Barua Prokash

Barua Prokash Buddhist

04/06/2026

সাসনস্স চ লোকস্স বুড্ঢী ভবতু সব্বদা
সাসনম্পি চ লোকঞ্চ, দেবা রক্খন্তু সব্বদা।
সদ্ধিং হোন্তু সুখী সব্বে, পরিবারেহি অত্তনো
অনীঘা সুমনা হোন্তু, সহ সব্বেহি ঞাতীভি।
অর্থাৎ
ধর্ম ও জগতের সর্ব্বদা শ্রীবৃদ্ধি হউক। দেবগণ, ধর্ম ও জগতকে সর্ব্বদা রক্ষা করুন। সকলে স্ব স্ব পরিবার ও জ্ঞাতিবর্গের সহিত শারীরিক ও মানসিক সুখী ও দুঃখহীন হউক।আমাদের দ্বারা যা কিছু পুণ্য সঞ্চয় করা হলো তা জ্ঞাতিগণ অনুমোদন করে সুখী হোক।
উচ্চ স্থান হতে জলধারা যেরূপ নিম্নদিকে প্রবাহিত হয়, সেরূপ আমাদের সঞ্চিত পুণ্যরাশিও পরলোকে প্রেতদের নিকট উৎপন্ন হোক।
ক্ষুদ্র নদী সমূহ চতুর্দিক হতে জলধারা বহন করে যেরূপ মহাসাগরকে পরিপূর্ণ করে সেরূপ আমাদের কৃত পুণ্যরাশিও পরলোকগত জ্ঞাতি প্রেতগণের অভাব অভিযোগ দূর করুক।
এ যাবৎ আমরা যে পুণ্য সম্পদ সঞ্চয় করেছি তা সর্বার্থসিদ্ধির নিমিত্ত সকল দেবতা, সত্ত্ব ও প্রাণিগণ অনুমোদন করুন।
মহাঋদ্ধিসম্পন্ন আকাশবাসী ও ভূমিবাসী দেবতাগণ এই পুণ্য অনুমোদন করে বুদ্ধের শাসন, বুদ্ধের উপদেশ, আমাকে অপরাপর সকল প্রাণীকে রক্ষা করুন।
এই পুণ্যকর্ম প্রভাবে আমার সাথে মূর্খ সমাগম না হোক। যাবত নির্বাণ সাক্ষাৎ না করি, ততদিন পর্যন্ত সৎসঙ্গের সাথে সমাগম হোক। এই পুণ্য আমার নির্বাণ লাভের হেতু হোক।
এই বসুন্ধরা ও দেবভূমি হতে যারা এখানে সমাগত হয়েছ তোমরা সকলে আমার কুশল কর্ম জ্ঞাত হও। হে বসুন্ধরা তুমি সাক্ষী হও।

30/05/2026

এই পৃথিবীতে,এই চক্রবালে সীমান্ত রক্ষাকারী দেবতা ও দেবরাজগন সহ সকল সত্বগন শত্রুহীন হোক, বিপদহীন হোক,কায়িক মানসিক দুঃখহীন হোক,সুখে বাস করুক,দুঃখ থেকে মুক্ত হোক, প্রাপ্ত সম্পত্তি ভোগে বঞ্চিত না হোক,সত্বগন কর্মের অধীন।পুর্বদিকে, দক্ষিনদিকে, পশ্চিমদিকে, উত্তরদিকে পুর্বকোণে, দক্ষিনকোণে, পশ্চিমকোণে, উত্তরকোণে, উর্ধদিকে, নিম্মদিকে সকল সত্ব সকল প্রাণী সকল ভুত,সকল ব্যক্তি, সকল তির্যকপ্রাণী, সকল নারী,সকল পুরুষ,সকল আর্য,সকল অনার্য,সকল দেবতা,সকল মনুষ্য,সকল অমনুষ্য,চার অপায়ের সকল সত্বগন শত্রুহীন হোক,বিপদহীন হোক,কায়িক মানসিক দুঃখহীন হোক,সুখে বাস করুক,দুঃখ থেকে মুক্ত হোক,যথালব্ধ সম্পত্তি হতে বঞ্চিত না হোক,কর্মই একমাত্র নিজস্ব।পুর্বদিকে যে সকল ঋদ্ধিমান গন্ধর্বগন, দক্ষিনদিকে যে সকল ঋদ্ধিমান কুম্ভগন,পশ্চিমদিকে যে সকল ঋদ্ধিমান নাগগন,উত্তরদিকে যে সকল ঋদ্ধিমান যক্ষগন আছেন তারা আমাকে/আমাদেরকে বিপদআপদ,কায়িক-মানসিক দুঃখ নিরাময় ও সুখে রক্ষা করুন।
সুমেরু পর্বতের পুর্বদিকে ধৃতরাস্ট্র, দক্ষিনদিকে বিরূঢ়ক, পশ্চিমদিকে বিরূপাক্ষ এবং উত্তরদিকে কুবের। এই চারিজন যশস্বী লোকপাল মহারাজ দেবতা আছেন।তাহাঁরা আমাকে/আমাদেরকে বিপদআপদ,কায়িক মানসিক দুঃখ নিরাময় ও সুখে রক্ষা করুন।
আকাশবাসী ও ভুমিবাসী যে সকল ঋদ্ধিমান দেবতা নাগগন আছেন তাহাঁরা আমাকে/আমাদেরকে বিপদআপদ, দুঃখ নিরাময় ও সুখে রক্ষা করুন।বুদ্ধশাসন রক্ষাকারী যে সকল ঋদ্ধিমান দেবতাগন আছেন তাহাঁরা আমাকে/আমাদের বিপদ-আপদ,দুঃখ নিরাময় ও সুখে রক্ষা করুন।নক্ষত্র,যক্ষ,ভুত,পাপগ্রহ প্রভৃতি উপদ্রব সমুহ এই পরিত্রান প্রভাবে নিবারন হোক।চারলোকপাল মহারাজা আমার কৃত সমস্ত পুন্যরাশি অনুমোদন করিয়া বুদ্ধ শাসনকে এবং আমাকে রক্ষা করুন।

29/05/2026

ইনি সেই ভগবান যিনি অর্হৎ সম্যক সম্বুদ্ধ, বিদ্যাচরণ সম্পন্ন, সুগত লোকবিদ অনুত্তর পুরুষ দমনকারী, সারথি, দেব মানবের শাস্তা বা শিক্ষক, বুদ্ধ ও ভগবান ।আমি সারা জীবনের জন্য বুদ্ধের শরণ গ্রহণ করছি, অতীতের বুদ্ধগণ, বর্তমানের বুদ্ধগণ ও ভবিষ্যতের বুদ্ধগণকে আমি সর্বদা বন্ধনা করছি। অজ্ঞানতা বশত, বুদ্ধের প্রতি কোন দোষ করে থাকলে বুদ্ধ আমায় ক্ষমা করুন ।
ভগবানের ধর্ম সুব্যাখ্যাত, স্বয়ং প্রত্যক্ষ করণীয় কালাকালহীন, "এস এবং দেখ" বলার যোগ্য, উপনয়ন সদৃশ বা ঔপনায়িক (অপায়দ্বার রুদ্ধ করণে এবং আর্যমার্গ আনয়নে সক্ষম), বিজ্ঞগণ কতৃক প্রতক্ষ্য জ্ঞাতব্য ।আমি আজীবন ধর্মের শরণাগত হচ্ছি । যে ধর্মসমূহ অতীত হয়েছে, যে ধর্মসমূহ ভবিষ্যতে উৎপন্ন হবে, এবং যে ধর্মসমূহ বর্তমানে আছে, আমি সে ধর্মসমূহকে সর্বদা বন্দনা করছি । আমার অন্য কোন শরণ নেই, ধর্মই আমার শ্রেষ্ঠ শরণ এ সত্য বাক্য দ্বারা আমার জয়মঙ্গল হোক । আমি ত্রিবিধ শ্রেষ্ঠ ধর্মকে ( পরিয়ত্তি, পটিপত্তি ও পটিবেধ ধর্ম ) অবনত মস্তকে বন্দনা করছি । অজ্ঞানতা বশতঃ কোন দোষ করে থাকলে ধর্ম আমায় ক্ষমা করুন ।
ভগবানের শ্রাবক সংঘ সুপ্রতিপন্ন অর্থাৎ স্রোতাপত্তি মার্গ ও ফললাভী, ভগবানের শ্রাবক সংঘ সোজাপথ প্রাপ্ত অর্থাৎ সকৃদাগামী মার্গ ও ফললাভী । ভগবানের শ্রাবক সংঘ ন্যায় প্রতিপন্ন অর্থাৎ অনাগামী মার্গ ও ফললাভী । ভগবানের শ্রাবক সংঘ সম্যক পথ প্রতিপন্ন অর্থাৎ অর্হৎ মার্গ ও ফললাভী । ভগবানের শ্রাবক সংঘ চার জোড়ায় আট প্রকার - পুদ্'গল, তারা আহবানের যোগ্য, সৎকারের যোগ্য, দক্ষিণা লাভের যোগ্য, অঞ্জলিবদ্ধ হয়ে প্রণামযোগ্য, জগতের শ্রেষ্ঠ পুণ্যক্ষেত্র ।আমি আজীবন সংঘের শরণাগত হচ্ছি, যে সংঘ অতীত হয়েছে, যে সংঘ অনাগতে উৎপন্ন হবেন এবং যে সংঘ বর্তমান আছে, সে সংঘকে আমি সর্বদা বন্দনা করছি । আমার অন্য কোন শরণ নেই, সংঘই আমার শ্রেষ্ঠ শরণ, এ সত্যবাক্য দ্বারা আমার জয়মঙ্গল হোক । আমি দ্বিবিধ সংঘকে (আর্যসংঘ ও আচার আর্যসংঘ) অবনত মস্তকে বন্দনা করছি । অজ্ঞানতা বশতঃ কোন দোষ করে থাকলে সংঘ আমায় ক্ষমা করুন ।

