24/06/2026
কিছু কিছু গল্প, কথা থাকে, যা যতক্ষণ বন্ধুস্বজনদের সাথে শেয়ার করা না যায় ততক্ষণ পেটের মধ্যে গুরগুর করতে থাকে। না বলা পর্যন্ত শান্তি মেলে না। আজ তেমনই একটা গল্প বলবো। আশ্বস্ত করছি, নাটকের শো দেখতে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে কোনো গল্প ফাঁদবো না। আমার পোস্টগুলো সচরাচর সেরকমই হয় কিনা। সেকারণে আমার বন্ধুস্বজন সেসব পোস্ট না পড়েই তাড়াতাড়ি কেটে পড়েন। কারণ পড়লে যদি নাটক দেখতে আসার কোনো রকম দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। বন্ধুস্বজনদের নিশ্চয়তা দিচ্ছি সেরকম কিছু ঘটবে না আজ।
এ লেখাটা একটু বড় হবে, যাদের হাতে সময় আছে, নাটকের পিছনের গল্প শোনার ধৈর্য আছে, তারা পড়তে পারেন। বাকিরা এড়িয়ে যেতে পারেন।
এই যে নিচে একটা ছবি পোস্ট করছি, এটি আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে নাটকের একটি ছবি। এখানে যে দুজনকে দেখছেন তারা এ নাটকে অনুস্বর ও অনুনাসিক চরিত্রে অভিনয় করতেন এক সময়। বামপাশের জনের নাম মিশাল সমাপ্ত। আর ডানপাশের জনের নাম হাসানুজ্জামান খান। আজ গল্পটা মূলত মিশাল সমাপ্তকে নিয়ে।
আজ থেকে প্রায় সাড়ে আট বছর আগে মিশাল ও হাসান থিয়েটার ফ্যাক্টরির প্রথম কর্মশালার মাধ্যমে দলের সাথে যুক্ত হয়। মিশাল সমাপ্ত নামটা আমাকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। মিশাল খুব চুপচাপ ধরনের ছেলে। কথা বলে কম কিন্তু ও মাঝে মাঝে এমন সব কথা বলতো যে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যেতো। ওর রসবোধ আমাদেরকে মুখিয়ে রাখতো ও কখন কী বলে সেটা যেন মিস না হয়ে যায়। মিশাল সমাপ্ত যখন থিয়েটার ফ্যাক্টরির সাথে যুক্ত হয়, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের প্রথম বা দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ে কালচারাল অ্যাক্টিভিটির সাথে সম্পৃক্ত। দারুণ প্যান্টোমাইম করতো।
এত মজার একটা ছেলে কিন্তু ওর সাথে কথা বলেই মাঝে মাঝে হতাশ হয়ে পড়তাম। ওর নিজের ডিপার্টমেন্ট নিয়ে সবসময় উল্টাপাল্টা কথা বলতো। তখন মনে হতো, বেচারা ভুল জায়গায় গিয়ে পড়েছে। ওর যা করতে বা পড়তে ভালো লাগে, সেটা ওর ভাগ্যে জোটেনি। হয়তো বাসার চাপে পড়ে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা করছে। এমনটাতো আমাদের দেশের আশি ভাগ ছাত্রছাত্রীদের কপালের লিখন। তারা তাদের পছন্দের বিষয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ পায় না।
মিশাল বুকে পাথর বেঁধে পড়াশোনাটা চালিয়ে গেছে। তবে ও বড় কিছুর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলো।
নাটকের ব্যাপারে ও দারুণ সিরিয়াস ছিলো। আমাদের আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে নাটকটি মঞ্চে আসার পর ছ'মাসের মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিরাজগঞ্জ, সাভার, টাঙ্গাইল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, কোলকাতাসহ বিভিন্নস্থানে প্রচুর কল শোয়ের আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। হাসান আর মিশাল দুজনে মিলে সবকিছু খুব সুন্দরভাবে সামলে নিতো। বাইরে ট্যুরে গেলে মিশাল মজার মজার কথা বলে আমাদেরকে জমিয়ে রাখতো। ওর কথাগুলো ছিলো বেশ উচ্চমার্গীয়। আমরা ঢাকা থেকে বাইরে গিয়ে শো করেই আবার ঢাকার উদ্দেশে রওনা হতাম। খুব ধকল যেতো সবার উপর দিয়ে, বিশেষ করে হাসান ও মিশালের ওপর দিয়ে।সেবার টাঙ্গাইলে শো করার পরে আমরা তিন-চার ঘণ্টা সময় পেয়েছিলাম বিশ্রাম ও পানাহারের জন্য। সেদিন গভীর রাতে বেশ আড্ডা জমে উঠেছিলো। নাটক নিয়ে নানারকম কথা হচ্ছিলো। আড্ডার সেই মুহূর্তে মিশাল বলে উঠলো, এত শো করে কী হবে? একদিনতো মরেই যাবো। মিশাল হয়তো মজার ছলেই কথাটা বলেছিলো কিন্তু কথাটার ভিতরে একটা গভীর বোধ লুকিয়ে আছে। সেটা না হয় একদিন মিশেলের মুখ থেকেই শুনবো।
