01/08/2026
খাওয়ার টেবিলে ভুল করে আমি আমার স্বামীর গ্লাস থেকে পানি খেয়ে ফেলেছিলাম। সে একদম স্বাভাবিকভাবে গ্লাসটা তুলে নিয়ে সরাসরি ডাস্টবিনে ফেলে দিল। আমার মায়ের মুখ সাথে সাথেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। “আরিফ, এটা কী করলে তুমি?” সে কোনো উত্তর দিল না। শান্তভাবে আরেকটা গ্লাসে পানি ঢেলে নিল। আমি অপমানটা গিলে ফেলে জোর করে হালকা একটা হাসি দিয়ে বললাম, “মা, কিছু না… ও একটু বেশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে পছন্দ করে।”
চারপাশের সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। কারণ তারা কখনো শুনেনি যে প্রফেসর আরিফ হোসেনের এমন কোনো অভ্যাস আছে। কিন্তু আমি জানি, এই ‘শুচিবায়ু’ শুধু আমার জন্যই বরাদ্দ। লাল বাতি জ্বলে উঠলে যেমন গাড়ি থেমে যায়, আমার প্রতি আরিফের আবেগও ঠিক তেমনি কোথাও একটা থমকে আছে।
বাসায় ফেরার পুরোটা পথ আরিফ একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি। গাড়ির ভেতরে এসির যান্ত্রিক শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছিল না। জানালার বাইরে ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো দ্রুত পেছনে সরে যাচ্ছে, ঠিক যেন আমার জীবনের শেষ কয়েকটা বছর। আরিফ যখন ড্রাইভ করে, তখন তার চোয়াল শক্ত থাকে। সে সামনের রাস্তার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকে যেন সেখানে তার পরম আরাধ্য কোনো সত্য লুকিয়ে আছে। আর পাশে বসে থাকা আমি? আমি সম্ভবত তার গাড়ির ড্যাশবোর্ডে রাখা কোনো নিষ্প্রাণ শোপিস।
মাঝপথে ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। মায়ের মেসেজ— “মা, তুই কি এতদিন কষ্টে ছিলি?”
বুকের ভেতরটা হঠাৎ হু হু করে উঠল। কষ্ট? এই শব্দটা কি আমার জীবনের সাথে খাপ খায়? আরিফ আমাকে প্রাচুর্য দিয়েছে। তার বেতনের পুরো টাকাটা মাসের এক তারিখে আমার হাতে তুলে দেয়। আমাকে কখনো খরচের হিসাব দিতে হয় না। কিন্তু এই প্রাচুর্যের আড়ালে যে মরুভূমি আছে, সেটা মা আজ প্রথম টের পেলেন। গত তিন চার বছরে আরিফ আমাকে একটা গোলাপ ফুলও কিনে দেয়নি। ঈদ বা বিবাহবার্ষিকীতে তার বরাদ্দকৃত বাক্য একটাই— “যা লাগবে নিজেই কিনে নাও। এসব আদিখ্যেতা আমি বুঝি না।”
আমি টাইপ করলাম, “মা, কিছু না। ওর প্রমোশনের চাপ চলছে। আমি ভালো আছি।” মিথ্যা বলতে বলতে আমি এখন দক্ষ অভিনেতা। অথচ আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজের চোখের নিচে কালচে দাগগুলো বলে দেয়, আমি ভালো নেই।
বাসায় ঢুকেই আরিফ সরাসরি চলে গেল ড্রইংরুমের পাশের ছোট ঘরটায়। ওটা এখন ‘লুনার’ ঘর। লুনা হচ্ছে আরিফের প্রিয় ছাত্রী কিয়ারার বিড়াল। কিয়ারা যখন বিদেশে যাওয়ার কথা বলছিল, তখন আরিফ নিজে যেচে লুনাকে আমাদের বাসায় রাখার প্রস্তাব দিয়েছিল। অথচ আমি যখন একবার একটা বারান্দা বাগান করতে চেয়েছিলাম, সে সরাসরি নাকচ করে দিয়ে বলেছিল, “কাদা-মাটি আমার সহ্য হয় না।”
আমি দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখলাম, আরিফ খুব যত্ন করে লুনাকে কোলে তুলে নিচ্ছে। তার মুখে সেই দুর্লভ হাসি, যা আমি গত এক বছরে দেখিনি। সে বিড়ালটার কানে কানে কী যেন বলছে। যে মানুষটা আমি ভুল করে তাকে ছুঁয়ে ফেললে সাবান দিয়ে হাত ধুতে যায়, সেই মানুষটাই একটা পশুর লোমে মুখ ঘষছে।
