22/06/2026
"আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিযিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।"
— (সূরা আত-তালাক ৬৫:২-৩)
জানুয়ারির ২৪ তারিখে বিয়ের প্রস্তাব এলো। কোথা থেকে যেন বিষয়টি দ্রুতই পরিবার পর্যন্ত পৌঁছে গেল। পরিবার ছেলেকে দেখতে চাইল। ছেলেও যথারীতি এলো। ফল-মিষ্টি খাওয়া হলো, পরিবারের সবার সঙ্গে গল্প-আড্ডা হলো।
ছেলেটিকে দেখে পরিবারের সবারই ভালো লেগেছিল। তাদের মুখে বারবার শুনছিলাম, "মাশাআল্লাহ, ছেলে তো খুব ভালো।"
কিন্তু আমি তাড়াহুড়ো করতে চাইনি। ভাবলাম, একটু সময় নিয়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাই। তাঁর ইচ্ছা কী, সেটাই জানতে চাই। তাই কিছু সময় নিলাম, নামাজে দাঁড়ালাম এবং দোয়া করলাম।
পরের দিন ছেলে জানালো, তারা প্রাথমিকভাবে রাজি। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সে কিছু খোঁজখবর নিতে চায়।
আমি বিষয়টি পরিবারকে জানালাম। কিন্তু আমার পরিবার ছেলেটির বাড়িতে গিয়ে একবারও খোঁজখবর নিল না। যেন আমাকে অজানা এক স্রোতে ভাসিয়ে দিল।
অবশেষে আমার বিয়ে হলো একজন জেনারেল লাইনে পড়াশোনা করা ছেলের সঙ্গে। বিয়ের আগে শুনেছিলাম, সে নামাজি, নিয়মিত নামাজ পড়ে। আমাকে দেখতে এসে সে বলেছিল,
"পর্দা করতে আপনার কোনো সমস্যা হলে, আমার পক্ষ থেকে কখনো বাধা আসবে না।"
আরও বলেছিল,
"বিয়ের জন্য আপনার পরিবারের কাছ থেকে আমি এক টাকাও নেব না। আপনার বাবাকে একটি টাকাও খরচ করতে দেব না।"
আলহামদুলিল্লাহ, অন্তত এই কথাটি সে রেখেছিল। কোনো যৌতুক ছাড়াই সে আমাকে বিয়ে করেছিল।
কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়।
একদিন সে বলল, এখনই আমাকে তাদের বাড়িতে নেবে না, আরও কিছুদিন পর নিয়ে যাবে। আমি বিশ্বাস করলাম। কারণ বিয়ের আগেই সে বলেছিল, সে এখনও ছাত্র। পড়াশোনা শেষ করবে, নিজের অবস্থান গড়বে, তারপর আমাকে স্থায়ীভাবে তুলে নেবে।
আমি অপেক্ষা করলাম।
দিন গেল, মাস গেল, সময় ফুরিয়ে গেল।
অবশেষে একদিন প্রথমবারের মতো তার বাড়িতে গেলাম। তার মাকে "আম্মু" বলে ডাকলাম, তার বাবাকে "আব্বু" বলে ডাকলাম। মনে মনে ভেবে নিলাম, এটাই আমার দ্বিতীয় পরিবার। এরা আমার দ্বিতীয় মা-বাবা।
তার ভাবীদের আপন করে নিলাম। ভাবলাম, তারা শুধু ভাবী নন, আমার নিজের বোনের মতো।
কিছুদিন সেখানে কাটিয়ে ফিরে আসার পর এমন একটি কথা শুনলাম, যা আমাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিল।
শুনলাম, তার পরিবারের কেউ নাকি এই বিয়েতে রাজি ছিল না!
আমি হতবাক হয়ে গেলাম।
তাহলে কেন বলা হয়েছিল যে পরিবার রাজি? কেন আমার বাবাকে জানানো হয়েছিল যে তাদের সম্মতি আছে? কেন তাদের পক্ষ থেকে মানুষ এসে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করল?
পরে জানতে পারলাম, ছেলেটি নাকি নিজের সিদ্ধান্তেই আমাকে বিয়ে করেছে। সে পরিবারকে জানিয়েছিল যে সে আমাকে বিয়ে করবেই। এরপর পরিবারও নাকি বলেছিল, "ঠিক আছে, তাহলে করো।"
বিয়ের পর তাদের অনেক আত্মীয়-স্বজন আমাকে দেখতে এলেন। মামী শাশুড়ি, খালা শাশুড়ি, দাদি শাশুড়ি—অনেকে আমার পাশে বসে গল্প করলেন।
হঠাৎ একজন বললেন,
"রূপকের সঙ্গে কি তোমার আগে প্রেম ছিল?"
আমি থমকে গেলাম।
দৃঢ় কণ্ঠে বললাম,
"অসম্ভব। প্রেম নয়, এটি বিয়ে। আর এই বিয়েতে তার মা-বাবার সম্মতি ছিল বলেই তো আমি জানতাম।"
কিন্তু কিছুক্ষণ পর যা শুনলাম, তাতে যেন পায়ের নিচের মাটি সরে গেল।
আমার শাশুড়ি নিজেই বললেন,
"আমরা কেউ রাজি ছিলাম না। ছেলে নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করেছে।"
সেদিন বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠেছিল।
এরপর তার ভাবিরা আমাকে আলাদা করে ঘরে ডেকে নিয়ে বলল,
"আচ্ছা, রূপক কি তোমাকে দেখে বিয়ে করেছিল, আরশি?"
