05/12/2025
পিলখানা বিদ্রোহ, সেনা অফিসার হ-ত্যা, ও "স্বাধীন" কমিশনের ফাইন্ডিং: একটা পরাধীন পর্যালোচনা।
______
ড. মাহমুদ হাসান
(এক)
পিলখানা হ-ত্যা-কান্ড বা বিডিআর বিদ্রোহ নিয়ে যেহেতু অনেক আলোচনা হয়েছে এবং হচ্ছে, স্পষ্টভাবে ভারত বিদ্বেষী ও আওয়ামী বিরোধী একজনকে স্বাধীন কমিশনের চেয়ারম্যান করে তাদের রিপোর্টের ফাইন্ডিংস প্রকাশ করেছে এবং স্বাভাবিকভাবেই ভারত ও আওয়ামীলীগের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে। যদিও একটা সদ্য গঠিত সরকার কোন কারণে এরকম একটা আত্মঘাতি কাজ করবে এবং এরকম জঘন্য কাজ করে সেই সরকারের কি লাভ হবে সেটা আমার মাথায় ঢুকে নাই কোনদিন।
একটা অডিও রেকর্ড অনেকদিন আগেই শুনেছিলাম এবং সেটা আবার শুনলাম। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ এর সকালে সেই ঘটনা শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৎকালীন বিডিআর প্রধান মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদকে কল দিয়ে তাদের অবস্থা জানতে চাইলে তিনি শেখ হাসিনাকে জানান যে পিলখানায় বিদ্রোহ হয়েছে এবং তার কাছে মনে হয়েছে এটা সরকারকে হেয় করার জন্য পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে। শাকিল জানান যে বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যরা প্রচুর অস্ত্র নিয়ে গোলাগুলি করছে। শেখ হাসিনার ক্যাজুয়াল্টি জানার প্রশ্নে তিনি জানান যে তখন পর্যন্ত কোন ক্যাজুয়াল্টি হয়নি এবং যেহেতু তাদের হাতে অস্ত্র নেই তাই তারা কোন জবাব দিতে পারছে না। শেখ হাসিনা সেইসময় জেনারেল শাকিলকে বলেন যে তিনি এবং তার অফিসাররা যেন যারা অস্ত্র লুট করে গুলি করছে তাদের যেন ছবি তুলে রাখে। এই ছবি তুলে রাখার কথা আরো একবার শেখ হাসিনা শাকিলকে বলেন। মেজর জেনারেল শাকিল শেখ হাসিনাকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বললে শেখ হাসিনা তখন বলেন র্যাব ও আর্মি রেডি আছে, হেলিকপ্টার পাঠানোর কথা ভাবছেন, কিন্তু এটা করে যেন ক্যাজুয়াল্টি ভয়ংকর দিকে না যায় সেটাও খেয়াল রাখার কথা বলা হয়।
(দুই)
আমি সেদিন সকালে বিডিআর গেটের সামনে দিয়েই রিকশা করে আমার ধানমন্ডির অফিসে যাই। তখনো বিদ্রোহ শুরু হয়নি। পিলখানা থেকে আমার অফিস এক কিলোমিটার দূরে ছিল এবং অফিস থেকেই প্রচন্ড গোলাগুলির শব্দ পাচ্ছিলাম, কিন্তু কোথায় এতো ভারী অস্ত্রের শব্দ হচ্ছে বুঝতে পারছিলাম না। তবে একটা গেস করছিলাম এটা পিলখানার দিক থেকে আসছে। কিছুক্ষণ পরেই জানতে পারলাম যে বিডিআর দরবার হলে বিদ্রোহ হয়েছে যেখানে বিডিআর সপ্তাহের অনুষ্ঠান হচ্ছিল।
ক্লাস থেকে বের হয়ে সকাল ১১ টার দিকে একটা রিকশা নিয়ে বিডিআর গেইটে গিয়ে দেখলাম কিছু মানুষ জড়ো হয়েছে। গেট বন্ধ। ভিতর থেকে প্রচুর গুলির শব্দ আসছে। গেইটে পাহারারত বিডিআর জওয়ানদের পা দেখা যাচ্ছে। ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা জড়ো হয়েছে, কিন্তু তারা তাদের সাথে কথা বলছে না। দূর থেকে ক্যামেরা তাক করে আছে সাংবাদিকরা। এর মধ্যেই দেখলাম কান্নাকাটি করতে করতে জিম্মিরত অফিসারদের স্বজনরা আসছেন।
