08/05/2026
[এক]
শীতের সকাল। উইন্টারবুকের তুষার-ভেজা রাস্তায় লোকজন নেই বললেই চলে। গোটা পাড়া ঘুমিয়ে আছে। হিম-শীতল ঠান্ডা বাতাসে অদ্ভুত এক ছন্দ তুলে তিরতির করে কাঁপছে জাপানি চেরি গাছের পাতা। তারই ধার ঘেঁষে হেঁটে যাচ্ছিলাম খুব সতর্কতায়। তুষার-গলা পিচ্ছিল রাস্তায় বেরসিক জুতো জোড়া প্যাচপ্যাচ আওয়াজ তুলছে। এই বুঝি জেগে গেল ঘুমন্ত উইন্টারব্রুক!
এ এলাকায় এই আমার প্রথম আসা। হোম নার্সিং এজেন্সিতে চাকুরিটা হয়ে যাবার পর প্রথম কাজ পেলাম উইন্টারবুকে। আলঝাইমার্স রোগীর দেখাশোনা করতে হবে। রোগীর নাম আহমাদ জোন্স। রেকর্ড ঘেঁটে দেখলাম আশি বছরের এই বৃদ্ধ কনভার্টেড মুসলিম। বাপ-দাদার ধর্ম ছেড়ে ইসলাম পালন করছেন প্রায় বছর-চল্লিশ হলো।
মুসলিমদের নিয়ে জানাশোনা ছিল না আমার। সত্যি বলতে কোনো ধর্ম সম্পর্কেই শিক্ষা-দীক্ষা পাইনি আমি। মনের গহীন থেকে কেউ বলে একজন স্রষ্টা তো নিশ্চয়ই আছে। আমি তাতে সায় দিয়েছি বটে, তবে স্রষ্টাকে খোঁজার চেষ্টা করিনি। গহীনের আওয়াজ গহীনেই ধামাচাপা পড়ে আছে তেইশটা বছর।
এর মাঝে একজন মুসলিম রোগী পেয়ে খানিকটা চিন্তায় পড়ে গেলাম। তিন বছরবয়সে মা-বাবাকে হারিয়েছি। আমাদের, মানে আমার আর ছোট ভাই পিটারের ঠাঁই হয়েছিল তখন নানাবাড়িতে। চারপাশে যাকেই পেয়েছি, খ্রিস্টান। কখনও জানা হয়নি-মুসলিমদের রীতিনীতি কেমন ছিল। রোগীর চিকিৎসার সুবিধার্থে
একটু-আধটু পড়াশোনা করলাম। জানতে পারলাম মুসলিমরা শুকরের গোশত খায় না, মদ ছুঁয়েও দেখে না। দোকান থেকে আহমাদ জোন্সের জন্য হালাল গোশত কিনেছি তাই। তাকে নিয়ে আমার উদ্বেগে কলিগরা অবাক। তাদের কথা এ রোগী তো আলঝাইমার্সের একদম এডভান্সড স্টেজে চলে গেছে। মাঝে মাঝে নিজেকেই চিনতে পারে না। তার ধর্মীয় রিচুয়াল নিয়ে এত ভাববার কী আছে?
