25/08/2026
শেয়ার প্লিজ 🙏
মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ মামাতো-পিসতুতো ভাই। ওরা দু'জন প্রথমে পাশের বাড়ির তিনতলায় উঠেছে। কিন্তু ওই ছাদে বসে ইয়াবা খাওয়া তাদের রুচিসম্মত হয়নি। তাই তিনতলা থেকে লাফ দিয়ে তারা পাশবর্তী গণপতি চক্রবর্তীর দোতলা বাসার ছাদে গেছে। সেখানে বসে আগুন জ্বালিয়ে ইয়াবা সেবন করেছে। সেটা মধ্যরাত—পুলিশের বর্ণনায় বোঝা যায়, রাত আড়াইটা থেকে তিনটার দিকে হবে। মাঝরাতে তাদের কার্যক্রমের শব্দ পেয়ে গণপতি বাবুর ঘুম ভেঙেছে। তিনি বিছানা থেকে উঠে ছাদে গেছেন। গণপতি বাবু দেখে ফেলায় দুই ইয়াবাখোর নাকি লজ্জা পেয়েছে। ইয়াবাসেবীদের এত লজ্জা আগে জানতাম না। লজ্জা ঢাকতে তারা একের পর এক চারজন মানুষকে খুন করেছে। নিরস্ত্র অবস্থায় দু'জনে মিলে চারজন সক্ষম মানুষের ওপর নিঃশব্দ হত্যাযজ্ঞ চালানো! এই প্রশিক্ষণ তারা কীভাবে পেয়েছে, কত বছরের ট্রেনিং, পুলিশের বর্ণনায় তা আসেনি!
তারা এক এক করে খুন করে গেছে, আর ভিকটিমরা বিনা আপত্তিতে নিঃশব্দে খুন হয়েছে! কোনো চেঁচামেচি নেই! খুন হওয়ার আগে খুশিতে নিজেদের মোবাইলগুলোও সুইচড অফ করেছে, যাতে কেউ ফোন করে হত্যার উৎসবে ডিস্টার্ব না করে! তার আগে বিদ্যুতের লাইন কেটে দিয়েছে, হত্যার উৎসব নির্বিঘ্ন করার জন্য। রাত তিনটার সময় ছাদে দু'জন লোক দেখেও গণপতি বাবু চোর সন্দেহ করেননি, চিৎকার-চেঁচামেচি করেননি। রাত তিনটায় তিনি এমনি-এমনি ইয়াবা সেবন দেখতে ছাদে গিয়েছিলেন, তাঁর স্ত্রী-সন্তানরাও আপত্তি করেননি। তারপর বিনা আপত্তিতে সবাই মিলে মরেছেন, বাধা দেননি।
নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর বোন বলেছেন, খুন হওয়ার আগে রাত আড়াইটার দিকে তাঁর দিদির নম্বর থেকে তাঁদের মোবাইলে ফোন গিয়েছিল। কিন্তু পুলিশের বর্ণনায় মনে হচ্ছে, তাঁরা চারজন বাঁচার জন্য প্রতিরোধ বা চিৎকার-চেঁচামেচি না করে পাতলা দেহী দুই তরুণের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন, মরার জন্য।
কমিশনারের কান্নাকাটির অভিনয়সহ বিশ্রী এই নাটক বিশ্বাসযোগ্য না হলে সেটা কি আমাদের পাপ হবে?
চারদিকে নানারকম নেশাখোর আছে! পুলিশ বিশেষভাবে ওই দু'জনকে ধরল কোন সাক্ষীর বয়ানে? বিনা তদন্তে কোন সূত্রের ভিত্তিতে ওরা দু'জন পুলিশের কাছে সন্দেহভাজন হলো? পুলিশ বর্ণনায় গণপতি চক্রবর্তীর লাশ তিন দিন খোলা ছাদে পড়ে ছিল, কিন্তু কাক-পক্ষীও ঠোকর মারেনি, ছিন্নভিন্ন করেনি! রহস্য কী? গল্প কেমনে মেলে?