27/05/2026

সর্ব সত্ত্ব, সর্ব প্রাণী, সর্ব ভূত জন
সর্ব ব্যক্তি দেহ ধারী নর-নারী গণ।
আর্য্য ও অনার্য্য আর দেবতা মন্ডল
মানুষ ও অমানুষ বিনিপাতি দল।
সকলের বিপদ শূণ্য হোক রোগ হীন
আত্ম সুখে বাস করে যেন চিরদিন।
আকাসট্ঠা চ ভূম্মট্ঠা দেব নাগা মহিদ্ধিকা ,,
পূঞ্ঞং তং অনুমোদিত্বা চিরং রক্খন্তু বুদ্ধ সাসনং ,,
চিরং রক্খন্তু বুদ্ধ দেসনং, চিরং রক্খন্তু মং পরং।
অর্থাৎ-আকাশবাসী, ভূমিবাসী, মহা ঋদ্ধিবান, দেব, নাগগণ, যক্ষগণ আমাদের পুণ্যসম্পদ অনুমোদন করে বুদ্ধের শাসন, বুদ্ধের দেশনা, আমাদের এবং সকল প্রাণীগণকে চিরকাল রক্ষা করুন। #বুদ্ধেরবাণী #পঞ্চস্কন্ধ #মনস্তত্ত্ব

🟡🟢🔵  বৌদ্ধ দর্শনে পঞ্চস্কন্ধ কি? """""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""পঞ্চস্কন্ধ হলো, বৌদ্ধ দর্শ...
27/05/2026

🟡🟢🔵 বৌদ্ধ দর্শনে পঞ্চস্কন্ধ কি?
"""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""
পঞ্চস্কন্ধ হলো, বৌদ্ধ দর্শনের সত্তার পাঁচটি স্তম্ভ,
বৌদ্ধ দর্শনে "স্কন্ধ" শব্দের অর্থ হলো স্তূপ বা সমষ্টি।

বুদ্ধ বলেছেন, যাকে আমরা "আমি" বা "আত্মা" বলে মনে করি, তা আসলে পাঁচটি পরিবর্তনশীল উপাদানের অস্থায়ী সমষ্টি মাত্র।
এই পাঁচটি উপাদানকে একত্রে বলা হয় পঞ্চস্কন্ধ।
এগুলো হলো —
১. রূপ,
২. বেদনা,
৩. সংজ্ঞা,
৪. সংস্কার এবং
৫. বিজ্ঞান।
------------------------------------------------------------------------

🔹 ১. প্রথম স্কন্ধ — রূপ (Rūpa)
রূপ কী?
রূপ হলো ভৌতিক বা বস্তুগত সত্তা। যা স্থান দখল করে, যার আকার-আকৃতি আছে, যা পরিবর্তনশীল এবং ক্ষয়যোগ্য — তাই রূপ। সহজ ভাষায় বললে, আমাদের শরীর এবং বাইরের জগতের সমস্ত বস্তু রূপের অন্তর্গত।
বৌদ্ধ দর্শনে রূপকে চারটি মহাভূতের সমন্বয় বলা হয় — পৃথিবী (কঠিনতা), জল (তরলতা), অগ্নি (উষ্ণতা), বায়ু (গতিশীলতা)। এই চার উপাদানের মিশ্রণেই শরীরসহ সকল বস্তু তৈরি।

▫️ রূপ কীভাবে তৈরি হয়?
রূপ তৈরি হয় কর্ম, চিত্ত, ঋতু (তাপমাত্রা ও প্রকৃতি) এবং আহারের মাধ্যমে। একটি শিশুর জন্মের সময় যে শরীর তৈরি হয়, তা পূর্বজন্মের কর্মের ফলে উদ্ভূত। পরে সেই শরীর আহার, পরিবেশ ও মানসিক অবস্থার দ্বারা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হতে থাকে।
রূপ কীভাবে কাজ করে?
রূপ মূলত পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে কাজ করে — চোখ, কান, নাক, জিহ্বা ও ত্বক। এই ইন্দ্রিয়গুলো বাইরের জগতের সাথে যোগাযোগের দরজা হিসেবে কাজ করে।

উদাহরণ: ধরুন আপনার হাত একটি জ্বলন্ত মোমবাতির কাছে গেল। ত্বকের রূপ-উপাদান তাপ অনুভব করল, চোখের রূপ-উপাদান আলো দেখল। এই মুহূর্তে রূপ তার কাজ করছে — বাইরের বস্তু (মোমবাতি) এবং ভেতরের ইন্দ্রিয় (ত্বক, চোখ) দুটোই রূপ। কিন্তু রূপ একা কিছু বুঝতে পারে না, সে কেবল তথ্য বহন করে।

🔹 ২. দ্বিতীয় স্কন্ধ — বেদনা (Vedanā)
বেদনা কী?
বাংলায় "বেদনা" মানে দুঃখ মনে হলেও বৌদ্ধ দর্শনে বেদনার অর্থ হলো অনুভূতির রং বা tone।
ইন্দ্রিয় যখন কোনো বিষয়ের সংস্পর্শে আসে, তখন সঙ্গে সঙ্গে তিন ধরনের একটি অনুভূতি জন্ম নেয় — সুখকর (সুখ-বেদনা), দুঃখকর (দুঃখ-বেদনা), অথবা নিরপেক্ষ (উপেক্ষা-বেদনা)।
এই তাৎক্ষণিক, প্রাথমিক রঞ্জনটাই বেদনা স্কন্ধ।

▫️ বেদনা কীভাবে তৈরি হয়?
বেদনা তৈরি হয় ইন্দ্রিয় (চোখ, কান ইত্যাদি), বিষয় (রূপ, শব্দ ইত্যাদি) এবং বিজ্ঞান (চেতনা) — এই তিনটির মিলনের মুহূর্তে। এই মিলনকে বলা হয় "স্পর্শ" বা ফস্স। স্পর্শ হওয়ার সাথে সাথেই বেদনা জেগে ওঠে, এটি কোনো বিলম্ব ছাড়াই ঘটে।
বেদনা পূর্ববর্তী কর্ম ও অভিজ্ঞতার দ্বারাও প্রভাবিত হয়। যে মানুষ অতীতে সাপের কামড় খেয়েছে, সে সাপ দেখলে যে বেদনা পাবে, যে কখনো সাপ দেখেনি তার থেকে তা আলাদা হবে।

▫️ বেদনা কীভাবে কাজ করে?
বেদনা হলো তৃষ্ণার জন্মদাত্রী। সুখ-বেদনা থেকে কামনা জন্মায়, দুঃখ-বেদনা থেকে বিরক্তি বা প্রতিহিংসা জন্মায়, নিরপেক্ষ বেদনা থেকে অজ্ঞানতা বা অমনোযোগ জন্মায়। এভাবে বেদনা প্রতিটি মানসিক প্রতিক্রিয়ার প্রথম ধাপ।

উদাহরণ: আপনি রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে একটি মিষ্টির দোকানের পাশ দিয়ে গেলেন। নাক দিয়ে মিষ্টির গন্ধ নাকে পৌঁছাল। সঙ্গে সঙ্গে একটি সুখকর অনুভূতি জাগল — এটাই বেদনা। আপনি কোনো চিন্তা করেননি, কোনো সিদ্ধান্ত নেননি — এই মুহূর্তের আগে-পরে আর কিছু নেই, শুধু একটা মনোরম স্পন্দন — এটাই বেদনা স্কন্ধের কাজ। এরপর যদি আপনি ভাবেন "আহা, খেতে ইচ্ছে করছে" — সেটা পরের স্কন্ধের কাজ।

