Brig Gen Waliur Rahman

Brig Gen Waliur Rahman Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from Brig Gen Waliur Rahman, Eastern Housing, Mirpur.

27/07/2026

“স্মৃতির আর্কাইভে জীবন পাঠ”

পর্ব–১১ (সেই ৭৮ এর কূঠা আর পার হতে পারিনি—কোন অদৃশ্য শক্তি কাজ করেছিল?)

মানুষ মাত্রই ভুলের সন্তান। আর কৈশোরের ভুল—তা যেন জীবনের অনিবার্য শিক্ষালিপি। সেই ভুল কখনো অপরিপক্বতার, কখনো আবেগের, আবার কখনো অদৃশ্য অহমিকার; যা নিঃশব্দে বিবেককে আচ্ছন্ন করে ফেলে। আমিও সেই নির্মম সত্যের ব্যতিক্রম ছিলাম না।

মেধার অহমিকা যেন কোনোদিন আমাকে গ্রাস করতে না পারে—এই ছিল আমার আজীবনের সাধনা। অথচ কৈশোরের এক ক্ষণিক আত্মবিশ্বাস কখন যে নিঃশব্দ অহংকারে রূপ নিয়েছিল, তার ব্যাখ্যা আজও আমার অজানা।

ক্লাস এইটে বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করায় স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষায় আমাকে বসতে হয়নি। বার্ষিক পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে একদিন স্কুলে গেলাম। সেদিন নবম শ্রেণির সাধারণ গণিত পরীক্ষা চলছিল। কয়েকজন শিক্ষক হঠাৎ আমাকে ডেকে বললেন, “তুমিও নবম শ্রেণির সাথে বসে যাও।” পরীক্ষা শুরু হওয়ার প্রায় আধঘণ্টারও পরে আমি খাতায় কলম ছুঁই। কোনো প্রস্তুতি ছিল না, কোনো প্রত্যাশাও ছিল না। অথচ ফলাফল প্রকাশের পর দেখা গেল—আমি পেয়েছি ৭৮ নম্বর, আর সেটিই ছিল সর্বোচ্চ।

সেদিন নবম শ্রেণির প্রথম ছাত্র শফিক ভাই আমাকে ডেকে খুব শান্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, “তুমি হয়তো খুব মেধাবী, কিন্তু তুমি আমাদের অনেক কষ্ট দিয়েছ।” সেদিন কথাগুলো কানে পৌঁছেছিল, কিন্তু হয়তো হৃদয়ে পৌঁছায়নি। বহু বছর পরে উপলব্ধি করেছি—সেটি কোনো অভিযোগ ছিল না; ছিল একজন পরিশ্রমী শিক্ষার্থীর নীরব আর্তনাদ। তখনই বুঝিনি, কিন্তু আজ উপলব্ধি করি—মেধারও একটি নৈতিক দায়িত্ব আছে। নিজের সাফল্যের উল্লাস যেন কখনো অন্যের শ্রম, ঘাম আর আত্মনিবেদনকে ম্লান না করে।

এরপর এলো এসএসসি এর প্রি-টেস্ট পরীক্ষার ফলাফল। সাধারণ গণিতে পেলাম ৯২ নম্বর। মাত্র আট নম্বর কম। একটি সুদের অঙ্কে কোনো নম্বর পাইনি। আমাদের প্রিয় অঙ্কের শিক্ষক, মরহুম মাখন বাবু স্যার সবসময় চাইতেন তার শেখানো পদ্ধতিতেই অঙ্কের সমাধান লেখা হোক। কিন্তু আমার স্বভাব ছিল ভিন্ন। আমি কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম মুখস্থ করতাম না; বরং অঙ্কের অন্তর্নিহিত ভাব , চাওয়া, যুক্তি ও দর্শনকে আত্মস্থ করার চেষ্টা করতাম। সেই সুদের অঙ্কটিও আমি অন্য পদ্ধতিতে সমাধান করেছিলাম এবং উত্তরটি ছিল সম্পূর্ণ সঠিক।

আমি নম্বর পুনর্বিবেচনার আবেদন করলাম। বিষয়টি প্রধান শিক্ষকের কাছে গেল। তিনি আমার সমাধানকে গ্রহণযোগ্য বলে দিলেন। আমি নম্বর ফিরে পেলাম, কিন্তু অনুভব করলাম—একজন প্রিয় শিক্ষকের অন্তরে হয়তো অদৃশ্য এক বেদনার রেখা এঁকে দিয়েছি। আজ মনে হয়, সেই কয়েকটি নম্বরের চেয়ে স্যারের প্রশান্ত হাসিটিই ছিল আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার। সেদিন আমি নম্বর পেয়েছিলাম, কিন্তু হয়তো একজন শিক্ষকের হৃদয়কে অজান্তেই আঘাত করেছিলাম, তার হৃদয়কে অসন্তুষ্টির ছায়ায় ঢেকে দিয়েছিলাম।

জীবন বড়ই রহস্যময় বিচারক। এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হলো। ইসলামিয়াতসহ বিজ্ঞান বিভাগের সব বিষয়েই লেটার মার্কস পেলাম। কিন্তু সাধারণ গণিতে? আবারও সেই ৭৮।

পরীক্ষার প্রতিটি অঙ্ক ছিল পরিচিত, প্রতিটি সূত্র ছিল আপন। তবুও যেন অঙ্ক কষার আকাশে অদৃশ্য কুয়াশা নেমে এসেছিল। হাত চলছিল, কিন্তু আত্মবিশ্বাস কোথায় যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল। মনে হচ্ছিল, কোনো অদৃশ্য শক্তি যেন আমাকে সেই সীমারেখা অতিক্রম করতে দিচ্ছে না। ফলাফল—আবারও সেই ৭৮।

আজও ভাবি, এটি কি নিছক কাকতালীয় ছিল, নাকি মহান রবের এক নীরব শিক্ষা? হয়তো তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন—মেধা তোমার সম্পদ হতে পারে, কিন্তু বিনয়ই তোমার প্রকৃত অলংকার।

অহংকার কখনো উচ্চস্বরে আসে না; কখনো তা আত্মবিশ্বাসের মুখোশ পরে নিঃশব্দে হৃদয়ে প্রবেশ করে। আর সেই সূক্ষ্ম অহংকারের মূল্য অনেক সময় নম্বর দিয়ে নয়, জীবন দিয়েই পরিশোধ করতে হয়।

তাই আজ নতুন প্রজন্মের কাছে আমার বিনীত নিবেদন—মেধাবী হও, কিন্তু মেধার বাহাদুরি করো না। সত্য প্রতিষ্ঠা করো, কিন্তু এমনভাবে, যাতে কারও সম্মান আহত না হয়। বিজয়ী হও, কিন্তু এমন কোনো বিজয় অর্জন করো না, যার অন্তরালে অন্য কারও নীরব কষ্ট লুকিয়ে থাকে।

জীবন আমাকে শিখিয়েছে—মেধার ঔজ্জ্বল্য মানুষকে বড় করে, কিন্তু বিনয় তাকে মহিমান্বিত করে। কারণ মেধার দীপ্তি চোখকে আকর্ষণ করে, আর বিনয়ের আলো হৃদয়কে জয় করে। আজ মনে হয়, সেই ৭৮ কোনো সাধারণ নম্বর ছিল না; সেটি ছিল মহান রবের পক্ষ থেকে আমার জন্য এক নীরব সতর্কবার্তা, এক অনন্ত শিক্ষা এবং জীবনপাঠ।