ডেইলি স্টারে নিউজ এসেছে, নিহতদের সবার মুখমণ্ডল দাহ্য পদার্থ দিয়ে ঝলসানো ছিল। কী রকম দাহ্য পদার্থ ব্যবহার হয়েছে পুলিশ তা বলেনি। কমিশনার সাহেব সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে রোদনময় গল্পের মাঝে ভিকটিমদের মুখমণ্ডল পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটি ঢোকানোর অবকাশ পাননি। তবে এডিশনাল এসপি (সিআইডি) এবং ওসি ব্যাপারটা স্বীকার করেছেন। স্বজনদের দাবি, তাঁদের চার প্রিয়জনের শরীরে দাহ্য পদার্থ ঢেলে খুব কষ্ট দিয়ে মারা হয়েছে।
দু'জন মিলে চারজন মানুষের মুখমন্ডলে দাহ্য পদার্থ নিক্ষেপ করলো, কিন্তু তাদের নিজেদের হাত পা পুড়লো না, একদম নিখুঁত কাজ—এতোই দক্ষ কিলার!
শুধু পোড়ানো নয়, পুলিশ বলেছে, মাস্টার্সপড়ুয়া মেয়েটার চোয়াল একদম ভাঙা ছিল। ওর গলায় নাকি দড়ি পেঁচিয়ে চাপ দেওয়ার কারণে চোয়াল ভেঙেছে। গলায় রশি পেঁচালে ঘাড় না ভেঙে চোয়াল ভাঙে—এমন গল্প আমি বাপের জন্মে শুনিনি। তবে গল্পটা আমাদের বিশ্বাস করতে হবে, যেহেতু পুলিশ বলেছে!
পুলিশ প্রথমে বলেছিল, এটা ডাকাতি। পরের ভাষ্য অন্যরকম। বলছে, হত্যার পর ওই দুই ভাই দীর্ঘ সময় গণপতি বাবুর বাড়িতেই ছিল। সেখানে তারা বাথরুমে ঢুকে গোসল করেছে—একজনের পর একজন। খেজুর ও শসা খেয়েছে, তারপর আবার বসে মাদক সেবন করেছে। ভিন্ন খাতে নেওয়ার জন্য নাকি বাসাটা দুজনে মিলে একদম লুটপাট ও তছনছ করেছে। স্বর্ণালংকার নিয়েছে। টাকাপয়সা বা অন্য কিছু নেওয়ার কথা বলছে না, শুধু সোনা নিয়েছে বলছে। সেই সোনা আবার সেখানে আগুন দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করেছে। বাসার মোবাইল ফোনগুলো নাকি পরে পানিতে ডুবিয়ে রেখেছে। ইয়াবা সেবনের অপারেশন রাত আড়াইটার দিকে শুরু হয়। খুনখারাবি, গোসল, খানাপিনা, বিশ্রাম ইত্যাদি সেরে ভোরের আজানের পরে তারা বেরিয়ে গেছে—এ পুলিশের বয়ান।
আচ্ছা, ওরা বিদ্যুতের লাইন কখন কেটেছে? হত্যার আগে, না পরে? বাসায় ঢোকার আগে, না পরে? হত্যার আগে বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলে ব্যাপারটা অনেক বেশি পরিকল্পিত। মাদকসেবন দেখে ফেলার কারণে তাৎক্ষণিক হত্যা—এই গল্প তাহলে মেলে না। আর, চারজনকে খুন করা সম্পন্ন হওয়ার পর বিদ্যুতের লাইন কেটে দিয়ে তাদের লাভ কী?
