03/02/2016
ছোটবেলা কত ধরণের স্টুপিডিটিই না
করতাম।
আজ সেরকমই একটা পাগলামির কথা মনে
পড়ছে...
২০০২ সাল, তখন ক্লাস ফোরে পড়ি, বয়স ছিল
৯
বছর। সে বছরই আমাদের নতুন বাড়ি বানিয়ে
পাড়ি দেই। আমার আম্মুর মুরগি পোষার
অনেক শখ
ছিল, সে সূত্রে প্রায় ৩০/৪০ টার মত মোরগ-
মুরগি
আমাদের বাড়িতে ছিল, তাদের বসবাস
ছিল
আমাদের নতুন বাড়িতে টিনের একটা ছোট
ঘরে।
প্রতিদিন অনেক গুলো মুরগি ডিম দিতো,
রোজ দুই
হালি থেকে এক ডজন ডিম হয়ে যেত। মুরগি
গুলো
সাধারণত দিনের বেলা ডিম দিতো, আর
সন্ধ্যার
দিকে সেগুলো সেই ছোট ঘর থেকে
কালেকশনের
দায়িত্ব ছিল আমার উপর, কারণ দরজার
সাইজটা
অনেক ছোট হওয়ায় বড় মানুষ ভিতরে ঢুকা
যেত
না।
একবার আমার মাথায় একটা আইডিয়া এলো,
আম্মুকে জিজ্ঞেস করলাম "আচ্ছা মা, মুরগি
ডিম
গুলো মুরগি তা না দিয়ে অন্য কিছুর
মাধ্যমে
প্রতিদিন উষ্ণ করে রাখলে কি বাচ্চা হবে
না?"
একটা স্টুপিড প্রশ্ন ছিল, আম্মু তার
স্বভাবতই
আনসার দিলেন "আমি জানি না!" আমার
মা
জননী এরকমই, একটা জিনিস মাথায় আসছে
না
বলেই তো জিজ্ঞেস করলাম, কোথায়
আমাকে
একটা সন্তোষজনক উত্তর দিবেন না উনি
বললেন
জানি না। চিন্তা করলাম নিজেই
আবিষ্কার
করবো এর সঠিক উত্তরটা কি! একটা রিসার্চ
এর
কথা মাথায় আসলো, যেই ভাবা সেই
কাজ....
আমার এক্সপেরিমেন্ট এর জন্য শুধু দুইটা
জিনিসের
দরকার ছিল, উষ্ণতা আর ডিম। ডিম
কালেকশনের
দায়িত্ব তো প্রতিদিন আমার উপরই ছিল,
আম্মুকে
ঘুমে রেখে কত ডিম যে চুরি করে খেয়েছি,
আমার
এক্সপেরিমেন্ট এর জন্য ডিম সংগ্রহ করা
কোন
ব্যাপার ছিল না। এবার দরকার উষ্ণতা
কিভাবে
আবিষ্কার করা যায়! তখন ছিল শীতকাল,
একদিন
রাতে বিছানায় কমল/লেপ (আমাদের
সিলেটী
আঞ্চলিক ভাষায় একে রাজাই বলে এর শুদ্ধ
নামটা
আমার জানা নাই) গায়ে দিয়ে শুয়ে আছি,
হঠাৎ
আমার মাথার টিউবলাইটটা জ্বলে উটলো।
আমার
উষ্ণতার যন্ত্র আমি পেয়ে গেছি, রাজাই
যদি
শীতের দিনে মানুষকে উষ্ণতা দিতে পারে
তাহলে ডিমকেও পারবে। পরেরদিন ছিল
আমার
এক্সপেরিমেন্ট এর প্রথমদিন। আমাদের ঘরে
২/৩টা অতিরিক্ত রাজাই ছিল, সেগুলো
কেউ
ব্যাবহার করতো না। সেদিন সন্ধ্যার দিকে
মুরগির ঘর থেকে ডিম সংগ্রহ করে কয়েকটা
ডিম
মেরে দিলাম, তারপর সেগুলো এনে দুইটা
রাজাই
এর মাঝখানে রেখে আমার এক্সপেরিমেন্ট
এর
প্রথম ধাপ শুরু করলাম। এভাবে পরের ৩/৪
দিন
কয়েকটা কয়েকটা করে প্রায় দুই ডজন ডিম
এনে
রাজাই এর ভিতরে রাখলাম। আম্মুর কাছ
থেকে
শুনেছিলাম মুরগির বাচ্চা বের হতে ২১ দিন
লাগে, তাই ডিম গুলো রাজাই এর ভেতর ২১
দিনের
জন্য রেখে দিলাম। দেখতে দেখতে ২
সাপ্তাহ
চলে গেল, প্রতিদিন সময় করে ডিম গুলো
একটা
একটা করে হাতে তুলে কানের কাছে নিয়ে
নেড়ে
দেখতাম সেগুলোর ভিতরে বাচ্চা জন্ম
নিচ্ছে
কিনা। শেষের কয়েকটা দিন যেন আর
যাচ্ছিলোই
না, প্রতিদিন ক্যালেন্ডারের পাতায় দাগ
দিয়ে
রাখতাম।
আমাদের নতুন ঘরের কিছু কাজ বাকি ছিল
তাই
কয়েকজন মিস্ত্রি প্রতিদিন এসে কাজ
করতো
আবার সন্ধ্যার দিকে চলে যেত। একদিন
অনেক
রাত পর্যন্ত তাদের কাজ করতে হয়েছিল,
কয়েকজন
মিস্ত্রির বাড়ি অনেক দূরে হওয়ায় তারা
আমাদের বাড়িতে থেকে যাওয়ার
পরিকল্পনা
করে। সেদিন ছিল আমার এক্সপেরিমেন্ট এর