🔹 ৩. তৃতীয় স্কন্ধ — সংজ্ঞা (Saṃjñā)
সংজ্ঞা কী?
সংজ্ঞা হলো পরিচয় নির্ধারণের ক্ষমতা — চেনার শক্তি। ইন্দ্রিয়ের সংস্পর্শে আসা বস্তুকে "এটা কী" তা নির্ধারণ করাই সংজ্ঞার কাজ। রং, আকার, শব্দ, গন্ধ, স্বাদ, স্পর্শ — সব কিছুকে চিহ্নিত করা এবং স্মৃতির সাথে মিলিয়ে দেখা সংজ্ঞার কাজ।
সংজ্ঞা মানে শুধু নাম জানা নয়। একটি রঙকে "লাল" বলে চেনা, একটি আওয়াজকে "বিপদের সংকেত" বলে চেনা, একটি মুখকে "আমার বন্ধু" বলে চেনা — এসব সবই সংজ্ঞার কাজ।

▫️ সংজ্ঞা কীভাবে তৈরি হয়?
সংজ্ঞা গড়ে ওঠে অভিজ্ঞতা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। একটি শিশু প্রথম আগুন দেখে কিছু বোঝে না। কিন্তু যখন তার একবার আগুনের ছেঁকা লাগে, তখন সে শিখে নেয় যে আগুন বিপজ্জনক, তখন থেকে আগুন দেখলেই তার সংজ্ঞা সক্রিয় হয় — "এটা বিপজ্জনক।"
ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ একই বস্তু বা অভিজ্ঞতাকে ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করে। একটি নেকড়েকে কেউ দেখতে পারে "সুন্দর বন্য প্রাণী" হিসেবে, কেউ দেখে "মৃত্যুর বার্তাবাহক" হিসেবে — এই পার্থক্য তৈরি হয় সংজ্ঞার পার্থক্যে।

▫️ সংজ্ঞা কীভাবে কাজ করে?
সংজ্ঞা বাস্তবতাকে বিভাজন করে ও শ্রেণিবদ্ধ করে। এটি অতীতের ছাপ থেকে বর্তমান অভিজ্ঞতার অর্থ নির্মাণ করে। কিন্তু সংজ্ঞার বড় বিপদ হলো এটি প্রায়ই ভুল বা অসম্পূর্ণ হয়। আমরা একটি মানুষকে একবার দেখে তাকে "শত্রু" বা "বন্ধু" বলে লেবেল লাগিয়ে দিই, এবং তারপর সেই লেবেল দিয়েই তাকে দেখতে থাকি।

উদাহরণ: রাতে বাড়িতে ফেরার পথে আপনি দূর থেকে একটি অন্ধকার আকৃতি দেখলেন। সঙ্গে সঙ্গে সংজ্ঞা কাজ করা শুরু করল — "এটা কি কুকুর? মানুষ? চোর?" স্মৃতি থেকে মিলিয়ে দেখছে। কাছে গিয়ে বুঝলেন এটা একটি রাস্তার ব্যানার। প্রথম সংজ্ঞা ভুল ছিল — এটাই সংজ্ঞার স্বভাব। এটি দ্রুত কাজ করে কিন্তু সব সময় সঠিক হয় না।

🔹 ৪. চতুর্থ স্কন্ধ — সংস্কার (Saṃskāra)
সংস্কার কী?
সংস্কার হলো মানসিক গঠন বা ইচ্ছাগত কার্যক্রম। এটি পঞ্চস্কন্ধের সবচেয়ে বিস্তৃত ও জটিল স্কন্ধ। বেদনা ও সংজ্ঞার পর মন যখন প্রতিক্রিয়া দেখায়, ইচ্ছা করে, সিদ্ধান্ত নেয়, মনোযোগ দেয়, হিসাব করে, ভালোবাসে, ঘৃণা করে — এই সমস্ত মানসিক ক্রিয়া সংস্কারের অন্তর্গত।
বৌদ্ধ মনোবিজ্ঞানে পঞ্চাশটিরও বেশি মানসিক উপাদান সংস্কারের মধ্যে গণনা করা হয় — যেমন: লোভ, দ্বেষ, মোহ, প্রেম, মৈত্রী, করুণা, বিশ্বাস, সংকল্প, প্রজ্ঞা, ঈর্ষা, অহংকার ইত্যাদি। এগুলোর প্রতিটি একটি মানসিক শক্তি যা কর্ম তৈরি করে।

▫️ সংস্কার কীভাবে তৈরি হয়?
সংস্কার তৈরি হয় মূলত দুইভাবে। প্রথমত, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে — কিছু দেখামাত্র বা শুনামাত্র মনে যে ইচ্ছা, বিরক্তি, ভয় বা আনন্দ জাগে সেটা। দ্বিতীয়ত, বারবার একই মানসিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে স্থায়ী চরিত্রের গঠন — যাকে "চরিত্র" বা "স্বভাব" বলা হয়।
একজন মানুষ বারবার রাগের প্রতিক্রিয়া দিলে তার মনে ক্রোধের সংস্কার গভীর হয়ে যায়। ঠিক তেমনি যে মানুষ প্রতিদিন দানশীলতার চর্চা করে, তার মনে উদারতার সংস্কার শক্তিশালী হয়।

▫️ সংস্কার কীভাবে কাজ করে?
সংস্কারই কর্মের উৎপত্তিস্থল। বৌদ্ধ দর্শনে বলা হয়, কর্ম মানে শুধু কাজ নয় — মানসিক সংকল্পই হলো প্রকৃত কর্ম। সংস্কার থেকে সংকল্প জন্মায়, সংকল্প থেকে কর্ম জন্মায়, কর্ম থেকে ফল জন্মায়। এভাবে সংস্কার জন্ম-মৃত্যুর চক্র পরিচালনা করে।

উদাহরণ: ধরুন অফিসে বস আপনাকে সবার সামনে ভুল ধরলেন। প্রথমে বেদনা জাগল (দুঃখকর), তারপর সংজ্ঞা কাজ করল ("আমাকে অপমান করা হলো")। এবার সংস্কারের পালা — মনে রাগ জাগল, প্রতিশোধের ইচ্ছা জাগল, অথবা হয়তো ধৈর্যের সংস্কার থাকলে শান্ত থাকার সিদ্ধান্ত হলো। এরপর যদি মনে মনে ভাবলেন "বসকে একদিন শিক্ষা দেব" — এই সংকল্পটি একটি নতুন কর্মবীজ হয়ে গেল, যা ভবিষ্যতে ফল দেবে। এটাই সংস্কারের ক্ষমতা।

🔹 ৫. পঞ্চম স্কন্ধ — বিজ্ঞান (Vijñāna)
বিজ্ঞান কী?
বিজ্ঞান হলো চেতনা বা সচেতনতা। এটি অন্য সব স্কন্ধের ভিত্তি। বিজ্ঞান মানে হলো জানা বা অনুভব করার সেই মৌলিক ক্ষমতা — যার কারণে "কিছু একটা ঘটছে" এটা জানা যায়। এটি কোনো বস্তু নয়, কোনো আত্মা নয় — এটি একটি প্রক্রিয়া।
বৌদ্ধ দর্শনে ছয় ধরনের বিজ্ঞান আছে —
চক্ষু-বিজ্ঞান (দেখার চেতনা),
শ্রোত্র-বিজ্ঞান (শোনার চেতনা),
ঘ্রাণ-বিজ্ঞান (শোঁকার চেতনা),
জিহ্বা-বিজ্ঞান (স্বাদের চেতনা),
কায়-বিজ্ঞান (স্পর্শের চেতনা) এবং
মনো-বিজ্ঞান (মানসিক চেতনা)।

▫️ বিজ্ঞান কীভাবে তৈরি হয়?
বিজ্ঞান একা উৎপন্ন হয় না। এটি নির্ভরশীল উৎপাদন — প্রতীত্যসমুৎপাদের নিয়মে ঘটে। একটি ইন্দ্রিয় এবং একটি বিষয় মিলিত হলে তবেই সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞান জন্মায়। চোখ থাকলেও যদি কোনো দৃশ্যমান বস্তু না থাকে, তাহলে চক্ষু-বিজ্ঞান উৎপন্ন হয় না। আবার দৃশ্যমান বস্তু থাকলেও যদি চোখ না থাকে বা চোখ বন্ধ থাকে, তাহলেও চক্ষু-বিজ্ঞান জন্মায় না। তিনটির মিলনেই বিজ্ঞান ঘটে।