ওদের কথায় আহত হয়েছিলাম খুব। একজন মানুষ স্মৃতিভ্রষ্ট বলে কি তার বিশ্বাস নিয়ে খেলা যায়? বারবার আমার নানীর মুখটা ভেসে উঠছিল। শেষ সময়ে তারও আলঝাইমার্স হয়েছিল। আমাকে আর পিটারকে যখন চিনতে পারতেন না, তখন কী যে কষ্ট লাগত! একদম শিশুর মতোন হয়ে যেতেন আমার নানী। যে-শিশু বলতে পারে না তার ক্ষিদে পেয়েছে, বুঝতে পারে না তাকে বাথরুমে যেতে হবে। স্মৃতি ফিরলে নানী একদম স্বাভাবিক মানুষ। আমাকে আর পিটারকে চোখে হারাতেন। এই মানুষটা যদি জানতেন এমনও দিন গেছে যেদিন তার কাছে আমি আর পিটার ছিলাম অচেনা আগন্তুক, তিনি কি মেনে নিতে পারতেন? মনে হয় পারতেন না।
আহমাদ জোন্স আমার নানীর রোগে ভুগছে। দেখার আগেই মায়া পড়ে গেছে লোকটার জন্য। আজ তার বাড়িতে গিয়েই হালাল বিফের স্ট্যু বানাব। প্রথমে তার আস্থা অর্জন করা চাই। সে যেন না-ভাবে আমার কাছে তার ধর্মীয় অনুভূতি অনিরাপদ। প্রয়োজনে চিকিৎসা-পদ্ধতি পালটে নেব, তবুও তার ধর্মের সাথে সংঘাতে যাব না।
সারবাঁধা চেরিফুলের গাছ পেরিয়ে রাস্তা যেখানে বামে বাঁক নিল, সেখানেই আহমাদ জোন্সের বাড়ি। লাল টালি দেওয়া ছাদের রঙটা জ্বলে গেছে। বাইরে থেকে বাড়ির দুরাবস্থা দেখে যা ভেবেছিলাম, ভেতরটা তেমন নয়। আমি ঢুকতেই বাতাসে দড়াম করে দরজা বন্ধ হয়ে গেল। ইজি চেয়ারে বসা বৃদ্ধ চোখ খুললেন।
'জেসিকা! তোমাকে বলেছি না এত আওয়াজ করে দরজা লাগাবে না।'
রোগীর হিস্ট্রি মোটামুটি মনে ছিল আমার। জেসিকা তার মেয়ের নাম। মারা গেছে বছর দেড়েক হলো।রুম-হিটারের উয়তায় গরম কাপড়ের প্রয়োজন নেই। গায়ের ওভারকোটটা খুলে সোফার একপাশে রাখলাম। বৃদ্ধের কাছে গিয়ে জানালাম আমি ক্যাসি, তার দেখাশোনা করতে এসেছি।
কৃষ্ণ জোন্স কী বুঝলেন কে জানে, আবার চোখ বন্ধ করে চেয়ারে গা এলিয়ে দিলেন। আমিও চলে গেলাম রান্নাঘরে। দ্রুত বিফ বের করে মশলাপাতি দিয়ে চুলায় চাপালাম।
জোন্সকে স্ট্যু খাওয়াতে একটু বেগ পেতে হলো। আমি বাঁ-হাতি। তাকে খাওয়াতে বারবার চামচটা বাম হাতে নিয়ে নিচ্ছিলাম। আর জোন্স কেবল ইশারায় ডান হাত দেখিয়ে দিচ্ছিল। আন্দাজ করে নিলাম এভাবেই মুসলিমরা খায়। বাম হাতে খাওয়া নিষেধ।
দুপুরে সাক্ষী হলাম এক অদ্ভুত ঘটনার। বৃদ্ধ ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে কী এক অচেনা ভাষা আওড়াচ্ছেন। খানিক বাদে দুই হাঁটু ধরে উবু হয়ে গেলেন। এরপর আবার দাঁড়িয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। অনেকটা ব্যায়ামের মতো, সাথে ভিনদেশি ভাষা। বিকেলে আবারও সেই একই কাজ। পরপর দুই দিন নিয়ম করে এমনটাই করে যাচ্ছেন তিনি। তা-ই নিয়ে কলিগের সাথে কথা বললাম। সে বলল, কোনো মুসলিমের সাথে সরাসরি কথা বলতে। কথায় কথায় এক চ্যাটরুমের সন্ধান পেলাম। সেখানে ধর্ম নিয়ে আলোচনা চলে।
সেই চ্যাটরুম থেকে জানতে পারলাম আহমাদ জোন্স ভিনদেশি ভাষায় যে-ব্যায়ামটা করেন, তা নিছক কাউকে দেখে শেখা নয়। সেটা ছিল মুসলিমদের প্রার্থনা। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল ভীষণ। যে-মানুষটা নিজের হাতে ঠিকমতো খেতে পারে না, নিজের পরিবারের কথাও ভুলে গেছে, সে ঠিক-ঠিক প্রার্থনা করে যাচ্ছে তার স্রষ্টার কাছে!