সেখানে ঘন্টাখানেক থাকার পর আমি আবার অফিসে চলে যাই। এরপর কানাডা থেকে আমার বন্ধুর কাছ থেকে খবর পাই যে তার বড় ভাই, যিনি তখন লেফটেনেন্ট কর্নেল ছিলেন সেইসময় এবং বিডিআরের গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন, দরবার হলে আটকা পড়েছেন। আমার বন্ধু আরো জানালো যে তার মেজভাই গেটের সামনে আছে। আমি ক্লাস সাসপেন্ড করে দ্রুত বিডিআর গেইটে গেলাম আবার। গিয়ে দেখলাম অসংখ্য মানুষ ভীড় করেছে ইতোমধ্যে। এদের বেশিরভাগই ভিতরে জিম্মি হওয়া আর্মি অফিসারদের স্বজন। অদূরে জিগাতলা বাস্ট্যান্ডের কাছে পুলিশ আছে অনেক। শুনলাম আর্মি অপারেশন চালাবে কি চালাবে না সেটা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। অপারেশন চালালে বিদ্রোহীরা জিম্মি সবাইকে মেরে ফেলতে পারে। আশেপাশে প্রচুর আবাসিক ভবন, সেখানেও প্রভাব পড়তে পারে। সেইসব বাড়ি থেকে লোকজনকে আগে সরাতে হবে। একটা বড় সিদ্ধান্ত। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে হেলিকপ্টার থেকে লিফলেট ছেড়ে বিডিআর সদস্যদের আলোচনায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
আমার বন্ধুর মেজভাইয়ের সাথে দেখা হলো। আমার আরেক বন্ধুও আসলো। আমরা প্রচন্ড উদ্ভিগ্নভাবে অপেক্ষা করছি। তখন আরো কয়েকটা টিভি চ্যানেল এসেছে। বিডিআর জওয়ানদের মধ্যে একজন মুখপাত্র মিডিয়ার সাথে কথা বলছে। তাকে বারবার জিজ্ঞেস করা হচ্ছিল তাদের অফিসাররা বেঁচে আছে কীনা। আদতেই জিম্মি অফিসারদের মেরে ফেলা হয়েছে নাকি বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে, বা মারলে কতজনকে মেরে ফেলা হয়েছে, এসব প্রশ্নের উত্তরে সে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছিল। ভিতরে তখন ফাঁকা গুলি চলছিল থেমে থেমে।
মেজভাই আহাজারি করছিলেন। কান্নাকাটি করছিলেন। তাকে শান্তনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। বারবার বলছিলাম যে ভাইয়া তো কোন অপরাধ করেনি, উনাকে কেন মারবে! মেজ ভাইয়া তখন বলছিলেন যে বড় ভাইয়া যেহেতু গোয়েন্দা প্রধান ছিলেন, তার কাছে রিপোর্ট ছিল যে বিডিআর জওয়ানরা নানা ঘটনায় প্রচন্ড অসন্তুষ্ট এবং তারা যে কোন বিদ্রোহ করতে পারে। এই গোয়েন্দা তথ্য বিডিআরের ডিজি শাকিলকেও তিনি জানিয়েছিলেন। মেজ ভাইয়া আরো বলছিলেন যে ডিজি শাকিল যদি বড় ভাইয়ার রিপোর্টকে ভালমত গুরুত্ব দিতেন তাহলে আজ এরকম দেখতে হতো না।
