16/07/2023
কপি পোষ্ট
২০১৯ সালের বিশ্বকাপের আগে একটা ট্রাইনেশন সিরিজি হয় যেটা বাংলাদেশের একমাত্র বহুজাতিক ট্যুর্নামেন্ট জয়। সেই ট্যুর্নামেন্টের পর দলের সবাই একসাথে বিশ্বকাপ খেলতে যায়, যেহেতু বিশ্বকাপ হয় ইংল্যান্ডে এবং বহুজাতিক ট্যুর্নামেন্টটা ছিল পাশের দেশ আয়ারল্যান্ডে, কেউ আর দেশে আসেনি। ব্যতিক্রম ছিলেন দুইজন।
প্রথম জন ছিলেন তামিম। তিনি পরিবারসহ দুবাই ভ্যাকেশনে যান। দ্বিতীয় জন ছিলেন ক্যাপ্টেন মাশরাফি। তিনি বাংলাদেশে আসেন ৩ দিনের জন্য, নির্বাচন জয়ের মিষ্টি খান-খাওয়ান, স্লোগান দেন এবং আরো অনেক কিছু করেন। সেই বছর পুরোটাই মাশরাফি ব্যস্ত ছিলেন তার নির্বাচন নিয়ে। সেই নির্বাচন শেষ করে তিনি সরাসরি বিশ্বকাপ খেলতে যান, আট ম্যাচ খেলে এক উইকেট পান (নয়টি ম্যাচ খেলার কথা থাকলেও একটি ম্যাচ বৃষ্টিতে পন্ড হয়)।
ব্যতিক্রম ছিলেন আরেকজন। দলের সাথে বিশ্বকাপের ওয়াগনে উঠলেও এর আগে বিশ্বকাপ টার্গেট করে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ৬ কেজি ওজন কমান তিনি। উনি সাকিব আল হাসান।
এরপরে বিশ্বকাপে কী হয় আমরা সবাই জানি। তামিমের চতুর্থ বারের মত বিশ্বকাপে ব্যার্থতা, ম্যাশরাফি নিজেকে আড়াল করে মাঝের ওভারে বল করা, ১০ ওভারও শেষ করতে না পারা। ক্যাপ্টেন দেখে ম্যাশকে বসানোও যায়নি, রুবেল হোসেন সব কয়টা ম্যাচে সাইড লাইনে বসে ছিলেন।
ম্যাশের ব্যার্থতায় মিনি অলরাউন্ডার সাইফুদ্দিনকে ইংল্যান্ডের বাউন্সি পিচে স্ট্রাইক বোলারের ভূমিকায় নামতে হয়। খারাপ করেননি তিনি। কিন্তু তিনি একবার টিম মিটিং-এ বলে উঠেন, 'আমি শুরু না করে পরে বোলিং-এ আসলে ভাল হয়।'
এর পরের দিন কালের কন্ঠ পত্রিকার সিনিয়র সাংবাদিকের সাথে ডিনারে যান তামিম এবং ক্যাপ্টেন মাশরাফি। তারও পরের দিন কালের কন্ঠ পত্রিকায় বড় করে হেডলাইন দিয়ে সংবাদ ছাপানো হয়, 'বড় দলের সাথে খেলতে ভয় পান সাইফুদ্দিন।' সাইফুদ্দিন ভেঙে পড়েন। তখনো কেউ জানেনা কীভাবে সাংবাদিক এমন খবর ছাপালো, ডিনারে যাওয়ার ছবি তখনো ফেসবুকে আপলোড করেননি সাংবাদিক। দলের কেউ ড্রেসিং রুমের তথ্য ফাঁস করছে বলে সাকিব সরাসরি সাংবাদিকদের বলেন।
