শব্দের সিন্দুক

শব্দের সিন্দুক কল্পনার কোনো সীমানা নেই, গল্পেরও না।

 লেখিকা: Mahejabin Alif অধ্যায় ৫- নীরবতার ছায়াথমাস হেইলের নথিডিসেম্বর, ১৮৪৭অ্যাশক্রফট প্রাসাদে আমি জীবনের অধিকাংশ সময়...
01/07/2026


লেখিকা: Mahejabin Alif

অধ্যায় ৫- নীরবতার ছায়া

থমাস হেইলের নথি
ডিসেম্বর, ১৮৪৭

অ্যাশক্রফট প্রাসাদে আমি জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছি।
এই প্রাসাদের পাথরের দেয়াল, উঁচু খিলান, অন্ধকার করিডোর এবং নিঃশব্দ সিঁড়িগুলো মানুষের চেয়ে অনেক বেশি স্মৃতি ধরে রেখেছে।
আমি রাজাদের দেখেছি।
রাণীদের দেখেছি।
ক্ষমতার উত্থান-পতন দেখেছি।
আর দেখেছি এমন কিছু নীরবতা, যেগুলো তলোয়ারের আঘাতের চেয়েও গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে।
প্রিন্স সেবাস্টিয়ান সেই নীরবতারই একটি অংশ।
আজ দুপুরে দক্ষিণ প্রাসাদের দীর্ঘ করিডোর অতিক্রম করার সময় আমি রাজা এডমন্ডকে দেখলাম।
তিনি উঁচু জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
জানালার রঙিন কাঁচ ভেদ করে শীতের ম্লান আলো তার রাজকীয় পোশাকের উপর পড়ছিল।
তার ছায়া লম্বা হয়ে করিডোরের কালো পাথরের মেঝেতে ছড়িয়ে পড়েছিল।
তার ভঙ্গি ছিল সোজা।
একজন রাজার মতোই।
কিন্তু সেই দৃঢ়তার আড়ালে এমন এক ক্লান্তি লুকিয়ে ছিল, যা কোনো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসা মানুষের নয়।
বরং এমন একজন মানুষের, যিনি নিজের ভেতরেই বহুদিন ধরে এক অদৃশ্য যুদ্ধ লড়ে চলেছেন।
আমি দূরে থেমে গেলাম।
কারণ রাজাকে এভাবে দেখা যায় না।
এটি কোনো সাধারণ মুহূর্ত ছিল না।
ঠিক তখনই করিডোরের শেষ প্রান্তে আরেকটি অবয়ব দেখা দিল।
প্রিন্স সেবাস্টিয়ান।
আমি তাকে আসতে দেখিনি।
শুধু একসময় বুঝতে পারলাম—
তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন।
যেন তিনি হাঁটেন না।
নিঃশব্দে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে উপস্থিত হন।
করিডোরের দুই প্রহরী সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
কিন্তু আমি লক্ষ্য করলাম—
তাদের কেউই তার চোখের দিকে তাকাচ্ছে না।
এটি ছিল সম্মান নয়।
ভয়ও হতে পারে।
অথবা এমন কিছু, যার নাম আমি জানি না।
সেবাস্টিয়ান ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন।
তার পদচারণার শব্দ পর্যন্ত যেন নিয়ন্ত্রিত।
তিনি রাজাকে দেখেও থামলেন না।
রাজাও সরে দাঁড়ালেন না।
দুই ভাইয়ের মাঝখানে কয়েক হাত দূরত্ব।
তবু মনে হচ্ছিল—
তাদের মধ্যে বহু বছরের নীরবতা দাঁড়িয়ে আছে।
অবশেষে রাজা বললেন—
"আপনি... আপনি আবার এসেছেন।"
তার কণ্ঠে কোনো রাগ ছিল না।
ছিল এক ধরনের ক্লান্ত স্বীকৃতি।
সেবাস্টিয়ান সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন না।
তিনি জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে বললেন—
"আমি কোথাও যাইনি, মহারাজ।"
রাজা ধীরে ধীরে তার দিকে ফিরলেন।
"তবুও আপনি ফিরে আসেন।"
সেবাস্টিয়ানের ঠোঁটের কোণে অতি ক্ষীণ একটি হাসি ফুটল।
সেই হাসির অর্থ বোঝা গেল না।
"কিছু ছায়া একবার জন্মালে..."
তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন,
"...তাদের আর কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হয় না।"
করিডোর আবার নীরব হয়ে গেল।
বাইরের বাতাসের শব্দ পর্যন্ত যেন থেমে ছিল।
রাজা এবার নিচু স্বরে বললেন—
"আজ আবার আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে।"
সেবাস্টিয়ান শান্তভাবে উত্তর দিলেন—
"অভিযোগ নিজে আসে না, মহারাজ।"
"তৈরি করা হয়।"
রাজা এক ধাপ এগিয়ে এলেন।
"আপনি কি অস্বীকার করছেন?"
সেবাস্টিয়ান দীর্ঘক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে বললেন—
"আমি আপনার প্রশ্নের ভাষা গ্রহণ করি না।"
রাজা এবার স্পষ্ট বিরক্ত হলেন।
"আপনি সবকিছুকে ধাঁধায় পরিণত করেন কেন?"
সেবাস্টিয়ান বললেন—
"ধাঁধা আমি তৈরি করি না।"
"মানুষ উত্তর খুঁজে না পেলে তাকে ধাঁধা বলে।"
কয়েক মুহূর্ত কেউ কথা বলল না।
