়ার ভাটায় নাইতে পারে, কোন জবরদস্তি নেই। আর চাষের মাছ কোন স্বাধীনতা নেই, যা খেতে দেবে তাই খেতে পারবে, জোয়ার ভাটার ছোঁয়া নেই, না চাইতে সব পেলেও মনে কোন সুখ নেই। সেই অসুখের প্রভাবেই চাষের মাঝে তেমন কোনো স্বাদ নেই ।
আম্মু এটা কি ব্যাখ্যা করল বুঝতে কিছু সময় লাগবে। নির্দিষ্ট একটা বয়স লাগবে। সে যাকগে।
স্নেহা এবার মাছ কাঁটায় মন দিল। একটু পর পর মাছের দাম নিয়ে বলল। আচ্ছা এখানে মাছের দাম এত বেশি কেন..? এখানেই তো ধরে তবুও এত দাম..! আম্মু বলল...
এখান থেকে ধরে সব মাছ শহরের দিকে পাঠিয়ে দেয়। এদিকে এখানে মাছের ঘাটতি পড়ে যায়। তাই এমনি দাম বেড়ে যায়। আসলে শুধু মাছের দামই না আজকাল নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছুই এমন আকাশ ছোঁয়া দাম। যে কেউ তা ছুঁতে গেলে প্যারাসুট লাগবে। হাত ফসকে গেলেই কমড় ভাঙবে। এতসবের পরও সামর্থ্যবানরা অপচয় করবে। আর বাকিরা সব না খেয়ে মরবে।
প্রকৃতপক্ষে এগুলো আমাদের জন্য রবের পক্ষ থেকে আজাব। আমাদের বদ আমলের জন্যই পৃথিবীর যাবতীয় বিশৃঙ্খলা। এসব কিছুই আমাদের দুই হাতের কামাই। আমরা ব্যক্তি পর্যায়ে সৎ হয়ে যাই, ভালো মানুষ হয়ে যাই, আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর পরিবেশকে শান্তিপূর্ণ করে দেবেন।
তো এক পর্যায়ে স্নেহা ডেকে বলল,,,
এই বলেন তো জান্নাতের প্রথম কি খেতে দেওয়া হবে..?
কি..?
মাছের কলিজা ভুনা।
তাই..?
জি, কিন্তু এই মাছের কলিজা তো একদম ছোট অনেক সময় খুঁজেই পাওয়া যায় না। কিন্তু এই মাছ হবে তুলনাহীন অকল্পনীয়।
কিন্তু তুমিতো কলিজা খাও না। তাই তোমার ভাগেরটা আমার। বলেই আদিব হো হো করে এক গাল হেসে দিল।
এরপর আদিব একটু ওয়াশ রুমে গেল। বের হয়ে অজু করতে যাবে। কিন্তু তার মাছ ধোয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে হলো। একটু জায়গা দিতে বলায় আরো আটকে বসলো। এভাবে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যায়...? এখন ওযু ছাড়া ঘরে চলে গেলে অনেক লস হয়ে যাবে।
একাধিক বার তাহকিক করে জানা গেছে অজুর শুরুতে 'বিসমিল্লাহি ওয়ালহামদুলিল্লাহ' এটা পড়ে ওজু শুরু করলে, যতক্ষণ এই অজু থাকবে ততক্ষণ তার আমলনামায় নেকি লেখা হতে থাকবে। কিন্তু এখন ঘরে চলে গেলে অনেকটা বঞ্চিত হয়ে যাবে।
সাহাবারা এমন করতেন, নেকির জন্য চালাকি করতেন। বাড়ি থেকে নামাজের জন্য মসজিদে যেতে প্রতিটি কদমে একটি করে নেকি হয় ও একটি করে গোনাহ মাফ হয়। তাই ইচ্ছা করেই ছোটখাটো কদমে মসজিদে যেতেন। কি চালাকি তাই না...?
আমরাও কম যাই না, বাংলালিংকে এক জিবি করে ফ্রি পাওয়া যায়। শুনেই হামলে পড়েছিলাম। যাক বাবা কয়েকদিনের খোরাক মিলল। আমরা হলাম দ্বিগুণ চালাক। এটা একেবারে নগদ ঝটপট..!