১৯ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার সাথে ম্যাচ। আমরা জিততেও পারতাম। মাহমুদুল্লাহ যখন ক্রিজে আসেন, ১২৪ বলে ২০৭ রান লাগে, হাতে আছে ৬ উইকেট। এরপরেই সারা পৃথিবী দেখে ঘৃণ্য এক দৃশ্য। মাহমুদুল্লাহ এবং মুশফিক মিলে হার নিশ্চিত ধরে নিয়ে নিজের পার্সোনাল গ্লোরির জন্য খেলতে থাকেন। আর ড্রেসিং রুমে বসে গজরাতে থাকেন সাকিব, যার পূর্ণ ইচ্ছা ছিল সেই বিশ্বকাপে সারা বিশ্বকে চমকে দেওয়া। মাহমুদুল্লাহ শেষ দিকে পিটিয়ে কিছু রান নিলেও মুশফিক অপরাজিত সেঞ্চুরি করে মাঠ থেকে বের হন। আমরা ৪৮ রানে হেরে যাই। মাঠ থেকে বের হবার সময় সমস্ত অস্ট্রেলিয়ার খেলোয়াড়েরা মুশফিককে ঘিরে ধরেন। টিপিকাল অস্ট্রেলিয়ানদের মত তাকে নিয়ে মজা নিতে থাকেন, কেউ একজন মুশফিকের ব্যাট ছুয়ে অবাক হওয়ার ভান করেন, পিছন থেকে কয়েকজন হাসিতে ফেটে পড়েন।মুশফিক এগুলো কিছুই বুঝতে পারেন না, বোকার মত হাসতে হাসতে মাঠ থেকে উঠে আসেন।
ঐদিনের পরই দলের উপর সাকিবের মোহ কেটে যায়। দলে হয় দুই ভাগ, সিনিয়ির চার জন এবং সাকিব একা।
মাশরাফিকে কাল্ট ফিগার বানানোয় লাভ কার হয়েছে? কোন সিগনিফিকেন্ট অ্যাচিভমেন্ট না থাকার পড়েও, তাকে দিয়ে দুইটা বায়োগ্রাফি লেখা হয়ে গেছে। দুই বই-এর লেখক, আরিফুল ইসলাম রনি এবং দেবব্রত মুখোপাধ্যায়সহ আরো কিছু সাংবাদিকদের মাশরাফি নিজের বাড়ি নড়াইলে নিয়ে যান, সাথে নিয়ে ঘুরেন, সপ্তাহ খানিকের মত থাকেন। রনি সাহেব প্রত্যেকদিন ফেসবুকে পোস্ট দিতেন, 'আমাদের মতই লুঙ্গি পড়েন ক্যাপ্টেন ম্যাশ।' লক্ষ-লক্ষ লাভ রিয়্যাক্ট পড়ে পোস্টে, মানুষ পাগলের মত ম্যাশকে ভালবাসতে থাকে। সকল সাংবাদিক মাশরাফিকে নিয়ে বন্দনায় ভেসে যেতে থাকেন। সাধারণ মানুষ ম্যাশকে সাধারণ মানুষ থেকে দেবতার আসনে বসায়। মাশরাফি হন নড়াইল-২ আসনের এমপি।
তামিম-মাশরাফির মত সাকিবের খুটি এত শক্ত না। ইংল্যান্ডে চিকিৎসার জন্য তামিমকে নিয়মানুযায়ী ইকোনমি ক্লাসের টিকিট দেওয়া হয়। তামিম সেই টিকিট বিসিবিতে যেয়ে ছিড়ে ফেলেন। বিসিবি উল্টো তামিমকে সরি বলে বিজনেস ক্লাসের টিকিট দেয়। সাংবাদিকগণ তাদের সংবাদপত্রে বিসিবিকে ধুয়ে দেয়। বিসিবির কেউ মিনমিন গলায় বলতে চেষ্টা করেন, 'নিয়মানুযায়ী ক্যাপ্টেন শুধুমাত্র বিজনেস ক্লাস পায়। তামিমতো ক্যাপ্টেন না।আমাদের ভুল হয়েছে, তাকে বিজনেস ক্লাসই দেওয়াই উচিত ছিল।'