তারপর রাজা বললেন—
"আপনি বুঝতে পারছেন না আপনি কোন অবস্থায় আছেন।"
সেবাস্টিয়ান এবার ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকালেন।
"আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, মহারাজ..."
তিনি সামান্য থামলেন।
"...সেখানে মানুষ নিজেই এসে দাঁড়ায় না।"
করিডোরের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।
রাজা ধীরে বললেন—
"মানুষ আপনাকে ভয় পায়।"
সেবাস্টিয়ানের ঠোঁটে অতি ক্ষীণ একটি হাসি ফুটে উঠল।
সেই হাসিতে আনন্দ ছিল না।
বরং এমন এক আত্মবিশ্বাস, যার উৎস বোঝা কঠিন।
"ভয় মানুষের বিচারকে সহজ করে দেয়।"
তিনি ধীরে বললেন।
"তারা তখন আর সত্য খোঁজে না।"
রাজা দীর্ঘক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর নিচু স্বরে বললেন—
"এটাই সমস্যা।"
সেবাস্টিয়ান মাথা নাড়লেন।
"না, মহারাজ।"
"এটি মানুষের সিদ্ধান্ত।"
তিনি ধীরে ধীরে ফিরে দাঁড়ালেন।
কয়েক পা এগিয়ে আবার থামলেন।
পেছনে তাকালেন না।
"আপনি আমাকে দোষী বানাতে পারবেন।"
তার কণ্ঠে কোনো আবেগ ছিল না।
"মানুষ বিশ্বাসও করবে।"
তিনি কয়েক মুহূর্ত নীরব রইলেন।
তারপর বললেন—
"কারণ মানুষ সেই গল্পই বিশ্বাস করে..."
"...যেটা তাদের সবচেয়ে কম ভাবায়।"
আরও এক মুহূর্তের বিরতি।
"আর আমি কখনো মানুষের ভাবনাকে সহজ করিনি।"
তিনি আবার হাঁটতে শুরু করলেন।
করিডোরের শেষ প্রান্তে পৌঁছে আরও একবার থামলেন।
রাজাকে না দেখেই বললেন—
"মহারাজ..."
"সবচেয়ে বিপজ্জনক মানুষ সেই নয়..."
"...যার হাতে রক্ত লেগে আছে।"
দীর্ঘ নীরবতা।
"সবচেয়ে বিপজ্জনক মানুষ সে..."
"...যে জানে কোন রক্ত সবাই দেখতে পায়, আর কোন রক্ত চিরকাল আড়ালেই থেকে যায়।"
এরপর আর একটি শব্দও উচ্চারণ না করে তিনি করিডোরের অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন।
অনেকক্ষণ আমি তার চলে যাওয়ার দিকেই তাকিয়ে ছিলাম।
করিডোর যেন আগের চেয়েও ফাঁকা হয়ে উঠেছে।
রাজা এডমন্ড একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলেন।
তার মুখে এমন এক অভিব্যক্তি, যা আমি আগে কখনো দেখিনি।
সেটি রাগ ছিল না।
দুঃখও নয়।
বরং এমন এক উপলব্ধি, যার বিরুদ্ধে আর লড়াই করার শক্তি অবশিষ্ট নেই।
অবশেষে তিনি এত নিচু স্বরে বললেন যে আমি প্রায় শুনতেই পাইনি—
"তাহলে... তাই হবে।"
আমি জানি না তিনি কাকে উদ্দেশ্য করে কথাটি বলেছিলেন।
সেবাস্টিয়ানকে।
নিজেকে।
নাকি সেই ভাগ্যকে, যা বহু আগেই লেখা হয়ে গেছে।
আজ রাতের নোটে আমি একটি বিষয় লিখে রাখছি।
আমি জানি না প্রিন্স সেবাস্টিয়ান কী লুকিয়ে রেখেছেন।
হয়তো কিছুই নয়।
হয়তো এমন কিছু, যার নাম উচ্চারণ করাও বিপজ্জনক।
কিন্তু আজ প্রথমবার আমার মনে হলো—
তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি সত্য গোপন করতে মিথ্যারও প্রয়োজন বোধ করেন না।
তার নীরবতাই যথেষ্ট।
আমি বহু বছর ধরে মানুষ পর্যবেক্ষণ করেছি।
আমি শিখেছি—
যারা খুব বেশি কথা বলে, তাদের উদ্দেশ্য বোঝা সহজ।
কিন্তু যারা প্রয়োজনের চেয়েও কম কথা বলে...
তাদের উদ্দেশ্যই সবচেয়ে বিপজ্জনক হতে পারে।
আর যে মানুষ নিজের নীরবতাকেও অস্ত্র বানাতে পারে—
তাকে কখনো হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
(নথি সমাপ্ত)
আর্থার ধীরে ধীরে পৃষ্ঠা থেকে চোখ তুলল।
গ্রন্থাগারের মোমবাতিগুলো এখনও জ্বলছে।
কিন্তু তাদের আলো যেন আগের চেয়ে আরও ম্লান।
বাইরে উত্তর টাওয়ারের ঘড়ি একবার ধ্বনি তুলল।
রাত আরও গভীর হয়েছে।
তার মনে হলো—
বাক্সের ভেতরের প্রতিটি নথি যেন সেবাস্টিয়ানের চারপাশে আরেকটি নতুন ছায়া তৈরি করছে।
এখনও পর্যন্ত সে কোনো অপরাধ করেনি।
কেউ তাকে অপরাধ করতে দেখেনি।
তবু প্রতিটি সাক্ষ্য, প্রতিটি স্মৃতি, প্রতিটি কথোপকথন অদৃশ্যভাবে একই দিকে ইঙ্গিত করছে।
আর্থার বুঝতে পারল—
একজন মানুষকে দোষী মনে হওয়ার জন্য কখনো কখনো একটি অপরাধও যথেষ্ট নয়।
বরং যথেষ্ট—
একটি দীর্ঘ নীরবতা।
সে ধীরে ধীরে বাক্সের ভেতরে রাখা পরবর্তী নথিটির দিকে হাত বাড়াল।