▫️ বিজ্ঞান কীভাবে কাজ করে?
বিজ্ঞান হলো মঞ্চের আলো — সে নিজে কিছু করে না, কিন্তু তার উপস্থিতিতে সব কিছু দৃশ্যমান হয়। বিজ্ঞান একটি স্থায়ী সত্তা নয়, এটি ক্ষণস্থায়ী — প্রতিটি মুহূর্তে উদ্ভূত হয় এবং বিলীন হয়। একটি দিনে হাজার হাজার চেতনার মুহূর্ত ঘটে।
বিজ্ঞানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো মৃত্যুর পর পরবর্তী জন্মের সংযোগ স্থাপন করা — এই সংযোগকারী চেতনাকে বলা হয় "পুনর্মিলন চেতনা" বা প্রতিসন্ধি চিত্ত।

উদাহরণ:
আপনি একটি সুন্দর গান শুনছেন। এই মুহূর্তে কান (ইন্দ্রিয়) এবং শব্দ (বিষয়) মিলিত হয়ে শ্রোত্র-বিজ্ঞান তৈরি হলো — "শব্দ হচ্ছে" এটা জানা গেল। এরপর সঙ্গে সঙ্গে বেদনা এলো (সুখকর), সংজ্ঞা এলো ("এটা রবীন্দ্রসংগীত"), সংস্কার এলো ("আরো শুনতে চাই")। কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়াটি যার আলোয় দৃশ্যমান হলো — সেই আলোটাই বিজ্ঞান। বিজ্ঞান না থাকলে বাকি চারটি স্কন্ধ থেকেও কোনো অভিজ্ঞতা তৈরি হতো না।

🔸🔸 পঞ্চস্কন্ধ একসাথে কীভাবে কাজ করে
পাঁচটি স্কন্ধ আলাদা আলাদাভাবে কাজ করে না — এরা প্রতিটি মুহূর্তে একত্রে এবং পরস্পর নির্ভর হয়ে কাজ করে। একটি সম্পূর্ণ উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যাক।
ধরুন আপনি রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ আপনার পুরনো প্রেমিকাকে দেখলেন।
প্রথমে রূপ — আপনার চোখ (ইন্দ্রিয়-রূপ) একটি মানবিক আকৃতি (বাহ্য-রূপ) দেখল। তারপর বিজ্ঞান — চক্ষু-বিজ্ঞান সক্রিয় হলো, "কিছু একটা দেখা যাচ্ছে" এই চেতনা জাগল। সাথে সাথে সংজ্ঞা — মুখের বৈশিষ্ট্য, চলার ভঙ্গি, স্মৃতির সাথে মিলিয়ে সংজ্ঞা বলল "এটা সে!" তারপর বেদনা — একটি মিশ্র অনুভূতি জাগল, পুরানো সুখের স্মৃতি ও বর্তমানের বিচ্ছেদের দুঃখ একসাথে। শেষে সংস্কার — মনে নানা ভাবনা এলো, কথা বলব কি বলব না, মুখ ঘুরিয়ে নেব কিনা, পুরানো অভিমান জাগল, নাকি ক্ষমা করার ইচ্ছা জাগল — এই সব মানসিক ক্রিয়া সংস্কার।
এই পুরো ঘটনা এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে ঘটল। এটাই পঞ্চস্কন্ধের কার্যপ্রণালী।
পঞ্চস্কন্ধের গভীর তাৎপর্য

বুদ্ধ বলেছেন, এই পাঁচটি স্কন্ধ যখন একসাথে কাজ করে, তখন আমরা ভুলে মনে করি "আমি আছি"।
কিন্তু এই "আমি" আসলে একটি প্রক্রিয়া, কোনো স্থায়ী সত্তা নয়।
যেমন একটি নদী — প্রতিটি মুহূর্তে নতুন জল প্রবাহিত হচ্ছে, কিন্তু আমরা বলি "পদ্মা নদী" — যেন এটি একটি স্থায়ী জিনিস।

পঞ্চস্কন্ধের বিশ্লেষণের মাধ্যমে বুদ্ধ দেখাতে চেয়েছেন যে আমাদের দুঃখের মূল কারণ হলো এই অনিত্য, অনাত্মা স্কন্ধগুলোকে "আমার আত্মা" বলে আঁকড়ে ধরা।
যখন কোনো সাধক প্রজ্ঞার মাধ্যমে দেখতে পারেন যে পাঁচটি স্কন্ধের কোনোটিই স্থায়ী নয়, কোনোটিই "আমি" নয় — তখনই আঁকড়ে ধরার মূল উৎপাটিত হয় এবং নির্বাণের পথ খুলে যায়।

🔸🔸 বি. দ্র.
লেখাটি পড়ুন, হাতে পড়ার মত সময় না থাকলে,
পরে পড়ার জন্য নিজের ওয়ালে সেভ করে রাখুন এবং
শেয়ার করে অন্যকে পড়ার সুযোগ তৈরী করে দেন।

K. Barua.
26-05-26

#পঞ্চস্কন্ধ #বৌদ্ধদর্শন #বুদ্ধেরবাণী #জীবনদর্শন #মনস্তত্ত্ব

26/05/2026

নমো তসস ভগবতো অরহতো সম্মাসম্বুদ্ধসস "
"নমো তসস ভগবতো অরহতো সম্মাসম্বুদ্ধসস "
"নমো তসস ভগবতো অরহতো সম্মাসম্বুদ্ধসস "
বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি – আমি বুদ্ধের শরণ নিলাম। বোধি লাভ জীবনের মূখ্য উদ্দেশ্য। বুদ্ধত্ব মানে পূর্ণ সত্য, পবিত্রতা, চরম আধাত্মিক জ্ঞান।
ধম্মং শরণং গচ্ছামি – আমি ধর্মের শরণ নিলাম। যে সাধনা অভ্যাস দ্বারা সত্য লাভ হয়, আধ্যাত্মিকতার পূর্ণ বিকাশ হয় তাই ধর্ম।
সঙ্ঘং শরণং গচ্ছামি – আমি সঙ্ঘের শরণ নিলাম। যেখানে পূর্ণ জ্ঞান লাভের জন্য ধর্মের সাধনা সম্যক্ ভাবে করা যায় তাই সঙ্ঘ।
সকলের মধ্যে প্রজ্ঞা উৎপন্ন হোক। সকলের জয়মঙ্গল হোক। ধর্মদানজনিত পুণ্যের প্রভাবে আমার অধিষ্ঠান পারমী যাতে পরিপূর্ণ হয় সেই প্রার্থনা করছি।সূত্র হল বুদ্ধ বচন। বুদ্ধের পবিত্র মঙ্গলবাণী প্রত্যক্ষভাবে আবৃত্তি করাই হচ্ছে সূত্রপাঠ বা পরিত্রাণ পাঠ। পরিত্রাণ বলা হয় এজন্য যে, এই মঙ্গলময় ও কল্যাণময় বাণী পাঠ এবং শুনার মাধ্যমে
সবার নানাবিধ বিপদ-আপদ, দুঃখ-ভয়, রোগ-শোকাদি থেকে পরিত্রাণ লাভ হউক । বুদ্ধবাণী প্রত্যক্ষ ফলদায়ী বলেই এর পাঠে ও শ্রবণে মানুষের কল্যাণ সাধিত হয়।হে বুদ্ধ শাসন রক্ষক, মহাঋদ্ধি ও ক্ষমতাধর, বুদ্ধ-শ্রাবক দেবরাজবৃন্দ-করুণা বশতঃ আমার শরীরের বাম কাঁধে আসন গৃহণে অবস্থান করুন। সদা সর্বদা চলনে-বলনে, শয়নে-স্বপনে, সর্বপ্রকার রোগ-ব্যাধি, ভয়-ভীতি, শত্রু ও বিপদ থেকে মুক্ত রাখুন যেন অন্তরায়বিহীনভাবে পারমী পূরণে সকল জীবের কল্যাণ সাধনে বুদ্ধ শাসনের শ্রীবৃদ্ধি করতে পারি।এতেন সচ্চ বজ্জেন সুবত্থি হোতু’-এই সত্যবাক্যে আমার শুভ হোক।

“অরহৎ ঊর ছিন” ────────────“ওরে ছিন… তোর শরীরের ভেতরে এখন ‘অরহৎ’ গুণধর্ম স্থিত হয়েছে। তুই একদিন অসাধারণ হয়ে উঠবি। চেষ্ট...
25/05/2026

“অরহৎ ঊর ছিন” ────────────

“ওরে ছিন… তোর শরীরের ভেতরে এখন ‘অরহৎ’ গুণধর্ম স্থিত হয়েছে। তুই একদিন অসাধারণ হয়ে উঠবি। চেষ্টা চালিয়ে যা, বুঝলি।”