এক পর্যায়ে গেটে দেখলাম মাস্ক পড়া এবং অস্ত্র হাতে কিছু বিডিআর সদস্য মিডিয়াতে কথা বলছে। তারা তখন বলছিল যে তারা আর্মির অফিসারদের জিম্মি করে তাদের দাবী আদায় করতে চায়। সরকার সেসব দাবী পূরণ করলে তারা তাদেরকে মুক্তি দিবে। সরকারের কাছে তারা বার্তা দিতে চায় যে যদি সরকার আর্মি অফিসারদের বাঁচাতে চায় তাহলে তাদের সমস্ত দাবী মানতে হবে। সেই দাবীর মধ্যে প্রধান দাবী ছিল বিডিআরকে আর্মির প্রভাবমুক্ত বাহিনীতে পরিনত করতে হবে এবং এই বাহিনী পরিচালনার দায়িত্বও এই বাহিনীর সদস্যদেরকে দিতে হবে। আর্মির অফিসারদেরকে ধরে এনে বিডিআরের প্রধান থেকে শুরু করে সকল কমান্ডিং পজিশনে নিয়োগ বন্ধ করতে হবে। এছাড়া মিলিটারি ব্যাকড মঈনউদ্দিন ও ফখরুদ্দিন সরকারের সময় বিডিআর কর্তৃক পরিচালিত ডালভাত কর্মসূচীতে বিডিআর জওয়ানদের আর্থিক সুবিধা থেকে জেনারেল শাকিল বঞ্চিত করেছে, সেই ক্ষতিপূরণ কড়ায় গন্ডায় মিটিয়ে দিতে হবে। এবং বিডিআরের উপর শোষণ বন্ধ করতে হবে।
কিছুক্ষণ পর দেখলাম সরকারের পক্ষে জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মির্জা আজমের নেতৃত্বে একটি ছোট দল বিডিআর সদস্যদের সাথে কথা বলতে গেলে তারা ফিরিয়ে দেয়। শুনলাম তারা সকালে আরেকবার কথা বলার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। আস্তে আস্তে রিউমার আসতে থাকে যে জিম্মি সেনা অফিসারদের অনেককেই মেরে ফেলা হয়েছে। তার মধ্যে জেনারেল শাকিলের কথা প্রথম শোনা গেল। সন্ধ্যায় শুনতে পেলাম যে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জায়গায় বিডিআর সদস্যরা বিদ্রোহ করেছে, ক্যাম্প দখলে নিয়েছে এবং সেনা অফিসারদের জিম্মি করেছে। শেখ হাসিনা রাত আটটার দিকে এক বক্তব্যে বিডিআর জওয়ানদের আত্মসমর্পনের আহবান জানান এবং যারা হ-ত্যা ও খুনের সাথে জড়িত নয় তাদের সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দেন। বেশ রাত পর্যন্ত সেখানে উদ্ভিগ্ন ও উৎকন্ঠায় কাটিয়ে আমার কাটাবনের বাসায় ফিরলাম। আমার বাসা থেকেও মাঝেমাঝেই গুলির শব্দ পাচ্ছিলাম। সেই রাত্রে আমি ঘুমাই নাই।
পরের দিন সকালে সেনাবাহিনীকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকতে বলা হয় কিন্তু তখনো প্রবেশের অনুমতি পায় না। দুপুরের পর থেকে গেট এলাকার কিছু বিদ্রোহী অস্ত্র জমা দিতে শুরু করে। এক পর্যায়ে ভিতর থেকে বার্তা আসে, “আমরা আলোচনায় রাজি, বাঁচতে চাই।” কিন্তু তারা জিম্মি অফিসারদের মেরে ফেলেছে কিনা, মারলে কতজনকে মেরেছে, পরিবারের সদস্যরা সুস্থ্য আছেন কীনা তা জানায়নি। আরো জওয়ান অস্ত্র ফেলতে শুরু করে যা মিডিয়াতে দেখাতে বলে। সরকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ও জাহাঙ্গীর কবির নানকের নেতৃত্বে একটা প্রতিনিধি দল গঠন করে বিদ্রোহীদের একটা দলের সাথে আলোচনার জন্য। পরে রাত সাড়ে এগারোটার দিকে সাহারা খাতুনের নেতৃত্বে একটা প্রতিনিধিদল বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের সাথে আলোচনায় বসেন এবং জওয়ানরা জানায় যে তাদের সবাইকে ক্ষমা ঘোষণা করলে তারা এই বিদ্রোহ থামাবে, বন্দী/জিম্মিদের মুক্তি দিবে এবং অস্ত্র জমা দিবে। এই আলোচনার অংশ হিসেবে শেখ হাসিনা বিদ্রোহী নেতাদেরকে সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা করেছিলেন এবং তারপর বিডিআর জওয়ানরা প্রায় ৪০ ঘন্টা পর তাদের বিদ্রোহ বন্ধ করে।
