17/03/2026
'গতকাল রাতে মাতাল কাব্য ভাই আর স্রোত ঘনিষ্ঠ হলো! জ্বরে ভুগতে থাকা স্রোত বুঝতেই পারেনি তার কত বড় সর্বনাশ হয়ে গেছে। এদিকে কাব্য নিজের হোঁশে ছিল না। সকালে যখন চোখের পাতা খুলেই একে অন্যকে খুব কাছাকাছি দেখল, আঁতকে উঠল দুজনেই! কাব্য দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
"এই স্টুপিড! তুই এখানে এই অবস্থায় কী করছিস?"
কাব্যের ধমকে কেঁপে ওঠে স্রোত। সে নিজের শরীরের দিকে তাকায়। স্রোতের গায়ে জড়ানো কাব্যের শার্ট, যা ওর গায়ে বেশ ঢিলেঢালা। মেয়েটার পরনে অন্য কোনো কাপড় নেই। বিছানার চাদর দিয়ে নিজেকে ঢেকে নিয়ে সে ধরা গলায় বলে,
"আপনি আমার সাথে কী করেছেন?"
"আমি তোর সাথে কিছুই করিনি। তুই নিজেকে কী ভাবিস, হু? তোর মতো মেয়েকে আমি টাচ করব? কখনোই না!"
রমণীর চোখ দুটো রক্তলাল। মুখমণ্ডল অপমানে রক্তিম হয়ে উঠেছে। সে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,
"আমার মতো মেয়ে মানে? আপনি কী বোঝাতে চাইছেন?"
"আমি বোঝাতে চাইছি তুই একটা খারাপ মেয়েমানুষ! আমার সাথে গেম খেলছিস, তাই না?তুই ইচ্ছে করেই এভাবে কাপড়চোপড় খুলে আমার রুমে এসেছিস।আমাকে ফাঁসাতে চাইছিস,রাইট?"
ভীষণ রাগ হলো স্রোতের। কাব্য এসব কী বলছে ওর সম্পর্কে? নিজের সাথে কী ঘটেছে তা ভাবতেই মেয়েটা কান্নায় ভেঙে পড়ে। স্রোতের কান্নার শব্দে কাব্য বিরক্ত হয়। দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে খোলা কিনা।না ফরজা ভেতর থেকে আটকানোই আছে। তবুও তার ভয় হচ্ছে, যদি কেউ স্রোতের কান্না শুনে ফেলে! তাহলে হয়তো সমস্যায় পড়তে হবে। কাব্য তড়িঘড়ি করে নিজের হাত দিয়ে স্রোতের মুখ চেপে ধরে। নিচু স্বরে শাসিয়ে বলে,
"চুপ! চুপ! একদম চুপ! কান্না করবি না।"
স্রোতের কান্না আরও বাড়ল। সে রাগে কাব্যের হাতে সজোরে কামড় বসিয়ে দিল। কাব্য হাত সরিয়ে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠে বলল,
"রাক্ষুসী কোথাকার! দেখি হাঁ কর তো, তোর দাঁতে ব্লেড লাগানো আছে কি না দেখতে হবে।"
স্রোত বড় বড় চোখ করে কাব্যের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ স্তব্ধ থেকে আবারও ডুকরে কেঁদে উঠল সে। কাব্য এগিয়ে এলে সে চিৎকার করে বলল,
"আ... আপনি আমার কাছে আসবেন না। আপনি একটা চরিত্রহীন লোক। আমাকে একা পেয়ে কী করেছেন ভাবলেই ঘেন্না হচ্ছে! ছিহ!"