সেদিনই বুঝে গিয়েছিলাম তাকে ভালো রাখার উপায়। একমাত্র ইসলামই তার কষ্ট লাঘব করতে পারে! ইসলাম নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি বাড়িয়ে দিলাম। চ্যাটরুমে একজন আমাকে তাদের ধর্মগ্রন্থ কুরআনের অনুবাদ পড়তে দিল। সেখান থেকে সূরা আন-নাহল যে কতবার পড়লাম! বারেবারে থমকে গিয়েছি এখানে-
কাজেই যিনি সৃষ্টি করেন, তিনি কি তার মতো, যে সৃষ্টি করে না? তবুও কি তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করবে না?)যতবার পড়ি হৃদয় ভেঙেচুরে আসে। সৃতি আর সুন্টা সমান হতে পারে নাং ফেতর থেকে তাগিদ আসে সুন্টাকে খুঁজে দেওয়ার। ধামাচাপা দেওয়া বোধগুলো জ্বালাতন করে খুব।
আমি এক মনে কুরআন পড়ে যাই। আইপড়ে তিলাওয়াত শুনি। জানি না কেন চোখ বেয়ে অশ্রু নামে।
দিনকে দিন কুরআন আমার কাছে বিস্ময়কর এক গ্রন্থ হয়ে ধরা দিচ্ছে। বৃন্দ জোন্স কুরআন শুনলে খুশি হয়, কখনও কাঁদে। অর্থ পড়ে আমিও বুঝে নিই কেন হাসে, কেনই বা কাঁদে। এই ভদ্রলোকের বাড়িতে পা রাখার আগের দিনটা পর্যন্ত আমি ভাবতাম-আমি সুখী, আমার হৃদয় পরিতৃপ্ত। জরাগ্রস্ত আহমাদ ছোপ আমার ভাবনা বদলে দিয়েছে। জীবনসায়াহ্নে এসেও তার চোখে-মুখে প্রশান্তির ছাপ ভুল প্রমাণ করে দিয়েছে আমায়। সেই প্রশান্তি আমারও চাই। জানি না-কীসের জন্য প্রাণটা আকুল হয়ে থাকে। ভীষণ খালি খালি লাগে। বারেবারে মনে হয় কী যেন নেই, কী যেন নেই!
[দুই]
চ্যাটরুমে আজকাল বেশিই সময় ব্যয় করি। রোগীর জন্য ইসলামকে জানতে গিয়ে কখন যে নিজের জন্যই জানতে শুরু করেছি, টেরই পাইনি। এখানে সবাই সাহায্য করতে তৎপর। আমাকে স্থানীয় মসজিদগুলোর একটা লিস্ট দেওয়া হলো। সেই লিস্ট ধরে একটা মসজিদে গেলাম।
দিনটার কথা জীবনে ভুলব না আমি। মসজিদে পা রাখতেই সমস্বরে আল্লাহু আকবার ধ্বনি! আল্লাহু আকবার আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ! কী যে এক অজানা অনুভূতি! স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে থেকেও কোথায় যেন ভেসে যাচ্ছি আমি। সত্য-মিথ্যা যা-কিছু মিলেমিশে একাকার ছিল, তার সবটা আমার সামনে দু'ভাগ হয়ে ধেয়ে আসছে। যেন বলছে, কোন দিকে যাবে তুমি? টালমাটাল আমি চোখভরা জল নিয়ে মুসলিমদের সালাত দেখলাম। দেখলাম, একদল মানুষ স্রষ্টার কাছে নিজেকে সঁপে দিচ্ছে।
মসজিদের ইমামের সাথে কথা হলো। সখ্য হলো তার স্ত্রীর সাথে। তারা আমাকে কিছু বই দিলেন, আর কিছু অডিও লেকচার।ইসলাম নিয়ে যা-কিছু জানার ছিল, জেনে নিতে লাগলাম চ্যাটরুম থেকে, কখনও মসজিদ থেকে। ধীরে ধীরে এমন একসময় চলে এলো, যখন ইসলামকে আঁকড়ে ধরা ছাড়া আমার আর কোনো গত্যন্তর নেই।
এক সন্ধ্যায় সেই চ্যাটরুমে গেলাম আবার। মাইক্রোফোনে একজন আমার সৃষ্টি আকর্ষণ করল।
'ক্যাসি, তোমার কি কোনো প্রশ্ন আছে?'