(তিন)
এরপর বিডিআর গেইট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারের জন্য গেইট খুলে দিলে ভিতর থেকে ভয়ংকর রোমহর্ষক ঘটনার খবর আসতে থাকে। আমরা একে একে নির্মম সব হ-ত্যাকান্ডের ঘটনা শুনতে থাকলাম। মুক্তিযুদ্ধের পর এতো সংখ্যক টপ লেভেলের আর্মি অফিসার মারা যায়নি বাংলাদেশে। এটা ছিল জাতির জন্য প্রচন্ড শোকের দিন, কালো দিন। সারা বাংলাদেশের মানুষ কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। আস্তে আস্তে ঘয়নার জট খুলতে শুরু করে। কিভাবে কি হয়েছিল তা আমরা মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারলাম।
সকাল পৌনে ৯ টায় দরবার হলে বিডিআর সপ্তাহের অনুষ্ঠান শুরু হয় এবং ৯ টার দিকে অনুষ্ঠান মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ বক্তব্য দিচ্ছিলেন এবং হঠাৎ কিছু জওয়ান দারবার হলে ঢুকে চিৎকার করে বলতে থাকে, “ডিজিকে হত্যা করো!”, “আমাদের দাবি মানো!” একজন জওয়ান অস্ত্র হাতে দৌড়ে শাকিলের কাছে আসলেও সে শাকিলকে গুলি করার আগেই অজ্ঞ্যান হয়ে পড়েন। পিছনে কিছু জওয়ান ফাঁকা গুলি করে এবং দরবার হলের সব দরজা বন্ধ করে দিয়ে জিম্মি করে। দরবারের নিয়ম হলো এইসময় কারো কাছে অস্ত্র থাকা যাবে না। দর্শক সারির প্রথম কয়েক লাইন ছিল সিনিয়র অফিসারদের জন্য, পরের সারি জুনিয়র আর্মি অফিসারদের এবং শেষের সারি ছিল বিডিআর জওয়ানদের জন্য। গোলাগুলি দেখে মঞ্চের কাছে থাকা সিনিয়র অফিসার কয়েকজন ডিজি শাকিলকে নিয়ে মঞ্চের পিছনে লুকায়। বাইরে তখন বেশ কিছু বিডিআর জওয়ান হলের দিকে গুলি করতে থাকে কিন্তু কাচ ভেঙে গুলি ঢুকে না। প্রত্যক্ষদর্শী এক সিনিয়র আর্মি অফিসার বলছিলেন যে সেই রাইফেল গুলোতে সম্ভবত রাবার বুলেট ছিল। সম্ভবত তখনই শেখ হাসিনা ডিজি শাকিলকে কল দেন এবং কথা বলার সময় গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। শাকিল শেখ হাসিনাকে বলছিলেন যে তাদের কারো হাতে অস্ত্র নেই বলে তারা কোন জবাব দিতে পারছেন না।
এরপর জওয়ানরা বিডিআরের অস্ত্রখানা দখলে নিয়ে ভারী অস্ত্র বের করে আনে। সেগুলো দিয়েই সকালেই শাকিল আহমেদ ও উপস্থিত সিনিয়র আর্মি অফিসারদের ওপর সরাসরি লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। দারবার হলে ঘটে প্রথম বড় ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটে। সকাল দশটার আগেই বৃহত্তর পিলখানা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে গোলাগুলি। বিডিআর সদস্যরা বিভিন্ন গেট দখলে নেয়। ঘটনা শুরুর কিছুক্ষণ পরেই শেখ হাসিনাকে পরিস্থিতি ব্রিফ করা হয়। সরকার সেনা অভিযান না করে শান্তিপূর্ণ সমাধানের নির্দেশ দেয়। কিন্তু সেনাবাহিনীর জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে ক্ষোভ জন্মাতে থাকে সরকারের এরকম সিদ্ধান্তের কারণে। সকাল ১১ টার দিকে হেলিকপ্টার থেকে প্রধানমন্ত্রীর আলোচনার আহ্বান লিফলেট ছড়ানো হয়।