হত্যার পর ওই বাসায় যে কাজগুলো তারা করেছে, তা অন্ধকারে করা সুবিধা, নাকি আলোতে করা সুবিধা? তাহলে তারা নিজেরা বিদ্যুতের লাইন কেটে দিয়ে ঘর অন্ধকার করবে কেন? যদি অন্ধকারে কাজ করতে তাদের সুবিধা হয়, তবে বাতি অফ করে রাখলেই হতো। গল্পটা মিলছে না।
তারা কি নিহতদের মুখমণ্ডল ঝলসে দেওয়ার জন্য দাহ্য পদার্থ সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল? তবে তো পরিকল্পিত—ইয়াবা খাওয়া দেখে লজ্জা পেয়ে হত্যার ব্যাপার নয়। গল্প মিলছে না।
ওদের একজন মাছের দোকানের, আরেকজন স্বর্ণের দোকানের কর্মচারী। ইয়াবা-আসক্ত ছেলেকে কোনো স্বর্ণ ব্যবসায়ী চাকরি দেবে? সে তো কেবল স্বর্ণ চুরি নয়, দোকান বেচে ইয়াবা খাবে। জীবনের গল্পের সঙ্গে বানানো গল্প মিলছে না।
মিলছে না পুলিশ কর্মকর্তার কান্নাকাটির ব্যাপারটা। প্রতিদিন খুনখারাবির তদন্তই যাদের কাজ, তারা গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার খুন হওয়ায় আবেগে একদম কান্না করে দিল!
মিডিয়ার ক্যামেরার সামনে হিন্দু অফিসারদের নাম ধরে হাঁকডাক আরেক চমৎকার ব্যাপার! পেশাদারিত্বের বদলে হত্যাকে সাম্প্রদায়িকভাবে ট্রিট করা হাই পলিটিক্স! সুবিচার তাতে মার খায়; মার খায় নিরপরাধ মানুষ। এমন পলিটিক্সে প্রয়োজন হয় বাংলা নামীয় বলির পাঁঠা। যেখান থেকে পারো, বলির পাঁঠা খুঁজে আনো। "জঙ্গিরা একটা হিন্দু পরিবারকে শেষ করেছে, অভিযুক্ত বানিয়ে আরও দুটি নিরীহ হিন্দু পরিবারকে শেষ করা গেল আর কি!" একথা মানুষের মুখে মুখে।
ব্যাপারটা জঙ্গিরা করেছে—এমন অভিযোগ শতজনে করলেও আমি নিশ্চিত না হয়ে মানতে চাই না। খুনিদের জাত-ধর্ম আমরা আসলে জানি না। মূলকথা, কীভাবে, কেন, কারা খুন করেছে আমরা কিছুই জানি না। একটা খুনের পেছনে কল্পনার অতীত রহস্য থাকতে পারে। অনুমান করি, এটা প্রশিক্ষিত কোনো দলের কাজ—যারা আগ্নেয়াস্ত্র, চাপাতি, লাঠি বা লৌহদণ্ড ব্যবহার না করেও, শুধুমাত্র খালি হাতে একাধিক খুন করতে পারে; ভিকটিমদের শব্দ করার অবকাশ না দিয়ে। অনুমান করি, ব্যাপারটা পরিকল্পিত, কারণ খুনিরা আগে বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে; তারা দাহ্য পদার্থ সঙ্গে নিয়ে গেছে।
প্রমাণের আগে আমি কখনোই বলব না, এটা সাম্প্রদায়িক আঘাত, বা হিন্দু সমাজকে নির্মূল করার চেষ্টা। তবে সত্য উদ্ঘাটন না করে, অপরাধীকে না ধরে হাই পলিটিক্সের যে প্রবণতা, অবশ্যই তাকে সাম্প্রদায়িক এবং হত্যার চেয়ে ঘৃণিত বলব।
আমি গতকাল শুধু "জজ মিয়া" শব্দ দুটি লিখে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। কে জজ মিয়া, কোন প্রসঙ্গ ইত্যাদি কিছুই লেখিনি। অথচ হাজারো মানুষ তাতে রিঅ্যাকশন দিয়েছে, কেউ আমাকে গালি দিয়েছে, কেউ সমর্থন করেছে।
বলুন তো, "জজ মিয়া" কী? এই শব্দে কী বোঝায়? এটা কি কোনো সত্য, বা কোনো মিথ্যা? কোনো প্রশাসনিক বা বিচারিক ব্যাপার? ব্যাপারটা সবাই বোঝেন।
আবার বলছি, গণপতি বাবুর পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করার কারণ কী, আমরা তা জানি না। সাম্প্রদায়িক টার্গেট হতে পারে, নাও হতে পারে। তদন্ত চাই, সত্য উদ্ঘাটন চাই, বিশ্বাস করতে চাই।