'না।'
'আমি কি জানতে পারি-কোন বিষয়টা তোমাকে ইসলামগ্রহণে বাধা দিচ্ছে?'
জবাব দিতে পারলাম না আমি। পরদিন ফজরের সালাত দেখতে মসজিদে চলে গেলাম। ইমামও চ্যাটরুমের সেই ভাইটির মতো একই প্রশ্ন করলেন। কী আমাকে বাধা দিচ্ছে? কী নিয়ে এত দোটানায় আমি? এবারও নিরুত্তর আমি।
চুপচাপ চলে এলাম আহমাদ জোন্সের কাছে। তাকে খাওয়াতে বসলাম। জবুথবু হয়ে ভদ্র ছেলের মতো খেয়ে নিচ্ছেন তিনি। তার শান্ত চোখের তারায় আমার প্রতিচ্ছবি। সে-ছবিতে নিজেকে পড়ে ফেললাম যেন! আমি ভয় পাচ্ছি... আল্লাহর কাছে নিজেকে সঁপে দিতে ভয় পাচ্ছি। কোনো অজানা আশংকায় নয়, সত্যকে আলিঙ্গন করতে ভয় পাচ্ছি আমি! আমি কি এর যোগ্য? এই বৃদ্ধ মানুষটার মতো প্রশান্ত হৃদয় কি আমার প্রাপ্য?
বিকেলে আবার গেলাম মসজিদে। শান্ত সুরে ইমামকে জানালাম শাহাদাহ পড়তে চাই। উচ্চারণ করলাম সেই অমোঘ বাণী-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ। আল্লাহ ছাড়া ইবাদতের যোগ্য কেউ নেই, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসূল।
ভেতর থেকে বোঝা নেমে গেল, এখন আমি মুসলিম! মনে হচ্ছিল ছোট্ট অৎকার এক গুহায় বন্দি ছিলাম আমি। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলতে বলতেই গুহামুখের পাথর সরে যেতে লাগল, আর আমি বুক ভরে শ্বাস নিলাম!
মসজিদ থেকে আহমাদ জোন্সের বাড়ির পথ ধরেছি। তাকেই আগে জানাব আমার ইসলাম গ্রহণের কথা। এরপর পিটারকে। এখনও জানি না, সে কীভাবে নেবে। আশারাখি পাশেই থাকবে আমার।
উইন্টারবুকের রাস্তাটা নতুন করে দেখছি। প্রথম যেবার এসেছিলাম, তখন শীতকাল। শীত পেরিয়ে এখন বসন্তের মাঝামাঝি। ন্যাড়া রেডউড গাছটাতে পাতা এসেছে। ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে জাপানি চেরিগাছগুলো।
চেরিফুল কী অদ্ভুত সুন্দর! সাদাটে ফুলে হালকা গোলাপি আভা। এর মাঝে লাল রঙা রেণু দেখলে ভ্রম হয়। যেন আচমকা উথলে উঠেছে ফুলের বুক চিরে।
চেরিফুলের মিছিলে হাঁটছি আর ভাবছি। গেল শীতেও আমি ছিলাম পথহারা। মাস কতকের ব্যবধানে জীবন কেমন করে বদলে গেল! মনের গহীনে ধামাচাপা দেওয়া সত্যটা ছলকে বেরিয়ে এলো যেন! ঠিক চেরিফুলের রেণুর মতো। একদম হুট করে, আচমকা ।