28/09/2026
স্মরণে অভিনেতা সাইফুদ্দিন আহমেদ।
মৃত্যু - ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১০।
এ দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ-এর অভিনেতা সাইফুদ্দিন আহমেদ ২০১০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর, সোমবার পৃথিবী ছেড়ে
চলে গিয়েছিলেন । তাঁকে স্মরণ করে লিখেছিলেন চলচ্চিত্র নির্মাতা আমজাদ হোসেন।
সাইফুদ্দিন ছিলেন আমাদের চলচ্চিত্রের
প্রথম সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ-
এর অভিনেতা। আমি ঢাকায়
এসেছিলাম ১৯৬০ সালের প্রথম দিকে। এই
ঢাকা শহরে তখন আমার কেউ ছিল না। এমন
কোনো স্বজন ছিল না, যার কাছে গিয়ে খাঁ খাঁ
দুপুরে এক গ্লাস পানি চাইব। থাকার জায়গাও
ছিল না। নাজিরাবাজার মসজিদের কোয়াটারে
থাকতাম। পুরান ঢাকার মানুষের সাহায্যে তখন
কোনো রকমে বেঁচে ছিলাম এই ঢাকার শহরে।
আস্তে আস্তে মঞ্চনাটকে সুযোগ পেলাম। তার
পর থেকেই অসংখ্য নাটক করেছি। এমনকি
বছরে একবার জেলখানার কয়েদিদের জন্য
নাটক পরিচালনা করতাম। মঞ্চনাটক করতে
এসেই সাইফুদ্দিনের সঙ্গে আমার পরিচয়। তবে
কখন, কীভাবে, কোন নাটকে কাজ করতে
গিয়ে পরিচয়, এখন আর তা মনে নেই। শুধু
এটুকু মনে আছে, পরিচয়ের দু-এক দিনের
মধ্যেই তাঁর খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে যাই আমরা।
আমার চেয়ে তাঁর বয়স অনেক বেশি ছিল। মুখ
ও মুখোশ-এর অভিনেতা বলে শ্রদ্ধাও করতাম
তাঁকে। তার পরও দু-চার দিনের মধ্যেই
একজন আরেকজনকে 'তুই তুই' করে সম্বোধন
শুরু করেছিলাম।
সাইফুদ্দিন, তুই তো নেই। আমাকে ফেলে
রেখেই চলে গেলি? আমি কি মরণঘাটের মাঝি?
জহির রায়হান থেকে শুরু করে নায়ক বুলবুল
আহমেদ, এমনকি শেষ পর্যন্ত তুইও আমাকে
ঘাটে রেখেই নিরুদ্দেশ চলে গেলি পরপারের
নৌকোয়? আমি আর কত চোখের জলে
সবাইকে বিদায় দেব? আমারও তো রক্ত-
মাংসের হৃদয়, পাথর তো নয়, আমি আর কত
সহ্য করব। আমি আর কতকাল একা একা এই
মরণঘাটে দাঁড়িয়ে থাকব।
সাইফুদ্দিন আমার অনেক ছবিতে কাজ করেছে।
তার মধ্যে সুন্দরী ছবিতে সে যে অভিনয়
করেছিল, বাংলাদেশের জনগণ সাইফুদ্দিনের
সেই অভিনয় কোনো দিন ভুলতে পারবে না।
এই সুন্দরী ছবিতে অভিনয়ের জন্য সে
চরিত্রাভিনেতা হিসেবে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেয়েছে।
সাইফুদ্দিনের খুব অভিমানী ছিল। আমার
কোনো ছবি কিংবা নাটকে যদি সে না থাকত,
তাহলে সে আমার সঙ্গে কথা বলত না। তার
সেই অভিমান আমাকেই ভাঙতে হতো। সে
অসংখ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছে। অসংখ্য
নাটক করেছে টেলিভিশন ও মঞ্চে। আমার
ঈদের নাটক দুর্নীতিবাজ ও জব্বর আলীতে
একটি বিশেষ চরিত্রে অভিনয় করছিল
সাইফুদ্দিন। ওর চরিত্রটির নাম ছিল ব্রিটিশ
আলী। ১৯৭৪ সালের আগে বিটিভিতে ঈদে
কোনো নাটক প্রচারিত হতো না। প্রযোজক
