27/06/2026
#অভিমানের_ওপারে_তুমি
#উপাখ্যান
লেখনীতে: তরুনিধী
❌ অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ ❌
ইউনিভার্সিটির সেন্ট্রাল লাইব্রেরির পেছনের রাস্তাটায় যখন কৃষ্ণচূড়া ফুলগুলো ঝরে পড়ে, তখন পুরো চত্বরটা যেন একটা রক্তিম গালিচায় রূপ নেয়। চিত্রাঙ্গনা মৈত্র যখন সেই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেত, তার হাতের রুপোর চুড়ির মৃদু নিক্বণ আর কপালে থাকা ছোট্ট লাল টিপটা এক অদ্ভুত সাযুজ্য তৈরি করত চারপাশের আবহের সাথে। চিত্রাঙ্গনা রক্ষণশীল মৈত্র পরিবারের একমাত্র কন্যাসন্তান। তার পরিবারে নিয়ম-কানুন, আচার-অনুষ্ঠান আর পারিবারিক আভিজাত্যের দেয়ালগুলো এতটাই উঁচু যে, বাইরের কোনো আলো সেখানে সহজে প্রবেশ করতে পারে না।
শেরহাম এই চত্বরেই দাঁড়িয়ে থাকত তার বন্ধুদের সাথে। শেরহাম—ইতিহাস বিভাগের সিনিয়র, পুরো নাম শেরহাম সুলতান। শান্ত, গম্ভীর এবং অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারের বড় ছেলে। তার পারিবারিক ঐতিহ্য ঢাকা শহরের পুরনো আভিজাত্যের সাথে মিশে আছে। শেরহামের নামের পেছনে যে ওজন, তার চেয়েও বড় ওজন তার পারিবারিক সংস্কারের।
তাদের প্রথম দেখা কোনো নাটকীয়তায় ভরা ছিল না। ডিপার্টমেন্টের একটা সেমিনারের বুকলেট গোছানোর দায়িত্ব পড়েছিল জুনিয়র চিত্রাঙ্গনা আর সিনিয়র শেরহামের ওপর।
"আপনি মৈত্র বাড়ির মেয়ে না?" শেরহাম কাগজের তাড়া থেকে চোখ না তুলেই জিজ্ঞেস করেছিল।
"হ্যাঁ। কেন বলুন তো?" চিত্রাঙ্গনা কিছুটা সচকিত হয়ে উত্তর দিয়েছিল।
"না, এমনি। আপনাদের বাড়ির পুজোয় একবার আমার আব্বা গিয়েছিলেন, ওনার এক বন্ধুর সাথে। খুব কড়া নিয়ম আপনাদের ওখানে, তাই না?" শেরহাম আলতো হেসেছিল।
সেই শুরু। তারপর ক্লাস, নোটস আদান-প্রদান এবং একসময় লাইব্রেরির পেছনের ওই নির্জন কৃষ্ণচূড়া তলা। কেউ কাউকে মুখে কখনো বলেনি 'ভালোবাসি'। কিন্তু বিকেলের আলো পড়ে যখন চিত্রাঙ্গনার মুখের একপাশ উজ্জ্বল হয়ে উঠত, আর শেরহাম মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেদিকে চেয়ে থাকত, তখন শব্দরা এমনিতেও অর্থহীন হয়ে যেত। তারা দুজনেই জানত, তারা একটা অলিখিত, অদৃশ্য আগুনের ওপর দিয়ে হাঁটছে।
সম্পর্কটা যখন দুই বছর পেরিয়ে তৃতীয় বছরে পা দিল, তখন আর সেটা শুধু তাদের দুজনের মাঝে সীমাবদ্ধ রইল না। ক্যাম্পাসের বাতাসেও ডানা মেলল তাদের গল্প। আর ঠিক এইখানেই প্রবেশ ঘটল সাইড ক্যারেক্টারদের, যারা জীবনের নাটকে কখনো কখনো মূল নিয়ন্তা হয়ে দাঁড়ায়।
