03/05/2025
শায়খ সুলতান যওক নদভী রহ.: টুকরো টুকরো অম্লান স্মৃতি (২)
একবার মাদরাসায় এক ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছিল। পানির তোড়ে রান্নাঘর পর্যন্ত ডুবে গিয়েছিল। ফলে সেদিন দুপুরবেলা কোনো খাবার রান্না করা সম্ভব হয়নি। শত শত ছাত্র-শিক্ষক অভুক্ত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছিলেন।
ঠিক সেই সময় হুজুর নিজ ঘরে দুপুরের খাবার খেতে বসেছিলেন। দস্তরখানে বসে খাবার শুরু করতে যাবেন, এমন সময় মাদরাসা থেকে একটি ফোন কল এল। অপর প্রান্ত থেকে জানানো হলো—রান্নাঘর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ছাত্র-শিক্ষকদের জন্য আজ কোনো খাবার প্রস্তুত হয়নি।
খবরটি শুনে হুজুর স্তব্ধ হয়ে গেলেন। বললেন,
“আমার সন্তানেরা অভুক্ত থাকবে, আর আমি শান্তিতে খাবার খাব—এটা কখনোই হতে পারে না।” এই বলে তিনি দস্তরখান ছেড়ে উঠে গেলেন।
মসজিদে যখন হুজুর এই ঘটনা বর্ণনা করছিলেন, তাঁর কণ্ঠ ভারী হয়ে এল। চোখে অশ্রুজল জমে উঠল। উপস্থিত সবাই যেন হৃদয়ের গভীর থেকে সেই বেদনার ঢেউ অনুভব করল। সবার চোখেও পানি জমে এসেছিল। মনে হচ্ছিল, এক গভীর অনুভূতি যেন হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে উৎসারিত হয়ে প্রতিটি হৃদয়কে স্পর্শ করছে।
এটি ছিল এক মহান শিক্ষকের দায়িত্ববোধ, ভালোবাসা ও মানবিকতার চিরন্তন দৃষ্টান্ত। শিক্ষক কেবল পাঠদানে সীমাবদ্ধ নন—তাঁর আচরণ, অনুভব এবং ভালোবাসা হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীদের জন্য জীবন্ত আদর্শ। হুজুরের সেই কথায় যেন উচ্চারিত হয়েছিল জীবনের এক অমোঘ সত্য—
শিক্ষার্থীরা তাঁর সন্তান, আর সন্তানের অভুক্ত অবস্থায় পিতার আহার—এ এক অকল্পনীয় অন্যায়।
হুজুরের সেই নিঃশব্দ পিতৃত্ব আমাদের শেখায় ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ। তাঁর সেই আবেগপূর্ণ উচ্চারণ—“আমার সন্তানেরা অভুক্ত থাকবে, আর আমি শান্তিতে খাবার খাব?”—আজও যেন বাতাসে ভেসে বেড়ায়, আমাদের চেতনায় বুনে দেয় ভালোবাসা, মমতা আর মানবতার এক গভীর অনুভূতি।
—চলবে...