মুস্তাফিজুর রহমান ও জি এম মুস্তফা মনোয়ার
১৯৭৪ সালেই আমাকে প্রস্তাব দেন, ঈদের জন্য
সাইফুদ্দিন আহমেদ
সুস্থ বিনোদন ও হাসির নাটক করতে হবে
একটি। গল্পটা বেশ বড়। এই শোকাচ্ছন্ন হৃদয়ে
সেই গল্পটা পরে কখনো বলা যাবে।
সাইফুদ্দিনকে সঙ্গে নিয়েই শুরু করলাম সেই
ঈদের নাটক। নাটকটি সেই সময় সুপারহিট।
সেই থেকেই টিভি পর্দায় শুরু হয় ঈদের
নাটক। ১৯৭৪ সাল থেকে এই জব্বর আলীর
জনপ্রিয়তা কমেনি। তিন প্রজন্ম ধরে দর্শক এই
নাটক এখনো দেখছে। সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার
হলো, এই নাটকের একটি মূল চরিত্র জব্বর
আলীর মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করতেন
আয়শা আখতার। তিনি মারা গেছেন অনেক
আগেই। জবা, কুসুম, রোকন, দুলালের মায়ের
ভূমিকায় অভিনয় করতেন জাহানারা আহমেদ।
তিনিও দীর্ঘদিন ধরে শয্যাশায়ী। আর
সাইফুদ্দিন, সেও অসুস্থতার কারণে প্রায় আট-
দশ বছর ধরে কাজ করতে পারছিল না। প্রায় আট বছর আগে অসুস্থ অবস্থায়ই আমি ওকে
জোর করে ধরে নিয়ে আসি। তখন সে কানে
শোনে না। চোখেও কম দেখে। গলার স্বরও
ভেঙে গেছে। তবু আমি বলেছিলাম, তোকে
কিছু করতে হবে না। তুই শুধু বিনা সংলাপে
চলাফেরা করবি। এই নাটকে তোর জনপ্রিয়তা
এত, দর্শক তোকে যেকোনো অবস্থায়ই দেখতে
চায়। অসুস্থ অবস্থায়ই অভিনয় করছিল সে। শুধু
জব্বর আলীকে কয়েকবার 'জেঠা' বলে
ডেকেছে। শুধু এই ডাক শুনেই দর্শক হেসে
উঠেছিল। আমার নাটকে এটাই তার শেষ
অভিনয়।
সাইফুদ্দিন নেই। ভাবি আছেন। চোখের জলে
ভাবিকে বলছি, 'ভাবি, আপনি জানেন, সে
আমার কত বড় বন্ধু ছিল। আপনাদের
পরিবারের অভিমান হলো, অসুস্থ অবস্থায় কেউ
তাকে দেখতে যায়নি। হ্যাঁ ভাবি, আমিও কোনো
দিন যাইনি। এর জন্য আপনার কাছে ক্ষমা
চাইছি। ফরিদ আলী, আবদুল আজিজ ওরা
গিয়েছিল কি না আমি জানি না। ওরাও
সাইফুদ্দিনের অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিল। আসল কথা কি
জানেন ভাবি, ঢাকা শহর এখন অনেক বড়।
যানজট। ইচ্ছা থাকলেও কোথাও যাওয়া যায়
না। তাই জানি, আমি যদি কখনো অসুস্থ হই,
তবে কেউ আমাকেও দেখতে যাবে না।'
সাইফুদ্দিনের সঙ্গে আমার হাজারো স্মৃতি
জ্বলজ্বল করছে হৃদয়জুড়ে, যা আমি কোনো দিন
ভুলতে পারব না।
সুন্দরী ছবির সেই ওড়িয়া ভাষার কথাগুলো মনে
পড়ছে, যা এ দেশের সিনেমা দর্শকদের মনে
আছে।
এক পাওয়া ছাতু/আধা পাওয়া গুড়/বিন্দিয়া কি
রূপ হামার/পরান চুর চর/দেখ চলি যা, দেখ
চলি যা/বাইয়ারে বাহবা, বাইয়ারে বাহবা
সাইফুদ্দিন, তোর উপমা কী দেব?
পশ্চিমবঙ্গের অভিনেতা তুলসী লাহিড়ীর মৃত্যুতে
যেমন অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তোর বেলায়ও
তা-ই হলো বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের।
তোর বাড়িঘরের সবাই কাঁদছে, কিন্তু আমি যে
কাঁদছি, সেই কান্না কেউ তো দেখতে পাচ্ছে
না। বিদায় বন্ধু...
©