মেধা তোমার পরিচয় হতে পারে, কিন্তু বিনয়ই হবে তোমার প্রকৃত মর্যাদা।

24/07/2026

“স্মৃতির আর্কাইভে জীবন পাঠ”

পর্ব–১০(বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র)

আমার জীবনের একটি ছোট্ট ঘটনা আজও আমার চিন্তার জগতকে আলোকিত করে রাখে।গাড়লগাতি নিবাসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মানি মিয়া কাকা, একদিন বলনারায়ণ বাজারে বসে আমাকে বললেন, “তুমি অত্র এলাকার সবচেয়ে মেধাবী ছাত্র। তোমাকে একটি প্রশ্ন করব। আজ উত্তর চাই না, যেদিন পারবে, সেদিন উত্তর দেবে।”

তিনি বর্ষার মাঠে ফুটে থাকা একটি শাপলা ফুলের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, “দেখো, শাপলা ফুল যখন হেলে যায় তখন পানির নিচে ডুবে যায়, আবার সোজা হলে তার কিছু অংশ পানির উপরে ভেসে থাকে। এর কারণ কী?”

আমি তখনও ত্রিকোণমিতির জ্ঞান অর্জন করিনি। তাই উত্তর দেওয়ার সাহসও করিনি। কিন্তু প্রশ্নটি আমার মন থেকে কখনো মুছে যায়নি। প্রায় এক বছর পর, যখন ত্রিকোণমিতির সঙ্গে পরিচয় হলো এবং জ্যামিতির নানা নীতির সঙ্গে পরিচিত হলাম, তখন উত্তর পেয়ে গেলাম, একদিন তার কাছে গিয়ে সেই প্রশ্নের উত্তর দিলাম। তিনি অপার আনন্দে আমার পিঠ চাপড়ে বলেছিলেন,

“এই উত্তরটার চেয়েও বড় কথা হলো—তুমি প্রশ্নটাকে এক বছর ধরে মনের কুঠায় বাঁচিয়ে রেখেছিলে।”

মানি মিয়া আমার কোন শিক্ষক ছিলেন না। তিনি কোনো শ্রেণিকক্ষে আমাকে পড়াননি। অথচ সেই একটি প্রশ্নই আমার জীবনের দর্শন পাল্টে দিয়েছিল। সেদিন আমি নিজের অন্তরে একটি নতুন সংকল্প লিখেছিলাম— মাঠে, ঘাটে, পথে, প্রান্তরে…সর্বত্রই জীবনের পাঠশালা; আর সর্বত্রই আমি একজন ছাত্র।

সেই দিন থেকে বুঝেছিলাম, শিক্ষা শুধু বিদ্যালয়ের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জ্ঞান লুকিয়ে থাকে প্রকৃতির নিঃশব্দ ভাষায়, মানুষের সাধারণ কথায়, অভিজ্ঞতার গভীরতায় এবং প্রতিটি মনের ও বিবেকের প্রশ্নের অন্তরালে।

মানুষের জীবনে মেধা এক আশীর্বাদ, আর জ্ঞান মহান স্রষ্টার অমূল্য দান। কিন্তু এই মেধা ও জ্ঞান যখন অদম্য সংকল্প, নিরলস অধ্যবসায়, আত্মনিবেদন ও সৃজনশীল সাধনার ডানায় ভর করে বিকশিত হতে থাকে, তখনই নীরবে আরেকটি শত্রু হৃদয়ের দুয়ারে কড়া নাড়ে, আর তা হলো — মিথ্যা পাণ্ডিত্যের অহংকার। আর অহংকারের সেই অদৃশ্য বিষ ধীরে ধীরে প্রতিভার প্রাণশক্তি, প্রজ্ঞা ও সৃজনক্ষমতার শিকড়কে শুষে নিতে থাকে। তখন পতন আর দূরে থাকে না; ধ্বংস হয়ে ওঠে অনিবার্য পরিণতি।

তাই জীবনের এক অনিবার্য শিক্ষা হলো—তুমি যত প্রাজ্ঞ, যত মেধাবী, যতই প্রতিষ্ঠিতই হও না কেন, নিজেকে আজীবন ছাত্র হিসেবে ধারণ করো। কারণ শেখার কোনো শেষ নেই। সময় বদলায়, মানুষ বদলায়, অভিজ্ঞতার ব্যঞ্জনা বদলায়; আর প্রতিটি পরিবর্তনের অন্তরালেই লুকিয়ে থাকে নতুন কোনো উপলব্ধি, নতুন কোন শিক্ষা, নতুন কোন জীবনদর্শন।

যে মানুষকে সমাজ দুর্বল বলে, তার কাছ থেকেও শেখার আছে। দুর্বল মানুষের কথারও একজন ছাত্র হয়ে দেখো। হয়তো তার কথার অন্তর্নিহিত অর্থে এমন একটি প্রশ্ন সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে, যার উত্তর অন্বেষণ করতে গিয়েই তুমি আবিষ্কার করবে নতুন জ্ঞানের এক অনাবিষ্কৃত দিগন্ত। অনেক সময় সবচেয়ে সাধারণ মানুষের কণ্ঠেই উচ্চারিত হয় জীবনের সবচেয়ে অসাধারণ দর্শন।

আমার কিশোর ও যৌবনের দিনগুলোতে আমি কখনো আমার চেয়ে দুর্বল কাউকে তুচ্ছ মনে করিনি। বরং তাকে নিজের নীরব প্রতিদ্বন্দ্বী এবং আত্মোন্নয়নের প্রেরণাস্বরূপ বিবেচনা করেছি। এই মানসিকতাই আমাকে প্রতিনিয়ত নিজেকে অতিক্রম করতে শিখিয়েছে। বহুবার আমার তুলনায় দুর্বল সহপাঠীর কাছ থেকেই এমন শিক্ষা পেয়েছি, যা কোনো পাঠ্যপুস্তক, কোনো বক্তৃতা কিংবা কোনো বিদ্যাপীঠ আমাকে দিতে পারেনি। তাদের কাছ থেকে শেখার মধ্য দিয়েই আমার অন্তর্লীন অহংকার ভেঙেছে, আর বিনয়ের বীজ অঙ্কুরিত হয়ে প্রজ্ঞার মহীরুহে পরিণত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।

আমাদের সময় পড়াশোনা বিভক্ত ছিল—আর্টস, সায়েন্স ও কমার্স। কিন্তু আমি কখনো জ্ঞানকে বিভাগে বিভক্ত করিনি। আমি বিশ্বাস করতাম, প্রতিটি শাখারই নিজস্ব সৌন্দর্য, স্বাতন্ত্র্য, দর্শন ও অবদান রয়েছে। তাই প্রতিটি বিভাগের কাছেই আমি নিজেকে একজন নিবেদিত ছাত্র হিসেবে উপস্থাপন করেছি। তবে জীবনের এক পর্যায়ে, অপরিণত বয়সের আবেগে, আমি একটি গুরুতর ভুল করেছিলাম। নিজেকে ছাত্র না ভেবে জ্ঞানী মনে করতে শুরু করেছিলাম। মনের অজান্তেই আত্মপ্রসাদ, আত্মম্ভরিতা ও পাণ্ডিত্য প্রদর্শনের মোহ আমাকে গ্রাস করেছিল। সেই ভুলের নির্মম মূল্য আমাকে দিতে হয়েছে। জীবনের কঠোর বাস্তবতা আমাকে শিখিয়েছে— যেদিন মানুষ শেখা বন্ধ করে, সেদিন থেকেই তার অধঃপতনের সূচনা হয়।

