25/12/2025
“ভুলের জাল-বোনা” শিরোনামের গানটির পেছনের গল্প নিয়ে গানটির গীতিকবি গোলাম মোর্শেদ এর কিছু কথাঃ
গানটি নিয়ে কথা বলতে গেলে “ভীষণ আনন্দের” এবং
একই সাথে
“তার চেয়ে বেশী বেদনার” কথা ভেসে আসে চোখের সামনে।
আনন্দের কথা দিয়ে শুরু করি।
আমাদের সবার প্রিয় খ্যাতিমান সঙ্গীতের মানুষ ‘লাবু রহমানের’ সুরকার হিসেবে আমার লিখা গানে সমহিমায় উপস্থিতি….এবং…
ভিন্ন গল্প টা এমনঃ
অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ কন্ঠশিল্পী ‘জেনস সুমনের’ বিনা নোটিশে অনন্তের পথে যাত্রা।
এই দেশের গানের ইতিহাসের সাথে একটি গীটার এবং লাবু রহমানের দশটি সুরেলা আঙুল ওতপ্রোতভাবে জড়িত, এই কথার মধ্যে কোনো বাহুল্য নেই, এটা বলতে পারি।
বলতে গেলে, এদেশের জন্মের পর থেকে আজ অবধি কালজয়ী এবং জনপ্রিয় বেশীরভাগ গানে গীটার বাজিয়েছেন লাবু রহমান। ওনার সাথে আমার গভীর বন্ধুত্বের বয়স প্রায় ২৮ বছর।
কিন্তু অবাক ব্যাপার, কিন্তু দু’জনে মিলে গান তৈরী করবো, এমন কথা ওনার সাথে আমার হয়নি কখনো।
বছর খানেক আগে একদিন আমাদের দেখা হলো। উনি আমাকে বললেন, মোর্শেদ ভাই, তাবৎ শিল্পীদের গানে তো অনেক গীটার বাজিয়ছি। এবার সুর করার কাজে হাত দিবো। আমার সব গুলো সুর হবে আপনার লিখা লিরিকের উপর। আপাততঃ ৫০ টা গানটি তৈরী করে ফেলি দু’জনে মিলে। তারপর আবার গান নিয়ে কথা হবে। গভীর সম্পর্কের ভেতরে এক ধরণের স্বজনপ্রীতি লতিয়ে ওঠে, সেটাকে আনন্দের সাথে গ্রহণ করে লাবু ভাইয়ের প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলাম। দু’জনেরই ব্যস্ততার কমতি নেই, নিজস্ব জগতে। তাই ৬ মাস পার করে দিয়ে কাজে হাত দেয়া হোলো। এর মধ্যে ১০ টা গান রেডি হয়ে গেছে। সে এক দারুন ভাল লাগা ! এই ভাল লাগার মধ্যেই লাবু ভাই মনে করিয়ে দিলেন, এখন কোনো কথা হবে না। আগে ৫০ টা গান শেষ হোক।
তবে মনে মনে দু’জনে ঠিক করে রাখলাম, কাকে কাকে দিয়ে গানগুলো গাওয়ানো হবে। সেকথা এখন অপ্রকাশিতই থাক।
আমার উপর দায়িত্ব বর্তালো, প্রথম গানটা কে গাইবে। উল্লেখ্য যে, সে সময়টাতে আমার লিখা পর পর কয়েকটা গানে কন্ঠ দিচ্ছিলো, একজন জনপ্রিয় এবং সম্ভাবনাময় শিল্পী । তার নাম ‘জেনস সুমন’। সে কারণেই হয়তোবা, বেশী কিছু চিন্তা না করেই সুমনের নাম বললাম লাবু ভাইকে।
সেভাবেই কাজ এগুলো। মাস দেড়েক আগে প্রথম গানটি রেকর্ড হয়ে গেলো সুমনের কণ্ঠে । “ভুলের জাল-বোনা” শিরোনামের এই গান। সুমনের সে কি উচ্ছ্বাস, আমার লিখায় গান করছে পর পর কয়েকটি এবং সেই সিরিয়ালে আসলো এই গানটি। বাড়তি উচ্ছ্বাস যোগ হোলো সুমনের, লাবু রহমানের সুরে তার গান গাওয়ার সুযোগ এসেছে !