কিন্তু এই সরকারের তদন্ত ও বিচার ব্যবস্থায় বিশ্বাস করব কীভাবে? প্রকাশ্য গণহত্যার পর বিএনপি-জামাতের সরকার আসামি হিসেবে জজ মিয়া আবিষ্কার করে। এরা বৃদ্ধ বিচারপতিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত হত্যার ঘটনায় আসামি বানায়। বিচারপতি খায়রুল হকের নামে নয়টি মামলা—যার মধ্যে চারটি মার্ডার কেস। তিনি ৯০ বছর বয়সে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে মার্ডার করে বেরিয়েছেন! একই সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে হত্যা করেছেন। এসব মামলায় পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। এ হলো পুলিশের কর্মের রেকর্ড। কিন্তু মুগ্ধ এবং সিদ্ধার্থ নামের ওই দুই তরুণের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধকর্মের রেকর্ড নেই। তারা ইয়াবাসেবী, এমন কথা এলাকাবাসী কেউ বলতে পারেনি। পুলিশ বলছে। এ বয়ান বিশ্বাস করব? যারা জজ মিয়া বানায়, তাদের বিশ্বাস করতে না পারা কি আমার অপরাধ?
মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ স্বীকারোক্তি দিয়েছে। একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলায় জজ মিয়াও স্বীকারোক্তি দিয়েছিল। মানুষ বিশ্বাস করতে পারেনি। বিশ্বাস করতে না পারা কী অপরাধ?
শত শত সাংবাদিক বর্তমানে হত্যা মামলার আসামি। মামলাগুলো বিশ্বাস করার কারণ নেই, করি না। এ কি আমাদের অপরাধ?
জুলাইয়ের সহিংস আন্দোলনে বহু হত্যায় জড়িত বিএনপি, জামাত, এনসিপির অপরাধীদের জন্য আছে দায়মুক্তি। তাদের কেস তদন্ত করাই যাবে না, বিচার দূরের কথা। এমন ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখব? আমি কেন তাদের কথা বিশ্বাস করতে পারছি না—এটা কি আমার অপরাধ?
এর চেয়ে মুফতি মুহিবুল্লাহ হুজুর ভালো কাহিনি সাজিয়েছিলেন—তাঁকে অপহরণ থেকে শুরু করে বলাৎকার পর্যন্ত। ইসকন তাঁকে বলাৎকার করেছে, হুজুরকে একদম ভিজিয়ে দিয়েছে। মুফতি সাহেবের সেই কান্নাকাটি বিনা প্রশ্নে বিশ্বাস করার মতো অসংখ্য অনুসারী এই ফেসবুকেই দেখা গেছে। প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন হওয়ার পরেও তারা খুশি হয়নি। পুলিশ কমিশনার সাহেবের কান্নাকাটি বিশ্বাস করার জন্যেও রেডিমেড জনগণ এদেশে আছে। তারা সত্য চায় না, হিংসার খায়েশ মেটাতে চায়!
আচ্ছা, জজ মিয়া নাটক কি বিএনপি-জামাতের কর্মীরা বিশ্বাস করেন? যারা মামলাগুলো করেছেন, তারা নিজেরা কি এসব মামলার সত্যতায় বিশ্বাস করেন? তারা একটা পক্ষ—আওয়ামী লীগের হলে একরকম আচরণ করেন, বিএনপি-জামাত আমলে আরেক রকম। এখানে বিশ্বাসটাও ভাঁওতাবাজি। প্রতিপক্ষকে গালি দিতে হবে, পারলে হামলা করতে হবে—এই কালচার! এটা কি একটা স্বাভাবিক দেশ, স্বাভাবিক অবস্থা?
তদন্ত ও বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা দরকার। সত্য উদ্ঘাটন হোক। দেশটা স্বাভাবিক হোক—সকলের জন্য বাসযোগ্য হোক। সুবিচার চাই।