03/06/2026
বই পড়া বলতে আমাদের দেশের মানুষ সাধারণত 'পাঠ্যবই পড়াকেই' বুঝে। ক্লাসের সীমিত পরিসরের নির্দিষ্ট কিছু বইয়ের বাইরে গোটা বিশ্বসাহিত্যজগৎ আমাদের বাবা-মায়েদের কাছে 'আউটবই' এবং অপ্রয়োজনীয় হিসেবেই বিবেচ্য। তাই লাভ-লসের হিসাবে পাকা অভিভাবকেরা বুঝেন যে, যেইসব বই পড়লে রেজাল্ট ভালো হবে এমন গ্যারেন্টি নাই; এমনকি ভবিষ্যতে ভালো চাকরীরও নিশ্চয়তা নাই সেসব বই অকেজো এবং অদরকারি। এসব আউটবই কেনা যেমন অহেতুক টাকার অপচয় তেমনি এগুলো সময়েরও অপচয়। তাদের ভাবখানা এমন যেন, এইসব 'আউট বই' না পড়ে এই সময়ে শিশুদের তারা অন্যকোন মহান কাজে যুক্ত করছেন প্রতিনিয়ত। আদতে বাস্তবতা পুরোই আলাদা। তাই অবসর সময়ে শিশুরা আজকাল মোবাইল কিংবা এইধরণের ডিভাইসে আসক্ত হয়ে পড়ছে ক্রমাগত। অথচ, ডিভাইসের অপকারিতার ফলাফল ক্রমাগত আমাদের চোখের সামনেই ভেসে বেড়াচ্ছে। তখন অবশ্য এইসব অভিভাবকেরাই আবার চুকচুক শব্দ করে বলেন- ' আমাদের সময়েই ভালো ছিলো। এখন তো সব শেষ। ' এই কথা বলার ক্ষেত্রে একবারও তারা ভাবেন না, তাদের ভালো সময়ের উপকরণ কি কি ছিলো, যা এখন তারা তাদের সন্তানদের দিচ্ছেন না।
স্কুল কিংবা কলেজে শিশুরা শেখে পড়ালেখার অভ্যাস, সামাজিকতা আর নিয়ম-শৃং্খলা। কিন্তু আমাদের দেশীয় বাস্তবতায় স্কুল-কলেজ হয়েছে নির্দিষ্ট কিছু বই গলধ:করণ প্রক্রিয়ার অন্যতম মাধ্যম। ফলে, শিশুরা ছকে বাধা পড়ার বই মুখস্ত করতে করতে একটা সময়ে পড়াশুনাকেই মনে করে বিরক্তিকর; পাশাপাশি 'আউটবই' পড়ার অনভ্যাসের কারনে বই এবং তারপ্রতি আগ্রহও হারিয়ে ফেলে প্রতিনিয়ত। আর বর্তমানে এই আউটবই-এর সময়টুকু রিপ্লেস হচ্ছে ডিভাইসে। যার ফলশ্রুতিতে, সবার আগে নষ্ট হয়ে যায় তাদের 'ইমাজিনেশন'!!!
একটা ছোট গল্প বা রূপকথা, সেই গল্প বাবা-মা,নানী-দাদী, নানা-দাদা, মামা-খালা যেই হোক না কেন যখনই পড়ে শুনায় শিশু অই গল্পের সাথে সাথে নিজেকে বা অই পরিস্থিতিকে ভাবতে শুরু করে। কখনো রাক্ষসের সাথে যুদ্ধে নিজেকেই যোদ্ধা ভাবে, আবার কখনো বা ছোট্ট রাজপুত্রদের ভেসে যাওয়ার কষ্টে নিজেই কেদে উঠে। এই যে গল্পে গল্পে শিশু তার আবেগ ও অনুভূতিকে নিয়ে ডিল করতে শিখে, শব্দমায়ার কল্পনায় রাক্ষস-খোক্ষস- পক্ষীরাজ ঘোড়া সবকিছু ভেবে নিচ্ছে- এরমাধ্যমেই একটি শিশু পরবর্তী জীবনে অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল, অনুভূতি ও কল্পনাপ্রবণ হয়ে উঠতে পারে। আর এই মানবীয় বৈশিষ্ট্যই এই সময়ের সবচেয়ে মূল্যবান ও দুষ্প্রাপ্য গুণাবলী।
আজকাল ডিগ্রীধারীর সং্খ্যা বাড়ছে বটে, কিন্তু কমে যাচ্ছে যেন মানবিক মানুষের সং্খ্যা। এর অন্যতম একটি কারন, আমাদের অভিভাবকেরা শিশুদের কেবল স্বার্থান্বেষী ও হিসেবী করে তুলছে ক্রমাগত। তা বই পড়ার ক্ষেত্রেই হোক কিংবা প্রকৃতির ক্ষেত্রেই হোক। যেমনটা বলেছি আগে, আউটবই-এ লাভ নাই তেমন(প্রত্যক্ষ) তাই এইসব পড়া লস। এই তাৎক্ষণিক লাভের হিসাব গুণতে গুণতে এইসব অভিভাবকেরা টেরই পায় না যে, সুদূর ভবিষ্যততে তাদের নিয়েও আজকের শিশুরা লাভ-লসের হিসাবই গুণবে।
ক্রমাগত অমানবিক হয়ে ওঠা এই পৃথিবীকে যদি সত্যিকার অর্থে মানবিক বানাতে হয়, তবে শিশুদের যতবেশি সম্ভব এই 'আউটবই'-এর প্রতি আকৃষ্ট করানোর কোন বিকল্প নেই।