23/06/2026
লোডশেডিং: শহরের মুখস্থ প্যারাগ্রাফ বনাম হাওরের নির্মম বাস্তবতা!
শহরের শিক্ষার্থীরা হয়তো পরীক্ষার খাতায় নম্বর পাওয়ার জন্য ‘Load Shedding’ প্যারাগ্রাফ মুখস্থ করে, কিন্তু এর আসল কষ্টটা তারা কোনোদিন টের পায় না। নিজের কিছু স্বপ্নের পেছনে ছুটতে গিয়ে কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চল—ইটনায় এসে বুঝতে পারছি, লোডশেডিং আসলে কতটা নির্মম ও অমানবিক হতে পারে।
গতকাল বিকেলেই বিদ্যুৎ চলে গেল। রাত ১০টায় যখন এলো, সবাই মিলে আর্জেন্টিনার ম্যাচটা কোনোমতে উপভোগ করলাম। কিন্তু খেলা শেষ হতেই বিদ্যুৎও যেন নিজের দায়িত্ব শেষ মনে করল—মুহূর্তেই আবার গায়েব! তারপর সারারাত আর দেখা মেলেনি।
এই ২২ বছরের জীবনে কখনো বিদ্যুৎ ছাড়া ঘুমানোর অভ্যাস ছিল না। অথচ এখন সারাদিনের ক্লান্তি শেষে, এই তীব্র গরমে বাতাস ছাড়াই ঘামতে ঘামতে রাতের পর রাত পার করতে হয়। ইটনা কিন্তু কিশোরগঞ্জ শহর থেকে খুব বেশি দূরে নয়। অথচ এখানে মাঝেমধ্যে কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি শুরু হতেই বিদ্যুৎ চলে যায়। আর একটানা বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই—এক-দুই দিন বিদ্যুতের মুখই দেখা যায় না। এটাই হাওরের নিত্যদিনের বাস্তবতা। আজ দুপুর ১২টায় গেছে, কখন আসবে কোনো নিশ্চয়তা নেই।
সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় আমার শিক্ষার্থীদের জন্য। সামনের সপ্তাহ থেকেই ওদের পরীক্ষা শুরু। আমাদের গ্রামীণ অঞ্চলের ছেলেমেয়েরা সন্ধ্যার পরেই মূলত পড়তে বসে, আর ঠিক তখনই বিদ্যুৎ থাকে না। ২০২৬ সালে এসেও একদল শিক্ষার্থীকে চার্জার লাইটের ম্লান আলোয় ভবিষ্যৎ গড়ার লড়াই করতে হচ্ছে।
প্রতিদিন ক্লাসে গিয়ে যখন জিজ্ঞাসা করি, "পড়া শিখে এসেছ?" তখন অনেকের মলিন মুখের উত্তর থাকে, "স্যার, কারেন্ট ছিল না।" এই কথার পর শিক্ষক হিসেবে আমার আর কোনো জবাব থাকে না। কারণ আমি জানি, ওরা কোনো অজুহাত দিচ্ছে না; ওরা ওদের বাস্তবতার কথাই বলছে।
দিনের বেলার অবস্থাও আলাদা কিছু নয়। ৪০-৫০ জন শিক্ষার্থী যখন বিদ্যুৎহীন এই অসহনীয় গরমে ঠাসাঠাসি করে ক্লাস করে, শিক্ষক হিসেবে আমার নিজেরই দম বন্ধ হয়ে আসে!
তার ওপর আরেক চরম ভোগান্তি—বিদ্যুৎ গেলেই ফোনের নেটওয়ার্কও হাওয়া! তখন মনে হয় পুরো পৃথিবী থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি। আমরা হয়তো মানচিত্রে আছি, কিন্তু উন্নয়নের হিসাবের খাতায় নেই।
বিদ্যুৎ কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক চাহিদা। আমাদের বাচ্চারা গরমে ছটফট করছে, হাওরবাসী ভালো নেই। প্রশ্ন একটাই—ডিজিটাল বাংলাদেশের এই সুন্দর স্বপ্নটা আমাদের হাওরবাসীর জন্য কতটুকু সত্যি?