04/01/2026
রিভিউটা যখন লিখছি তখন মাথার ভেতর দি আলকেমিস্ট বইয়ের সেই বিখ্যাত বাক্যটা বারবার মনে পড়ছে— “যখন মানুষ সর্বান্তকরণে কিছু একটা পেতে চায়, তখন মহাবিশ্বের প্রতিটি কণা সেই চাহিদা মেটাবার যোগসাজশে লেগে পড়ে।”
বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের লেখা “আদর্শ হিন্দু হোটেল” পড়েননি, এমন পাঠক খুব কমই পাওয়া যাবে। বহুকাল ধরে এই বই নিয়ে জয়জয়কার শুনেছে পাঠকরা। তাই বইয়ের নাড়িনক্ষত্র বের করার কোনো ইচ্ছে বা দুঃসাহস কোনোটাই আমার নেই। বরং এই বই থেকে আমি কী অর্জন করেছি বা কী শিখতে পেরেছি, এই বই আমার চিন্তার জগতে কীভাবে ছাপ ফেলল বা সাচ্চা পাঠকরা এই বইটার কেন এত প্রশংসা করেন, সেসব জানার চেষ্টা করব।
এই বইয়ের প্রধান চরিত্র হলো হাজারি দেবশর্মা। গ্রাম থেকে বেশ দূরে রাণাঘাটের রেল-বাজারে বেচু চক্কত্তির দোকানে রান্নার কাজ করেন। হাজারি ঠাকুর, এক নামে সবাই চিনবে। হাজারি ঠাকুর রান্নার কাজটা বেশ ভালোই রপ্ত করেছেন। বলতে গেলে হাজারি ঠাকুরের রান্নার জন্যই বেচু চক্কত্তির হোটেল ভালোভাবে চলে। কিন্তু বেচু চক্কত্তি আর হোটেলের পদ্মঝি যেন তার কাজ না দেখেও দেখেন না। বরং উল্টো তার উপরেই সবার সব ক্ষোভ। মাত্র ক'টা টাকায় তার পরিবার চলে না। তবুও হাজারি ঠাকুর তার মালিকের প্রতি কৃতজ্ঞ। তবে তার একটা স্বপ্ন আছে, এই রাণাঘাটের রেল-বাজারেই একটা হোটেল হবে। হাজারি ঠাকুরের নিজের হোটেল। নাম হবে আদর্শ হিন্দু হোটেল। সেখানে খদ্দেরদের সর্বোচ্চ সুবিধা দেওয়া হবে। অন্যান্য হোটেলের মতো সেখানে দুইনাম্বারি কোনো কাজ হবে না। এই স্বপ্নেই হাজারি ঠাকুর বিভোর। চল্লিশের কোঠা পার হলে কী হবে, তার এই স্বপ্ন তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
আলোচনার সুবিধার্থে ঘটনা সংক্ষেপ সামান্য তুলে ধরলাম। এখানে ফাইন্ডিংসগুলো হলো— এক, হাজারি ঠাকুর তার নিজের কাজে সর্বোচ্চ দক্ষ। দুই, হাজার অপমানিত হলেও সে কখনো মালিকপক্ষের প্রতি অকৃতজ্ঞ ছিল না বরং ধৈর্য্য ধরে তার নিজের স্বপ্নের দিকে এগিয়ে চলেছে। আচ্ছাহ্, বাকিগুলো আস্তে আস্তে জানব। এগুলো নিয়েই আমি বরং আলোচনা করি।
এখান থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হলো, প্রত্যেকটা মানুষ, যেই কাজই করুক না কেন, তার নিজের কাজে দক্ষ হতে হবে। হোক সে ঝাড়ুদার কিংবা শিক্ষক। আপনি আপনার কাজে যদি দক্ষতা অর্জন করতে পারেন, বাকিদের থেকে বেশি দক্ষ হতে পারেন, তাহলে আপনার সফলতা সুনিশ্চিত। এরপরেই যেটা আসবে, আপনাকে আপনার স্বপ্নপূরণের রোডম্যাপ রেডি করতে হবে এবং যতই ঝড়ঝাপটা আসুক, সৎ, কৃতজ্ঞ ও বিনয়ী থাকতে হবে।