কিন্তু এই দুই চালাকির মধ্যে কি বিস্তর ব্যবধান তাই না..? এই ব্যবধানের জন্যই সর্বত্র তারা বিজয়ী ছিলেন। সুসংবাদপ্রাপ্ত ছিলেন।অস্ত্রহীন হলেও শত্রুর আতঙ্ক ছিলেন। আর আমরা..? এই যা কোথায় চলে গেলাম।
তো এর পর স্নেহার মাছ ধরার অপেক্ষায় না থেকে, এক মগ পানি নিয়ে এক পাশে গিয়ে ওযু করে ঘরে চলে এলো আদিব। তবে আসার আগে খুব যত্ন করে স্নেহার মুখে এক আঁজলা পানি খুব যত্ন করে স্নেহার মুখে মেখে দিল।বেচারি কিছু বোঝে ওঠার আগেই এক দৌড়ে আম্মুর কাছে ....
"এই দিন দিন না আরো দিন আছে" এই বলে স্নেহা এক হাক ছাড়তেই আদিব হাসতে হাসতে পল্টি খাওয়ার জোগার।
বেচারির মাছ ধোয়া শেষ হলে, তাতে লবণ দিয়ে রেখে ফ্রেশ হয়ে আবার পড়তে বসল। কিন্তু শব্দ আর কমলো না। এবার আরো জোরে পড়তে লাগলো।উফ,,
আদিব আম্মুকে আবারও বলল "এই আম্মু কিছু বলবেন, আমাকে একটুও পড়তে দিচ্ছে না। কি হিংসুটে।"
আম্মু বলল "এই স্নেহা,এবার তুমি আস্তে পাড়ো।"
শুনলো না। তার মত সে পড়তেই আছে। এবার আম্মু বলল,,,, "এটা হচ্ছে ঘাউড়া বোউ। আদিব তুমি ঐ রুমে গিয়ে পড়ো।"
এই কথা বলতে দেরি,অমনি পড়া বন্ধ করে হাঁক ছারলো। "কি আম্মু..? আমি কি...?"
আম্মু মুড অফ।এদিকে আদিবতো হাসতে গিয়ে না আবার কারো কাঁধে চড়ে বসে। ঘাউরা বউ হাহাহা...
আম্মু বলল "একটু আগে একবার তোমার পক্ষ নিয়েছি আর এবার ওর পক্ষ নিলাম। সমান সমান আর কি"
স্নেহা:- ভ্যা..!
আদিব:- ভ্যা ভ্যা।হাহাহা।
আসলে সুখ কোন বস্তুগত জিনিস নয়। এটা কেউ কাউকে দিতে পারে না। টাকা দিয়ে কিনতেও পারেনা। এর জন্য সুবিশাল বাড়ি আর অঢেল অর্থবিত্তের প্রয়োজন নেই। কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স আর ক্ষমতার অস্ফালনের দরকার নেই। এসবের মাঝে সুখ নেই।
সুখ হল বিচ্ছিন্ন কিছু অনুভূতির নাম। ছড়িয়ে থাকা বকুল কুড়িয়ে মালা গাথার নাম। সেই মালা প্রিয়জনকে নিজ হাতে পড়িয়ে দেওয়ার নাম। এর মাঝে যে ধূলিকণা থাকবে না সেটা নয়। জীবন প্রবাহের প্রতিটি পরতই ধূলিকণাময়। বিষাক্ত সব প্রয়োজন সুপ্ত আছে। একটু বেখেয়ালিতে এই রাজ্য ধ্বংস হওয়ার জন্য যথেষ্ট। একটু অসতর্ক তাতেই সুখের সংসার বিষে নীল হওয়ার জন্য খুব যথেষ্ট। উচিত হল বকুল গুলো কুরিয়ে সযত্নে সংগ্রহ করা। আর ধূলিকণা গুলো স্রেফ ঝেড়ে ফেলে বকুলের মালা গাথায় মন দেওয়া। আর,,,, আর একান্ত প্রিয়জনের গলায় সে মালা পরিয়ে দেওয়া।
নিয়মিত ইসলামী গল্প শুনতে আমাদের ইউটিউব চ্যানেলের সাথে কানেক্ট হতে পারেন। চ্যানেল লিংক কমেন্ট বক্সে দেওয়া আছে।