চলবে...

 লেখিকা : Mahejabin Alif অধ্যায় ৪- এলিনরথমাস হেইলের নথিডিসেম্বর, ১৮৪৭আজ আমি আবার উপলব্ধি করলাম—অ্যাশক্রফটে সবচেয়ে বিপজ...
01/07/2026


লেখিকা : Mahejabin Alif
অধ্যায় ৪- এলিনর

থমাস হেইলের নথি
ডিসেম্বর, ১৮৪৭

আজ আমি আবার উপলব্ধি করলাম—
অ্যাশক্রফটে সবচেয়ে বিপজ্জনক মানুষ তারা নয়, যারা ক্রোধে কণ্ঠস্বর উঁচু করে।
বরং তারা— যাদের মুখে কখনো ক্রোধের ছায়াও দেখা যায় না।
রাণী এলিনর তাদেরই একজন।
আমি তাকে বহুবার দেখেছি।
রাজদরবারে।
রাজকীয় ভোজসভায়।
প্রার্থনালয়ে।
অভিষেক অনুষ্ঠানে।
শোকসভায়।
প্রতিবারই তিনি একই রকম।
মেরুদণ্ড অবিচল সোজা।
চোখ দুটি স্থির।
ঠোঁটের কোণে মৃদু, সংযত এক হাসি।
দরবারের অধিকাংশ মানুষ বলেন, তিনি শান্ত স্বভাবের।
কেউ কেউ আরও এক ধাপ এগিয়ে তাকে নিখুঁত রাণী বলে অভিহিত করেন।
কিন্তু আমি এখনও নিশ্চিত নই—
এই দুটি পরিচয় আদৌ একই অর্থ বহন করে কি না।
আজ সকালে রাজকীয় গ্রন্থাগার থেকে কিছু নথি আমাকে তার ব্যক্তিগত কক্ষে পৌঁছে দিতে হয়েছিল।
এ কাজ নতুন নয়।
অসংখ্যবার করেছি।
অন্য যেকোনো দিনের মতো আজও হয়তো ঘটনাটি বিস্মৃতির ভিড়ে হারিয়ে যেত।
কিন্তু আজ, তার কক্ষের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ আমার মনে হলো—
আমি যেন আর একটি ঘরে প্রবেশ করতে যাচ্ছি না।
বরং এমন এক মনের ভেতরে প্রবেশ করতে চলেছি, যেখানে প্রতিটি চিন্তারও নিজস্ব শৃঙ্খলা রয়েছে।
দরজার দুই পাশে দুইজন দাসী দাঁড়িয়ে ছিল।
তাদের মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।
তারা আমার দিকে তাকাল।
কিন্তু একটি শব্দও উচ্চারণ করল না।
কিছুক্ষণ পর ভেতরে প্রবেশের অনুমতি মিলল।
আমি দরজা অতিক্রম করলাম।
কক্ষটি অস্বাভাবিকভাবে নিস্তব্ধ।
সেই নীরবতা আরামদায়ক নয়।
বরং নিয়ন্ত্রিত।
সযত্নে নির্মিত।
চারদিকে এমন পরিচ্ছন্নতা, যেন এই কক্ষে কোনো বস্তু কখনো নিজের ইচ্ছায় স্থান পরিবর্তন করার সাহস পায় না।
ভারী পর্দাগুলো জানালার দু'পাশে নিখুঁত ভাঁজে ঝুলছিল।
প্রাচীন কাঠের আসবাবপত্রে এক বিন্দু ধুলোর চিহ্নও নেই।
জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড থেকেও খুব সামান্য উষ্ণতা বের হচ্ছিল।
যেন আগুনকেও এখানে সংযত থাকতে শেখানো হয়েছে।
রাণী এলিনর জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
বাইরের শীতের ম্লান আলো তার মুখের এক পাশ আলোকিত করছিল।
অন্য পাশটি ছায়ায় ঢাকা।
তিনি ধীরে ধীরে আমার দিকে ফিরে তাকালেন।
"থমাস হেইল।"
তার কণ্ঠস্বর উঁচু ছিল না।
তবু মনে হলো, ঘরের প্রতিটি দেয়াল যেন সেই দুটি শব্দ শুনতে থেমে গেছে।
আমি মাথা নত করলাম।
"মহারাণী।"
তিনি মৃদু হাসলেন।
"আপনি সবকিছু মনে রাখেন, তাই না?"
প্রশ্নটি ছিল অদ্ভুত।
আমি বুঝতে পারলাম না—
এটি প্রশংসা।
নাকি সতর্কবার্তা।
আমি শান্তভাবে উত্তর দিলাম—
"আমি চেষ্টা করি, মহারাণী।"
তিনি জানালার কাছ থেকে ধীরে ধীরে সরে এলেন।
আমার দিকে এগিয়ে এলেন না।
আবার দূরেও গেলেন না।
আমাদের মাঝখানের দূরত্বটুকু অপরিবর্তিত রাখলেন।
যেন সেই দূরত্বও তার নিয়ন্ত্রণে।
"দরবারে যারা সবকিছু মনে রাখে..."
তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
"...তারা একদিন সমস্যায় পড়ে।"
আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
তিনি আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
দীর্ঘক্ষণ।
অস্বস্তিকরভাবে দীর্ঘ।
তার চোখে কোনো কঠোরতা ছিল না।
কিন্তু সেই দৃষ্টির ভেতর থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়াও সহজ ছিল না।
অবশেষে তিনি বললেন—
"আপনি আজ কী নিয়ে এসেছেন?"
আমি নথিগুলোর কথা জানালাম।
তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনলেন।
অথবা অন্তত এমনটাই মনে হলো।
কিন্তু তার চোখ দুটি স্থির ছিল।
অস্বাভাবিকভাবে স্থির।
মনে হচ্ছিল, তিনি আমার কথা শুনছেন না।
বরং আমি যা বলিনি, সেটাই শুনছেন।
নথিগুলো রেখে আমি বিদায় নেওয়ার জন্য ঘুরতেই তিনি ডাকলেন—
"থমাস।"
আমি থেমে গেলাম।
"আপনি কি বিশ্বাস করেন..."
তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
"...মানুষ নিজের ইতিহাস নিজেই লেখে?"
আমি উত্তর দেওয়ার আগেই তিনি নিজেই বললেন—
"আমি করি না।"
তারপর তিনি হাসলেন।
হাসিটি ছিল নিখুঁত।
কিন্তু উষ্ণ ছিল না।
"মানুষ কেবল চেষ্টা করে..."
তিনি জানালার বাইরে তাকালেন।
"...নিজের ভুলগুলোকে সুন্দর ভাষায় লিখে রাখতে।"
আমি আবার প্রস্থান করতে উদ্যত হলাম।
কিন্তু তিনি আবার বললেন—
"আরেকটি প্রশ্ন।"
আমি নীরবে দাঁড়িয়ে রইলাম।
"যদি কোনো রাজা ভুল করেন..."
তার কণ্ঠে এখনও একই প্রশান্তি,
"...তাহলে সেটাই কি ইতিহাস হয়ে যায়?"
আমি কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দিলাম—
"ইতিহাস বিচার করে না, মহারাণী।"
তিনি খুব ধীরে মাথা নাড়লেন।
যেন এই উত্তরটিই তিনি প্রত্যাশা করেছিলেন।
"ঠিক তাই।"
তিনি মৃদুস্বরে বললেন।
"তাই ইতিহাস সবসময় নিরাপদ।"
কক্ষটি আবার নীরব হয়ে গেল।
অগ্নিকুণ্ডের আগুন ক্ষীণ শব্দে জ্বলছিল।
তারপর তিনি শেষবারের মতো বললেন—
"কারণ ইতিহাস কখনো জবাবদিহি করে না।"
কথাটি বলার সময় তার মুখের অভিব্যক্তিতে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন এল না।
কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার মনে হলো—
এটি কোনো সাধারণ মন্তব্য নয়।
এটি এমন একটি বিশ্বাস, যা বহুদিন ধরে তার ভেতরে বাস করছে।
আমি কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলাম।
দরজাটি ধীরে ধীরে আমার পেছনে বন্ধ হয়ে গেল।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে মনে হতে লাগল—
আমি যেন এখনও সেই কক্ষের ভেতরেই দাঁড়িয়ে আছি।
আমি অনেকক্ষণ দক্ষিণ প্রাসাদের করিডোরে স্থির দাঁড়িয়ে রইলাম।
চারদিকে কেউ ছিল না।
তবু মনে হচ্ছিল—
আমার পেছনে কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি ফিরে তাকালাম।
কেউ নেই।
তবুও অনুভূতিটি মিলিয়ে গেল না।
আজ রাতে আমি এই নোটটি লিখে রাখছি।
কারণ আমি নিশ্চিত নই—
আজ আমি সত্যিই কিছু দেখেছি।
নাকি আমাকে কেবল দেখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
রাণী এলিনর হাসেন।
সবসময়ই হাসেন।
কিন্তু আজ আমি বুঝলাম—
সব হাসি মানুষের ভয় দূর করে না।
কিছু হাসি নীরবে জানিয়ে দেয়—
তুমি ইতিমধ্যেই এমন এক পথে হেঁটে এসেছ, যেখান থেকে ফিরে যাওয়া আর সম্ভব নয়।
(নথি সমাপ্ত)

চলবে....

   অধ্যায় ৩ঃ নীরবতা১২ ডিসেম্বর, ১৮৪৭থমাস হেইলের নথিআমি বহু বছর ধরে অ্যাশক্রফট প্রাসাদে কাজ করছি।এই সময়ে আমি তিনজন রাজা...
28/06/2026