চিত্রাঙ্গনার কাজিন, সৌম্যদীপ। সে অত্যন্ত কট্টরপন্থী এবং মৈত্র পরিবারের ভাবমূর্তি নিয়ে অতিরিক্ত মাত্রায় সচেতন। সে একদিন চিত্রাঙ্গনাকে টিএসসির মোড়ে শেরহামের রিকশায় উঠতে দেখে ফেলে। বাড়িতে অশান্তির ঝড় উঠতে সময় লাগেনি। চিত্রাঙ্গনার বাবা, অনাথবন্ধু মৈত্র, সেদিন ডাইনিং টেবিলে বসে শুধু একটি কথাই বলেছিলেন -
"আমাদের বংশের একটা মর্যাদা আছে, চিত্রা। এমন কিছু করো না যাতে আমার পিণ্ডী দেওয়ার মতো কেউ না থাকে।"
অন্যদিকে, শেরহামের বাড়িতেও হাওয়া বদলাতে শুরু করেছিল। শেরহামের মা, জাহানারা বেগম, সম্ভ্রান্ত সুফি পরিবারের মেয়ে। তিনি তার বড় ছেলের জন্য অলরেডি এক দূর সম্পর্কের খালার রূপবতী, সুশীলা মেয়ে রাইমা-কে পছন্দ করে রেখেছেন। রাইমা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও পারিবারিক পর্দার ব্যাপারে বেশ সচেতন। সে শেরহামকে মনে মনে পছন্দও করতে শুরু করেছে।
শেরহামের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইশতিয়াক একদিন ক্যাফেটেরিয়ায় বসে চা খেতে খেতে বলেছিল, "শেরহাম, তুই আগুন নিয়ে খেলছিস। চিত্রাঙ্গনা মেয়েটা ভালো, কিন্তু তোদের ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড জাস্ট অপোজিট পোলস। মাঝখান থেকে মেয়েটার লাইফটাও হেল হবে, তোরটাও।"
শেরহাম সেদিন চায়ের কাপে চামচ নাড়তে নাড়তে বলেছিল, "ধর্ম বা পরিবারটা তো বাহ্যিক রে ইশতি। আত্মার যে টান, সেটাকে কোন দেওয়ালে আটকাবি..!!
মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, সে যখন বাইরের পৃথিবীর সাথে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যায়, তখন সে নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষটার ওপর অন্যায্য অভিমান করতে শুরু করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের পরীক্ষার পর শেরহামের ওপর পারিবারিক চাপ আসতে শুরু করে তাদের পারিবারিক টেক্সটাইল ব্যবসার হাল ধরার জন্য এবং একই সাথে রাইমার সাথে বিয়ের পিঁড়িতে বসার জন্য। শেরহাম লড়াই করছিল। সে তার বাবার সাথে প্রথমবার গলা উঁচিয়ে কথা বলেছিল, যার ফলে তার বাবা বুকে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।
এই চরম মানসিক অশান্তির মুহূর্তে শেরহাম চিত্রাঙ্গনার সাথে দেখা করে। চিত্রাঙ্গনাও তখন তার নিজের বাড়িতে অবরুদ্ধ। সৌম্যদীপ তার ওপর নজরদারি চালাচ্ছে, তার ফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছে মাঝেমধ্যে।
সেদিন সন্ধেয় কার্জন হলের এক কোণায় তারা বসেছিল। শেরহামের চোখমুখ ক্লান্ত, আর চিত্রাঙ্গনার চোখে জল।