সেই অভিজ্ঞতার কথাই লিখব পরবর্তী পর্বে। আজ শুধু এই কথাটুকু রেখে যেতে চাই—

মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত যদি মানুষ নিজেকে জীবন নামের এই বিশাল পাঠশালার একজন বিনম্র, অনুসন্ধিৎসু ও জ্ঞানপিপাসু ছাত্র হিসেবে ধারণ করতে পারে, তবেই প্রকৃত মেধার জাগরণ ঘটে। কারণ জ্ঞান মানুষকে পাণ্ডিত্য দেয়, কিন্তু বিনয় তাকে প্রজ্ঞাবান করে; আর প্রজ্ঞাই মানুষকে মহত্ত্বের সর্বোচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত করে।

বিশ্বজোড়া এই পাঠশালায় প্রতিটি মানুষ একেকটি জীবন্ত গ্রন্থ, প্রতিটি ঘটনা একেকটি অনন্য অধ্যায়, প্রতিটি ব্যর্থতা একেকজন প্রজ্ঞাবান শিক্ষক, প্রতিটি প্রশ্ন একেকটি নতুন অভিযাত্রার আহ্বান, আর প্রতিটি অনুশোচনা একেকটি আত্মশুদ্ধির সোপান। যে হৃদয় বিনয়ের সঙ্গে শিখতে জানে, সেই হৃদয়ই একদিন আলোকবর্তিকা হয়ে অসংখ্য মানুষের পথ আলোকিত করে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর পঙ্ক্তির মতোই আজও আমার বিশ্বাস— “বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র।”

এই একটি বিশ্বাসই আমার জীবনযাত্রার সবচেয়ে বড় পরিচয়।

…চলবে।

22/07/2026

“স্মৃতির আর্কাইভে জীবন পাঠ”

পর্ব–৯ (পরাগায়ন , কয়েকটি বেত্রাঘাত এবং তাৎক্ষণিক মেধার জাগরণ)

জীবনের পথ কখনোই সমতল নয়। যে পথ যত বেশি বন্ধুর, যে যাত্রায় যত বেশি ধাক্কা, বাধা ও প্রতিকূলতা থাকে, সেই পথের গন্তব্যে পৌঁছানোর আনন্দও তত গভীর হয়। কারণ বাধা মানুষকে ভেঙে দেওয়ার জন্য আসে না; বরং তাকে সাহসী করে, দৃঢ় করে, আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। প্রতিটি প্রতিবন্ধকতা যেন আমাদের অন্তরে নতুন এক শপথের বীজ বপন করে—হার না মানার, আরও শক্ত হয়ে দাঁড়ানোর।

আমার শৈশব এবং কৈশোরও ছিল এমনই অসংখ্য সীমাবদ্ধতা আর সংগ্রামের গল্পে ভরা। নতুন বইয়ের ঝকঝকে পাতার গন্ধ আমি কোনোদিন উপভোগ করতে পারিনি। প্রতি বছরই আমার সঙ্গী হতো পুরোনো বই। কারণ নতুন বই কেনার অতিরিক্ত চাপ বা সামর্থ্যের সংকট ছিল ; পুরোনো বই অর্ধেক দামে পাওয়া যেত।

তবে সেই পুরোনো বইগুলোরও ছিল এক নীরব বেদনা। অনেক সময় কোনো বইয়ের কয়েকটি পাতা ছেঁড়া এবং কাটা থাকত, কোথাও আবার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ই অনুপস্থিত থাকত। তখন স্কুলে গিয়ে সহপাঠীদের বই থেকে সেই অনুপস্থিত পাতাগুলো নকল করে নিতাম কিংবা পড়ে নিতাম। অভাব এবং সংকট আমাকে শিখিয়েছিল—যা নেই, তা নিয়ে হাহাকার না করে, যা আছে তা দিয়েই পথ খুঁজে নিতে হয়।

এই পুরোনো বইকে ঘিরেই আজও মনে গেঁথে আছে একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা। তখন আমি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। সেদিন বিজ্ঞান ক্লাস নিতে এসেছিলেন আমাদের শ্রদ্ধেয় চিত্র মণ্ডল স্যার। সেদিনের পাঠের বিষয় ছিল—পরাগায়ন। দুর্ভাগ্যবশত, আমার বইয়ের ঠিক সেই পাতাটিই ছেঁড়া/মিস /কাটা ছিল।

ক্লাসে ঢুকেই স্যার প্রথমে আমাকে দাঁড় করালেন। হয়তো তিনি বিশ্বাস করতেন, আমি নিশ্চয়ই উত্তর দিতে পারব। কিন্তু সেই দিন আমি একেবারেই পারলাম না। আমার নীরবতা স্যারকে হতাশ করল। তার যে প্রত্যাশা ছিল, মুহূর্তেই তা নিরাশায় পরিণত হলো। তিনি আমাকে বেত দিয়ে কয়েকটি আঘাত করলেন।

এরপর তিনি একে একে অন্যদের জিজ্ঞেস করলেন। কেউ অর্ধেক উত্তর দিল, কেউ একেবারেই পারল না। আশ্চর্যের বিষয়, তাদের কাউকেই তিনি বকেননি, মারেননি।

আমি তখন চোখের জল লুকিয়ে পাশে বসা বন্ধুর বইটি নিয়ে পরাগায়নের চারটি ধাপ দ্রুত পড়তে শুরু করলাম। বুকের ভেতর যেন এক অদ্ভুত জেদ জন্ম নিয়েছিল। মনে মনে বলেছিলাম, এই অপমানের জবাব আমাকে দিতেই হবে , এই মুহূর্তেই দিবো এবং তা কোন রাগ দিয়ে নয়, মেধা দিয়ে, যোগ্যতা দিয়ে।

কিছুক্ষণ পর আমি নিজেই হাত উঁচু করলাম। স্যার বিস্মিত হয়ে আমাকে দাঁড়াতে বললেন। আমি নিঃশ্বাস ফেলে শুরু করলাম। তারপর এক নিঃশ্বাসে পুরো পাঠ—পরাগায়নের সংজ্ঞা, প্রক্রিয়া এবং চারটি ধাপ—হুবহু মুখস্থ বলে গেলাম।

পুরো শ্রেণিকক্ষ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সহপাঠীরা বিস্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। স্যারের ঠোঁটের কোণে মৃদু এক তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন- “বুঝতে পেরেছো, কেন শুধু তোমাকেই মারলাম?”