ছোটো-বড়ো ভাল লাগা এবং চমক মিশ্রিত গানের পেছনের এই গল্পটা এই টুকু পর্যন্ত ঠিক ছিলো।
কিন্তু এরপর যা ঘটে গেলো, কোনো কিছু আর ঠিক থাকলো না। এক প্রচন্ড নির্মম ঝড়ে সব কিছু ওলট পালট করে দিলো !
গানটিতে কন্ঠ দেয়ার পর সুমন প্রায় প্রতিদিনই আমার সাথে ফোনে কথা বলতো। সব কথার ভিতর একটাই তার ছিলো জিজ্ঞাসা। কবে ‘গান জানালা’ থেকে এই গানটা বাজারে আসবে।
তাকে আশ্বস্ত করেছি এই বলে, এই বছর পার হবে না। ডিসেম্বরেই আসবে।
সেদিন ছিলো নভেম্বর মাসের ২৭ তারিখ। হঠাৎ দুপুরে দেখি, আমার বাসার ভেতরে গান জানালার একটা ছোট্ট রুমের অফিসে সুমন এসেছে। সেদিন এমন সময়ে সুমনের আসার কথা নয়। আর সে সময়টাতে আমার ব্যবসায়িক কাজে বাইরে যাবার কথা। সুমনকে দেখে অবাক হয়ে বললাম, কি খবর সুমন ? তুমি আসবে, সে কথা তো জানাও নি আমাকে ? কেমন যেন একটা হাসি দিয়ে বললো, ‘না কোনো কাজে নয়, এমনিই আসতে ইচ্ছে হলো, তাই এসেছি। দুঃখ প্রকাশ করে ওকে জানালাম, ‘আমি কিন্তু সময় দিতে পারবো না এখন।’
কাজে বাইরে যাচ্ছি বলে ওর কাছে বিদায় নিলাম দুপুর ৩ টা নাগাদ।
এরপর ২৪ ঘন্টাও পার হয়নি। পরদিন সকালের দিকে আমাদের অফিসের কো-অর্ডিনেটর আশিক তখন বাইরে। হঠাৎ ওর ফোন পেলাম। চিৎকার করে কি যেন বললো আমাকে, কিছুই বুঝতে পারিনি। আবার যখন বলতে বললাম, তখন সেই একই রকম চিৎকারে বলে উঠলো আশিক , “ স্যার, সুমন ভাই আর নেই। আজ সকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এখন মোহাম্মদপুর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে আছেন”…..!!!
দাঁড়ানো অবস্থা থেকে বসে পড়লাম। বুকে ব্যথা কামড়ে ধরেছে টের পেলাম। আধা ঘন্টা পর স্থির হয়ে রেডি হলাম। গাড়ি তে করে সোজা চলে গেলাম হৃদরোগ ইন্সটিটিউটে। দোতলায় গিয়ে দেখলাম, সুমন শুয়ে আছে একটা বিছানায়, পৃথিবীর তাবৎ আনন্দ- বেদনাকে মুক্তি দিয়ে।
এরপর আর লিখার কিছু নেই।
সুমনের গাওয়া সেই “ভুলের জাল-বোনা” গান অবমুক্ত হতে যাচ্ছে শীঘ্রই। কথা মতো, গানটি বের করার জন্য এবছর পার করতে দেই নি।
এই মুহূর্তে, কেমন লাগছে আমার, কেমন করে বোঝাবো ?
লাবু ভাইকেও ফোন দিতে ইচ্ছে হোলো না।
শুধু মনে হতে লাগলো, সুমন চলে যাওয়ার আগের দিন দুপুরে আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলো। সুমন নিজেই জানতো না বলেই, বলতে পারেনি, মোর্শেদ ভাই, এটাই আমাদের শেষ দেখা। আর….সেদিন সুমনকে আমি এক মিনিটের বেশী সময় দেই নি।
হায় বিধাতার খেয়াল !!!!