"তুমি কি পারবে না চিত্রা, সব ছেড়ে আমার সাথে চলে আসতে?" শেরহামের গলার স্বর কাঁপছিল।
চিত্রাঙ্গনা মাথা নিচু করে রইল। "আমার বাবা মরে যাবেন শেরহাম। মা স্ট্রোক করতে পারেন। আমি আমার ফ্যামিলিকে এভাবে ধ্বংস করে আসতে পারব না।"
"তার মানে তোমার কাছে তোমার ফ্যামিলির জেদটাই বড় হলো? আমার এই প্রতিদিনের নরকযন্ত্রণা তোমার কাছে কিছু না?" শেরহামের কণ্ঠে এক তীব্র অভিমানী সুর ফুটে উঠল।
"তুমি আমার জায়গা থেকে দেখছ না, শেরহাম—"
"দেখতে চাই না, চিত্রা। যে ভালোবাসায় একটুও সাহস নেই, সেই ভালোবাসা বিলাসিতা মাত্র।"
শেরহাম উঠে দাঁড়িয়ে চলে গেল। চিত্রাঙ্গনা তাকে ডাকেনি। এক তীব্র, অবোধ্য অভিমান তার বুকেও জমা হলো। 'সে কেন বুঝল না আমার অবাধ্যতা মানে আমার গোটা পরিবারের মৃত্যু?'—এই প্রশ্নটাই চিত্রাঙ্গনার মনে এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর তৈরি করল।
মাস চারেক কেটে গেছে। এর মাঝে তাদের আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। অহংকার নয়, এই নীরবতার নাম ছিল গভীর অভিমান। মানুষ তার আত্মিক সম্পর্কের মাঝে গড়ে ওঠা অভিমান সহজে ভাঙতে পারে না। বাইরের শত্রুকে ক্ষমা করা যায়, কিন্তু পরম আত্মার মানুষটি যখন আঘাত করে বা বুঝতে ভুল করে, তখন সেই অভিমানটা একসময় পাথরের মতো শক্ত হয়ে হৃদয়ে বসে যায়।
শেরহামের বাবা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন, কিন্তু শেরহাম এখন আর আগের সেই প্রাণবন্ত ছেলেটি নেই। সে এখন রোবটের মতো অফিস করে, রাইমার সাথে তার বাগদান প্রায় পাকা। রাইমা শেরহামের এই নীরবতা দেখেও না দেখার ভান করে থাকে, সে ভাবে বিয়ের পর সব ঠিক হয়ে যাবে।
এদিকে চিত্রাঙ্গনার বিয়ের কথাবার্তা চলছে এক প্রবাসী পাত্রের সাথে। চিত্রাঙ্গনা কোনো প্রতিবাদ করেনি। সে যেন এক জ্যান্ত লাশ।
একদিন আচমকাই ইশতিয়াকের বোনের বিয়েতে দুজনের দেখা হয়ে গেল। ইশতিয়াক দুজনকে একই টেবিলে বসানোর ব্যবস্থা করেছিল, হয়তো শেষ একটা চেষ্টা করতে চেয়েছিল সে।
টেবিলে চারপাশ জুড়ে বিয়ের শোরগোল, আলো, হাসি-কান্না। কিন্তু সেই কোলাহলের মাঝেও শেরহাম আর চিত্রাঙ্গনার মাঝের টেবিলটা যেন এক অফুরন্ত মরুভূমি।
শেরহাম চিত্রাঙ্গনার দিকে তাকাল। চিত্রাঙ্গনার পরনে একটা ছাই রঙের শাড়ি, কপালে সেই লাল টিপটা আজ নেই। চোখ দুটো বসা।
চিত্রাঙ্গনাও তাকাল শেরহামের দিকে। শেরহামের শেরওয়ানির বোতামগুলো বড্ড চেনা, কিন্তু মানুষটা কত অচেনা লাগছে আজ।
"ভালো আছ?" শেরহাম অনেক কষ্টে শব্দ দুটো উচ্চারণ করল।
চিত্রাঙ্গনা একটা ম্লান হাসি হাসল। "যেমন থাকার কথা। আপনি?"