আমি নীরবে দাঁড়িয়ে রইলাম। তিনি আবার বললেন-“কারণ তোমার কাছে আমার প্রত্যাশা ছিল। আমি জানতাম, তুমি পারবে। আজ তুমি প্রমাণ করে দিলে, আমার বেতের আঘাতের চেয়েও তোমার আত্মপ্রত্যয় অনেক বেশি শক্তিশালী।”

সেদিন আমি উপলব্ধি করেছিলাম—প্রতিশোধের সর্বোত্তম ভাষা প্রতিহিংসা নয়; নিজের মেধা আর যোগ্যতা দিয়ে সবাইকে অবাক করে দেওয়াই সবচেয়ে সুন্দর প্রতিশোধ।

আজ এত বছর পর বুঝি, সেদিনের সেই ছেঁড়া পাতাটি হয়তো আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান পাঠের জন্ম দিয়েছিল। যদি বইয়ের সেই পাতা অক্ষত থাকত, যদি সেদিন বেত্রাঘাত না পেতাম, তবে হয়তো নিজের ভেতরের সেই সুপ্ত প্রতিভা এবং অদম্য সংকল্পকে কখনো চিনতেই পারতাম না।

জীবনের প্রতিটি আঘাত, প্রতিটি অপমান, প্রতিটি প্রতিবন্ধকতা—আসলে একেকটি পরাগায়ন। যেমন ফুলের পরাগ এক ফুল থেকে আরেক ফুলে গিয়ে নতুন জীবনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে, তেমনি জীবনের দুঃখ-কষ্টও মানুষের অন্তরে নতুন শক্তি, নতুন স্বপ্ন আর নতুন সম্ভাবনার পরাগায়ন হয় ।

সেদিনের সেই বেতের দাগ অনেক আগেই মুছে গেছে; কিন্তু সেই দিনের শিক্ষা আজও আমার চরিত্রের ভেতরে অমলিন হয়ে বেঁচে আছে।… চলবে…

18/07/2026

“স্মৃতির আর্কাইভ হতে জীবন পাঠ”

পর্ব–৬ (পাঁচ কিলোমিটারের পথ, জীবন গড়া ও স্বপ্নের যাত্রা)

জীবনের মোড় ঘুরে যাওয়ার মুহূর্তগুলো কখনো হঠাৎ করেই আসে না; সেগুলো গড়ে ওঠে অসংখ্য ছোট ছোট চেষ্টা, অদম্য অধ্যবসায়, কিছু কষ্ট সহ্যের অদম্য স্পৃহা এবং নীরব আত্মবিশ্বাসের ইট গেঁথে। ক্লাস সিক্সের সেই বছরটি আমার জীবনেও ছিল ঠিক তেমনই এক সন্ধিক্ষণ। এটি ছিল এমন একটি সময়, যখন আমার ভেতরে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনা ধীরে ধীরে নিজের পরিচয় দিতে শুরু করেছিল, আর ভবিষ্যৎ যেন প্রথমবারের মতো দূর আকাশ থেকে আমাকে স্পষ্ট ভাষায় ডাকতে শুরু করেছিল।

শিক্ষকদের স্নেহমাখা দৃষ্টি যত আমার ওপর নিবদ্ধ হতে লাগল, ততই যেন আমার ভেতরের সুপ্ত সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যেতে লাগল। বইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠা আর কেবল পরীক্ষায় পাস করার উপকরণ ছিল না; সেগুলো হয়ে উঠেছিল আত্মবিশ্বাস গড়ার ইট, বালু, সিমেন্ট এবং স্বপ্ন নির্মাণের ভিত্তি। লেখাপড়ার প্রতি আমার একাগ্রতা, অধ্যবসায় এবং মনোবল প্রতিদিন নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে লাগল।

এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার পর সমাপ্ত হলো ক্লাস সিক্সের বার্ষিক পরীক্ষা। ফলাফল প্রকাশের সেই দিনটি আজও স্মৃতির ক্যানভাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে। জীবনের প্রথমবার আমি শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করলাম। সেদিনের আনন্দ কেবল আমার ছিল না; তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল আমার বাবা-মায়ের। আমি ছিলাম তাদের অষ্টম সন্তান। হয়তো তারা অনেক স্বপ্ন দেখেছিলেন, আবার সময়ের নির্মমতায় অনেক স্বপ্ন ভেঙেও যেতে দেখেছিলেন। কিন্তু সেই দিন আমি তাদের হাতে তুলে দিতে পেরেছিলাম আমার জীবনের প্রথম সাফল্যের অমূল্য উপহার। তাদের মুখের প্রশান্ত হাসি, চোখের কোণে চিকচিক করা আনন্দাশ্রু আর নিঃশব্দ গর্ব আজও আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার। মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সমস্ত সম্মান এক পাশে, আর বাবা-মায়ের সেই তৃপ্তির হাসি অন্য পাশে—তবুও সেই হাসির ওজনই সবচেয়ে বেশি।

আমার এই সাফল্যের কথা খুব দ্রুত আশপাশের গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে পড়ল। আমাদের গ্রামটি ছিল দুই থানার সীমান্তবর্তী একটি বড় জনপদ। সেই অঞ্চলের বহু বিদ্যালয়ের মধ্যে বাথানডাঙ্গা স্কুল ছিল শিক্ষা, শৃঙ্খলা ও কৃতিত্বের জন্য সর্বাধিক সম্মানিত। এলাকার মুরব্বিরা বাবাকে বলতে লাগলেন- “এই ছেলেটির মেধাকে যদি প্রকৃত বিকাশ ঘটাতে চান, তবে তাকে বাথানডাঙ্গা স্কুলে ভর্তি করুন। বড় স্বপ্নের জন্য বড় পরিসর দরকার।”

সেই কথাগুলো আমার কিশোর মনেও গভীর রেখাপাত করল। অচেনা এক আকাঙ্ক্ষা বুকের ভেতর ডানা মেলল। আমিও চাইতে শুরু করলাম সেই নামকরা বিদ্যালয়ের একজন ছাত্র হতে। কিন্তু স্বপ্নের পথে একটি বাস্তব বাধা ছিল। আমাদের বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। তখন কোনো বাস ছিল না, রিকশারও সুবিধা ছিল না। প্রতিদিন সেই দীর্ঘ পথ হেঁটেই বিদ্যালয়ে যেতে হবে, আবার হেঁটেই ফিরে আসতে হবে।

কিন্তু তখনই আমি উপলব্ধি করতে শিখছিলাম—যে মানুষ Tomorrow-এর হাতছানি অনুভব করতে পারে, তার কাছে পথের দৈর্ঘ্য কখনোই প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায় না। স্বপ্ন যখন হৃদয়ের ভেতর আলো জ্বালায়, তখন কষ্টও আনন্দে রূপ নেয়, দূরত্বও হয়ে ওঠে প্রেরণার সিঁড়ি।

আমি প্রতিদিন ভোরের আলোয় পাঁচ কিলোমিটার পথ হেঁটে বিদ্যালয়ে যেতাম। শিশিরভেজা শস্য ক্ষেত, কাঁচা রাস্তার ধুলোমাখা বাঁক, গাছের পাতায় ঝরে পড়া সকালের রোদ আর পাখিদের কলরব যেন আমার চলার পথের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছিল। প্রতিটি পদক্ষেপে মনে হতো, আমি কেবল একটি বিদ্যালয়ের দিকে নয়, আমার ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছি।

বিদ্যালয়ে প্রথম দিন, প্রথম ক্লাস; আর সেখানেই যেন ভাগ্য আমার জন্য নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা লিখে রেখেছিল। সেটি ছিল গণিতের ক্লাস। শ্রদ্ধেয় সন্তোষ বাবু স্যার শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেই ব্ল্যাকবোর্ডে একটি জটিল সূদকষা অঙ্ক লিখে বললেন,

“কে এসে এটি সমাধান করবে?”