অধ্যায় ৩ঃ নীরবতা

১২ ডিসেম্বর, ১৮৪৭
থমাস হেইলের নথি

আমি বহু বছর ধরে অ্যাশক্রফট প্রাসাদে কাজ করছি।
এই সময়ে আমি তিনজন রাজাকে দেখেছি।
দুইজন রাণীকে।
অসংখ্য মন্ত্রীকে।
শত শত অভিজাতকে।
আর একটি বিষয় শিখেছি—
রাজদরবারে সবচেয়ে বিপজ্জনক বস্তু সবসময় ছুরি নয়।
সবচেয়ে বিপজ্জনক অস্ত্র সবসময় বিষও নয়।
কখনো কখনো সবচেয়ে ভয়ংকর জিনিস হলো নীরবতা।
কারণ ষড়যন্ত্রের শব্দ থাকে।
গুজবেরও শব্দ থাকে।
ফিসফাস, গোপন বৈঠক, বন্ধ দরজার আড়ালে চাপা কথোপকথন—
সবকিছুরই কোনো না কোনো প্রতিধ্বনি শোনা যায়।
কিন্তু নীরবতা আসে তখনই, যখন মানুষ কিছু বলতে চায়, অথচ বলে না।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আমি সেই নীরবতাকে বেড়ে উঠতে দেখছি।
প্রাসাদের করিডোরে।
দরবারের আলোচনায়।
এমনকি ভোজসভার মধ্যেও।
আজ সকালে রাজকীয় আর্কাইভ থেকে কিছু নথি নিয়ে আমাকে দক্ষিণ প্রাসাদে যেতে হয়েছিল।
সাধারণ কাজ।
অগণিতবার করেছি।
তবু আজকের দিনটি কোনো কারণে সাধারণ মনে হয়নি।
দক্ষিণ প্রাসাদের দীর্ঘ করিডোরটি অস্বাভাবিকভাবে ফাঁকা ছিল।
উঁচু জানালাগুলো দিয়ে শীতের ম্লান আলো প্রবেশ করছিল।
পাথরের মেঝেতে সেই আলো পড়ে লম্বা ছায়া তৈরি করছিল।
দুজন প্রহরী দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল।
দুজনের মুখই কঠিন।
গম্ভীর।
আমি তাদের একজনকে জিজ্ঞেস করলাম—
"সব ঠিক আছে তো?"
সে উত্তর দিল না।
শুধু মাথা নাড়ল।
তখন বিষয়টি গুরুত্ব দিইনি।
এখন মনে হচ্ছে দেওয়া উচিত ছিল।
করিডোরের শেষপ্রান্তে রাজকীয় পরামর্শকক্ষ।
প্রাচীন ওক কাঠের দরজা।
ব্রোঞ্জের হাতল।
সাধারণত দরজাটি বন্ধ থাকে।
আজও ছিল।
কিন্তু ভেতর থেকে কোনো শব্দ আসছিল না।
অথচ আমি জানতাম কক্ষে দুজন মানুষ উপস্থিত।
রাজা এডমন্ড।
এবং তার ছোট ভাই, প্রিন্স সেবাস্টিয়ান।
আমি নথিগুলো হস্তান্তর করে ফিরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।
ঠিক তখন দরজাটি খুলে গেল।
প্রথমে বেরিয়ে এলেন প্রিন্স সেবাস্টিয়ান।
তাকে আমি বহুবার দেখেছি।
লম্বা।
সুদর্শন।
সর্বদা নিখুঁত পোশাকে আবৃত।
আর তার চোখে এমন এক ধরনের সংযম ছিল, যা অনেক মানুষকে অস্বস্তিতে ফেলত।
দরবারে তাকে খুব কম মানুষ ভালোবাসে।
আংশিক কারণ তার স্বভাব।
আংশিক কারণ তিনি কখনো কারও ভালোবাসা অর্জনের চেষ্টা করেন না।
তিনি আমাকে লক্ষ্য করেননি।
অথবা লক্ষ্য করেও গুরুত্ব দেননি।
দ্রুত পদক্ষেপে করিডোর অতিক্রম করে চলে গেলেন।
তবে যাওয়ার আগে একবার পিছনে তাকিয়েছিলেন।
মাত্র একবার।
সেই দৃষ্টির অর্থ আমি আজও বুঝতে পারিনি।
সেখানে কি রাগ ছিল?
হতাশা?
অনুশোচনা?
নাকি সম্পূর্ণ অন্য কিছু?
আমি জানি না।
হয়তো কখনো জানতেও পারব না।
তার কয়েক মুহূর্ত পরে রাজা বেরিয়ে এলেন।
আর তখনই প্রথমবার আমার মনে হলো—
কিছু একটা বদলে গেছে।
কারণ তাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছিল।
অস্বাভাবিকভাবে ক্লান্ত।
যুদ্ধ শেষে ফেরা মানুষের মতো নয়।
বরং এমন একজন মানুষের মতো, যিনি এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যার মূল্য তিনি সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করেন।
তিনি করিডোরে দাঁড়িয়ে রইলেন।
সম্পূর্ণ একা।
কয়েক মুহূর্ত।
আমি তখনও সেখানে উপস্থিত ছিলাম।
অবশেষে তিনি আমাকে লক্ষ্য করলেন।
"মিস্টার হেইল।"
আমি নত হলাম।
"মহারাজ।"
তিনি কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন—
"আপনি এখনও নথি নিয়ে কাজ করেন?"
প্রশ্নটি অদ্ভুত ছিল।
তবু আমি উত্তর দিলাম—
"জি, মহারাজ।"
তিনি মৃদু হাসলেন।
"ভালো।"
তারপর যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলতে বলতে বললেন—
"নথি মানুষের চেয়ে বেশি বিশ্বস্ত।"
আমি কোনো উত্তর দিতে পারিনি।
কারণ কথাটি প্রশংসা নয়।
আবার অভিযোগও নয়।
তিনি আবার বললেন—
"যদিও শেষ পর্যন্ত মানুষই নথি লেখে।"
এরপর তিনি চলে গেলেন।
সেদিনের ঘটনাটি হয়তো আমার স্মৃতিতে বিশেষ স্থান পেত না।
যদি না সেই রাতেই আরেকটি অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করতাম।
সন্ধ্যার পর রাজকীয় ভোজসভা অনুষ্ঠিত হয়।
রাজা উপস্থিত ছিলেন।
রাণী এলিনরও।
মন্ত্রীসভা।
সামরিক কর্মকর্তারা।
প্রধান বিচারপতি।
অভিজাত পরিবারগুলোর প্রতিনিধিরা।
সবাই।
কেবল একজন ছাড়া।
প্রিন্স সেবাস্টিয়ান।
তার আসনটি খালি ছিল।
কেউ কোনো প্রশ্ন করেনি।
কেউ কোনো মন্তব্যও করেনি।
কিন্তু কখনো কখনো মানুষ যা বলে না, তা-ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আমি লক্ষ্য করলাম—
রাণী এলিনর একবারও সেই খালি আসনের দিকে তাকাননি।
একবারও না।
যেন তিনি আগেই জানতেন সেটি খালি থাকবে।
যেন তার অনুপস্থিতি তাকে বিস্মিত করেনি।
হয়তো এর কোনো অর্থ নেই।
হয়তো আছে।
আমি নিশ্চিত নই।
আর রাজা?
তিনি পুরো সন্ধ্যায় মাত্র একবার সেই আসনের দিকে তাকিয়েছিলেন।
মাত্র একবার।
কিন্তু সেই এক দৃষ্টিই আমার মনে গেঁথে গেছে।
কারণ সেখানে আমি রাগ দেখিনি।
ঘৃণাও নয়।
বরং এমন কিছু, যার নাম দেওয়া কঠিন।
সম্ভবত শোক।
সম্ভবত অনুশোচনা।
সম্ভবত উভয়ই।
আমি তখন এর অর্থ বুঝিনি।
আজও পুরোপুরি বুঝি না।
তবে সেদিন রাতেই নিজের ব্যক্তিগত নোটে একটি বাক্য লিখে রেখেছিলাম।
আমি সাধারণত ভবিষ্যদ্বাণী করি না।
তবু সেদিন করেছিলাম।
আমি লিখেছিলাম—
"যখন কোনো রাজা তার জীবিত ভাইয়ের দিকে মৃত মানুষের মতো তাকায়, তখন রাজ্যের জন্য শুভ সময় অপেক্ষা করে না।"
(নথি সমাপ্ত)
আর্থার ধীরে ধীরে পৃষ্ঠা থেকে চোখ তুলল।
মোমবাতির শিখা কেঁপে উঠছিল।
গ্রন্থাগারের উঁচু দেয়ালগুলো আরও অন্ধকার মনে হচ্ছিল।
দূরে কোথাও রাতের বাতাস জানালার কাঁচে আঘাত করল।
সে কিছুক্ষণ নীরবে বসে রইল।
সেবাস্টিয়ান এখনও পর্যন্ত কিছুই করেনি।
কোনো অপরাধ নয়।
কোনো বিশ্বাসঘাতকতা নয়।
কোনো ষড়যন্ত্রের প্রমাণও নয়।
তবু থমাস হেইলের প্রতিটি পর্যবেক্ষণ অদ্ভুতভাবে তাকে রহস্যের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে যাচ্ছে।
এটাই কি ইতিহাসের প্রথম কৌশল?
কোনো মানুষকে দোষী প্রমাণ করার আগে তাকে রহস্যময় করে তোলা?
আর্থার নিশ্চিত ছিল না।
কিন্তু সে জানত—
আজ রাত দীর্ঘ হতে চলেছে।
খুব দীর্ঘ।
সে ধীরে ধীরে পরের পৃষ্ঠায় হাত বাড়াল।
আর তখনই প্রথমবার একটি নতুন নাম তার চোখে পড়ল।
Queen Eleanor Ashcroft
আর্থারের চোখ স্থির হয়ে গেল।
রাণীর নামের নিচে মাত্র একটি বাক্য লেখা ছিল।
কিন্তু সেই একটি বাক্যই তার ভেতরে অদ্ভুত শীতলতা ছড়িয়ে দিল।
"তিনি কখনো কণ্ঠস্বর উঁচু করতেন না।"
একটি ফাঁকা লাইন।
তারপর—
"এটাই তাকে বিপজ্জনক করে তুলেছিল।"