দুপুরের দিক থেকে বিদ্রোহী জওয়ানরা আর্মি অফিসারদের বাড়ি লুটপাট ও পরিবারদের জিম্মি রাখা শুরু করে এবং বিকেলের দিকে পিলখানার ভিতরে বন্দী আর্মি অফিসারদের কিছুক্ষণের ব্যবধানে হত্যা করা হয়। পরের দিন ভোর সাতটা থেকে সকাল নয়টা পর্যন্ত সময়ে পিলখানার ভেতর থেকে নিহতদের লাশ মাটিচাপা বা লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা চলে।
২৭ ফেব্রুয়ারি সকালে আমি আবার বিডিআর গেটে যাই এবং বন্ধুর মেজভাইয়ের সাথে দেখা হয় সেখানে। একে একে আর্মি অফিসারদের মৃতদেহ পাওয়ার খবর আসতে থাকে। মাটিচাপা থেকে, ড্রেইন থেকে, বাসা থেকে সবার লাশ উদ্ধার হতে থাকে। এর মধ্যে অনেকের পরিচয় জানা যায়নি কারণ তারা বেশ কিছু লাশ পুড়িয়ে দিয়েছে। আবার অনেককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। জানা গেল মেজর জেনারেল শাকিলের স্ত্রীকেও নিশংসভাবে হ-ত্যা করেছে। দূর্ভাগ্যজনকভাবে আমার বন্ধুর বড়ভাইয়ের কোন খোঁজ পাওয়া গেল না। বিকেলের দিকে হঠাৎ খবর এলো যে বেশ কিছু লাশ বুড়িগঙ্গা নদীতে পাওয়া গেছে এবং সেগুলো পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালে তোলা হচ্ছে। দ্রুত আমরা চলে গেলাম মিটফোর্ড হাসপাতালে। সেখানে শত শত মানুষের ভীড়। লাশ পচার দূর্গন্ধ সহ্য করে আমরা অপেক্ষা করতে থাকলাম আমার বন্ধুর বড় ভাইয়ের খবর পেতে। পুরো সন্ধ্যা পর্যন্ত যত মৃতদেহ আসলো আমার বন্ধুর বড় ভাইয়ের নাম না শুনে ভাঙ্গা মন নিয়ে বাসায় ফিরলাম। পরের অনেকদিন আমি স্বাভাবিক ছিলাম না। খেতে পারি নাই ঠিক মতো। বেশ কয়েকদিন পর জানতে পারলাম যে ডিএনএ টেস্ট করে বড় ভাইয়ের মৃতদেহ শনাক্ত করা গেছে।
(চার)
বর্তমান সরকারের অধীনে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিশন এই রিপোর্টের মাধ্যমে বর্তমান সময়ের একটা ইলিয়াসিও পপুলার ন্যারেটিভকেই ফাইন্ডিং হিসেবে দাঁড় করিয়েছে, কিন্তু এতে ভিক্টিমদের পরিবার ন্যায়বিচার পাবে কিনা আমার সন্দেহ। আমি পুরো রিপোর্ট পড়িনি কিন্তু আওয়ামীলীগ কিভাবে দল হিসেবে এতে জড়িত হলো সে সম্পর্কে ধারণা পাইনি। কিসের ভিত্তিতে ভারত এই হত্যাকান্ডে জড়িত সেটাও স্পষ্ট না। এটা যে প্রিডিটারমিন্ড রিপোর্ট সেটা এক নজর দেখলেই বুঝতে পারার কথা। জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমানকে যিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভারতবিরোধী মন্তব্য করে সমালোচিত হন।