বাংলাদেশে শুভাশীষ নামের এক বোলার ছিল। কোন এক বিপিএলে তার সাথে মাশরাফির বাকবিতন্ডা হয়। মাশরাফি ছিলেন ব্যাটিং-এ। শুভাশীষ বল ডেলিভারির পর বোলার সুলভ এগ্রেসন দেখান। মাশরাফি তেড়ে যান। সেই বোলার এরপর থেকে ঘরোয়াতেও আর সুযোগ পাননি। ২০১৫ বিশ্বকাপ থেকে বোলার আল-আমিনকে কোন কারণ দেখানো ছাড়া দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে জানা যায় ম্যাশের সাথে তার কথা কাটাকাটি হয়। ইনফর্মড বোলার থেকে ঘরোয়াতেও অচ্ছুৎ হয়ে যান বোলার আল-আমিন। কেউ কিছুই বুঝতে পারেন না।
২০১২ এশিয়া কাপের আগে তামিম বাজে পার্ফর্মেন্সের কারণে দল থেকে বাদ পড়েন। তার চাচা, বিসিবিতে কর্মরত আকরাম খান এজন্য অবসরে চলে যান। সরি-টরি বলে চাচা-ভাতিজা সবাইকে স্ব-স্ব জায়গায় বহাল রাখা গেছে। তামিম আবারো অবসর নিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী ডেকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে দেড় মাসের ছুটিসহ তাকে দলে ফিরিয়েছেন। তামিম আবার আবদার করেছেন, ছুটি ছাড়াও বিশ্বকাপে তার মাশরাফিকে লাগবে, মেন্টর হিসাবে। মাশরাফির হ্যা-না কিছুই বলেন নি। বিশ্বকাপের আগ দিয়েই কেন যেন তার নির্বাচন পড়ে যায়!
আজ জুলাই মাসের ১৫ তারিখ। ১৮ তারিখে তামিমের তার পরিবারসহ দুবাই ভ্যাকেশনে যাওয়ার কথা। উনি অনেক আগেই সেটার টিকিট কেটে ফেলেছেন। তবে আবার শুনলাম তিনি ইংল্যান্ড যাচ্ছেন চিকিৎসার জন্য।বিশ্বকাপের আগ দিয়ে তামিমের ডুবাই ভ্যাকেশন, কোথায় যেন মিল পাওয়া যাচ্ছে!
সবকিছুতে প্যাটার্ন পাওয়া যাচ্ছে পুরনো একটা। এই দেশটা দুর্ভাগা, মানুষগুলোও সহজ-সরল। আমি অনেক বুদ্ধিমান, হাজার-হাজার সাইটেশন ওয়ালা নামকরা সায়েন্টিস্টকে দেখেছি যারা মনে করেন, বাংলাদেশ দুনিয়ার সেরা দল, খালি ইন্ডিয়া আর আইসিসির ষড়যন্ত্রের কারণে জিততে পারেনা। এধরণের ধারণা উনাদের হয়েছে এই দেশের সাংবাদিকগণের কারণে। রিয়াসাদ আজিমদের মত শিক্ষিত সাংবাদিকও যখন চামারের মত কথা বলেন, যা-তা প্রশ্ন করে বেড়ান সবাইকে, সাধারণ মানুষ ধরে নেয় এটাই বোধয় সাহসিকতা। আজিম কি জানেন না কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক? উনি জানেন, কিন্তু এটাও জানেন এদেশের মানুষ বোকা।
বোকাদের মাঝে থেকে কেউ যদি বুঝে ফেলে সে বেশিরভাগ মানুষ থেকে চালাক, সে এটাকে ক্যাপিটালাইজ করতে পারে। হিরো আলম, জায়েদ খান, মাশরাফি, রিয়াসাদ আজিম উনারা সবাই ব্যাপারটা ধরতে পেরেছেন।