অষ্টাদশ দিন। রাতে আমি পড়া শেষ করে
আমার
রুমে এসে ৯টার দিকে ঘুমিয়ে গেছি,
মিস্ত্রিদের
কাজ শেষ করে খাওয়াদাওয়া শেষ করে
তখন
রাত১১টা বাজে। তাদের শুয়ার ব্যবস্থা
করতে
হবে, আব্বু তাদেরকে একটা খালি রুম
দেখিয়ে
দিয়ে সে ঘরে শুয়ার জন্য বলেন। আর সেই
ঘরেই
চলছিল আমার ১৮ দিন থেকে চলে আসা
অনেক
সাধনার ডিম থেকে কৃত্রিম উপায়ে বাচ্চা
বের
করার এক্সপেরিমেন্ট। আব্বু তাদেরকে রুম
আর
রুমে রাখা রাজাই দেখিয়ে দিয়ে চলে
গেলেন।
মিস্ত্রি ছিল তিনজন, দুইজন হেল্পার আর
একজন
তাদের বস। হেল্পার দুইজন একটা রাজাই
নিয়ে
একটা বিছানায় শুয়ে পড়লো, আর তাদের বস
আরেকটা বিছানায় গিয়ে কাত হয়ে যেমনি
দ্বিতীয় রাজাইটা গায়ে দেওয়ার জন্য টান
দিলেন অমনি আমার এক্সপেরিমেন্টের
আস্তো দুই
ডজন ডিম এসে সোজা তার মুখের উপর।
বেচারা
এক লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে
পড়লো।
আস্তো মুখে ডিমের কুসুম আর ভাঙা অংশ
লেগে
আছে, তার হেল্পার দুইটা এই দৃশ্য দেখে
তারা
অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। পরে আব্বু-
আম্মুকে
ডেকে নিয়ে ঘটনা বিস্তারিত বয়ান করলো,
আম্মু
খোঁজে পাচ্ছিলেন না এখানে ডিম গুলো
আসলো
কোথা থেকে, আমাদের মুরগি গুলোর মধ্যে
একটা
মুরগির একটা খারাপ অভ্যাস ছিল যে ঘরের
ভিতর
বিছানায় কিংবা টেবিলের নিচে এরকম
জায়গায়
বসে ডিম পাড়তে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতো।
আম্মু
ভাবলেন এটা বোধহয় সেই মহীয়সী মুরগির
কর্মকাণ্ড। যাই হউক বেচারা বস মিস্ত্রি
মুখটা
ধোয়ে পুরো রাজাই টা আরো কয়েকবার
চেক করে
নিস্তব্ধে শুয়ে পড়লেন।
সকালে অনেক ভোরে তারা ঘুম থেকে উটে
তাদের কাজ শুরু করে দিলেন, আর আম্মু এসে
তাদের বিছানা ঠিক করে রাজাই গুলো
ঠিক
আগের মতই একটার উপর আরেকটা গোছিয়ে
রেখে
চলে গেলেন। আমি ঘুম থেকে উটে নাস্তা
শেষ
করে স্কুলের জন্য রেডি হলাম, রাতে কি
হয়েছে
সেটা সম্পর্কে আদৌ আমার কোন ধারণা
নেই।
স্কুলের জন্য বেরিয়ে যাওয়ার আগে চিন্তা
করলাম ডিম গুলো একবার দেখে যাই, কিন্তু
একি
পুরো রাজাই তছনছ করে ডিমের সন্ধান তো
আর
পেলাম না। দৌড়ে গিয়ে আম্মুকে
জিজ্ঞেস
করলাম....
- "আম্মু, আম্মু, আমার ডিম কই?"
- "তর ডিম!"
- "হ্যা, ওই রুমে রাজাইয়ের ভিতরে
রাখাছিল!"
- "ও আচ্ছা এগুলো তাহলে তর কান্ড? ওগুলো
ওখানে রাখছিলি কেন?"
- "বাচ্ছা হবে তাই, সেদিন তোমাকে
জিজ্ঞেস
করেছিলাম না মুরগির তা না দিয়ে ডিম
থেকে
বাচ্চা বের করা যায় কিনা, তুমি জানি না
বলেছিলে তাই আমি পরীক্ষা চালাচ্ছি! ১৮
দিন
হয়ে গেছে আর ৩ দিন গেলেই বাচ্চা বের
হবে!"
যেমনি আমি আমার এক্সপেরিমেন্ট এর
কথাটা
বললাম, অমনি সবাই হু-হু করে হেসে উটলো!!
জীবনে নিজেকে এতটা বেশি বোকা
কোনদিন
আর ভাবিনি সেদিন যতটা বোকা মনে
হয়েছিল
আমাকে!! তবে যাই হউক বুড়ো বয়সে নাতি-
নাতনিদের কাছে গল্প করার মত আমার
ছোটবেলার 'টিউবলাইট' মার্কা একটা
বুদ্ধিতো
পেয়েছিলাম.... আর বাই দ্যা ওয়ে, আমার
এক্সপেরিমেন্ট এর পুরো ২১ দিন কিন্তু পুরো
হতে
পারেনি, ৩ দিন বাকি ছিল! তাই কেউ
চাইলে
নিজ দায়িত্বে এই গবেষণা চালিয়ে যেতে
পারেন.... হেহেহে!!!
লেখাঃ uzzol