19/06/2026
সুখের খোঁজে: একটি নীল খাম ও দুটি জীবন
লেখা: নজরুল ইসলাম
▶️ শহরের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বহুতল অ্যাপার্টমেন্টের দশতলায় দাঁড়িয়ে কফির মগে চুমুক দিচ্ছিলেন রিয়াজ সাহেব। প্রাইড গ্রুপের চিফ এক্সিকিউটিভ তিনি। বিলাসী জীবন, ড্রয়িংরুমে দামি ঝাড়বাতি, আর গ্যারেজে ঝকঝকে গাড়ি—কোনো কিছুরই কমতি নেই।
তবুও আজ সকাল থেকেই তার মনটা বিষণ্ণ। কারণ, তার এক ব্যবসায়ী বন্ধু সম্প্রতি শহরের সবচেয়ে অভিজাত এলাকায় বিশাল এক রাজপ্রাসাদের মতো বাংলো বাড়ি কিনেছেন। রিয়াজ সাহেব তার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
> "কী লাভ হলো এত খেটে? এই চার দেয়ালের ফ্ল্যাটেই জীবন পার হয়ে গেল। একটা নিজস্ব বড় বাগানসহ রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি তো বানাতে পারলাম না!"
>
তার স্ত্রীও সুর মিলিয়ে বললেন, "ঠিক বলেছ। আর আমাদের এই তিনবেলা একঘেয়ে খাবার! উফ, জীবনটা বড্ড একঘেয়ে হয়ে গেছে।"
ঠিক একই সময়ে, রিয়াজ সাহেবের বহুতল ভবনের ঠিক নিচে, ফুটপাতের এক কোণে প্লাস্টিকের ছাউনি দেওয়া ছোট্ট একটা জায়গায় ঘুম থেকে জাগল আকাশ। ১৯ বছরের এক তরুণ, যে সারাদিন রিকশা চালায়।
আকাশের রাতের ঘুমটা ভালো হয়নি। গতকাল রাতে প্রচণ্ড বৃষ্টি হয়েছিল, আর প্লাস্টিকের ফুটো দিয়ে পানি পড়ে তার পুরো শরীর ভিজে গেছে। সে তার চটের বিছানাটা গুছিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসল। তার মনে কোনো ক্ষোভ নেই, শুধু একটা তীব্র স্বপ্ন আছে।
আকাশ মনে মনে বলল, *“ইশ! ওই বড় দালানটার মতো যদি আমার একটা ছোট্ট মাথা গোঁজার ঠাঁই থাকত! যেখানে বৃষ্টি হলে ছাদ চুয়ে পানি পড়বে না। কি চমৎকার হতো!”*
সেদিন দুপুরবেলা রিয়াজ সাহেব তার দামি গাড়ি নিয়ে অফিসের দিকে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ একটা সিগন্যালে গাড়ি থামতেই তিনি জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেন। দেখলেন, ফুটপাতে বসে আকাশ আর তার এক সঙ্গী দুপুরের খাবার খাচ্ছে।
খাবার বলতে—একটা অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে সামান্য কিছু বাসি ভাত, সাথে একটু লবণ আর একটা কাঁচা মরিচ। রিয়াজ সাহেব অবাক হয়ে দেখলেন, ওই সামান্য খাবারটুকু মুখে দেওয়ার আগে আকাশ চোখ বন্ধ করে ওপরওয়ালার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানাল। তার মুখে কোনো আফসোস নেই, বরং এক টুকরো স্বর্গীয় তৃপ্তির হাসি লেগে আছে।
রিয়াজ সাহেবের বুকটা কেঁপে উঠল। তিনি নিজের দিকে তাকালেন—যিনি সকালে দামি ডাইনিং টেবিলে বসেও খাবারের খুঁত ধরছিলেন। আর এই ছেলেটি একবেলা আধপেটা খেয়েও কতটা সন্তুষ্ট।
ঠিক তখনই আকাশের পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা নীল কাগজ পড়ে গেল, যা সে খেয়াল করেনি। গাড়ি টান দেওয়ার মুহূর্তে রিয়াজ সাহেব ড্রাইভারকে বললেন গাড়ি থামাতে। তিনি নিজে নেমে কাগজটি কুড়িয়ে নিলেন। কৌতূহলবশত তিনি কাগজটি খুললেন। সেটা কোনো চিঠি ছিল না, ছিল আকাশের ডায়েরির একটা পাতা। সেখানে কাঁচা হাতের লেখায় লেখা ছিল:
*"আজ সারাদিন মাত্র ১০০ টাকা আয় হয়েছে। একবেলা খেয়েই দিনটা কেটে গেল, তাও তো বেঁচে আছি! রাস্তার ওই পাশে রাতে যে বৃদ্ধ লোকটা শীতে কাঁপছিল, তার তো তাও জোটেনি। ওপরওয়ালা আমাকে অনেক ভালো রেখেছেন। আমার শুধু একটাই স্বপ্ন—কোনো একদিন যদি ওই বড় দালানটার মতো একটা পাকা ঘরে ঘুমাতে পারতাম! তবেই আমার জীবন সার্থক।"*
লেখাটা পড়ে রিয়াজ সাহেবের চোখ ভিজে এলো। যে দালান বাড়িকে তিনি খাঁচা মনে করে আফসোস করছিলেন, তা অন্য কারোর জীবনের পরম স্বপ্ন! যে খাবারকে তিনি অবহেলা করছিলেন, তা পাওয়ার জন্য কেউ কেউ তীব্র লড়াই করছে।
রিয়াজ সাহেব সেদিনই বাড়ি ফিরে এলেন। ড্রয়িংরুমে ঢুকে চারপাশের দেয়ালগুলোর দিকে তাকালেন। আজ আর তার এগুলোকে ছোট মনে হলো না। তিনি তার স্ত্রীকে ডেকে আকাশের ফেলে যাওয়া কাগজটা দেখালেন।
দুজনেরই চোখ খুলে গেল। রিয়াজ সাহেব বুঝতে পারলেন, **সুখ রাজপ্রাসাদে থাকে না, সুখ থাকে সন্তুষ্টিতে।** মানুষের চাওয়ার কোনো শেষ নেই, কিন্তু যা আছে তা নিয়ে যদি কেউ কৃতজ্ঞ হতে শেখে, তবে একটা ছোট্ট দালান বাড়িই তার কাছে রাজপ্রাসাদ হয়ে ওঠে।
#জীবনবোধ #কৃতজ্ঞতা #গল্প #সন্তুষ্টি #বাস্তবতা #অনুপ্রেরণা #সুখ #মানবিকতা #গল্পের_ঝুড়ি #উপলব্ধি #আবেগ #অনুভূতি