হাজারি ঠাকুর কিন্তু তার স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছিল। তার স্বপ্নপূরণের পেছনের গল্পটাই মূল। এখানে একটা ছোট্ট উপদেশ যোগ করি, আপনি অনুপ্রেরিত হতে চাইলে সফল মানুষদের সফলতার পেছনের ব্যর্থতার গল্পগুলো জানুন। হাজারি ঠাকুর নিজের কাজে ছিল দক্ষ, ছিল সৎ, কৃতজ্ঞ ও বিনয়ী। কিন্তু এসব দিয়ে তো আর বাজার চলে না। ব্যবসায় নামতে গেলে দরকার পুঁজি, ইনভেস্টমেন্ট। সেখানে হাজারি ঠাকুর সাহায্যপ্রাপ্ত হয়েছিল অন্যদের দ্বারা। আচ্ছা ভাবুন তো, এই সাহায্যপ্রাপ্তির পেছনের মূল কারণ কী? কারণ ঐ আগেরটাই। সে ছিল নিজের কাজে দক্ষ, সৎ, কৃতজ্ঞ ও বিনয়ী। তার উপর অন্যদের ভরসা ছিল। সে তার সর্বোচ্চটুকু দিয়ে চেষ্টা চালিয়েছিল। পোস্টের প্রথম প্যারার বাক্যটা প্রয়োজনে আবার পড়ে আসুন।
হাজারি ঠাকুরের সফলতা কি ঐ হোটেল খুলেই থেমে ছিল? নাহ্। তারপরের কাহিনি না-হয় পাঠক পড়েই জেনে নিবে। সে কি সফল হওয়ার পরও পরিবর্তন হয়েছিল? নাহ্, হয়নি। সে তখনও তার পূর্বের মালিকের প্রতি ছিল কৃতজ্ঞ। সে সবসময় মনে রেখেছে তার সফল হওয়ার পেছনের সামান্য ভূমিকা রাখা প্রতিটা ব্যক্তিকে। তখনও সে ছিল বিনয়ী ও সৎ। এসবকিছুই হাজারি ঠাকুরকে নিয়ে গিয়েছে সফলতার আরো উচ্চ পর্যায়ে।
কিছু বোদ্ধা পাঠকদের বলতে শোনা যায়, ফিকশন পড়ে কি লাভ? জ্ঞান অর্জন করতে হলে, কিছু জানতে হলে নন-ফিকশন পড়তে হবে। ফিকশনে শুধু সময় অপচয়। ইত্যাদি ইত্যাদি। আসলেই কি তাই? বরং এসব ফিকশন পড়ার পর একজন পাঠকের মধ্যে এই জিনিসগুলো সহজেই ঢুকে যায় এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়, যেগুলো নন-ফিকশন বইয়ে কাঠখোট্টা লেখায় পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ভরা থাকে। ফিকশনের প্রয়োজনীয়তাও ব্যাখ্যাতীত। তার জন্য সত্যিকারের পাঠক হতে হবে। তাহলেই সঠিক বই চিহ্নিত করা সম্ভব।
এসব বই পড়ার পর কিছুক্ষণ চিন্তা করুন। কী শিখলেন, কী পেলেন, এসব ঘটনা কি এমনিই হয়ে গেল, নাকি এর পেছনে জীবন পরিবর্তন করার মতো বার্তা রয়েছে! দেখবেন, এমন অনেককিছুই আছে, যেগুলো আপনাকে সাহস দেবে, সফলতার রাস্তা দেখাবে।
আর হ্যা, রিভিউয়ের চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী কিছু কথা না বললেই নয়। এই বইয়ে বিভূতির লেখনশৈলি আপনাকে মুগ্ধ করবে বরাবরের মতো। পড়ার সময় বিরক্তবোধ আসার কথা না। ছোট্ট একটা বই, খুব সাবলীল ও প্রাঞ্জল। আশা করি সকলের জন্য বেশ উপভোগ্য হবে। সতীর্থ প্রকাশনীর ভিন্টেজ সেটের বইটার প্রোডাকশন দারুণ হয়েছে। সাইজ ছোটো থাকার কারণে হাতে ধরে পড়তেও দারুণ লাগবে।
পরিশেষে, আদর্শ হিন্দু হোটেল শুধু একজন রাঁধুনির সফল হওয়ার গল্প না। বরং সফলতার রোডম্যাপ। আবারও সেই লাইনটাই মাথায় আসে—“যখন মানুষ সর্বান্তকরণে কিছু একটা পেতে চায়, তখন মহাবিশ্বের প্রতিটি কণা সেই চাহিদা মেটাবার যোগসাজশে লেগে পড়ে।”
বই : আদর্শ হিন্দু হোটেল
লেখক : বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রকাশনী : সতীর্থ প্রকাশন
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২৩২