তিনি ভারত-শাসিত কাশ্মীরের পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার পর গত ২৯ এপ্রিল এক ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘ভারত পাকিস্তান আক্রমণ করলে বাংলাদেশের উচিত হবে উত্তর-পূর্ব ভারতের সাত রাজ্য দখল করে নেওয়া। এ ব্যাপারে চীনের সঙ্গে যৌথ সামরিক ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন বলে মনে করি।’ তার এই কথা ভারতীয় মিডিয়া ফলাও করে প্রচার করে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার থেকে বলা হয় কমিশন প্রধানের এই মন্তব্য তার ব্যাক্তিগত। সরকারের উচিৎ ছিল তার এই মন্তব্যের কারণে তাকে কমিশনের প্রধান পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া। ভারত যদি জড়িতও থাকে তারা বলবে যে তার এই রিপোর্ট ভারত বিদ্বেষ মনোভাবের ফল ছাড়া আর কিছুই না। এর আগে গত বছর ২৩ ডিসেম্বর ফজলুর রহমানকে প্রধান করে সাত সদস্যের তদন্ত কমিশন গঠন করার দুই সপ্তাহের মধ্যে কোন তদন্ত ছাড়াই তিনি বলেন যে ২০০৯ সালের ওই সময়ে বিডিআরে কোনো বিদ্রোহ হয়নি; ওটা ছিল সেনা কর্মকর্তাদের ‘হত্যার একটি ষড়যন্ত্র’। তিনি আরো বলেন যে "আমাদের আর্মি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে ছিল আর দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা মিলে এই হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে গেছে"! তার সময়ে সময়ে এরকম মন্তব্য কোনভাবেই স্বাধীন ও নিরপেক্ষতার পরিচয় দেয় না।
কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশের পর শহীদ কর্নেল কুদরত ই খোদার ছেলে শাকিব রহমান ফেসবুকের এক পোস্টে পিলখানা হ-ত্যা-কান্ডের পর তার কঠিন জীবনের বর্ণনা দেওয়ার পাশাপাশি বলেন যে এই কমিশন যাদেরকে দোষী সাব্যস্ত করেছে তাদের প্রায় সবার নামে তারা অনেকদিন আগেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছে। যেহেতু শাকিব রহমান ও অন্যান্য ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচারের পাওয়ার আশায় মামলা করেছে, সেই সূত্র ধরেই মামলার প্রসিডিং চলতে পারতো। সেটা না করে "স্বাধীন" নামের বায়াসড কমিশনকে তদন্ত করতে দেওয়ার কোন যৌক্তিকতা দেখি না। এই তদন্ত কমিশন শাকিবদের সেই মামলায় যাদের নাম দেওয়া হয়েছে সেটাই কপি পেস্ট করেছে বলে প্রতীয়মান মনে করলে তাকে দোষ দেওয়া যাবে না।
(পাঁচ)
বর্তমানে চলছে আওয়ামীলীগকে দোষ দেওয়ার উৎকৃষ্ট সময়। এই কমিশন যেমন আওয়ামীলীগকে দল হিসেবে পিলখানা হ-ত্যা-কান্ডের জন্য দোষী করছে, তেমনি রেজা কিবরিয়াও আওয়ামীলীগকে তার বাবার হ-ত্যার জন্য দোষ দিচ্ছে। সামনে হয়তো দেখা যাবে অন্যান্য অনেক হ-ত্যা-কান্ডের জন্য আওয়ামীলীগকে দোষী দাবী করবে। কারণ, এখনই সেরা সময় এভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে আওয়ামীলীগকে দোষী বানিয়ে নিষিদ্ধ করার। আর একদল উগ্রবাদীদের ভারতের বিরুদ্ধে উষ্কে দিচ্ছে। কমিশন প্রধান ফজলুর রহমানের মতো আরেকজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্যকে বলতে শুনলাম যে বাংলাদেশের মানুষের একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ সেভেন সিস্টার্সকে স্বাধীনতা এনে দেওয়া। এসব কথা বলা মানে দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলা।
