27/07/2026
“স্মৃতির আর্কাইভে জীবন পাঠ”
পর্ব–১১ (সেই ৭৮ এর কূঠা আর পার হতে পারিনি—কোন অদৃশ্য শক্তি কাজ করেছিল?)
মানুষ মাত্রই ভুলের সন্তান। আর কৈশোরের ভুল—তা যেন জীবনের অনিবার্য শিক্ষালিপি। সেই ভুল কখনো অপরিপক্বতার, কখনো আবেগের, আবার কখনো অদৃশ্য অহমিকার; যা নিঃশব্দে বিবেককে আচ্ছন্ন করে ফেলে। আমিও সেই নির্মম সত্যের ব্যতিক্রম ছিলাম না।
মেধার অহমিকা যেন কোনোদিন আমাকে গ্রাস করতে না পারে—এই ছিল আমার আজীবনের সাধনা। অথচ কৈশোরের এক ক্ষণিক আত্মবিশ্বাস কখন যে নিঃশব্দ অহংকারে রূপ নিয়েছিল, তার ব্যাখ্যা আজও আমার অজানা।
ক্লাস এইটে বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করায় স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষায় আমাকে বসতে হয়নি। বার্ষিক পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে একদিন স্কুলে গেলাম। সেদিন নবম শ্রেণির সাধারণ গণিত পরীক্ষা চলছিল। কয়েকজন শিক্ষক হঠাৎ আমাকে ডেকে বললেন, “তুমিও নবম শ্রেণির সাথে বসে যাও।” পরীক্ষা শুরু হওয়ার প্রায় আধঘণ্টারও পরে আমি খাতায় কলম ছুঁই। কোনো প্রস্তুতি ছিল না, কোনো প্রত্যাশাও ছিল না। অথচ ফলাফল প্রকাশের পর দেখা গেল—আমি পেয়েছি ৭৮ নম্বর, আর সেটিই ছিল সর্বোচ্চ।
সেদিন নবম শ্রেণির প্রথম ছাত্র শফিক ভাই আমাকে ডেকে খুব শান্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, “তুমি হয়তো খুব মেধাবী, কিন্তু তুমি আমাদের অনেক কষ্ট দিয়েছ।” সেদিন কথাগুলো কানে পৌঁছেছিল, কিন্তু হয়তো হৃদয়ে পৌঁছায়নি। বহু বছর পরে উপলব্ধি করেছি—সেটি কোনো অভিযোগ ছিল না; ছিল একজন পরিশ্রমী শিক্ষার্থীর নীরব আর্তনাদ। তখনই বুঝিনি, কিন্তু আজ উপলব্ধি করি—মেধারও একটি নৈতিক দায়িত্ব আছে। নিজের সাফল্যের উল্লাস যেন কখনো অন্যের শ্রম, ঘাম আর আত্মনিবেদনকে ম্লান না করে।
এরপর এলো এসএসসি এর প্রি-টেস্ট পরীক্ষার ফলাফল। সাধারণ গণিতে পেলাম ৯২ নম্বর। মাত্র আট নম্বর কম। একটি সুদের অঙ্কে কোনো নম্বর পাইনি। আমাদের প্রিয় অঙ্কের শিক্ষক, মরহুম মাখন বাবু স্যার সবসময় চাইতেন তার শেখানো পদ্ধতিতেই অঙ্কের সমাধান লেখা হোক। কিন্তু আমার স্বভাব ছিল ভিন্ন। আমি কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম মুখস্থ করতাম না; বরং অঙ্কের অন্তর্নিহিত ভাব , চাওয়া, যুক্তি ও দর্শনকে আত্মস্থ করার চেষ্টা করতাম। সেই সুদের অঙ্কটিও আমি অন্য পদ্ধতিতে সমাধান করেছিলাম এবং উত্তরটি ছিল সম্পূর্ণ সঠিক।
আমি নম্বর পুনর্বিবেচনার আবেদন করলাম। বিষয়টি প্রধান শিক্ষকের কাছে গেল। তিনি আমার সমাধানকে গ্রহণযোগ্য বলে দিলেন। আমি নম্বর ফিরে পেলাম, কিন্তু অনুভব করলাম—একজন প্রিয় শিক্ষকের অন্তরে হয়তো অদৃশ্য এক বেদনার রেখা এঁকে দিয়েছি। আজ মনে হয়, সেই কয়েকটি নম্বরের চেয়ে স্যারের প্রশান্ত হাসিটিই ছিল আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার। সেদিন আমি নম্বর পেয়েছিলাম, কিন্তু হয়তো একজন শিক্ষকের হৃদয়কে অজান্তেই আঘাত করেছিলাম, তার হৃদয়কে অসন্তুষ্টির ছায়ায় ঢেকে দিয়েছিলাম।
জীবন বড়ই রহস্যময় বিচারক। এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হলো। ইসলামিয়াতসহ বিজ্ঞান বিভাগের সব বিষয়েই লেটার মার্কস পেলাম। কিন্তু সাধারণ গণিতে? আবারও সেই ৭৮।
পরীক্ষার প্রতিটি অঙ্ক ছিল পরিচিত, প্রতিটি সূত্র ছিল আপন। তবুও যেন অঙ্ক কষার আকাশে অদৃশ্য কুয়াশা নেমে এসেছিল। হাত চলছিল, কিন্তু আত্মবিশ্বাস কোথায় যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল। মনে হচ্ছিল, কোনো অদৃশ্য শক্তি যেন আমাকে সেই সীমারেখা অতিক্রম করতে দিচ্ছে না। ফলাফল—আবারও সেই ৭৮।
আজও ভাবি, এটি কি নিছক কাকতালীয় ছিল, নাকি মহান রবের এক নীরব শিক্ষা? হয়তো তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন—মেধা তোমার সম্পদ হতে পারে, কিন্তু বিনয়ই তোমার প্রকৃত অলংকার।
অহংকার কখনো উচ্চস্বরে আসে না; কখনো তা আত্মবিশ্বাসের মুখোশ পরে নিঃশব্দে হৃদয়ে প্রবেশ করে। আর সেই সূক্ষ্ম অহংকারের মূল্য অনেক সময় নম্বর দিয়ে নয়, জীবন দিয়েই পরিশোধ করতে হয়।
তাই আজ নতুন প্রজন্মের কাছে আমার বিনীত নিবেদন—মেধাবী হও, কিন্তু মেধার বাহাদুরি করো না। সত্য প্রতিষ্ঠা করো, কিন্তু এমনভাবে, যাতে কারও সম্মান আহত না হয়। বিজয়ী হও, কিন্তু এমন কোনো বিজয় অর্জন করো না, যার অন্তরালে অন্য কারও নীরব কষ্ট লুকিয়ে থাকে।
জীবন আমাকে শিখিয়েছে—মেধার ঔজ্জ্বল্য মানুষকে বড় করে, কিন্তু বিনয় তাকে মহিমান্বিত করে। কারণ মেধার দীপ্তি চোখকে আকর্ষণ করে, আর বিনয়ের আলো হৃদয়কে জয় করে। আজ মনে হয়, সেই ৭৮ কোনো সাধারণ নম্বর ছিল না; সেটি ছিল মহান রবের পক্ষ থেকে আমার জন্য এক নীরব সতর্কবার্তা, এক অনন্ত শিক্ষা এবং জীবনপাঠ।
মেধা তোমার পরিচয় হতে পারে, কিন্তু বিনয়ই হবে তোমার প্রকৃত মর্যাদা।