29/06/2026
শিল্পী মোস্তফা মনোয়ারের কথা বলতে গেলেই আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে নব্বইয়ের দশক—আমার কৈশোরের দিনগুলো। তখন স্কুলে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা আর বাড়ি ফিরে টেলিভিশন দেখা—এই ছিল আমাদের বিনোদনের জগৎ। আর টেলিভিশন বলতে তখন একটাই চ্যানেল, বিটিভি।
বিটিভিতে অনেক ধরনের অনুষ্ঠান দেখেছি। কিন্তু ছোটদের জন্য সবচেয়ে প্রিয় অনুষ্ঠান ছিল ‘মনের কথা’। আর ‘মনের কথা’ মানেই শিল্পী মোস্তফা মনোয়ার।
ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকতে আমার খুব ভালো লাগত। পরে চিত্রকলা নিয়েও পড়াশোনা করেছি। ছোটবেলায় মনে মনে শিল্পী হওয়ার যে ছোট্ট স্বপ্ন ছিল, তার বড় একটা অনুপ্রেরণা ছিলেন মোস্তফা মনোয়ার। আমাদের দেশে চিত্রশিল্পীর কথা বললে জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, এস. এম. সুলতানসহ আরও অনেক মহান শিল্পীর নাম আসে। কিন্তু আমার কাছে মোস্তফা মনোয়ার সবসময়ই এক বিশেষ নাম।
তাকে কখনো সামনাসামনি দেখার সুযোগ হয়নি। কিন্তু বিটিভির পর্দায় ‘মনের কথা’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর অসাধারণ ছবি আঁকার প্রতিভা দেখেছি। বিশেষ করে জলরঙের ছবি আঁকার যে অপূর্ব সৌন্দর্য, তা প্রথম তাঁর কাছ থেকেই উপলব্ধি করি।
একটি সাদা কাগজ ভিজিয়ে তিনি যখন তুলি চালানো শুরু করতেন, তখন মনে হতো যেন রং আর পানি নিজেদের মধ্যেই এক অদ্ভুত খেলা খেলছে। মুহূর্তের মধ্যেই সেই সাদা কাগজে ফুটে উঠত মেঘলা আকাশ, সবুজ মাঠ, দূরের নদী কিংবা আমাদের চিরচেনা গ্রামবাংলা। তিনি কথা বলতে বলতেই ছবি এঁকে ফেলতেন। আমি মুগ্ধ হয়ে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি দেখতাম। কোনো পর্বই মিস করতে চাইতাম না।
তাঁর ছবিতে খুব বেশি খুঁটিনাটি বা বাড়তি অলংকরণ থাকত না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যখন ছবিটি সম্পূর্ণ হতো, তখন মনে হতো—এই তো আমার চেনা বাংলাদেশ।
শুধু ছবি আঁকাই নয়, তাঁর কথাগুলোও আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করত। তিনি বলতেন, “ছবি আঁকায় আসলে কোনো ভুল হয় না।” বিশেষ করে শিশুদের তিনি কখনো নিয়মের গণ্ডিতে আটকে রাখতে চাইতেন না। তাঁর বিশ্বাস ছিল, কোনো শিশু যদি আকাশকে বেগুনি রঙের দেখে, তাহলে তাকে বেগুনি আকাশই আঁকতে দিতে হবে। শিল্পের কোনো কঠিন ব্যাকরণ দিয়ে শিশুর কল্পনাশক্তিকে বেঁধে রাখা উচিত নয়।
আরেকটি কথা তিনি প্রায়ই বলতেন, “শিল্পী হতে গেলে সমস্যার কথা ভাবলে চলবে না।” ছবি আঁকার আগে যদি মনে হয়, “এটা পারব না, ওটা হবে না,” তাহলে শিল্পী হওয়াই কঠিন। এই কথাগুলো আজও আমাকে সাহস জোগায়।
পরে ‘মনের কথা’ অনুষ্ঠানে পারুল, বাউল আর একটি গরুর পুতুল যোগ হয়েছিল, যা আমাদের অনেক আনন্দ দিত। কিন্তু আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল তাঁর ছবি আঁকার সেই জাদুকরী মুহূর্তগুলো।
তিনি একবার বলেছিলেন, জলরঙে ছবি আঁকার সময় রং আর পানি যেন নিজেরাই ছবি আঁকতে চায়। শিল্পীর খুব বেশি কিছু করতে হয় না, শুধু তাদের সেই খেলাটাকে বুঝে এগিয়ে নিতে হয়। কথাটা শুনে আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। পরে তাঁর হাতেই দেখেছি কীভাবে এক রং আরেক রঙের সঙ্গে মিশে, ধীরে ধীরে গড়িয়ে, একসময় একটি সুন্দর ছবির জন্ম দেয়।
আজ সেই প্রিয় মানুষটি আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে অনন্তের পথে পাড়ি জমিয়েছেন। তাঁর চলে যাওয়ায় বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গন এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে হারাল। মহান আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করুন, তাঁর কবরকে প্রশস্ত করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।আমিন।