পিলখানার বিদ্রোহের ঘটনার পর আওয়ামীলীগ সরকার বর্তমান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জাহাঙ্গীর আলমকে প্রধান করে একটা স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে মামলায় বিচার শুরু করে ২০১৩ সালের ৫ই নভেম্বর মামলা সম্পন্ন হয়। এই মামলায় ৮৫০ জন আসামীর বিচার করা হয় এবং এতে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হয় ১৫২ জন, যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয় ১৬০ জন ও বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড হয় ২৫৬ জনের। বাকি প্রায় ২৩৫ জনকে খালাস দেওয়া হয়। সেইসব মামলায় যারা আসামী পক্ষের আইনজীবি ছিলেন তাদের বিষয়ে খতিয়ে দেখতে পারেন। আরো কিছু পেয়ে যেতে লারেন। বর্তমান কমিশনের রিপোর্ট অনুসারে জাহাঙ্গীরের রিপোর্ট মিথ্যা। তাহলে মিথ্যা রিপোর্ট দেওয়ার জন্য জাহাঙ্গীরকে কেন দোষী সাব্যস্ত করা হবে না, এমন প্রশ্ন আসতে বাধ্য। আবার বর্তমান সরকারের পুলিশ প্রধান বাহারুল ইসলামকেও এই ঘটনায় জড়িত একজন হিসেবে দেখিয়েছে বর্তমানের কমিশন। আইজিপি বাহারুলের ব্যাপারে সরকার কি সিদ্ধান্ত নেয় সেটাও দেখার বিষয়।
এই বছর ২৫শে ফেব্রুয়ারিতে বর্তমান সেনাপ্রধান ওয়াকারুজ্জামান বলেছিলেন যে এটা একটা মীমাংসিত বিষয়, তাই এটা নিয়ে যেন আর কথা না বাড়ানো হয়। তিনি এও বলেছেন যে পিলখানার ঘটনায় কোন ষড়যন্ত্র ছিল না। তার এই ভাষ্যে অনেক মানুষ নাখোশ হলেও তা নিয়ে উউচ্চবাচ্য করেনি তেমন কেউ। গত বছর ৫ই আগস্টের পর বিভিন্ন মেয়াদে সব মিলিয়ে মৃত্যুদন্ড ও যাবজীবন কারাদন্ডে শাস্তিপ্রাপ্ত ও বিভিন্ন মেয়াদে দন্ডপ্রাপ্ত ২৯৩ জন আসামীকে (বিডিআর সদস্য) আইনী প্রক্রিয়া ঠিক মতো না মেনে ছেড়ে দেয় বর্তমান সরকার। সাধারণত দন্ডপ্রাপ্ত আসামীকে রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমার মাধ্যমে মুক্তি হলো একমাত্র পদ্ধতি। এক্ষেত্রে শয়ে শয়ে এভাবে দন্ডপ্রাপ্ত আসামীকে সরকার ছেড়ে দিয়ে সংবিধান লংঘন করেছে।
শেষ কথা:
আমেরিকা থেকে ইলিয়াস হোসেন ও কনক সারোয়ার, ফ্রান্স থেকে পিনাকি ভট্টাচার্য ও বিদেশে বসবাসরত অন্য ইউটিউবারদের চাপে সরকার এইসব দন্ডপ্রাপ্ত আসামীদের ছেড়ে দেওয়ার পর ভিক্টিমদের পরিবার প্রচন্ড ক্ষেপে যায় এবং কষ্ট পায়। যেহেতু তারা ইউনুস সরকারের উপর ও স্বাধীন কমিশনের উপর ভরসা রেখেছে, তাদেরকে এইসব দন্ডপ্রাপ্তদের খালাসের সিদ্ধান্তও হজম করতে হয়েছে। এখন নতুন করে কমিশনের রিপোর্টে যে ফাইন্ডিং এসেছে, এতে শহীদ সেনা অফিসারদের আত্মা শান্তি পাবে কীনা জানিনা। পলিটিক্যালি ও মিডিয়া-মব মোটিভেটেড ফাইন্ডিং হয়েছে বলেই আমার ধারণা।
_____
ড. মাহমুদ হাসান
আইনের অধ্যাপক ও গবেষক
ক্যানাডা
ডিসেম্বর ৩, ২০২৫!