মিলাশ আমাদের 'আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে' ও 'তালিকা'(পথনাটক) এ দুটি নাটকে অভিনয় করেছে। দুটোতেই সে চমৎকার অভিনয় করেছে।
এক সময় করোনার মহামারি নেমে এল। আমাদের নাটকের কার্যক্রমে কমে গেলো। মাঝে মাঝে পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটলে আমরা শো করি, মহড়া করি। সবাই মুখে মাস্ক পরে দূরত্ব বজায় রেখে মহড়ায় হাজির হই। এক সন্ধ্যায় মিশাল আমার কাছে এসে মাস্ক সরিয়ে বলে, দাদা আমি থিয়েটার নিয়ে পড়াশোনা করতে আমেরিকায় যাওয়ার কথা ভাবছি। আপনি আমাকে সাপোর্ট দিবেন। খুব খুশি হলাম ওর পরিকল্পনার কথা জেনে। কিন্তু আমি কী সাপোর্ট দিবো, ভেবে উঠতে পারছিলাম না। আসলে তেমন কিছু না। ও যে আমাদের দলে কাজ করে সেসব কিছুর লিখিত ডকুমেন্টস দরকার সেগুলোই সরবরাহ করতে হবে আমাকে। আমার পক্ষে যা যা করণীয় আমি করলাম।
একদিন এসে মিশাল জানালো ওর ভর্তি সম্পন্ন হয়ে গেছে। ও আমেরিকায় চলে যাবে। কাছাকাছি সময়ে আরও জানতে পারলাম আমাদের প্রথম কর্মশালার আরও একজন, সুমন মণ্ডল যে আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে নাটকে নিক্ষেপ চরিত্রে চমৎকার অভিনয় করে, জাহাঙ্গীরনগর থেকে মাস্টার্স শেষ করে সেও আরও উচ্চতর পড়াশোনা করার জন্য আমেরিকায় যাচ্ছে। আর একদিন দ্বিতীয় কর্মশালার প্রাপ্তি কবীর, যে বুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে এমবিএ করে একটা চাকরি করছিলো, সেও এসে বললো, সে একটা চাকরি নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা যাচ্ছে। তিনজনের জন্য একদিন বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করলাম। নতুন দল, ছোট দল। সেখান থেকে তিনজন মেধাবী কর্মী একই সময়ে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে মনে আনন্দও হচ্ছিল, কষ্টও হচ্ছিলো।
মিশালের কথা বলছিলাম, ওকে নিয়েই বলি। মিশাল আমেরিকায় গিয়ে সিরিয়াসলি থিয়েটার নিয়ে পড়াশোনা করেছে। এখন সে নাটকের ওপর পিএইচডি করছে। মিশাল তুমি তোমার লক্ষে এগিয়ে যাও। তোমাকে নিয়ে আমাদের, Theatre Factoryর গর্বের শেষ নেই।
মিশেলের কথা তার জবানেই জেনে নিই। সাম্প্রতি ফেইসবুকে এক পোস্টে সে লিখেছে-
SUNY to CUNY: I have made the biggest ‘academic’ comeback of my life. Starting my PhD in Theatre and Performance Studies at the CUNY Graduate Center this fall.
৪ বছর আগেও কেউ যদি আমাকে বলতো ‘তুমি একদিন ম্যানহ্যাটনে থিয়েটার নিয়া পিএইচডি করবা। তোমার ভার্সিটি থেকে দুই ব্লক দূরে ব্রডওয়ে থাকবে। বিশ্বের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত এবং কালচারালি রিচড এন্ড ডাইভার্সড শহরের আর্টিস্ট নিয়ে কাজ করবা। শহরের ইতিহাস নিয়ে কাজ করবা,’ আমি হয়তো ‘ধুর মিয়া আমার সিজি নাই’ বলে উড়ায় দিতাম। আসলে আমার খালি সিজি না, ব্যাকগ্রাউন্ডও নাই। তো এসব নিয়ে ভাবার সময়ও নাই।
কিন্তু সেটাই করলাম! ফারসি ভাষা ও সাহিত্য থেকে ২.৯৪ সিজিপিএ নিয়ে গর্বের সহিত অনার্স শেষ করে সাবজেক্ট শিফট করার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিংহ্যামটনে থিয়েটার নিয়ে মাস্টার্স করলাম। ৪ সেমিস্টারের জায়গায় ৫ সেমিস্টার লাগাইলাম। ‘বাপের জন্মে থিসিস করতে পারবো বলে মনে হয়না’ বান্দা ১৩০ পেইজের থিসিস লিখলাম, ডিফেন্ড করলাম। এখন আগস্ট মাস থেকে পিএইচডি শুরু করতে যাইতাসি!