আমি বললাম,
"হ্যাঁ, দেখে-শুনেই বিয়ে করেছে।"
তারা মৃদু হেসে একে অপরের দিকে তাকালো।
সেই হাসির অর্থ আমি বুঝতে পারিনি, কিন্তু অনুভব করেছিলাম বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টের ভার।
চোখের কোণে পানি এসে গিয়েছিল।
আমি মুখ লুকিয়ে ফেলেছিলাম।
সেদিন আমার কান্না কেউ দেখেনি—
না আমার বিয়ে করা স্বামী,
না আমার বাবা-মা।
শুধু আল্লাহ দেখেছিলেন।
"নিশ্চয়ই আল্লাহ অন্তর সমূহের গোপন কথা জানেন।"
— (সূরা আল-মুলক ৬৭:১৩)
সেদিন ঘরে ফিরে আমি অনেক কেঁদেছিলাম।
জায়নামাজে সিজদায় পড়ে চিৎকার করে কেঁদেছিলাম। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার কেউ ছিল না। বুকের ভেতর জমে থাকা ভয়, কষ্ট আর অনিশ্চয়তা নিয়ে শুধু আল্লাহর কাছেই কথা বলেছিলাম।
আমি বলেছিলাম—
"হে আল্লাহ! আমি তো তাকে ভালোবেসে ফেলেছি। যদি সে আমার জীবন থেকে চলে যায়, আমি কীভাবে থাকব? যদি তার পরিবার তাকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে নেয়, তবে আমি কোথায় যাব?
হে আমার রব! তুমি তো সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান। তুমি শুধু 'কুন' বললেই সব হয়ে যায়। তুমি আমার জীবনটাকে ঠিক করে দাও। তুমি আমাকে পথ দেখাও। আমি ভেঙে পড়ছি, তুমি আমাকে সামলে নাও।"
দোয়া শেষ করে আমি ফিরে গেলাম বাবার বাড়িতে। আম্মু-আব্বুর কাছে কিছুই বললাম না। চোখের পানি লুকিয়ে রাখলাম। বুকের ভেতর ঝড় বয়ে যাচ্ছিল, অথচ মুখে হাসির অভিনয় করছিলাম।
বাস্তবে আমার রুহ যেন ছিঁড়ে যাচ্ছিল।
আমি বুঝতে পারছিলাম না, কোথায় যাব, কী করব, কার কাছে আমার কষ্টের কথা বলব।
তার ভাবিরা শুধু আমাকে অপমান করেনি, তারা আমার চেহারা, আমার গায়ের রঙ, আমার অস্তিত্ব—সবকিছুকে তুচ্ছ করার চেষ্টা করেছিল।
আমি নীরবে সব সহ্য করেছিলাম।
"নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি। নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি।"
কিছুদিন পর জানতে পারলাম, তার ভাবিরা আমার স্বামীর কাছে আমার সম্পর্কে এমন কিছু কথা বলেছে, যা আমার জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলতে শুরু করল।
আমি তখন বাবার বাড়িতে ছিলাম।
একদিন কোনো একটি বিষয় নিয়ে আমাদের কথা কাটাকাটি হলো। কথা বাড়তে বাড়তে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাল, যেখানে আমার স্বামী আমাকে হঠাৎ ব্লক করে দিল।
আমি হতবাক হয়ে গেলাম।
বারবার ফোন দিলাম।
ফোন বেজে গেল, কিন্তু সে ধরল না।
অনেকক্ষণ পর একবার ফোন ধরল।
কণ্ঠে ছিল অচেনা শীতলতা।
সে বলল,
— "ফোন দাও কেন?"
আমি কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম,
— "আমার সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখতে চাও না?"
সে এক মুহূর্তও দেরি না করে বলল,
— "না।"
শব্দটি যেন বজ্রপাত হয়ে আঘাত করল আমার হৃদয়ে।
আমি ফুপিয়ে কেঁদে উঠলাম।
কিন্তু আমার কান্নার শব্দ শেষ হওয়ার আগেই ফোনের লাইন কেটে গেল।
সেদিনও আমার কান্না শুধু একজনই দেখেছিলেন—
আমার রব।
"আর তোমরা নিরাশ হয়ো না এবং দুঃখ করো না। যদি তোমরা মুমিন হও, তবে তোমরাই বিজয়ী হবে।"
— (সূরা আলে ইমরান ৩:১৩৯)
চলবে...পরবর্তী পর্ব আসছে।
—যে গল্প কেউ জানতো না
—নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক
পাঠকদের উদ্দেশে: এই গল্প পড়ে অনুগ্রহ করে লেখিকার ব্যক্তিগত পরিচয় জানার চেষ্টা করবেন না। আমি শুধু তার মুখে শোনা ঘটনা গুলো গল্পের আকারে আপনাদের সামনে তুলে ধরেছি। এর বাইরে তার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না।এভাবে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ অধ্যায়ের মতো পড়তে সুন্দর লাগবে।