পুরো শ্রেণিকক্ষ নীরব। সেই নীরবতার মাঝেই একটি হাত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। হাতটি ছিল এক সম্পূর্ণ নতুন ছাত্রের—আমার।

স্যার বিস্মিত হয়ে আমার নাম-পরিচয় জানতে চাইলেন। তারপর আমি ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে গিয়ে ধাপে ধাপে অঙ্কটির সমাধান করলাম। মুহূর্তেই শ্রেণিকক্ষে নেমে এলো বিস্ময়ের নীরবতা। স্যারের চোখে ফুটে উঠল প্রশংসার দীপ্তি, সহপাঠীদের চোখে বিস্ময় আর কৌতূহল। সেই প্রথম দিনেই আমি বুঝতে পারলাম—যোগ্যতা কখনো পরিচয়ের অপেক্ষা করে না; সে নিজের পরিচয় নিজেই সৃষ্টি করে। তবে সবচেয়ে কঠিন অনুভূতির মধ্য দিয়ে হয়তো যাচ্ছিল আমার দূর-সম্পর্কের মামা আজিজুল হক। তিনি ছিলেন সেই শ্রেণির প্রথম ছাত্র। এতদিন যিনি নিরঙ্কুশভাবে প্রথম স্থান ধরে রেখেছিল, সে হয়তো অনুভব করেছিল —নতুন এক প্রতিদ্বন্দ্বীর আগমন ঘটেছে।

তার মুখের নীরব বিষণ্ণতা আমাকে ভাবিয়েছিল। তখনই উপলব্ধি করলাম, জীবনের প্রতিটি সাফল্যের আড়ালেও অন্য কারও একটি নীরব বেদনা লুকিয়ে থাকতে পারে। তাই বিজয়কে কখনো অহংকারের মুকুট বানানো উচিত নয়; তাকে বিনয়ের অলংকার হিসেবেই ধারণ করা শ্রেয়।

মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রায় প্রতিটি শিক্ষকের দৃষ্টি, বিশ্বাস এবং স্নেহ অর্জন করতে সক্ষম হলাম। তাদের প্রত্যাশা আমার কাঁধে দায়িত্ব হয়ে বসলো, আর সেই দায়িত্বই আমাকে আরও পরিশ্রমী, আরও শৃঙ্খলাবদ্ধ করে তুলল।

সেদিন আমি গভীরভাবে উপলব্ধি করলাম—Yesterday আমাকে দিয়েছিল অনুপ্রেরণার প্রথম প্রদীপ, Today সেই প্রদীপের শিখাকে যত্নে প্রজ্বলিত রাখছে, আর Tomorrow দিগন্তের ওপার থেকে সোনালি সূর্যের আলো হাতে আমাকে অবিরাম আহ্বান জানাচ্ছে—“এসো, পথ এখনও অনেক বাকি। তোমার সামর্থ্যের আকাশ এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। আরও এগিয়ে চলো, আরও আলো ছড়াও।”

আজ ফিরে তাকিয়ে মনে হয়, জীবনের সবচেয়ে বড় পথ সেই পাঁচ কিলোমিটার ছিল না; সবচেয়ে বড় পথ ছিল নিজের ভেতরের সংশয়, ভয় , কষ্ট আর সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করা। যে মানুষ সেই পথ অতিক্রম করতে পারে, তার জন্য প্রতিটি নতুন সকালই হয়ে ওঠে নতুন সম্ভাবনার সূচনা, আর প্রতিটি Tomorrow হয়ে ওঠে আরও উজ্জ্বল এক নতুন জীবনের প্রতিশ্রুতি।

…চলবে।

17/07/2026

স্মৃতির আর্কাইভে জীবন পাঠ

পর্ব–৫ (স্বীকৃতির প্রথম আলো, আত্মবিশ্বাসের প্রথম উত্তরণ )

জীবনের পথচলায় কিছু মুহূর্ত আসে, যা সময়ের ক্যালেন্ডারে ক্ষণস্থায়ী হলেও আত্মার ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে থাকে। সেই মুহূর্তগুলো কোনো পদক নয়, কোনো পুরস্কার নয়; বরং কিছু মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা, কয়েকটি আন্তরিক বাক্য আর আশীর্বাদের স্পর্শে জীবন নতুন অর্থ খুঁজে পায়। আমার ছাত্রজীবনের এই অধ্যায়ও তেমনই এক অমূল্য স্মৃতির দীপশিখা।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অধ্যায় শেষ করলাম দ্বিতীয় স্থান অর্জনের মধ্য দিয়ে। ফলাফল ভালো ছিল, কিন্তু প্রথম না হওয়ায় আলোটা যেন সম্পূর্ণভাবে আমার ওপর এসে পড়েনি। তারপর শুরু হলো জীবনের আরেকটি নতুন অধ্যায়; হাই স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হলাম।

সেই বিদ্যালয়ে একত্রিত হলো পাঁচ-ছয়টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারী ছাত্রছাত্রীরা। স্বাভাবিকভাবেই প্রথম স্থান অধিকারীদের ঘিরেই শিক্ষকদের আগ্রহ, কৌতূহল এবং প্রত্যাশার আলো বেশি কেন্দ্রীভূত ছিল। আমি ছিলাম দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী; তাই আমাকে কেউ অবহেলা করেননি, কিন্তু আমি ছিলাম না প্রথম স্হানধারীদের সাথে সেই উজ্জ্বল কেন্দ্রবিন্দুতে। কিন্তু আমি তখনও বুঝিনি—মানুষের চোখে প্রথম হওয়ার চেয়েও বড় বিষয় হলো স্রষ্টার নির্ধারিত সময়ে নিজের সামর্থ্যের পরিচয় দেওয়া।

ভর্তির প্রায় দুই মাস পর ইংরেজির শিক্ষক শ্রদ্ধেয় নলিন বাবু এবং গণিতের প্রয়াত সালাম স্যার একটি বিশেষ পরীক্ষা নিলেন। আমি অন্য সবার মতোই পরীক্ষা দিলাম। কোনো বিশেষ প্রত্যাশা ছিল না। শুধু নিজের সাধ্য অনুযায়ী উত্তর লিখে শ্রেণিকক্ষ থেকে বেরিয়ে এলাম। দুই দিন পর হঠাৎ দপ্তরি খবর নিয়ে এল—প্রধান শিক্ষক আমাকে তার কক্ষে ডেকেছেন।

খবরটি শুনেই বুকের ভেতর অজানা এক শঙ্কা বাসা বাঁধল। মনে হতে লাগল, নিশ্চয়ই কোনো ভুল করেছি। কিশোর পা যেন ভারী হয়ে গেল, ঠোঁট শুকিয়ে এলো, বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন নিজের ভয়ের অস্তিত্ব জানান দিতে লাগল। কাঁপা কণ্ঠে সালাম জানিয়ে প্রধান শিক্ষকের কক্ষে প্রবেশ করলাম। দেখি, প্রধান শিক্ষকের পাশে বসে আছেন ইংরেজির শিক্ষক নলিন বাবু এবং গণিতের সালাম স্যার। ভয় যেন আরও বেড়ে গেল। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষক কেবল পাঠদান করেন না; তিনি ছাত্রের চোখের ভাষাও পড়তে পারেন।