এতক্ষণে কাব্যের পূর্ণ জ্ঞান ফিরল। মাথায় একটু চাপ দিতেই মনে পড়ল, গতরাতে তার বিয়ে হয়েছে। এই যে বিছানায় ওর সামনে বসে থাকা স্রোত—সে হলো কাব্যের বিবাহিত স্ত্রী!স্রোত কাব্যের নামে কবুল বলেছে। ওকে ছোঁয়ার সম্পূর্ণ অধিকার কাব্যের আছে। সে তো ভুল কিছু করেনি। হোঁশে থেকে হোক বা না থেকে, যেভাবেই হোক স্রোতকে স্পর্শ করার সব রকম অধিকার তার আছে। কিন্তু এ মেয়ে যে কী পরিমাণ বজ্জাত! এমন ন্যাকামি করছে যেন কাব্য তার অপরিচিত কেউ। কাব্য ধমক দিয়ে বলল,
"এইই, ন্যাকা কান্না কাঁদবি না। আমি ইচ্ছে করে কিছুই করিনি, আর যদি করেও থাকি তাতে সমস্যা কোথায়? তুই তো আমার বউ। আমরা ইনটিমেট হতেই পারি।"
বিয়ের কথা উঠতেই স্রোতের মনে পড়ে গেল গতরাতের ঘটনা। সে কোনোভাবেই এই বিয়ে করতে চায়নি। কাব্য তাকে জোর করে কবুল বলিয়েছে, ভয় দেখিয়েছে! স্রোত শুধু তার প্রিয় মানুষকে বাঁচাতে এই বিয়েতে রাজি হয়েছিল। তবে কাব্যকে সে কোনোদিন মন থেকে মেনে নেবে না। স্রোত তেজ দেখিয়ে বলল,
"চুপ করুন! আমি এই বিয়ে মানি না।"
"তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। আইন আর ধর্মমতে আমরা স্বামী-স্ত্রী। আমি ছাড়া অন্য কারো অধিকার নেই তোকে স্পর্শ করার। আমি যখন ইচ্ছে তোকে ছোঁব, বুঝতে পেরেছিস?"
ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেয় স্রোত। কাব্য মনে মনে হাসল। বিছানা ছেড়ে সে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল। শাওয়ারের নিচে দাঁড়াতেই শরীরের তীব্র জ্বালায় চোখ-মুখ কুঁচকে এল তার। পিঠে আর হাতে লালচে জখমের দাগ। রাক্ষুসীটা শরীরের সব শক্তি দিয়ে খামচি দিয়েছে বোধহয়! কাব্য ওয়াশরুমের দরজা সামান্য ফাঁক করে স্রোতকে বলল,
"তোকে আমি দেখে নেব!"
"আপনাকেও আমি দেখে নেব।"
স্রোতের পালটা জবাবে ঠোঁট কামড়ে হাসল কাব্য। সে হুট করে দরজাটা পুরোপুরি খুলে দিয়ে পরনের টাওয়ালটা আলগা করার ভঙ্গি করল। হালকা চোখ টিপে দুষ্টুমিভরা স্বরে বলল,
"দেখ... ভালো করে দেখে নে।"
স্রোত লজ্জায় আর অপমানে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল। দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল,
"ছিহ!"
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় ধাক্কা পড়ল। আওয়াজ পেয়েই স্রোত সচকিত হয়ে সেদিকে তাকাল। কাব্য দ্রুত ওয়াশরুমের দরজা আটকে দেয়। স্রোত তাড়াহুড়ো করে মেঝেতে পড়ে থাকা নিজের কামিজটা পরে নিল। নিজেকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করে সে ঘরের দরজা খুলে দিল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে দোয়েল। কাব্যের আদরের বোন সে। মেয়েটা স্রোতকে আপাদমস্তক খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করল। স্রোতের গলায় আর গালে নখের আঁচড়, চুলগুলো বড্ড এলোমেলো। দোয়েলের মনে হলো তার রাগী ভাইটা বোধহয় স্রোতের ওপর খুব অত্যাচার করেছে। সে দরদ মাখা গলায় বলল,
"ভাইয়া তোকে মে'রেছে, তাই না? চল, তোকে আর এখানে থাকতে হবে না।"
স্রোত নিজেকে সামলে নিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
"তেমন কিছুই না দোয়েল আপু, আসলে..."
"আসলে-নকলে বুঝি না স্রোত। তুই আমার সাথে আয়।এই রাক্ষসটার সাথে তোকে থাকতে হবে না, ও তোকে মেরেই ফেলবে।"
ওয়াশরুম থেকে বের হতেই দোয়েলের কথাগুলো কাব্যের কানে গেল। তার প্রচণ্ড রাগ হলো। দোয়েল তো আগে এমন ছিল না, সে কাব্যকে যথেষ্ট সম্মান করত। অথচ আজ এসব কী বলছে? সব দোষ এই স্রোতের! এ বাড়িতে এসেই সবার মাথা খাচ্ছে মেয়েটা। কাব্য রক্তচক্ষু নিয়ে দোয়েলের দিকে তাকাতেই সে ভয়ে সেখান থেকে দ্রুত সরে গেল। স্রোত অবাক হয়ে ভাবল, দোয়েল আপু হুট করে এভাবে পালিয়ে গেল কেন!
'কাব্য ভাই...[সূচনা পর্ব]
© আফরোজা আঁখি