চলবে....

 Writer  অধ্যায় ২ঃ প্রথম নথিজোনাথন হেইল চলে যাওয়ার পর গ্রন্থাগারটি যেন অদ্ভুতভাবে বদলে গেল।আসলে ঘরটি আগের মতোই ছিল।একই...
27/06/2026


Writer

অধ্যায় ২ঃ প্রথম নথি

জোনাথন হেইল চলে যাওয়ার পর গ্রন্থাগারটি যেন অদ্ভুতভাবে বদলে গেল।
আসলে ঘরটি আগের মতোই ছিল।
একই উঁচু ছাদ।
একই অগণিত বইয়ের তাক।
একই মোমবাতির কাঁপতে থাকা আলো।
তবু কিছু যেন পরিবর্তিত হয়েছে।
হয়তো ঘরটি আরও বড় হয়ে উঠেছে।
অথবা আরও ফাঁকা।
আর্থার নিশ্চিত হতে পারল না।
বৃদ্ধ মানুষটি খুব বেশি কথা বলেননি। অথচ তার প্রস্থান সত্ত্বেও মনে হচ্ছিল, ঘরের কোথাও এখনও তার উপস্থিতির ক্ষীণ ছায়া ভেসে বেড়াচ্ছে।
যেন বহু প্রজন্ম ধরে বহন করে আনা এক প্রাচীন দায়িত্ব অবশেষে কারও হাতে সমর্পণ করে তিনি চলে গেছেন।
আর এখন সেই দায়িত্বের ভার নেমে এসেছে আর্থারের সামনে।
ওক কাঠের টেবিলের উপর বাক্সটি স্থির হয়ে পড়ে ছিল।
নীরব।
অচঞ্চল।
অপেক্ষমাণ।
যেন বহু বছর ধরে এই রাতটির জন্যই অপেক্ষা করে আছে।
আর্থার ধীরে ধীরে হাত বাড়াল।
তার আঙুল বাক্সটির ঢাকনার উপর স্থির হয়ে রইল।
এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো—
বাক্সটি বন্ধই থাকুক।
কিছু রহস্য কি অজানাই থাকা উচিত নয়?
সব সত্য কি জানার জন্যই তৈরি?
চিন্তাটি পরমুহূর্তেই তাকে বিরক্ত করল।
অজ্ঞতা কখনো আশীর্বাদ নয়।
অন্তত একজন রাজার জন্য নয়।
সে চাবিটি তুলে নিল।
পুরোনো ধাতু।
সময়ের ক্ষয়ে ক্ষয়ে নিস্তেজ হয়ে যাওয়া।
অগণিত হাতের স্পর্শে মসৃণ হয়ে ওঠা।
চাবিটি ধীরে ধীরে তালার মধ্যে প্রবেশ করল।
একবার ঘোরাতেই ক্ষীণ একটি শব্দ হলো।
খট।
শব্দটি খুব ছোট।
তবু সেই ক্ষুদ্র শব্দের প্রতিধ্বনি আর্থারের কানে অস্বাভাবিকভাবে স্পষ্ট শোনাল।
যেন প্রাসাদের কোথাও কোনো অদৃশ্য দরজা খুলে গেছে।
যে দরজা বহু বছর ধরে বন্ধ ছিল।
সে ঢাকনাটি তুলে দিল।
ভেতরে সোনা ছিল না।
ছিল না রত্নভর্তি কোনো বাক্স।
ছিল না কোনো হারিয়ে যাওয়া রাজমুকুট কিংবা গোপন যুদ্ধের মানচিত্র।
ভেতরে ছিল কাগজ।
শত শত কাগজ।
চিঠি।
ব্যক্তিগত নোট।
ডায়েরির পৃষ্ঠা।
সরকারি প্রতিবেদন।
আদালতের সাক্ষ্য।
অতীতের বিচ্ছিন্ন স্মৃতি।
কিছু কাগজের কিনারা সময়ের ছোঁয়ায় হলদেটে হয়ে গেছে।
কিছু এতটাই ভঙ্গুর যে সামান্য অসাবধান স্পর্শেই ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যেতে পারে।
আর্থার ধীরে ধীরে সেগুলো দেখতে লাগল।
প্রতিটি আলাদা হাতের লেখা।
আলাদা সময়ের।
আলাদা মানুষের।
যেন কয়েক প্রজন্ম ধরে কেউ ইতিহাসের ছিন্নভিন্ন টুকরোগুলো সংগ্রহ করে এই বাক্সের মধ্যে জমা করে রেখেছে।
তার দৃষ্টি হঠাৎ একটি ভাঁজ করা খামের উপর গিয়ে থামল।
খামটি অন্য সব নথির ওপরে রাখা।
ইচ্ছাকৃতভাবে।
যেন প্রথমে এটিই পড়ার কথা।
আর্থার সেটি তুলে নিল।
খামের উপর কালি দিয়ে লেখা—
To the King of Ashcroft
সে কিছুক্ষণ শব্দগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
এটি তার জন্য লেখা নয়।
তার পিতার জন্যও নয়।
কোনো নির্দিষ্ট মানুষের জন্য নয়।
এটি লেখা হয়েছে সেই ব্যক্তির জন্য—
যে অ্যাশক্রফটের সিংহাসনে বসবে।
সে খামটি খুলল।
ভেতরে ছিল মাত্র একটি পৃষ্ঠা।
পাতার উপরে কোনো নাম নেই।
কোনো তারিখ নেই।
শুধু কয়েকটি বাক্য।
"এই নথিগুলোর ভেতরে তুমি উত্তর পাবে না।
তুমি পাবে মানুষের স্মৃতি।
আর স্মৃতি উত্তর নয়।
স্মৃতি কেবল দাবি করে যে সে সত্য জানে।
