26/11/2025
কড়াইল বস্তিতে আগুন লেগে (আগুন লাগানোতে না) ১ লাখ মানুষ বাস্তুহারা হয়েছে আজ। খোলা মাঠে নিঃস্ব অবস্থায় তাদের আজকের রাত কাটছে। হাজার হাজার বাচ্চা, আজ শীতে কেঁপে কেঁপে নির্ঘুম রাত কাটাবে। সঙ্গত কারণেই প্রচুর বাচ্চা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হবে। হয়তো মারাও যাবে।
একশ নয়, এক হাজার নয়; বিদেশ নয়, দেশের প্রত্যন্ত কোনো অঞ্চল হয়....রাজধানীর এক পাশে প্রায় এক লাখ মানুষের বেদনা কোথাও কাউকে স্পর্শ করছে বলে মনে হলো না। কারণ এদের দুর্দশার কারণ ঠিক কে, কেউ জানে না। আমাদের দেশের মানুষের আবেগ আক্রান্ত মানুষ দেখে হয় না৷ এদেশের মানুষ আগে খুঁজে কালপ্রিট কে। যদি কালপ্রিট হয় অপছন্দের, তবেই লোকজন চিন্তা করে এবার তবে কথা হোক।
বস্তি হচ্ছে মানুষের বাচ্চাদের সর্বশেষ স্বীকৃত গ্রহ। মানুষের যখন কোথাও কোনো অস্তিস্ব থাকে না, তারা ঘর করে বস্তিতে। বস্তি কুকুর ও মানুষের মধ্যে পার্থক্যের সবশেষ ফাইন লাইন। বস্তির পরে মানুষের বসবাস করতে হয় কুকুরের সাথে। রাস্তায়, ওভারব্রিজে, হাসপাতালের নিচতলায়, ব্রিজের নিচে। কুকুরের নিয়মে শোয়া, কুকুরের নিয়মে ঘুম। কুকুরের মতোই আলো ফুটতেই জায়গা ছেড়ে দেয়া।
বস্তির টিন বা বেড়া পুড়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে শুধু সর্বশেষ ঘরই হারায় না, হারায় পরিবারের শেষ দড়ি। বন্ধন খুলে যায়। স্ত্রী ঘুমায় এক রাস্তায়, স্বামী অন্য ওভারব্রিজে। বাচ্চারা নেশায় ঢুলে। এরা চোর হয়, ছিনতাইকারী হয়, হয় বিরক্তিকর ভিক্ষুক। আমরা রাস্তার ময়লার মতোই এদের দেখে বিরক্ত হই, রাস্তায় শুতে দেখলে পড়ে থাকা গোবর ঘেন্না করার মতোই ভয়ে পাশ কাটাই।
সভ্য লোকজন কয়েকটা বিল্ডিং জোড়া দিয়ে একেকটা সোসাইটি করে। লাগিয়ে দেয় গেট। এরা তাড়া খেয়ে বাইরে যায়। যেতেই থাকে। ভার্সিটি পরিষ্কার রাখতে উচ্ছেদ অভিযান চলে। দোষ কারোর নেই। আপদ ও ময়লা কে রাখবে? কার দায়? কার এত ঠেকা?
দাবড়ানি খেতে খেতে এদের জগত কেবলই ছোট হয়, কেবলই ছোট হয়। ওদের দাবড়ানিতে অপরাধ নেই। প্রত্যেকেরই আপদমুক্ত ও নিরাপদ থাকার অধিকার আছে।
শুধু সমস্যা একটা জায়গাতেই। সভ্য লোক কখনোই প্রশ্ন তোলা দূরে থাক, নিজেকেও প্রশ্ন করে না যে...রাস্তার এই লোকগুলো আসে কোত্থেকে? কোন সুখে এরা ঘর ছেড়ে রাস্তায় ঘুমায়? সবাই তাড়ালে এরা যাবে কই?
নিয়ম করে বস্তি পুড়ে। তাৎক্ষণিকভাবে সেই খালি জায়গায় ওঠে আবাসিক দালান। মার্কেট। সরকারি অফিস। এক ইঞ্চি জায়গা খালি থাকে না একটা দিন। সরকার আসে, সরকার যায়। জালিম মজলুম হয়, মজলুম বনে যায় জালিম।
শুধু একটা জায়গা থাকে অবিচল। বাস্তুহারা এসব মানুষের জায়গা কোথায় হবে কেউ ভাবে না।
আজকে যে কয়টা মানুষ খোলা আকাশের নিচে, আজকে যে কয়টা বাচ্চা নিউমোনিয়া আক্রান্ত হবে...তারা ঠিক কোন দায়ে সভ্য মানুষের সাথে সদ্ভাব করবে? কেন আলাদা জাত ভাববে না? কেন সুযোগ পাওয়া মাত্রই ব্যাগ ধরে টান দেবে না?
গৃহহীন প্রত্যেক দেশেই আছে। কিন্তু বস্তি উড়াড় বানিয়ে গৃহহীন আর কোনো দেশে এত মানুষ হয় কিনা আমার জানা নেই। এ যেন এক অক্লান্ত প্রক্রিয়া।
বস্তি উজাড়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সভ্য লোক লাভবান হয়। আগারগাঁওয়ের মতো সুন্দর ছিমছাম অফিস পাড়া পায়। পায় টাকা খরচ করার নতুন মার্কেট। কিন্তু এই সুখের দায়ও কী মেটাতে হচ্ছে না?
রাস্তায় বাস্তুহারাদের মিছিল বাড়ছেই। ঢাকার সর্বশেষ বস্তিও একদিন পুড়বে। প্রত্যেকের জায়গা হবে সড়কে। এদের লাত্থি দিয়ে সরাতে সরাতে ক্লান্ত হতে হবে। সিকিউরিটি গার্ডরা অপরাগ হয়ে চাকরি ছেড়ে দেবে।
কুকুর নির্বংশ করা যায়। কুকুর এমনিও মরে যায়। মানুষ কুকুরের জীবন পেলেও শরীরে মানুষ তো। এদেরকে ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলার সুযোগ নেই। এরা চিৎকার করে, কথা বলে, ক্ষেত্রবিশেষে প্রতিআক্রমণ করে বসে।
অর্থাৎ বস্তির আগুনের আঁচ আমাদের গায়ে এসেও লাগে, লাগবে। টের পাচ্ছি না আরকি।
মানুষকে যদি কুকুরের জীবন থেকে মুক্তি না দেয়া যায়, র্যাবিসের আঘাত থেকে আমাদের মুক্তি দেবে কে?