আমার মনে পড়ল তিন বছর আগের সেই অভিশপ্ত রাতের কথা। হাসপাতালের সাদা বিছানায় যখন আমি আমার অনাগত সন্তানকে হারানোর যন্ত্রণায় ছটফট করছিলাম, আরিফ তখন পাশের চেয়ারে বসে ল্যাপটপে তার রিসার্চ পেপার ঠিক করছিল। আমি তার হাতটা ধরতে চেয়েছিলাম। সে আলতো করে হাতটা সরিয়ে নিয়ে বলেছিল, “কাঁদাকাটি করে শরীর আরও খারাপ কোরো না। আর শোনো, আমি আসলে বাবা হতে চাইনি। হয়তো যা হয়েছে, ভালোই হয়েছে।”
সেইদিন আমার ভেতরকার একটা অংশ ম*রে গিয়েছিল। আজ লুনার প্রতি তার মমতা দেখে সেই মৃ*ত অংশটা আবার চিৎকার করে কাঁদতে চাইল।
“লুনা, মাম্মাকে হাই বলো,” আমি ঘরে ঢুকে শান্ত গলায় বললাম।
আরিফ সাথে সাথে ফিরে তাকাল। তার চোখের সেই কোমলতা মুহূর্তেই কঠোরতায় রূপ নিল।
“তুমি এখানে কেন? আমি বলেছি না লুনা অপরিচিত মানুষ দেখলে ভ*য় পায়? তুমি বাইরে যাও।”
আমি নড়লাম না। শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে বললাম, “এই বাসাটা আমারও আরিফ। আর লুনার জন্য যে রুমটা তুমি ছেড়ে দিয়েছ, ওটা আমাদের বাচ্চার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল। মনে আছে?”
আরিফ বিড়ালটাকে নিচে নামিয়ে রাখল। তারপর ধীর পায়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। তার গায়ের সেই চিরচেনা পারফিউমের ঘ্রাণ আমার নাকে এল, যা একসময় আমাকে মুগ্ধ করত। কিন্তু আজ সেই ঘ্রাণে কেবল অবহেলার গন্ধ।
“অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা তোমার পুরনো অভ্যাস। আমি ক্লিয়ারলি বলেছিলাম, আমি বাচ্চা চাই না। তুমিই জোর করে প্রজেক্টটা এগিয়ে নিতে চেয়েছিলে। সো, ডোন্ট ব্লেম মি।”
সে আমাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল। আমি তার হাতটা ধরার চেষ্টা করলাম। কিন্তু সে বিদ্যুৎবেগে হাতটা সরিয়ে নিল। তার চোখেমুখে চরম বিতৃষ্ণা।
“আবার? কতবার বলেছি আমাকে টাচ করবে না?”
সে গটগট করে বাথরুমের দিকে চলে গেল। কিছুক্ষণ পরেই কল ছাড়ার শব্দ এল। সে হাত ধুচ্ছে। সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে আমার অস্তিত্ব মুছে ফেলছে।
আমি খাটের কোণায় ধপ করে বসে পড়লাম। জানালার বাইরে অন্ধকার আকাশ দেখা যাচ্ছে। মা সবসময় বলতেন, “তুই খুব ভাগ্যবতী যে আরিফের মতো একজন শিক্ষিত এবং স্বাবলম্বী স্বামী পেয়েছিস।”
আজ আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে— মা, এই ভাগ্য আমি আর চাই না। এই শিক্ষিত মানুষটার ভেতরে একটা বরফখণ্ড বাস করে, যা প্রতিদিন আমাকে একটু একটু করে জমিয়ে দিচ্ছে।
হঠাৎ ফোনটা আবার কেঁপে উঠল। কিয়ারার মেসেজ আরিফের ফোনে। লক স্ক্রিনে ভেসে উঠল— “স্যার, লুনা কি ঠিকমতো খেয়েছে? থ্যাংক ইউ সো মাচ সবকিছুর জন্য।”
আমি ফোনটার দিকে তাকিয়ে হাসলাম। চোখের জল গাল বেয়ে টুপ করে ফোনের স্ক্রিনে পড়ল। আরিফ বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে তোয়ালে দিয়ে হাত মুছতে মুছতে বলল, “কাল সকালে কিয়ারা আসবে লুনাকে দেখতে। ঘরটা যেন পরিষ্কার থাকে। ওর যেন কোনো অসুবিধা না হয়।”
আমি কোনো উত্তর দিলাম না। শুধু মনে মনে বললাম— কালকের সকালটা অন্যরকম হবে আরিফ। অনেক বেশি অন্যরকম...
চলবে...
#মনের_দেয়াল
পর্ব ০১
লেখক The_Story_Haven
আজকে রাতেই দ্বিতীয় পর্ব পড়তে চাইলে কমেন্ট করুন।তাহলে দ্বিতীয় পর্ব পোস্ট করার সাথে সাথে নোটিফিকেশন পাবেন।