— মসোয়েইন সেয়াদাও
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার কিছু পরে, মত্তারা এলাকার প্রায় সবাই “অরহৎ ঊর ছিন” নামে এক ব্যক্তিকে চিনত।

তিনি বিখ্যাত হয়েছিলেন শুধু ধনী চালকল-মালিক হিসেবে নয়; বরং একসময়ের ছেঁড়া লুঙ্গি পরা, গরু চরানো দরিদ্র যুবক থেকে হঠাৎ বড় চালকলের মালিক হয়ে ওঠার জন্য। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সর্বদা হাতে জপমালা নিয়ে “অরহৎ” জপ করতেন। তাঁর বাড়ির সামনে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল — “অরহৎ”। এ কারণেই সবাই তাঁকে “অরহৎ ঊর ছিন” বলে ডাকত।

ছোটবেলায় ঊরে ছিন একজন সামণের (শ্রমণ) হিসেবে মসোয়েইন মঠ-এ অবস্থান করেছিলেন। সেখানে তাঁর গুরু ছিলেন ভদন্ত সূরিয়াভিবংশ। কিন্তু ভিক্ষু হওয়ার আগেই তাঁর পিতার মৃত্যু হয়। ফলে মা ও ছোট ভাইবোনদের দেখাশোনার জন্য তাঁকে গৃহীজীবনে ফিরে আসতে হয়।

নিজস্ব জমিজমা কিছুই ছিল না। অন্যের বাড়িতে চাষের কাজ ও গরু চরিয়ে দিন চলত। সংসারে লোকসংখ্যা বেশি, আয় কম— ফলে খাবার ও পোশাকের অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। ছেঁড়া লুঙ্গি, খালি গা, ভাঙাচোরা ঘর— এভাবেই কাটছিল জীবন।

তবু তিনি তাঁর গুরুর প্রতি অগাধ ভক্তি রাখতেন। প্রতি বছর গুরুদেবের জন্মোৎসবের সময় তিনি মঠে এসে পানি তোলা, ঝাড়ু দেওয়া, কাঠ কাটা— সব ধরনের সেবাকর্ম করতেন। গুরু তাঁকে দয়া করে কাপড় দিতেন, কিন্তু ঊর ছিন নিজের জন্য কিছু না রেখে সেগুলো ছোট ভাইবোনদের জন্য ব্যবহার করতেন।

একদিন গুরু তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন—
“ওরে ছিন, তুই কি ধনী হতে চাস না?”

ঊর ছিন বিনয়ে উত্তর দিলেন—
“ভন্তে, অন্যদের মতো বড়লোক হতে চাই না। শুধু পরিবার নিয়ে পেট ভরে খেতে আর মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলেই যথেষ্ট।”

তখন গুরু বললেন—
“আমি তোকে ধনী বানাতে পারব না। নিজের কর্মফল ও পরিশ্রমেই মানুষ উঠে দাঁড়ায়। তবে একটা সহায়তা দিতে পারি।”

এই বলে তিনি একটি জপমালা দিয়ে বললেন—
“‘অরহৎ’ শব্দটিকে অর্থসহ মনে রেখে নিরন্তর জপ করতে থাক।”

ঊর ছিন সেই দিন থেকে আর থামেননি। কাজের সময় গলায় জপমালা ঝুলত, অবসরে হাতে নিয়ে জপ করতেন। গরু চরানোর সময়ও “অরহৎ” জপ চলত। ফলে খারাপ কাজের দিকে মন যেত না।

প্রতি বছর তিনি গুরুর কাছে আসতেন। প্রথম কয়েক বছর বিশেষ পরিবর্তন দেখা যায়নি। কিন্তু চতুর্থ বছরে গুরু তাঁকে কাছে ডেকে হঠাৎ আঘাত করতেই তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠলেন—

“অরহৎ! অরহৎ! অরহৎ!”
তখন গুরু আনন্দে বললেন—
“এবার সত্যিই তোর দেহমনে ‘অরহৎ’ গুণ স্থিত হয়েছে।

তুই একদিন উন্নতি করবি। চেষ্টা চালিয়ে যা।”

এর কিছুদিন পর জাপানি যুদ্ধ শুরু হয়। এলাকায় থাকা এক ভারতীয় চালকল-মালিক পরিবার যুদ্ধের ভয়ে ভারত ফিরে যেতে চাইল। তারা এমন একজন বিশ্বস্ত মানুষ খুঁজছিল, যার কাছে চালকল রেখে যেতে পারে।

গ্রামের প্রবীণরা একবাক্যে ঊর ছিনের নাম প্রস্তাব করলেন—

“তিনি দরিদ্র, কিন্তু সৎ ও বিশ্বস্ত। মসোয়েইন সেয়াদাও-এর শিষ্য। অন্যের সম্পত্তির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না।”

অবশেষে চালকল তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হলো।
এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ঊরছিন কঠোর পরিশ্রম করলেন। ধীরে ধীরে তাঁর জীবনে সচ্ছলতা এলো।

পরের বছর যখন তিনি গুরুর জন্মোৎসবে এলেন, তখন তিনি আর আগের মতো দরিদ্র নন— সুন্দর পোশাক, সঙ্গে দানের চালের বস্তা।

তিনি আবেগভরে বললেন—
“ভন্তে, এটা সবই আপনার কৃপা।”

কিন্তু গুরু উত্তর দিলেন—
“না, এটা আমার কৃপা নয়। তোর ভেতরে যে ‘অরহৎ’ তুই নিজে জাগ্রত রেখেছিস, তারই ফল। শুধু অলৌকিক শক্তিতে নয়— সৎকর্ম, সঠিক দৃষ্টি আর অধ্যবসায়ের ফলেই এই উন্নতি এসেছে।”

যুদ্ধের পর ভারতীয় মালিকরা স্থায়ীভাবে ভারতে বসবাস শুরু করলে পুরো চালকলই ঊরছিনকে দিয়ে দেন।

এভাবেই এক দরিদ্র গরু-চরানো যুবক “অরহৎ ঊরছিন” নামে বিখ্যাত ধনী ও ধর্মভীরু মানুষে পরিণত হন।

এই ঘটনার মূল শিক্ষা হলো— বুদ্ধের গুণ, সূত্র বা গাথার মধ্যে “কোনটা বেশি শক্তিশালী” এমন তুলনা নেই। মূল বিষয় হলো— নিয়মিত অনুশীলন, দৃঢ় বিশ্বাস, সৎকর্ম এবং অবিচল সাধনা।

পালি মতে একে বলা হয় “আসেৱন পচ্চয়” — অর্থাৎ বারবার চর্চা করতে করতে মন ও কর্ম শক্তিশালী হয়ে ওঠা। নিয়মিত শুভকর্ম ও সঠিক স্মরণ মানুষকে বর্তমান জীবনেও ফল দেয়, ভবিষ্যতেও কল্যাণ বয়ে আনে।

দেশনায়- পরম পূজনীয় অরহৎ মসোয়েইন ছেয়াদ--

✍️কলমে- ভিক্ষু দ্বীপ --

দস্যু অঙ্গুলিমালকে দমন:অঙ্গুলিমাল শ্রাবস্তী নগরে কোশলরাজ প্রসেনজিতের পুরোহিত ভার্গব ব্রাহ্মণের পুত্র। যে মুহূর্তে তিনি ভ...
25/05/2026