প্রধান শিক্ষক আমার মুখের ভয়, শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট আর কাঁপা কণ্ঠ দেখে মৃদু হেসে বললেন— “এত ভয় পাচ্ছ কেন? আগে একটু হাসো।”

এই একটি মাত্র বাক্য যেন সমস্ত ভয়ের মেঘ সরিয়ে দিল। তিনি স্নেহভরা হাতটি আমার মাথায় রেখে বললেন— “তুমি অন্যদের মতো নও। তুমি এই বিদ্যালয়ের সম্পদ। তোমাকে আমরা যত্ন করে গড়ে তুলব, তোমাকে সংরক্ষণ করব।”

সেই মুহূর্তে মনে হলো, কেউ যেন আমার অন্তরের গভীরে আত্মবিশ্বাসের একটি প্রদীপ জ্বালিয়ে দিল। এরপর তিনি আমার জন্য দোয়া করলেন। নলিন বাবু স্যার স্নেহভরে পিঠে হাত রাখলেন। সালাম স্যারও মমতার স্পর্শে আশীর্বাদ করলেন।

সেদিন আমি প্রথম উপলব্ধি করলাম—একজন শিক্ষকের একটি বাক্য, একটি স্পর্শ, একটি আন্তরিক দোয়া একজন ছাত্রের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

আমার ভেতরে তখন আনন্দের এমন এক সমুদ্র জেগে উঠেছিল, যার ঢেউ ভাষার তীরে এসে ধরা দেয় না। মনে হচ্ছিল— আজ আমার মধ্যে জমে থাকা গতকালের সংকোচ নীরবে বিদায় নিচ্ছে। আজকের এই স্বীকৃতি আগামী দিনের সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে।

Yesterday আমাকে সংগ্রামের শিক্ষা দিয়েছিল। Today আমাকে আত্মবিশ্বাসের স্বাদ দিল। আর Tomorrow দূর আকাশ থেকে হাতছানি দিয়ে বলল— “চলো, তোমার পথ এখনো অনেক দূর।”

সেদিন নিজের অন্তরে এক নীরব প্রতিজ্ঞা জন্ম নিল। আমি শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য পড়ব না। আমি এমন একজন মানুষ হওয়ার চেষ্টা করব, যার পরিচয় হবে তার সততা, বিবেক, ন্যায়বোধ, মানবিকতা এবং কর্মের উৎকর্ষে। জ্ঞানকে আমি শুধু খাতার পাতায় সীমাবদ্ধ রাখব না; চরিত্রের প্রতিটি স্তরে তাকে বিকশিত করার চেষ্টা করব।

পরদিন থেকেই শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ যেন নিঃশব্দে বদলে গেল। যারা এতদিন শিক্ষকদের প্রধান দৃষ্টির কেন্দ্র ছিল, সেই বৃত্তটি এখন কিছুটা আমার দিকে প্রসারিত হলো। এখন ক্লাসে শিক্ষকদের প্রশ্নের উত্তর দিতে আমার দিকে তাকানো হয়। কঠিন অঙ্ক বোঝাতে আমাকে ডাকা হয়। ইংরেজির ভালো উত্তর উদাহরণ হিসেবে আমার খাতা তুলে ধরা হয়। আমি অনুভব করলাম— যোগ্যতা কখনো উচ্চকণ্ঠে নিজের পরিচয় দেয় না; তার পরিচয় দেয় মানুষের কাজ, নিষ্ঠা এবং নীরব অধ্যবসায়।

সেদিন বুঝেছিলাম, মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নিজেকে বড় প্রমাণ করার মধ্যে নয়; বরং এমনভাবে নিজেকে গড়ে তোলার মধ্যে, যাতে অন্যেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার মূল্য উপলব্ধি করতে পারে।

আমার অন্তরে তখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে এলো। মনে হলো, অদৃশ্য কোনো করুণার হাত আমাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরেছে। আমি নীরবে আকাশের দিকে তাকিয়ে শুকরিয়া আদায়ের সুরে বললাম— হে পরম করুণাময় আল্লাহ! এই সম্মান আমার কৃতিত্বের চেয়ে অনেক বেশি তোমার রহমতের দান। তুমিই মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা সৃষ্টি করো। তুমিই শিক্ষকের চোখে সম্ভাবনার আলো জ্বালিয়ে দাও। তুমিই নিরবে নিরবে একজন সাধারণ কিশোরকে অসাধারণ স্বপ্ন দেখার সাহস দাও।

আজ বহু বছর পরে সেই দিনের কথা মনে হলে অনুভব করি— জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার সব সময় ট্রফি বা সনদ নয়। কখনো কখনো একজন প্রধান শিক্ষকের স্নেহমাখা হাত, দুইজন শিক্ষকের আন্তরিক আশীর্বাদ, আর কয়েকটি বিশ্বাসভরা বাক্যই একটি কিশোরের পুরো ভবিষ্যতের ভিত্তি নির্মাণ করে।

সেদিনের সেই ছোট্ট কক্ষে আমি শুধু প্রশংসা পাইনি; পেয়েছিলাম নিজের ভেতরের মানুষটিকে চিনে নেওয়ার প্রথম আহ্বান। আজও বিশ্বাস করি— একজন সত্যিকারের শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেন না; তিনি একজন মানুষের ভেতরে সুপ্ত সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলেন।

সেদিনের সেই আশীর্বাদ আজও আমার জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে নীরব প্রেরণা হয়ে আছে। আজও মনে হয়, সেদিন বিধাতা তাঁর অদৃশ্য রহমতের সুবাসে আমাকে আলিঙ্গন করেছিলেন। সেই সুবাস আজও আমার হৃদয়ের গভীরে ভেসে বেড়ায়, আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয়—মানুষের স্বীকৃতি আনন্দ দেয়, কিন্তু আল্লাহর রহমতই সেই স্বীকৃতিকে স্থায়ী বরকতে পরিণত করে।

আর তাই, স্মৃতির আর্কাইভে এই অধ্যায়টি কেবল একজন ছাত্রের সাফল্যের গল্প নয়; এটি একজন শিক্ষকের বিশ্বাস, একজন ছাত্রের আত্মবিশ্বাস এবং মহান রবের অদৃশ্য অনুগ্রহে আলোকিত হয়ে ওঠা একটি জীবনের প্রথম দীপ্তিময় সোনালি আলো ছড়ানো ভোর।

17/07/2026

“স্মৃতির আর্কাইভে জীবন পাঠ”

পর্ব–৪ (Yesterday থেকে Tomorrow)

শৈশবের প্রথম দিকের আমি পড়াশোনার প্রতি খুব একটা মনোযোগী ছিলাম না। বইয়ের পাতাগুলো আমার কাছে যেন পাহাড়ের চূড়া, অন্ধকারময় দূরের বন্ধুর পথ; নিজস্ব স্বাধীন সময়ের পথে এক দুরূহ, ভয়ংকর বন্দিদশা। অক্ষরগুলোকে মনে হতো বোঝার চেয়ে বয়ে বেড়ানোর বোঝা। তাই ফলাফলও ছিল সাধারণের কাতারে। ক্লাস থ্রি পর্যন্ত জীবন যেন অন্যমনস্ক এক নদী—যার নিজস্ব স্রোত ছিল, কিন্তু গন্তব্যের কোনো দৃঢ় সংকল্প ছিল না; ছিল না ভবিষ্যতের কোনো উজ্জ্বল দিগন্তের আহ্বান।ঠিক সেই সময়েই ঘটে গেল একটি ছোট্ট ঘটনা, যা পরে আমার সমগ্র জীবনের গতিপথ বদলে দিল।

