01/09/2025
প্রবাস জীবনের ২৪ বছর: সৌদির মরুভূমিতে একাকী সংগ্রাম
দেখতে দেখতে কেটে গেছে ২৪টি বছর—একটি প্রবাসী জীবনের পূর্ণ অধ্যায়। আমি সৌদি আরবের এই মরুর দেশে কাটিয়েছি জীবনের এক বিশাল অংশ, দূরে রেখে এসেছি নিজের জন্মভূমি, প্রিয় মুখগুলো, শৈশবের স্মৃতিময় দিনগুলো।
সৌদি আরবের এক ফার্মেসিতে কাজ করি আমি। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসে—রোগী, কাস্টমার, কখনও কখনও সহানুভূতি খুঁজতে থাকা কেউ। আমি শুধু ওষুধ দিই না, মাঝে মাঝে চেষ্টা করি একটু মনোযোগ দিতে, একটু মানবতা ছুঁয়ে দিতে।
প্রথমদিকে জীবনটা ছিল সত্যিই কঠিন। নতুন পরিবেশ, ভিন্ন ভাষা, অচেনা সমাজ—আর আমি ছিলাম একেবারে একা। এই একাকীত্বই ছিল আমার সবচেয়ে বড় শত্রু। রাতের বেলায় যখন চারপাশটা নিস্তব্ধ হয়ে যেত, তখন নিঃশব্দে বুকের ভেতর কাঁদত নিজের দেশ, মা-বাবা, ভাইবোন, বন্ধুরা।
প্রতিটি দিন কাটত পরিশ্রমে। সকালে ফার্মেসি, রাতে নিজের সাথে বোঝাপড়া। বহুবার ভেবেছি—ফিরে যাই কি না! কিন্তু পরিবারের মুখটা মনে পড়লে আবার শক্ত হই। কারণ এই প্রবাসের কষ্টেই তো গড়ে উঠেছে ওদের মুখের হাসি।
প্রতি দুই বছর পরপর ছুটিতে দেশে ফিরি। সেই ক'টা দিন যেন স্বর্গের মতো লাগে। মায়ের হাতে রান্না, বাবার স্নেহ, ছোট ভাইবোনের হাসি—সব যেন নতুন করে বাঁচিয়ে তোলে। কিন্তু সেই আনন্দেরও মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, আবার ফিরে আসতে হয় পরিচিত অচেনা মরুর দেশে।
এই ২৪ বছরে অনেক কিছু বদলে গেছে। প্রযুক্তি বদলেছে, শহর বদলেছে, আমার চেহারাও বদলেছে। শুধু এক জিনিস বদলায়নি—বাংলাদেশকে মনে বয়ে বেড়ানোর তৃষ্ণা। প্রবাস আমাকে রুটি-রুজি দিয়েছে, স্বপ্ন পূরণের পথ তৈরি করেছে। কিন্তু বিনিময়ে কেড়ে নিয়েছে সময়, আত্মীয়তা আর দেশমাটির গন্ধ।
আজ আমি যখন পেছনে তাকাই, দেখি একজন নিরলস পরিশ্রমীর গল্প। একজন প্রবাসী, যে একাকীত্বের মাঝেও ভেঙে পড়েনি। বরং দাঁড়িয়েছে, হেঁটেছে, এবং লড়াই করেছে—নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, দেশের জন্য।
এটাই আমার ২৪ বছরের প্রবাস জীবন। গর্বও আছে, কষ্টও আছে—কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, এই জীবন আমাকে মানুষ করেছে।