দস্যু অঙ্গুলিমালকে দমন:
অঙ্গুলিমাল শ্রাবস্তী নগরে কোশলরাজ প্রসেনজিতের পুরোহিত ভার্গব ব্রাহ্মণের পুত্র। যে মুহূর্তে তিনি ভূমিষ্ট হন, তখন সমস্ত নগরের অস্ত্রশস্ত্রসমূহ হতে আগুনের শিখা বের হয়েছিল। রাজার মঙ্গলায়ুধ তাঁর শয়নকক্ষে ছিল। তা হতেও আগুনের শিখা বের হয়েছিল। তা দেখে রাজা ভীত উদ্বিগ্ন হয়ে আর ঘুমাতে পারলেন না। পুরোহিত ঔই লক্ষণ দেখে চোর নক্ষেত্রে পুত্রের জন্মের বিবরণ জ্ঞাত হলেন। তিনি ভোরে রাজদর্শনে এসে রাজাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কেমন রাজন, সুনিদ্রা হয়েছে তো? রাজা বললেন, কোথায় আচার্য সুনিদ্রা! আজ রাতে আমার মঙ্গলায়ুধ হতে কেন জানি আগুনের শিখা বের হলো, বলুন তো? পুরোহিত বললেন, মহারাজ, ভয় করবেন না, আমার এক পুত্র জন্মেছে; তার প্রভাবে এই কাণ্ড হয়েছে।’ ‘সে কেমন হবে?’ মহারাজ, ‘সে চোর হবে।’ ‘একচর চোর, না দলবদ্ধ চোর হবে?’ মহারাজ, একচর চোর হবে। রাজা বললেন, ‘তাকে কি হত্যা করাব?’ পুরোহিত চুপ করে রইলেন। রাজা পুনঃরায় বললেন, যদি একাকি চুরি করে, সে কী করতে পারবে? তাকে পালন করো। তার জন্মক্ষণে রাজার চিত্তে দুঃখ দিয়েছে বলে শিশুর নাম রাখলেন ‘হিংসক’। কিন্তু পরে তার সদাচরণে অহিংসক বলে প্রকাশিত হলো। পূর্বজন্মের কর্মের ফলে অহিংসক সাতটি হাতির বলসম্পন্ন হন। বয়ঃপ্রাপ্তির পর বিদ্যাশিক্ষার জন্য অহিংসক তক্ষশিলায় গিয়ে এক আচার্যের কাছে বিবিধ শিল্প শিক্ষা করতে লাগল। সে আচার্যকে ও আচার্যের স্ত্রীকে যত্নসহকারে সেবা করত। তার এমনই মেধা ও অধ্যবসায় ছিল যে, সহধ্যায়ীদের কেউই তার সমকক্ষ হতে পারেনি। তার অধ্যবসায় ও সেবা-যত্নে সন্তুষ্ট হয়ে আচার্যের স্ত্রী যা পায় তাকে দিত। কিন্তু অন্য ছাত্রদের তা সহ্য হলো না। এতে তারা ঈর্ষাপরতন্ত্র হয় এবং তাদের চক্রান্তে আচার্যের মনে মিথ্যা ধারণা জন্মে যে, অহিংসক তার স্ত্রীর সঙ্গে গুপ্ত প্রেমে আবদ্ধ। এভাবে নানা কৌশল প্রয়োগ করে ছাত্ররা আচার্যের মন বিগড়ায়ে ফেলল। আচার্য ভাবলেন, ‘অহিংসক বড় শক্তিশালী, একে কৌশলে মেরে ফেলতে হবে।’ একসময় স্কুল ছুটি হলে অহিংসক নগরে যাচ্ছিল, এমন সময়ে আচার্য তাকে ডেকে বললেন, ‘দেখো অহিংসক, তোমার বিদ্যাশিক্ষা সমাপ্ত হয়েছে, এখন আমাকে গুরু দক্ষিণা দিয়ে তুমি বিদায় গ্রহণ করো।’ সে বলল, ‘অতি উত্তম আচার্য, তবে আপনাকে কীরূপ দক্ষিণা প্রদান করব?’ আচার্য বললেন, আমার দক্ষিণা হবে ‘মানুষের ডান হতের এক হাজার আঙুল।’ আচার্য মনে করেছিলেন, ‘যখন সে এতগুলো নরহত্যা করবে, অবশ্যই যে কেউ তাকে মেরে ফেলবে।’ অহিংসক নিজেও একটু নিষ্ঠুর প্রকৃতির ছিল, তা শুনে সে সানন্দে অস্ত্রে-শস্ত্রে সজ্জিত হলো। কোশলরাজ্যে জালিনি নামে এক বনখণ্ড ছিল, সেই বনে তার বাসস্থান করল। পর্বতের কাছে এক সদর রাস্তা ছিল, সে পর্বতশিখরে বসে লোকজনের যাতায়াত প্রত্যক্ষ করত, যখনিই দেখত রাস্তা দিয়ে লোক যাচ্ছে, অমনি ভীমপরাক্রমে ধাবিত হয়ে অঙ্গুলগুলো কেটে আনত এবং গাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখত। ওই কর্তিত অঙ্গুল কিছু কিছু কাক, শকুনেরাও খেয়ে ফেলত।’ কতগুলো আঙুল মাটিতে পড়ে পচে যেত। এভাবে বহুদিন গত হবার পরও হাজার আঙুল পূর্ণ করতে পারল না। তার পর সে সূতো দিয়ে মালাকারে আঙুল গেঁথে যজ্ঞোপবীতের মতো কাঁধে ঝুলিয়ে রাখত। সেই হতে তার নাম হলো ‘অঙ্গুলিমাল’। তার ভয়ে সদর রাস্তা দিয়ে পথিকদের গমনাগমন বন্ধ হলো। গমনাগমন বন্ধ হওয়ায় সেই রাস্তায় মানুষ না পেয়ে এবার গ্রাম্য রাস্তার ধারে এসে লুকিয়ে রইল। সেখানে বহু নরহত্যার পর গ্রামবাসীরা গ্রাম ছেড়ে পলায়ন করল। এখন গ্রামে-নগরে সর্বত্র তার ভয়ে মানুষ সন্ত্রস্ত হলো। এতদিনে হাজার আঙ্গুলের মধ্যে তার আর একটি মাত্র আঙুল বাকি রইল। এ সময় তার উপদ্রবের বিষয় মানুষেরা রাজার কর্ণগোচর করল। কোশলরাজ এই সংবাদ পেয়ে ভেরী পিটিয়ে ঘোষণা করলেন যে, ‘শিগগিরই চোর অঙ্গুলিমালকে ধরতে হবে, সৈন্যগণ আগমন করুক।’ তখন অঙ্গুলিমালের মাতা মন্তানী এ সংবাদ তার পিতাকে জানাল। ‘তোমার পুত্র চোরবেশে বহু গুরুতর ঘটনা করছে, তাকে এই কাজ না করো বলে জানিয়ে তাকে নিয়ে আসো, না-হয় রাজা তাকে হত্যা করে ফেলবে।’ ব্রাহ্মণ বললেন, ‘আমার তেমন কুলাঙ্গার পুত্রের প্রয়োজন নেই, রাজার যা ইচ্ছা তা করুক।’ কিন্তু পুত্রবৎসলা মা তা সহ্য করতে পারলেন না, কিছু পাথেয় সংগ্রহ করে ‘পুত্রকে যেকোনো প্রকারে বুঝিয়ে আনব’ এই উদ্দেশ্যে জালিনি বনের দিকে যাত্রা করলেন। তখন ভগবান দিব্যচোখে দেখলেন, ‘তার মাতা আজ পুত্রকে ফিরিয়ে আনার ইচ্ছায় যাচ্ছে, যদি সে যায়, অঙ্গুলিমাল তার মাকে হত্যা করে হলেও হাজার আঙুল নিশ্চয়ই পূর্ণ করে নেবে।’ এই কারণে সে আজ মাতৃহত্যা করে তার মার্গফলের অন্তরায় ঘটাবে। ‘যদি আমি সেখানে না যাই, তার মহাপরিহানি হবে।’ ভগবান এ বিষয়টা জ্ঞাত হয়ে বিকালবেলায় পাত্র-চীবর গ্রহণ করে অঙ্গুলিমালের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। তার অবস্থিত স্থান জালিনিবন শ্রাবস্তী হতে ত্রিশ যোজন। ভগবান পায়ে হেঁটে চলতে লাগলেন। পথিমধ্যে রাখালেরা নিষেধ করতে লাগল যে, ‘ভগবন, এই রাস্তা দিয়ে যাবেন না।’ কিন্তু বুদ্ধ কারও কথায় কর্ণপাত না করে জালিনিবনে উপস্থিত হলেন। অঙ্গুলিমাল তখনি তার মাকে দেখতে পেল। দূরে থাকতে মাকে দেখে ভাবল, ‘আজ মাতৃহত্যা করেই অবশিষ্ট আঙুলটি পূর্ণ করে নেব।’ তাই অসি উত্তোলন করে সবেগে ধাবিত হলো। অঙ্গুলিমাল ও তার মায়ের দূরত্ব সামান্য আছে, এমন সময় বুদ্ধ উভয়ের মধ্যস্থলে দেখা দিলেন। সে ভগবানকে দেখে ভাবল, ‘আর মাতৃহত্যা করব কেন, মা জীবিত থাকুন, এখন এই শ্রমণকে মেরে হাজারটা আঙুল পূর্ণ করে নেব। সে উক্ষিপ্ত অসি নিয়ে ভগবানের অনুধাবন করল। ভগবান তখন এমন এক ঋদ্ধি প্রদর্শন করলেন, যেন তিনি আআস্তে আআস্তে পথ চলছেন, অথচ অঙ্গুলিমাল সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করেও ভগবানের কাছে পৌঁছাতে পারল না। সে অবশ হয়ে পড়ল, শ্বাসপ্রশ্বাসের ঘর্‌ঘর্‌ শব্দ ছুটল, সমস্ত শরীর ঘর্মাক্ত হলো এবং পা চালাতে অসমর্থ হলো, স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে ভগবানকে বলল, ‘হে শ্রমণ দাঁড়াও।’ ভগবান হাঁটতে হাঁটতে বললেন, ‘অঙ্গুলিমাল, আমি স্থিত আছি, তুমি দাঁড়াও।’ ভগবানের এই কথা শুনে সে ভাবল, ‘এই শাক্যপুত্রীয় শ্রমণগণ সত্যবাদী, অথচ তিনি পথ চলতে চলতে আমাকে বলছেন, ‘অঙ্গুলিমাল, আমি স্থিত আছি, তুমি দাঁড়াও।’ সে ভাবল ‘আমি দাঁড়িয়েছি, এই কথা বলার উদ্দেশ্য কি?’ না তাঁকে একবার জিজ্ঞাসা করি :