ভালো ছাত্র কোনকালেই ছিলাম না। জেএসসি পর্যন্ত সিরিয়াস ছিলাম। এরপরে প্রত্যেক বোর্ড পরীক্ষায় আবোলতাবোল প্রিপ নিয়ে এক্সাম দিসি। আর ভর্তি পরীক্ষার কথা তো বাদই দিলাম। ইংরেজিতে কঠিন লেভেলের মারা খেয়ে ফারসিতে ভর্তি হই। সেখানে পড়ালেখার সাথে আমার কোন যোগাযোগ ছিল না। এক সিরাজি স্যার ছাড়া আমাকে আর কেউ চিনেও না। একদিন মুমিত স্যাররে গিয়া সালাম মারসি স্যার বলে, ‘তুমি কি আমাদের ডিপ্টের?’ হাহা।
যাই হোক, পিএইচডিতে কি করবো জানি না। কিন্তু আমি কাজ করছি অ্যামেরিকান থিয়েটার নিয়ে। অ্যামেরিকান পপুলার এন্টারটেইনমেন্ট, ফিমেইল ইম্পার্সনেশন, ড্র্যাগ কুইন, এবং হলোকাস্ট থিয়েটার নিয়ে আমার গবেষণা। আর থিওরির জায়গায় রেইস এন্ড এথনিসিটি, জেন্ডার স্টাডিজ, এবং কুইয়ার এন্ড এলজিবিটিকিউ থিওরিজ নিয়ে আমার কাজ। শুধু্মাত্র শেষের স্পেশালাইজেশনের জন্যে বাংলাদেশে আমার কিছু করা সম্ভব হবে না আমি জানি। তাই দেশটা নিয়ে মাথাও ঘামাইতাসি না।
কিছুদিন পর আবার পড়াশোনার চাপে আইডি হাওয়া করে দিবো। যাওয়ার আগে সবাইকে জানিয়ে দিলাম। যারা আমাকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করেছেন সবাইকে ধন্যবাদ।
স্পেশাল ধন্যবাদ থিয়েটার ফ্যাক্টরি, ঢাকা ইউনিভার্সিটি মাইম অ্যাকশন, কালচারাল সোসাইটি, এবং টুরিস্ট সোসাইটিকে (আমার থিসিসের আইডিয়া হলো ফিমেইল ইম্পার্সনেশন, যেটা এদের প্রোগ্রামে বহুতবার করসি!)। এরা আমার থিয়েটার/অভিনয়/সবকিছুর বেইজ।
মিশালের উপরের কথাগুলোর মধ্যেই আছে ও কতটা সিরিয়াস থিয়েটার নিয়ে। যার স্বপ্ন বড় থাকে এবং তার জন্য কঠিন সাধনা থাকে, তার জয় সুনিশ্চয়। আমার বিশ্বাস, মিশাল সমাপ্ত একদিন তার নিজের, দেশের এবং থিয়েটার ফ্যাক্টরির মুখ উজ্জ্বল করবে। লক্ষ্যে এগিয়ে যাও মিশাল। জয়ী হলে লেক্সাস বিস্কুট আর কলা থাকবে পুরস্কার হিসেবে।
শুরুতে মিশালকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রসঙ্গক্রমে হাসানুজ্জামান খানের কথা এসে গিয়েছিলো। হাসানকে নিয়ে আর একদিন বলবো। আজ শুধু বলি, হাসান থিয়েটার ফ্যাক্টরির আগে কোনোদিন নাটকে কাজ করেনি। সাড়ে ছ' বছরের মাথায় সে নিজযোগ্যতাগুণে থিয়েটার ফ্যাক্টরির প্রধান কারিগর পদে অধিষ্ঠিত হয়ে প্রায় দুবছর যাবৎ সাফল্যের সাথে দায়িত্ব পালন করে চলেছে। আমরা চাই, আমাদের কর্মীরা থিয়েটার ফ্যাক্টরিতে তাদের মেধা ও যোগ্যতার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটানোর সুযোগ পাক।
জয় হোক তোমাদের। জয় হোক থিয়েটার ফ্যাক্টরির। জয় হোক নাটকের। Mishal Shomapto wish you good luck.