তাই যা পড়বে, তা বিশ্বাস করার আগে সন্দেহ করবে।
যা সন্দেহ করবে, তা বাতিল করার আগে আবার পড়বে।
কারণ এই বাক্সের ভেতরে যারা কথা বলেছে, তারা সবাই কিছু না কিছু হারিয়েছিল।
আর যারা সবচেয়ে বেশি হারায়, তারাই প্রায়শই সবচেয়ে জোরে মিথ্যা বলে।"
আর্থার ধীরে ধীরে পৃষ্ঠাটি নামিয়ে রাখল।
অদ্ভুত ভূমিকা।
তার চেয়েও অদ্ভুত সতর্কবাণী।
এটি যেন কোনো ইতিহাসবিদের লেখা নয়।
বরং এমন কারও, যে সত্য খুঁজতে গিয়ে সত্যের ওপর বিশ্বাস হারিয়েছে।
সে আবার বাক্সের দিকে তাকাল।
এবার তার চোখে পড়ল একটি কালো চামড়ার খাতা।
অন্য নথিগুলোর তুলনায় এটি অনেক বেশি যত্নে সংরক্ষিত।
মলাটে কোনো শিরোনাম নেই।
কোনো অলংকরণও নয়।
শুধু প্রথম পাতায় লেখা—
Thomas Hale
Royal Archivist
আর্থার থেমে গেল।
হেইল।
জোনাথন হেইলের বংশের নাম।
তার বুকের ভেতর কৌতূহল আরও তীব্র হয়ে উঠল।
সে খাতাটি খুলল।
প্রথম পাতায় একটি তারিখ।
১২ ডিসেম্বর, ১৮৪৭
নিচে লেখা—
"আমার পেশা আমাকে পর্যবেক্ষণ করতে শিখিয়েছে।
লিখতে শিখিয়েছে।
কিন্তু বিচার করতে শেখায়নি।
তবুও আমি এই নথি লেখা শুরু করছি।
কারণ আমি আশঙ্কা করছি, খুব শিগগিরই এমন এক সময় আসবে যখন মানুষ ঘটনাগুলোকে মনে রাখবে, কিন্তু সত্যকে নয়।"
আর্থার আরও মনোযোগ দিয়ে পড়তে শুরু করল।
কালির দাগগুলো বহু পুরোনো।
তবু শব্দগুলোর মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি এখনও জীবন্ত।
মনে হচ্ছিল লেখকটি যেন ঠিক এই মুহূর্তেই লিখে উঠেছেন।
থমাস হেইল লিখেছেন—
"আজ রাজা জীবিত।
আজ প্রাসাদ অটুট।
আজ দরবার স্বাভাবিক।
আর আজই আমি প্রথমবার ভয় পেয়েছি।"
আর্থারের ভ্রু কুঁচকে গেল।
ভয়?
কিসের?
সে দ্রুত পরের অনুচ্ছেদে চোখ নামাল।
"আমি ভয় পেয়েছি কারণ আজ দুপুরে আমি রাজা এডমন্ড এবং তার ভাই সেবাস্টিয়ানকে একই কক্ষে দেখেছি।
এবং তারা দুজনেই এমনভাবে নীরব ছিল, যেন কোনো কথোপকথন অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে।"
আর্থার পড়া থামাল।
সেবাস্টিয়ান।
অবশেষে নামটি এসে গেছে।
অ্যাশক্রফটের ইতিহাসে যার নাম উচ্চারিত হয় ফিসফিসিয়ে।
যার পরিচয় একটি শব্দেই সীমাবদ্ধ—
বিশ্বাসঘাতক।
সে আবার পড়তে শুরু করল।
"আমি জানি না তারা কী নিয়ে কথা বলছিল।
আমি জানি না তারা আদৌ কথা বলছিল কি না।
কিন্তু আমি নিশ্চিত, সেই কক্ষের ভেতরে এমন কিছু ছিল যা আমি বুঝতে পারিনি।
এবং বহু বছর নথি নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি একটি বিষয় জানি—
মানুষ যখন সত্য লুকায়, তখন তারা কথা বলে।
মানুষ যখন ভয় লুকায়, তখন তারা নীরব হয়ে যায়।"
এরপর কয়েকটি ফাঁকা লাইন।
শূন্য।
নিঃশব্দ।
তারপর একটি মাত্র বাক্য।
অন্য সব লেখার তুলনায় গাঢ় কালি।
যেন লেখার সময় কলমের সঙ্গে সঙ্গে লেখকের হাতও কেঁপে উঠেছিল।
"আমি আশঙ্কা করছি অ্যাশক্রফটের জন্য বিপজ্জনক সময় আসছে।
আর আমি আশঙ্কা করছি সেই সময়ের কেন্দ্রে রয়েছে দুই ভাই।"
আর্থার ধীরে ধীরে খাতাটি বন্ধ করল।
গ্রন্থাগারের নীরবতা আবার তাকে ঘিরে ধরল।
দূরে উত্তর টাওয়ারের ঘড়ি একবার ধ্বনি তুলল।
রাত আরও গভীর হয়েছে।
প্রাসাদের করিডোরগুলো আরও নিস্তব্ধ।
মোমবাতির শিখাগুলো আরও ছোট।
কিন্তু এখন তার ঘুমানোর কোনো ইচ্ছা নেই।
কারণ প্রথম নথিটি তাকে কোনো উত্তর দেয়নি।
বরং আরও প্রশ্ন দিয়েছে।
আর প্রশ্নের সংখ্যা যত বাড়ছিল—
টেবিলের উপর রাখা বাক্সটির ওজন ততই ভারী হয়ে উঠছিল।