হে শ্রমণ, তুমি গমনাবস্থায় থেকেও ‘আমি স্থিত আছি’ বলছ, আমাকে স্থিতাবস্থায় দেখেও তুমি ‘অস্থির বলে’ বলছ, বোধ হয় এখানে কোনো রহস্য থাকবে। সে কারণে হে শ্রমণ, আমি এই বিষয় তোমাকে জিজ্ঞাসা করছি, তুমি কী প্রকারে স্থিত আছ, আর আমি কী প্রকারে অস্থিত আছি?”
“অঙ্গুলিমাল, আমি সর্বদা সমস্ত প্রাণীদের প্রতি দণ্ডদান নিবারণ করে স্থিত আছি, তুমি প্রাণীদের প্রতি অসংযম আচরণ করছ, সেই কারণে আমি পথ চললেও স্থিত, তুমি দাঁড়িয়ে থেকেও অস্থিত আছ।”
অঙ্গুলিমাল ভগবানের এ কথা শুনে পানিতে তেল নিক্ষিপ্ত হলে যেমন তাড়াতাড়ি পরিব্যাপ্ত হয়ে যায়, তেমন ভগবানের সুব্যাপ্ত সুকীর্তি পূর্বে শুনতে পেয়েছিল বলে ও জ্ঞানের পরিপক্বতা বিধায় অতিশয় আনন্দিত হলো। ভাবল, এই মহাসিংহনাদ, এই মহাগর্জন অন্য কারও নয়, নিশ্চয়ই এটা শ্রমণ গৌতমের গর্জন, এই মহাপুরুষ সম্যকসম্বুদ্ধ, আজ তিনি আমাকে দেখা দিলেন, তিনি আমার উপকারের জন্যই এখানে শুভাগমন করেছেন।
“বহুদিন পর আমাকে অনুগ্রহ করার জন্য সর্বলোক-পূজিত মহর্ষি শ্রমণ এই মহাবনে উপস্থিত হয়েছেন, আমি তোমার ধর্মসংযুক্ত গাথা শ্রবণ করেছি। আমার সুদীর্ঘকাল সঞ্চিত সেই হাজার পাপ পরিত্যাগ করব।”
এই বলে তখনি অঙ্গুলিমাল ছিন্নতটে, প্রপাতে ও বিদীর্ণ ভূমির বিবরে অসি এবং অন্যান্য অস্ত্রসমূহ নিক্ষেপ করল। তারপর অগবানের পায়ে বন্দনা করে সেখানেই বুদ্ধের কাছে প্রব্রজ্যা প্রার্থনা করল।
সেই সদেব সত্ত্বলোকের কারুণিক মহর্ষি বুদ্ধ তখন হাত প্রসারণ করে ‘এসো ভিক্ষু’ বলার সঙ্গে সঙ্গে অঙ্গুলিমালের ঋদ্ধিময় পাত্র-চীবরসহ প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা লাভ হলো। পরে ভাবনাবলে অর্হত্ত্বফল প্রাপ্ত হয়ে বিমুক্তিসুখ-জ্ঞাপক এই প্রীতিগাথা উচ্চারণ করলেন :
“যখন কোনো গৃহস্থ-প্রব্রজিত পাপমিত্র সংসর্গে পড়ে প্রথমে সদাচরণে ভুল করে থাকে, পরে কল্যাণমিত্রের সংসর্গে শমথ-বিদর্শন ভাবনাবলে ত্রিবিধ বিদ্যা ও ষড়ভিজ্ঞা প্রাপ্ত হয়, তখন সে মেঘমুক্ত চন্দ্রতুল্য স্বীয় বিদ্যাবলে এই পঞ্চস্কন্ধাদি লোককে উদ্ভাসিত করে।
যার পূর্বকৃত পাপকর্মকে লোকোত্তর কুশল দ্বারা আবৃত করে, সেও ... । বায়ু, রৌদ্র প্রভৃতির উপদ্রব অগ্রাহ্য করে যেই তরুণ সাধক ভিক্ষু প্রাণপণে বুদ্ধশাসনে সগৌরবে শিক্ষাত্রয় সম্পাদন করে, সেও ... ।
যখন অঙ্গুলিমাল স্থবির নগরে পিণ্ড সংগ্রহের জন্য প্রবেশ করতেন, তখন কেউ অন্যদিকে ঢিল, দণ্ড ছুড়লেও এগুলো এসে তাঁর শরীরে পড়ত, তিনি ভাঙ্গাপাত্রে বিহারে প্রত্যাবর্তন করে বুদ্ধের কাছে যেতেন। বুদ্ধ তাঁকে উপদেশ দিতেন, ‘হে ব্রাহ্মণ, সহ্য করো, তুমি যেই পাপকর্ম করেছ, এর ফলে বহু হাজার বছর নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে, অথচ তুমি সেই কর্মফল ইহজন্মে ভোগ করে যাচ্ছ।’ অঙ্গুলিমাল সমস্ত প্রাণীর প্রতি অসীম অনন্তভাবে মৈত্রীচিত্ত পোষণ করে বলছেন :
যারা আমার কারণে জ্ঞাতিবিয়োগ দুঃখ ভোগ করেছেন, তারা আমার ধর্মকথা শ্রবণ করুন। আমার কথা শুনে সকলে বুদ্ধশাসনে সৎকার্য সম্পাদনে নিযুক্ত হন। তারা ধার্মিক কল্যাণমিত্রদের সেবা করুন। যারা লোকোত্তর ধর্ম গ্রহণ করাতে সমর্থ, তাদের সেবা করুন।
যারা ক্ষান্তিশীলতার কথা বলেন, যারা মৈত্রীধর্মের প্রশংসা করেন, সময়ে তাদের নিকটে গিয়ে ধর্ম শ্রবণ করুন এবং যথাধর্ম আচরণ করুন।
কেউ আমার শত্রু হয়ে আমাকে হিংসা করবেন না, কেবল আমাকে নয়, অন্য কাকেও হিংসা করবেন না। পরম শান্তি বা নির্বাণপদ প্রাপ্ত হয়ে সমস্ত সত্ত্বদিগকে পুত্রবৎ প্রতিপালন করবেন।
জলার্থীরা নালাযোগে ইচ্ছিত ইচ্ছিত স্থানে জল নিয়ে যায়, ইষুকারগণ ইষু উত্তপ্ত করে বক্রতাকে সোজা করে বাণ প্রস্তুত করে, কারিগরেরা কাঠকে আঘাত করে যা ইচ্ছা সোজা ও বাঁকা করে, পণ্ডিতগণ নিজকে অর্হত্ত্বফলের দ্বারা দমন করেন, এ জগতে কেউ কেউ বিবিধ দণ্ড দ্বারা অর্থাৎ হাতিকে অঙ্কুশ দ্বারা, ঘোড়াকে কশাঘাত দ্বারা দমন করে, কিন্তু আমি শাস্তা কর্তৃক বিনা দণ্ডে, বিনা অস্ত্রে দান্ত হয়েছি।
আগে আমার নাম হিংসক যোগ্য থাকলেও আমি অহিংসক নামে পরিচিত হতাম। আজই আমার অহিংসক নাম সত্যতায় পরিণত হলো, আমি আর কাকেও হিংসা করি না।
আমি আগে দস্যু অঙ্গুলিমাল নামে বিশ্রুত ছিলাম; কাম-ভব-দৃষ্টি-অবিদ্যাস্রোতে ডুবে যাওয়ার সময়ে বুদ্ধের শরণে উপস্থিত হই।
আমি আগে রক্তপাণি অঙ্গুলিমাল নামে বিশ্রুত ছিলাম; মহাফলদায়ক শরণগমনের প্রভাব দেখ, আমার ভবতৃষ্ণা সমূহত হয়েছে।
আমি শতশত পুরুষ বধ ও এরূপ বহু দুর্গতিগামী কর্ম করেছি, তবুও লোকোত্তর কর্মের ফলস্বরূপ বিমুক্তিসুখ লাভ করেছি। অঋণী হয়ে অর্থাৎ স্বামী পরিভোগে চার প্রত্যয় সেবন করছি।
ইহ-পরলোকের হিতসাধনে অজ্ঞানী ও প্রমাদকর বিষয়ে অদোষদর্শী দুর্মেধ ব্যক্তিগণ প্রমাদসহকারে সময় ক্ষেপণ করে থাকে, ধর্মজ্ঞানী মেধাবী উত্তম সপ্তরত্নের ন্যায় অপ্রমাদকে রক্ষা করে।
প্রমাদসহকারে কাল ক্ষেপণ করো না, কামরতি উপভোগের জন্য সচেষ্ট হয়ো না, স্মৃতিশীল অপ্রমত্ত ব্যক্তিই সাধনাবলে উত্তম নির্বাণ সুখকে প্রাপ্ত হয়।
তখন শাস্তার নিকটে আমার আগমন ও এই মহাবনে শাস্তার আগমন শুভাগমন হয়েছে, অন্যায়ভাবে আগমন হয়নি। শাস্তার কাছে প্রব্রজ্যা গ্রহণের যে মন্ত্রণা, তা সুমন্ত্রণা হয়েছে। সদোষ-নির্দোষ ধর্মের মধ্যে উত্তম নির্বাণমূলক ধর্মে উপনীত হয়েছি ... । আমি ত্রিবিধ বিদ্যা প্রাপ্ত হয়েছি, বুদ্ধের শাসনে কৃতকার্য হয়েছি।
আগে আমি যেই যেই অরণ্যে, বৃক্ষমূলে, পর্বতে, গুহায় অবস্থান করতাম, সেই সেই স্থানে তখন উদ্বিগ্ন চিত্তে থাকতাম।
এখন আমি সুখে শয়ন করছি, সুখে অবস্থান করছি, সুখে জীবনযাপন করছি। অহো, আমি বুদ্ধের দয়া প্রাপ্ত হয়ে এখন ক্লেশমার প্রভৃতির অগোচরে বাস করছি।
আমি পরিশুদ্ধ মাতৃ-পিতৃকুলে ব্রাহ্মণের পুত্ররূপে পূর্বে জন্মগ্রহণ করেছিলাম, আজ আমি ধর্মরাজ সুগত শাস্তার পরমার্থ ব্রাহ্মণ পুত্র নামে অভিহিত।
এখন আমি বীততৃষ্ণ হয়েছি, আমার বলে কিছুই গ্রহণের নেই, ইন্দ্রিয় আমার সংযত-সুরক্ষিত হয়েছে, পাপের মূলোচ্ছেদ করে আমার আসক্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে।
শাস্তা এখন আমার সুপরিচিত, বুদ্ধের শাসনে আমি কৃতকার্য হয়েছি, পঞ্চস্কন্ধের ভার নেমে ফেলেছি ও আমার ভবতৃষ্ণা সমূহত হয়েছে।—থেরগাথা