আমাদের অত্যন্ত প্রিয় শিক্ষক—ভিলোচন বাবু স্যার। একদিন ইংরেজি ক্লাসে তিনি আমাকে দাঁড় করিয়ে একটি মাত্র শব্দের বানান জিজ্ঞেস করলেন—Yesterday।

আমি পারলাম না।

স্যার আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে বললেন। তারপর তিনি ক্লাসের দ্বিতীয় স্থান অধিকারী একটি মেয়েকে একই প্রশ্ন করলেন। সে নির্ভুলভাবে বানানটি বলে দিল। এরপর স্যার এমন একটি নির্দেশ দিলেন, যা হয়তো তার কাছে ছিল শিক্ষার একটি পদ্ধতি; কিন্তু আমার ছোট্ট হৃদয়ে তা হয়ে উঠেছিল এক প্রবল ঝড়ের মধ্যে পড়া এক অসহায় কিশোরের নিঃশব্দ আর্তনাদ। তিনি সেই মেয়েটিকে বললেন, আমার কান ধরে আমাকে বেঞ্চে বসিয়ে দিতে।

সেই মুহূর্তে হয়তো আমার বয়স খুবই কম ছিল; ব্যক্তিত্ব, আত্মমর্যাদা কিংবা অপমানের সংজ্ঞা পুরোপুরি বোঝার মতো পরিণত হইনি। কিন্তু হৃদয় তো বয়স মানে না। মনে হলো, আমার আত্মসম্মানের বাগানে হঠাৎ যেন শত শত পচা ফুলের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। বুকের ভেতর এক অদৃশ্য বজ্রপাত হলো। বিবেক আমাকে প্রশ্ন করল— “ তুমি অপমানের এই তাণ্ডব এর কাছে আত্মসমর্পণ করবে? তুমি কি সত্যিই এভাবেই অযোগ্যতা আর ব্যর্থতা নিয়ে বেঁচে থাকবে?”

সেদিন আমার চোখে জল ছিল না, কিন্তু বুকের ভেতরে জ্বলছিল এক নিঃশব্দ আগুন—চৈত্রের দাবদাহে ফেটে যাওয়া এক হৃদয়ের গভীর আর্তনাদ। সেটি আমার প্রতিহিংসার আগুন ছিল না; ছিল নিজেকে বদলে দেওয়ার আগুন। অন্যকে হারানোর নয়, নিজের দুর্বলতাকে পরাজিত করার আগুন। সেই আগুনে পুড়েই যেন আমার ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা আত্মবিশ্বাসের ফিনিক্স পাখি নতুন করে ডানা মেলতে শুরু করল।

সেদিনই আমি নিজের সঙ্গে এক নীরব অঙ্গীকার করলাম— “আমার প্রতিশোধ হবে আমার ফলাফল। আমার জবাব হবে আমার মেধা। আমার অনুকরণ হবে Yesterday নয়, Tomorrow।”

তারপর শুরু হলো এক নতুন যাত্রা, নতুন অধ্যবসায়, নতুন আত্মজাগরণ। বই আর বোঝা রইল না; হয়ে উঠল পথের প্রদীপ। পড়াশোনা আর ভয়ের নাম রইল না; হয়ে উঠল আত্মমর্যাদা ফিরে পাওয়ার সিঁড়ি। প্রতিটি ভোর আমাকে নতুন করে ডাকতে লাগল নতুন উদ্দীপনা নিয়ে। প্রতিটি অক্ষর যেন চলমান পাখির ডানায় পরিণত হলো, আর আমি ধীরে ধীরে সেই ডানায় ভর করে স্বপ্নের আকাশে উড়তে শিখলাম।

কান ধরার বিনিময়ে আর একটি কান ধরার প্রতিশোধ নেওয়ার কোনো সুযোগ আর কখনো আসেনি। আসলে, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর প্রতিশোধ হলো—নিজেকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে পুরোনো অপমানগুলো নিজেই মাথা নিচু করে দাঁড়ায়, আর সেই অপমান একদিন সাফল্যের দীপ্তিময় চাদরে ঢেকে যায়, আর তখন আলোকিত বিবেক অপমানের শির কে অবনত করে মর্যাদার শির কে উঁচুতে মেলে ধরে।

ক্লাস ফোরে উঠেই আমি সেই মেয়েটির দ্বিতীয় স্থানটি অর্জন করলাম। সে চলে গেল আমার পেছনে। সেদিন বুঝলাম, Yesterday কখনো কখনো মানুষের জীবনে Tomorrow হয়ে ফিরে আসে।

যে শব্দটি একদিন আমাকে অপমানের অন্ধকারে দাঁড় করিয়েছিল, সেই Yesterday-ই পরদিন আমার জীবনের নতুন সূর্যোদয়ের নাম হয়ে Tomorrow-এর রূপে আবির্ভূত হলো। মনে হলো, আমি যেন Yesterday-এর মশালটি নিজের হাতে তুলে নিয়ে Tomorrow-এর পথে হাঁটতে শুরু করেছি। আর সময়ের প্রবাহে সেই Yesterday এর মশালটি একদিন নীরবে তুলে দিয়েছি সেই সহপাঠীর হাতেও।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুরো সময়জুড়ে আমি দ্বিতীয় স্থান ধরে রেখেছিলাম। কিন্তু তার চেয়েও বড় অর্জন ছিল অন্য কিছু— আমি নিজের ভেতরের পরাজিত শিশুটিকে অপমানের আগুনে পুড়ে যেতে না দিয়ে সংকল্পের পরশে জয় করেছিলাম।

তারপর থেকে জীবনের প্রতিটি নতুন সকাল আমার কাছে আরেকটি Tomorrow হয়ে ধরা দিতে লাগল। প্রতিটি Tomorrow নতুন আলো নিয়ে এল, নতুন স্বপ্ন নিয়ে এল, নতুন সাহস নিয়ে এল। আর প্রতিটি Yesterday ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে লাগল অতীতের অন্ধকার গলিতে, যেখানে ব্যর্থতার ছায়াগুলো একসময় চিরতরে মিলিয়ে যায়।

আজ এত বছর পরে ফিরে তাকিয়ে বুঝি—জীবনে কিছু অপমান আসলে আশীর্বাদ হয়ে আসে। কিছু অশ্রু আমাদের চোখে নয়, আত্মায় আলো জ্বালায়। কিছু ব্যর্থতা আমাদের থামিয়ে দেয় না; বরং এমন এক পথে ঠেলে দেয়, যেখানে সাফল্য নীরবে আমাদের জন্য অপেক্ষা করে।

‘Yesterday’ আমাকে শিখিয়েছিল আমি কে ছিলাম, আর ‘Tomorrow’ আমাকে শিখিয়েছে আমি কে হতে পারি। আর এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল, আজও আছে, একটি মাত্র শব্দ— সংকল্প। কারণ, মানুষের ভাগ্য বদলে যায় কোনো অলৌকিক ঘটনায় নয়; বদলে যায় সেই দিন, যেদিন সে নিজের ভেতরে জ্বালিয়ে দেয় একটি অদম্য আলোর প্রদীপ।