চলবে....

  অধ্যায় ১ঃ শেষ রাতের উত্তরাধিকারউত্তর টাওয়ারের প্রাচীন ঘড়িটি যখন মধ্যরাত্রির দ্বাদশ ধ্বনি আকাশে ছড়িয়ে দিল, তখন অ্য...
26/06/2026



অধ্যায় ১ঃ শেষ রাতের উত্তরাধিকার

উত্তর টাওয়ারের প্রাচীন ঘড়িটি যখন মধ্যরাত্রির দ্বাদশ ধ্বনি আকাশে ছড়িয়ে দিল, তখন অ্যাশক্রফট প্রাসাদের অধিকাংশ জানালা বহু আগেই অন্ধকারে ডুবে গেছে।
শতাব্দীপ্রাচীন পাথরের দেয়ালগুলো নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল, যেন তারা অসংখ্য রাজা, যুদ্ধ, ষড়যন্ত্র ও শোকের স্মৃতি নিজেদের বুকের মধ্যে গোপন করে রেখেছে।
সেই অসীম অন্ধকারের মধ্যে কেবল একটি জানালায় আলো জ্বলছিল।
রাজকীয় গ্রন্থাগারের জানালায়।
আগামী প্রভাতে রাজপুত্র আর্থারের অভিষেক।
অ্যাশক্রফটের ইতিহাসে শতাধিক বছর ধরে একটি প্রাচীন রীতি চলে আসছে—অভিষেকের আগের রাত উত্তরাধিকারীকে একাকী কাটাতে হয়।
কোনো ভোজসভা নয়।
কোনো বাদ্যযন্ত্রের উৎসব নয়।
কোনো মন্ত্রী, উপদেষ্টা কিংবা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গ নয়।
শুধু সে।
রাজবংশের দীর্ঘ ইতিহাস।
আর নীরবতা।
এত গভীর নীরবতা, যা কখনো কখনো মানুষের নিজের চিন্তার চেয়েও বেশি ভারী হয়ে ওঠে।
এই রীতির উৎপত্তি কেউ জানত না।
প্রাসাদের বহু পুরোনো নিয়মের মতো এটিও টিকে ছিল কেবল একটি কারণেই—
এটি সবসময় ছিল।
গ্রন্থাগারের কেন্দ্রে স্থাপিত দীর্ঘ ওক কাঠের টেবিলের পাশে বসে ছিল আর্থার।
তার সামনে খোলা ছিল গাঢ় চামড়ায় বাঁধানো এক বিশাল গ্রন্থ।
অ্যাশক্রফটের ইতিহাস।
পাতাগুলো সময়ের স্পর্শে হলদেটে হয়ে গেছে।
প্রান্তগুলো ক্ষয়ে গেছে বহুবার উল্টে দেখার ফলে।
তবু কালির আঁচড়গুলো এখনও অদ্ভুত দৃঢ়তায় টিকে আছে।
মনে হয়, যারা এগুলো লিখেছিল, তারা নিশ্চিত ছিল—
তাদের লেখা কথাগুলোই শেষ পর্যন্ত সত্য বলে গণ্য হবে।
গ্রন্থাগারের উঁচু জানালার বাইরে রাতের বাতাস প্রবাহিত হচ্ছিল।
দূরে কোথাও কোনো বৃক্ষের শুষ্ক ডাল পাথরের গায়ে ঘষা খেয়ে মৃদু আঁচড় কাটছিল।
সেই শব্দে প্রাসাদটিকে আরও পুরোনো, আরও নিঃসঙ্গ মনে হচ্ছিল।
আর্থার চোখ নামিয়ে আবার পড়তে শুরু করল।
রাজা।
যুদ্ধ।
সন্ধি।
বিদ্রোহ।
রাজকীয় বিবাহ।
মৃত্যু।
একেকটি নাম যেন ইতিহাসের পাতায় নয়, বরং গ্রানাইট পাথরে খোদাই করা।
এই গ্রন্থের দাবি অনুযায়ী, অ্যাশক্রফটের ইতিহাসে কোনো রাজা কখনো ভুল করেননি।
অন্তত বইটি তাই বলে।
আর্থারের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটল।
মানুষ ভুল করে।
রাজারা সম্ভবত আরও বেশি।
কিন্তু ইতিহাস প্রায়ই নিজের প্রভুদের ভুলগুলো মনে রাখতে পছন্দ করে না।
ঠিক তখনই ঘরের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে একটি শব্দ শোনা গেল।
দরজায় টোকা নয়।
বরং যেন বহু শতাব্দী পুরোনো কাঠের দরজাটি নিজেই দীর্ঘ নিদ্রা ভেঙে ধীরে ধীরে নড়ে উঠেছে।
আর্থার মাথা তুলল।
গ্রন্থাগারের একমাত্র দরজাটি ধীরগতিতে খুলে গেল।
করিডোরের ম্লান আলো দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল।
আর সেই আলোয় একজন বৃদ্ধ মানুষের অবয়ব ফুটে উঠল।
তিনি দীর্ঘদেহী।
কিন্তু বয়স তার কাঁধকে কিছুটা নত করে দিয়েছে।
চুল সম্পূর্ণ শুভ্র।
মুখে সময়ের অসংখ্য রেখা।
আর চোখদুটি—
অস্বাভাবিকভাবে স্থির।
যেন বহুদিন ধরে এমন কিছু দেখেছেন, যা অন্য কারও দেখা উচিত ছিল না।
তার হাতে ছিল একটি কাঠের বাক্স।
আর্থার তাকে সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারল।
জোনাথন হেইল।
রাজকীয় আর্কাইভের রক্ষক।
যতদূর তার স্মৃতি যায়, এই মানুষটিকে সে বইয়ের তাকের মাঝেই দেখে এসেছে।
মনে হতো, প্রাসাদের প্রাচীন দেয়াল, ধূলিধূসর পাণ্ডুলিপি এবং জোনাথন হেইল—সবই যেন একই যুগের সৃষ্টি।
"মিস্টার হেইল?"
বৃদ্ধ মানুষটি কোনো উত্তর দিলেন না।
তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন।
কোনো প্রণাম নয়।
কোনো আনুষ্ঠানিক সম্ভাষণ নয়।
কোনো ব্যাখ্যাও নয়।
শুধু নীরবে এসে বাক্সটি টেবিলের উপর রাখলেন।
শব্দটি আশ্চর্যরকম ভারী শোনাল।
যেন কাঠের চেয়ে তার ভেতরের গোপনীয়তার ওজন বেশি।
আর্থারের দৃষ্টি বাক্সটির উপর স্থির হলো।
গভীর কালো কাঠ।
পিতলের প্রান্ত।
মাঝখানে একটি পুরোনো তালা।
কোনো রাজচিহ্ন নেই।
কোনো নাম নেই।
কোনো পরিচয় নেই।
শুধু সময়ের ক্ষতচিহ্ন।
"এটা কী?"
আর্থার জিজ্ঞেস করল।
জোনাথন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন না।
বরং ধীরে ধীরে চারদিকে তাকালেন।
যেন নিশ্চিত হতে চাইছেন, তাদের কথোপকথন আর কারও কানে পৌঁছাবে না।
অথবা হয়তো নিশ্চিত হতে চাইছেন—
ঘরটি এখনও আগের মতোই আছে।
অবশেষে তিনি বললেন,
"এটি আপনার জন্য।"
"আমার জন্য?"
"আজ রাতের জন্য।"
আর্থারের ভ্রু কুঁচকে গেল।
"আমি বুঝতে পারছি না।"
"আমিও না।"
উত্তরটি এতটাই অপ্রত্যাশিত ছিল যে আর্থার কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ রইল।
জোনাথনের দৃষ্টি তখনও বাক্সটির উপর নিবদ্ধ।
"আমার বাবা আমাকে এটি দিয়েছিলেন।"
তিনি ধীরে ধীরে বললেন।
"তার বাবা তাকে দিয়েছিলেন।"
"আর তারও আগে।"
গ্রন্থাগারের মোমবাতির শিখা সামান্য কেঁপে উঠল।
আর্থার ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসল।
"কতদিন ধরে?"
জোনাথন কয়েক মুহূর্ত ভেবে উত্তর দিলেন।
"অনেকদিন।"
শব্দ দুটি এমনভাবে উচ্চারিত হলো, যেন প্রকৃত সংখ্যাটি তিনি জানেন, কিন্তু বলতে চান না।
অথবা হয়তো কখনো গুনেই দেখেননি।
বাইরে বাতাস আরও জোরে বইতে শুরু করল।
উঁচু জানালাগুলোর কাঁচ কেঁপে উঠল।
আর্থার আবার বাক্সটির দিকে তাকাল।
"এর ভেতরে কী আছে?"
"নথি।"
"কীসের নথি?"
"আমি জানি না।"
আর্থার হাসল।
"আপনি জানেন না?"
"না।"
"আপনি কখনো খুলে দেখেননি?"
"না।"
"কেন?"
এবার উত্তর এল কোনো বিলম্ব ছাড়াই।
"কারণ আমাকে নিষেধ করা হয়েছিল।"
আর্থারের হাসি মিলিয়ে গেল।
বৃদ্ধ মানুষের কণ্ঠে কোনো নাটকীয়তা ছিল না।
তিনি এমনভাবে বললেন, যেন এটি জীবনের সবচেয়ে সাধারণ সত্য।
তবুও কথাটির মধ্যে এমন কিছু ছিল, যা অস্বস্তিকরভাবে ঘরের বাতাসকে ভারী করে তুলল।
