22/08/2026
নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর রুহুল কবির রিজভীর কথায় ছিল এক ধরনের আত্মসংশয়—এই দায়িত্বের জন্য তিনি কতটা যোগ্য, কিংবা এত বড় দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারবেন কি না, সেই উদ্বেগ। বাইরে থেকে দেখলে একে হয়তো নিজের অযোগ্যতার স্বীকারোক্তি মনে হতে পারে। কিন্তু একজন মানুষের প্রায় চার দশকের রাজনৈতিক জীবন সামনে রাখলে কথাটির অন্য অর্থও খুঁজে পাওয়া যায়—নিজেকে বড় করে দেখানোর বদলে দায়িত্বকে বড় করে দেখার মানসিকতা।
কারণ রুহুল কবির রিজভীর রাজনৈতিক পথচলা কোনো হঠাৎ পাওয়া পদ কিংবা সুবিধাজনক সময়ের রাজনীতির গল্প নয়। এর শিকড় পড়ে আছে বাংলাদেশের স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল সময়ে।
ছাত্রজীবনে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া রিজভী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক এবং পরে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। আশির দশকে এইচ এম এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে যখন দেশের ছাত্রসমাজ রাজপথে, তখন রিজভীও ছিলেন সেই আন্দোলনের সক্রিয় নেতৃত্বে। আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে তিনি গুরুতর আহত হন। গুলি তাঁর মেরুদণ্ডে আঘাত করে এবং সেই আঘাত তাঁকে স্থায়ী শারীরিক সমস্যার মুখে ফেলে। বহু বছর পরও সেই গুলির ক্ষত তাঁর শরীরে থেকে গেছে।
কিন্তু সেই আঘাত তাঁর রাজনৈতিক পথ থামাতে পারেনি।
১৯৮৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ—রাকসুর নির্বাচনে তিনি সহসভাপতি বা ভিপি নির্বাচিত হন। ১৯৮৯-৯০ মেয়াদে তিনিই ছিলেন রাকসুর সর্বশেষ নির্বাচিত ভিপি। তখনও এরশাদবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় পর্যায়ের আন্দোলনের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠার সময়টা তাই তাঁর জন্য একই সঙ্গে নেতৃত্ব, সংগ্রাম এবং ব্যক্তিগত ত্যাগের সময়।
এরপর তাঁর ছাত্ররাজনীতির যাত্রা আরও ওপরে ওঠে। ১৯৯২ সালের ১৬ জুন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে ভোটের মাধ্যমে তিনি সংগঠনটির সভাপতি নির্বাচিত হন। The Daily Star জানিয়েছে, ছাত্রদলের ইতিহাসে ভোটের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হওয়া প্রথম নেতা ছিলেন রিজভী। ছাত্ররাজনীতির পর স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতৃত্ব হয়ে তিনি ধীরে ধীরে বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন।
কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় সম্ভবত শুরু হয় বিএনপি দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ার পর।
বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় নয়াপল্টন যখন প্রায় নিয়মিত রাজনৈতিক উত্তেজনা, পুলিশি অভিযান, মামলা ও গ্রেপ্তারের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল, তখন রিজভী দীর্ঘ সময় সেই কার্যালয়েই অবস্থান করেছেন। দলের কর্মসূচি ঘোষণা থেকে শুরু করে সংবাদ সম্মেলন, বিবৃতি এবং রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বিএনপির সবচেয়ে দৃশ্যমান মুখগুলোর একটি। The Daily Star–এর সাম্প্রতিক প্রোফাইল অনুযায়ী, দলীয় নেতাদের হিসাবে সে সময় তাঁর বিরুদ্ধে ১৮০টির বেশি মামলা হয়েছিল।
এগুলো শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের বিষয়ও ছিল না। ২০১৩ সালের ৩০ নভেম্বর ভোরে বিএনপির নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে গোয়েন্দা পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা Human Rights Watch–এর নথিতেও তাঁর সেই গ্রেপ্তারের উল্লেখ রয়েছে। ২০১৫ সালেও তাঁকে বিভিন্ন মামলায় রিমান্ডে নেওয়ার তথ্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে পাওয়া যায়। অর্থাৎ দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরোধের সময় কারাবাস, মামলা, গ্রেপ্তার ও রিমান্ড—এসব তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পুনরাবৃত্ত বাস্তবতা ছিল।
এই জায়গাতেই রিজভীর রাজনৈতিক জীবনের একটি বৈশিষ্ট্য আলাদা হয়ে ওঠে। তিনি দীর্ঘ সময় সংসদ সদস্য কিংবা সরকারের ক্ষমতাবান পদে না থেকেও দলের সাংগঠনিক রাজনীতির সামনের সারিতে ছিলেন। সংকটের সময় নিয়মিত সংবাদমাধ্যমের সামনে উপস্থিত হওয়া, দলীয় কার্যালয় সচল রাখা এবং দলের কর্মসূচি জানানো—এসবের কারণে তিনি ধীরে ধীরে বিএনপির অন্যতম প্রধান মুখপাত্রে পরিণত হন।
২০১৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তিনি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। এরপর প্রায় এক দশক তিনি সেই দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৬ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পান। এরপর ১৫ আগস্ট ২০২৬ তাঁকে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়।
আর মাত্র পাঁচ দিন পর আসে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
২০ আগস্ট ২০২৬ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর বিএনপি রুহুল কবির রিজভীকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে মনোনীত করে। বিএনপির গঠনতন্ত্রের ৭(খ)৬ ধারা অনুযায়ী এই মনোনয়ন তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়।
তাই আজ যখন রিজভী নতুন দায়িত্বের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সামর্থ্য নিয়ে সংশয়ের কথা বলেন, তখন তাঁর রাজনৈতিক অতীতও পাশাপাশি দেখতে হয়।
একজন মানুষ যিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন; যিনি রাকসুর ভিপি হয়েছেন; ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দিয়েছেন; দীর্ঘ বিরোধী রাজনৈতিক সময়ে মামলা, গ্রেপ্তার ও কারাবাসের মধ্যেও দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন; যিনি জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব থেকে স্থায়ী কমিটি এবং শেষ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্বে পৌঁছেছেন—তাঁর যোগ্যতা নিয়ে চূড়ান্ত বিচার অবশ্যই রাজনৈতিক ইতিহাস ও তাঁর দায়িত্ব পালনের ফলাফল করবে।
তবে একটি বিষয় ইতিহাসের নথি থেকেই স্পষ্ট—এই পদে তাঁর আগমন আকস্মিক নয়।
এর পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের একটি রাজনৈতিক পথ।
গুলি থেকে কারাগার,
রাকসুর ভিপি থেকে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব,
নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয় থেকে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম—
একটির পর একটি অধ্যায় পেরিয়েই আজকের রুহুল কবির রিজভী।
তাই তাঁর নিজের মনে হয়তো প্রশ্ন থাকতে পারে—
“আমি কি এই দায়িত্বের যোগ্য?”
কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর শুধু কোনো বক্তৃতায় নেই।
উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে তাকাতে হয় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ পথটার দিকে—যেখানে পদ পাওয়ার গল্পের চেয়ে পথ পাড়ি দেওয়ার গল্পটাই অনেক দীর্ঘ।