সেই প্রদীপের নাম—আত্মবিশ্বাস, অধ্যবসায়, অবিচল সংকল্প এবং নিজের প্রতি অটল বিশ্বাস।

02/07/2026

“চেয়ার-বেঞ্চগুলো আজও আছে, বদলে গেছে শুধু মানুষের মন, বিবেক আর অনুভূতির রঙ”

পাড়া-মহল্লার সেই পুরোনো চেয়ার, কাঠের বেঞ্চ, উঠানের ছোট্ট মোড়া—সবই আজও আছে। সন্ধ্যার আড্ডা আছে, চায়ের কাপে ধোঁয়া ওঠে, সমাজের ছোট-বড় মানুষও আছে। শুধু নেই আগের সেই হৃদয়, নেই সেই আদব, নেই সেই শ্রদ্ধার নীরব সৌন্দর্য—যা একসময় মানুষকে মানুষ করে তুলত। একটা সময় ছিল— কোনো মুরব্বি সামনে এলেই বসে থাকা তরুণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে উঠে দাঁড়াত। কেউ তাকে শেখাতে আসত না, কোনো নিয়মপুস্তক খুলে দেখাতে হতো না; তবুও সে জানত—

সম্মান প্রদর্শন কেবল শিষ্টাচার নয়, এটি মহৎ চরিত্রের দীপ্ত স্বাক্ষর।

আজ দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। আজ শুধু পাড়া-মহল্লায় নয়; Dhaka Metro Rail, বাস, গণপরিবহন—সবখানেই যেন একই বেদনাময় দৃশ্য। প্রবীণদের জন্য সংরক্ষিত আসনও আজ অনেক যুবক নির্দ্বিধায় দখল করে বসে থাকে। সামনেই হয়তো দাঁড়িয়ে আছেন কাঁপা হাতে লাঠি ধরা এক বৃদ্ধ যার শরীরে বয়সের ভার, চোখে ক্লান্তির ছায়া, অবসন্ন শরীরে সময়ের নির্মম ক্ষয়চিহ্ন। তবুও কেউ উঠে দাঁড়ায় না, বরং অনেকেই না-দেখার অভিনয়ে নিজেদের বিবেককেই অন্ধ করে রাখে।

কী ভয়ংকর এই অবক্ষয়!

আজ শিক্ষার হার বেড়েছে, ডিগ্রি বেড়েছে, প্রযুক্তি আকাশ ছুঁয়েছে— কিন্তু প্রশ্ন একটাই:

মানুষ হওয়ার শিক্ষা কি বেড়েছে?

যে শিক্ষা মুরব্বির সামনে বসে থাকতে লজ্জা দেয় না, যে শিক্ষা হৃদয়ে বিনয় জাগায় না, যে শিক্ষা মানুষকে সম্মানের সৌন্দর্য শেখায় না; সেই শিক্ষা কেবল অক্ষরের ভার, রুচির অবনতি, চরিত্রের দুর্যোগ ও মনুষ্যত্বের দারিদ্র্যের পরিচয়; তা নির্মল আত্মার আলো না ছড়িয়ে আকাশের ঘন কালো মেঘের মতো আদব কায়দা কে অন্ধকারে নিমজ্জিত করে ।

আজ চেয়ারের অভাব নেই, আসনেরও অভাব নেই—

অভাব শুধু মন থেকে উঠে দাঁড়ানোর সেই আলোকিত মানুষের। সবচেয়ে বেদনাদায়ক সত্য হলো—

একদিন মানুষ বসার আগে সম্মানকে বসাতো;� আজ মানুষ নিজে বসে থেকে সম্মানকে দাঁড় করিয়ে রাখে।

হায়রে সমাজ! হায়রে শিক্ষা!

সভ্যতার আসল পরিচয় অট্টালিকার উচ্চতায় নয়, উন্নত প্রযুক্তির চাকচিক্যেও নয়; সভ্যতার প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে থাকে— বয়োজ্যেষ্ঠের সামনে শ্রদ্ধাভরে উঠে দাঁড়ানো এক জোড়া বিনয়ী পায়ের মধ্যে।

আজ সমাজে সেই বিনয়ী পায়ের মৃত্যু হয়েছে; তবু আশার আলো একেবারে নিভে যায়নি। সুশিক্ষায় আলোকিত, মানবিকতায় দীপ্ত হৃদয়ই আবার সমাজে জেগে উঠবে এবং ফিরিয়ে আনতে পারে সেই হারিয়ে যাওয়া আদব, সেই শ্রদ্ধা, সেই সৌন্দর্য।

কারণ, যেদিন হৃদয় খাঁটি শিক্ষায় শিক্ষিত হবে, সেদিন সমাজও আবার সভ্য হবে এবং সমাজের মানুষগুলো আবার বিনয়ী হবে ।

23/05/2026

কোনো মানুষকেই তার প্রকৃত যোগ্যতার চেয়ে বেশি মূল্যায়ন করা উচিত নয়। কারণ, মানুষ যখন তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সততা, জবাবদিহিতা, লোভহীনতা, বিনয় ও কৃতজ্ঞতার গুণে সমৃদ্ধ না হয় অথচ তাকে অতিরিক্ত ক্ষমতা, মর্যাদা বা প্রভাব দেওয়া হয়; তখন সেই ক্ষমতাই তার চরিত্রকে বিষাক্ত করে তোলে।

এমন মানুষ ধীরে ধীরে নিজেকে ভুলে যায়, কি ছিলো তার যোগ্যতা আর কেমনে পেলো এই মর্যাদা!! সে অহংকারে অন্ধ হয়ে পড়ে এবং মানুষের কল্যাণের পরিবর্তে নিজের স্বার্থ, প্রতিহিংসা ও আধিপত্য বিস্তারে ব্যস্ত হয়ে যায়। তখন তার আচরণ হয়ে ওঠে বিষধর সাপের মতো, যার বিষ নীরবে সংস্থা, পরিবার, সমাজ, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে।

ক্ষমতা নিজে কখনো খারাপ নয়; কিন্তু অযোগ্য, অসৎ ও অকৃতজ্ঞ মানুষের হাতে ক্ষমতা পড়লে তা আশীর্বাদের বদলে অভিশাপে পরিণত হয়।

তাই মানুষকে মূল্যায়ন করতে হলে শুধু বাহ্যিক চাকচিক্য, পদ-পদবি বা কথার জৌলুস নয়; বরং তার চরিত্র, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, বিনয়, অতীত কাজের রেকর্ড, কৃতজ্ঞতাবোধ ও মানবিকতাকে বিচার করা জরুরি। কারণ, যোগ্যতার চেয়ে অতিরিক্ত সম্মান অনেক সময় মানুষকে মানুষ না রেখে অহংকারী ও ক্ষতিকর সত্তায় রূপান্তরিত করে। মহান আল্লাহ আমাদেরকে এই অকৃতজ্ঞ মানুষকে সনাক্ত করতে এবং তাদের সংস্পর্শ ত্যাগ করার তাওফিক দিন । আমিন ।

14/05/2026

My best efforts are given here

14/05/2026

Address

Eastern Housing
Mirpur
1216

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Brig Gen Waliur Rahman posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share