টেবিলের পাশে তখন আর্থারের চোখে পড়ল একটি ছোট চাবি।
সম্ভবত এতক্ষণ সেটি তার নজর এড়িয়ে গিয়েছিল।
চাবিটি পুরোনো।
রূপালি আভা বহু আগেই মুছে গেছে।
"আজ রাতে কেন?"
জোনাথন এবার প্রথমবারের মতো সরাসরি তার চোখের দিকে তাকালেন।
"কারণ আগামীকাল আপনি রাজা হবেন।"
কথাটি উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন গ্রন্থাগারের বাতাসের রূপ বদলে গেল।
শব্দগুলো খুব সাধারণ ছিল।
তবু সেগুলো ঘরের নীরবতার মধ্যে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ল, যেন কোনো অদৃশ্য ঘণ্টাধ্বনি পাথরের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
ভারী।
অপরিহার্য।
অস্বস্তিকরভাবে বাস্তব।
হঠাৎ করেই আর্থারের মনে হলো, এতদিন ধরে সবাই যে ভবিষ্যতের কথা বলছিল, সেটি আর ভবিষ্যৎ নয়।
এটি এখন তার দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে।
আগামীকাল।
আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা।
তারপর অ্যাশক্রফটের প্রতিটি সৈনিক, প্রতিটি মন্ত্রী, প্রতিটি সাধারণ মানুষ তার দিকে তাকিয়ে থাকবে।
মুকুটের দিকে নয়।
তার দিকে।
আর্থার কিছু বলল না।
জোনাথনও নীরব রইলেন।
দুজন মানুষের মাঝখানে তখন শুধু মোমবাতির আলো আর সেই রহস্যময় বাক্সটি।
অবশেষে বৃদ্ধ মানুষটি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালেন।
তার দীর্ঘ ছায়া পাথরের মেঝের উপর সরে গেল।
"আপনি যাচ্ছেন?"
আর্থারের কণ্ঠ নীরবতার মধ্যে অদ্ভুতভাবে স্পষ্ট শোনাল।
জোনাথন দরজার কাছে গিয়ে থামলেন।
তার হাত কয়েক মুহূর্ত দরজার ব্রোঞ্জের হাতলে স্থির রইল।
মনে হলো, তিনি যেন কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
অথবা এমন কিছু বলবেন কি না ভাবছেন, যা বহু বছর ধরে কেউ উচ্চারণ করেনি।
গ্রন্থাগারের উঁচু জানালার বাইরে বাতাস গর্জে উঠল।
মোমবাতির শিখাগুলো কেঁপে উঠল।
বৃদ্ধ মানুষটি ধীরে ধীরে ফিরে তাকালেন।
তার চোখে এমন এক দৃষ্টি ছিল, যা আর্থার আগে কখনো দেখেনি।
সেখানে ভয় ছিল না।
তবু নিশ্চিন্ততাও ছিল না।
"আগামীকাল আপনার মাথায় মুকুট উঠবে।"
আর্থার অপেক্ষা করল।
জোনাথনের কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে এল।
যেন তিনি ঘরটিকেও শুনতে দিতে চান না।
"কিন্তু আজ রাতে আপনার সামনে রয়েছে এমন কিছু..."
তিনি থামলেন।
"...যার সামনে সমস্ত মুকুট সমান অসহায়।"
কথাগুলো শেষ হওয়ার পর মনে হলো, পুরো গ্রন্থাগার যেন আরও নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।
দেয়ালজুড়ে সাজানো শত শত বছরের ইতিহাস।
অসংখ্য রাজা।
অসংখ্য বিজয়।
অসংখ্য যুদ্ধ।
সবকিছু যেন হঠাৎ করেই গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে।
কেউ আর কিছু বলল না।
কয়েক মুহূর্ত পরে জোনাথন হেইল দরজাটি খুললেন।
তারপর নিঃশব্দে করিডোরের অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন।
দরজাটি ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে এল।
পুরোনো কব্জাগুলো ক্ষীণ শব্দ করল।
তারপর আবার নীরবতা।
গভীর।
দীর্ঘ।
প্রায় অস্বস্তিকর।
এখন আর্থার একা।
সম্পূর্ণ একা।
তার সামনে টেবিলের উপর কালো কাঠের বাক্সটি।
তার পাশে সেই প্রাচীন চাবি।
আর চারপাশে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সঞ্চিত অ্যাশক্রফটের ইতিহাস।
দূরে উত্তর টাওয়ারের ঘড়ির যন্ত্র ধীরে ধীরে চলছিল।
ধাতব চাকার ক্ষীণ শব্দ।
সময়ের নিরবচ্ছিন্ন পদচারণা।
নীরবে।
অবিরাম।
অপ্রতিরোধ্যভাবে।
আর্থার ধীরে ধীরে হাত বাড়াল।
তার আঙুল বাক্সটির গায়ে স্পর্শ করল।
কাঠটি অস্বাভাবিক ঠান্ডা।
এমন ঠান্ডা, যেন এটি কয়েক ঘণ্টা নয়, কয়েক শতাব্দী ধরে সূর্যের আলো দেখেনি।
সে হাত সরিয়ে নিল না।
কিছুক্ষণ শুধু স্পর্শ করে রইল।
মনে হলো, বাক্সটির ভেতরে নিঃশব্দে লুকিয়ে আছে বহুদিনের কোনো অপেক্ষা।
অবশেষে সে চাবিটি তুলে নিল।
মোমবাতির আলোয় ধাতব পৃষ্ঠে ক্ষীণ ঝিলিক দেখা দিল।
চাবিটির গায়ে সময়ের দাগ।
অগণিত বছরের ক্ষয়।
তবু এখনও অক্ষত।
যেন এটিও কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তের জন্য সংরক্ষিত ছিল।
আর্থার কিছুক্ষণ সেটির দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে তালার দিকে এগিয়ে দিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে তার চোখে পড়ল একটি অদ্ভুত বিষয়।
বাক্সটির নিচের অংশে, কাঠের গায়ে, প্রায় মুছে যাওয়া কিছু অক্ষর।
এত ক্ষুদ্র যে সাধারণ দৃষ্টিতে সেগুলো চোখেই পড়ার কথা নয়।
আর্থার থেমে গেল।
চাবিটি আবার টেবিলের উপর রাখল।
বাক্সটি নিজের দিকে টেনে আনল।
মোমবাতির শিখা কাছে নিয়ে এল।
তারপর ঝুঁকে পড়ল।
আঙুল দিয়ে ধুলোর স্তর সরাল।
সময়ের জমে থাকা সূক্ষ্ম ধূসর আবরণ ধীরে ধীরে সরে গেল।
আর তার নিচে ফুটে উঠল কয়েকটি বিবর্ণ অক্ষর।
আর্থার মনোযোগ দিয়ে পড়ল।
মাত্র তিনটি শব্দ।
For The Next King.
পরবর্তী রাজার জন্য।
এক মুহূর্তের জন্য সে স্থির হয়ে রইল।
তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি জেগে উঠল।
এটি ভয় নয়।
কৌতূহলও নয়।
বরং দুটোর মাঝামাঝি কোনো অচেনা অনুভূতি।
কারণ বাক্সটি যে-ই তৈরি করুক, সে জানত—
একদিন এটি কোনো রাজার হাতে পৌঁছাবে।
কোনো নির্দিষ্ট রাজার নয়।
কোনো নির্দিষ্ট সময়ের নয়।
শুধু—
পরবর্তী রাজা।
আর সেই দিনের জন্য কেউ অপেক্ষা করে গেছে।
বছরের পর বছর।
দশকের পর দশক।
সম্ভবত শতাব্দীর পর শতাব্দী।
কিসের জন্য?
আর্থার জানত না।
কিন্তু উত্তর টাওয়ারের ঘড়ি তখন মধ্যরাত্রি পেরিয়ে এক মিনিট ঘোষণা করেছে।
আর তার হাতে ছিল সেই চাবি—
যে চাবি হয়তো এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে কোনো তালায় প্রবেশ করেনি।

চলবে...

Address

Rayerbag, Kadamtali Thana, Mohammad Bug Chawrasta
Dhaka

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when শব্দের সিন্দুক posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share

Category