Ten Unknown Facts About  1. Founding and History: BMW, Bayerische Motoren Werke AG, was founded in 1916 in Munich, Germa...
24/05/2026

Ten Unknown Facts About

1. Founding and History: BMW, Bayerische Motoren Werke AG, was founded in 1916 in Munich, Germany, initially producing aircraft engines. The company transitioned to motor

দিব্যচক্ষুর মধ্যে শ্রেষ্ঠ — আনুরুদ্ধ মহাস্থবির জীবনকথা 👁️ নিদ্রাকে পরিত্যাগ করে “দিব্যচক্ষু” লাভ করেছিলেন যিনি। আমরা দেখ...
24/05/2026

দিব্যচক্ষুর মধ্যে শ্রেষ্ঠ — আনুরুদ্ধ মহাস্থবির জীবনকথা

👁️ নিদ্রাকে পরিত্যাগ করে “দিব্যচক্ষু” লাভ করেছিলেন যিনি।

আমরা দেখেছিলাম, কীভাবে রাজপুত্র আনুরুদ্ধ কখনও “নেই” শব্দটি শোনেননি এবং দেবতাদের অমৃতসদৃশ খাদ্য ভোগ করতেন। আজ জানব, কীভাবে তিনি রাজজীবন ত্যাগ করে বৌদ্ধ সংঘে প্রবেশ করে অসাধারণ সাধনায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিলেন।

🦚 ১। অহংকার ভেঙে ভিক্ষু সংঘে প্রবেশ
যখন গৌতম বুদ্ধ কাপিলাবস্তু নগরে ফিরে আসেন, তখন শাক্য বংশের বহু রাজপুত্র তাঁর নিকট প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন। আনুরুদ্ধ রাজপুত্রও তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন নিজেদের নাপিত ও সেবক উপালি।

বুদ্ধের সম্মুখে পৌঁছে রাজপুত্ররা নিজেদের বংশগৌরব ও অহংকার দমন করার উদ্দেশ্যে অনুরোধ করেন— দরিদ্র সেবক উপালিকেই যেন প্রথমে প্রব্রজ্যা দেওয়া হয়। ফলে উপালি আগে ভিক্ষু হন এবং বয়োজ্যেষ্ঠত্ব লাভ করেন। এরপর শাক্য রাজপুত্ররা সেই উপালি ভিক্ষুকেই প্রণাম করে নিজেরা প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন।

এটি ছিল অহংকারকে সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

👁️ ২। নিদ্রা ত্যাগ করে দিব্যচক্ষু লাভ
প্রব্রজ্যা গ্রহণের পর প্রথম বর্ষাবাসেই আনুরুদ্ধ থের এমন এক অতিমানবীয় জ্ঞান লাভ করেন, যার দ্বারা তিনি অসংখ্য জগৎকে স্পষ্টভাবে দেখতে পারতেন। এই জ্ঞানকে বলা হয় “দিব্যচক্ষু অভিঞা” বা দেবচক্ষু জ্ঞান।
পরবর্তীতে বুদ্ধের প্রত্যক্ষ উপদেশে তিনি সমস্ত আসবক্ষয় সাধন করে আরহত্ব লাভ করেন।

আনুরুদ্ধ মহাস্থবিরের এক বিস্ময়কর দৃঢ় সংকল্প ছিল— একবার বুদ্ধের ধর্মদেশনা চলাকালে তাঁর তন্দ্রা এসেছিল। সেই ঘটনাকে উপলক্ষ করে তিনি সংকল্প করেন:

“আজ থেকে আমি আর কখনও নিদ্রা যাব না।”
তিনি টানা ২৫ বছর পর্যন্ত নিদ্রাহীন সাধনা করেছিলেন বলে বলা হয়। এর ফলে তাঁর শারীরিক চোখের দৃষ্টি দুর্বল হয়ে গেলেও দিব্যচক্ষুর জ্যোতি আরও প্রখর হয়ে ওঠে। তখন গৌতম বুদ্ধ তাঁকে “দিব্যচক্ষু জ্ঞানে শ্রেষ্ঠ” (এতদগ্গ) উপাধিতে ভূষিত করেন।

🪔 ৩। বুদ্ধের পরিনির্বাণের সময় পর্যবেক্ষক
যখন গৌতম বুদ্ধ কুশীনগরে পরিনির্বাণের পূর্বমুহূর্তে বিভিন্ন ধ্যানসমাপত্তিতে প্রবেশ ও নির্গমন করছিলেন, তখন অন্য ভিক্ষুরা বুঝতে পারছিলেন না— বুদ্ধ ইতিমধ্যে পরিনির্বাণে প্রবেশ করেছেন কি না।

সেই সময় কেবল আনুরুদ্ধ মহাস্থবিরই তাঁর দিব্যচক্ষু জ্ঞানের মাধ্যমে বুদ্ধের চিত্তপ্রবাহ অনুধাবন করে আনন্দ থের ও অন্যান্য ভিক্ষুদের বলেছিলেন—
“ভগবান এখন নিরোধসমাপত্তিতে অবস্থান করছেন, এখনও পরিনির্বাণে প্রবেশ করেননি।”

এইভাবে তিনি সকলকে সঠিকভাবে দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন।

পরবর্তীকালে আনুরুদ্ধ মহাস্থবির দীর্ঘকাল বৌদ্ধ শাসনের কল্যাণে কাজ করে প্রায় ১১৫ বছর বয়সে বেলুব গ্রামে পরিনির্বাণ লাভ করেন।

আনুরুদ্ধ মহাস্থবিরের জীবন আমাদের শেখায়—
“নেই” শব্দটি শুনতে না চাইলে দান করতে হবে, আর দৃঢ় সংকল্প থাকলে মানুষ অসাধারণ উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। 🙏

সংখিপ্ত আকারে---
✍️কলমে- ভিক্ষু দ্বীপ --

Address

Dhaka
1234

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Barua Prokash posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share

Category