'তুমি' থেকে 'আপনি'-তে নেমে যাওয়ার এই দূরত্বটুকু তীরের মতো গিয়ে বিঁধল শেরহামের বুকে। সে জবাব দিল, "আমিও... যেমন রাখা হয়েছে।"
উভয়ের চোখেই এক আকাশ কথা, এক সমুদ্র আকুলতা। শেরহাম মনে মনে ভাবছিল, 'চিত্রা, একবার শুধু বলো তুমি এখনো আমার, আমি সব ভেঙে চুরমার করে দেব।' আর চিত্রাঙ্গনা ভাবছিল, 'শেরহাম, একবার হাতটা ধরে বলো যে তুমি আমার নিরুপায় হওয়াটাকে ক্ষমা করেছ, আমি এই মুহূর্তেই তোমার সাথে হেঁটে চলে যাব।'
কিন্তু কেউ কোনো কথা বলল না। তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল সেই রাক্ষুসে অভিমান—যা তৈরি হয়েছিল একে অপরকে অতিরিক্ত ভালোবাসার কারণে, অথচ আজ সেই ভালোবাসাই একে অপরের দিকে হাত বাড়াতে দিচ্ছে না।
হঠাৎ করেই সৌম্যদীপ এসে টেবিলের সামনে দাঁড়াল। তার চোখে তীব্র সন্দিহান দৃষ্টি। সে চিত্রাঙ্গনার দিকে তাকিয়ে বলল, "চিত্রা, জ্যাঠামশাই গাড়িতে ডাকছেন। আমাদের বের হতে হবে।"
চিত্রাঙ্গনা আস্তে করে উঠে দাঁড়াল। সে পার্সটা হাতে নিয়ে শেরহামের দিকে শেষবারের মতো তাকাল। শেরহামও চেয়ে রইল তার দিকে।
বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি নামার উপক্রম...
বাইরে তখন সত্যি সত্যিই ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। আর বৃষ্টি বুঝি চিত্রার মনেও বর্ষণপাত ঘটাল। সৌম্যদীপের ছাতার নিচে হেঁটে যেতে যেতে চিত্রাঙ্গনা একবারের জন্যও পেছন ফিরে তাকাল না। সে জানত, পেছন ফিরে তাকালে সে আর নিজের পায়ে হেঁটে গাড়িতে উঠতে পারবে না। তার অবশ পা দুটো তাকে টেনে নিয়ে যাবে ওই ছাই রঙের শেরওয়ানি পরা মানুষটার বুকে।
আর শেরহাম? সে ঠায় বসে রইল সেই টেবিলটায়। ইশতিয়াক এসে তার কাঁধে হাত রাখল।
"শেরহাম, ওঠ। সবাই দেখছে।"
শেরহাম আলতো করে ইশতিয়াকের হাতটা সরিয়ে দিল। তার গলার স্বর এতটাই নিচু যে বৃষ্টির শব্দের তোড়ে তা প্রায় হারিয়ে গেল, "ও একবারও বলল না রে ইশতি, যে ও ভালো নেই। ও এমন একটা ভাব করল যেন আমি ওর জীবনের কেউ না।"
"তুইও তো কিছু বলিসনি, শেরহাম। অভিমান ধরে রাখলে দূরত্ব কমে না, বাড়ে।" ইশতিয়াক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
পরদিন সকালে শেরহামের ড্রয়ারে একটা চিঠি এসে জমা হলো। চিঠিটা ইউনিভার্সিটির আরেকজন কমন ফ্রেন্ড, নীলাঞ্জনা দিয়ে গেছে। চিত্রাঙ্গনা নিজের হাতে লিখেছে, কিন্তু কোনো সম্বোধন নেই।
"আমি জানি, তুমি ধরে নিয়েছ আমি খুব সুখে আছি। আমার পরিবার, আমার জাত-ধর্ম আমার কাছে বড় হয়েছে। কিন্তু তুমি কি একবারও আমার বুকের ভেতরের খাঁ খাঁ রোদটা দেখতে পেয়েছিলে, শেরহাম? যেদিন তুমি কার্জন হলে আমাকে ভালোবাসার অযোগ্য আখ্যা দিয়ে চলে গেছিলে, সেদিন আমার ভেতরের আমিটাও মরে গিয়েছিল। যে মানুষটা আমার নীরবতার ভাষা বুঝল না, তাকে আমি কোন মুখে বলব—'তুমি ছাড়া আমার আর কোনো গতি নেই'? আমার অভিমান তোমার ওপর নয় শেরহাম, আমার অভিমান আমাদের ভাগ্যের ওপর। ভালো থেকো।"
শেরহাম চিঠিটা মুচড়ে ফেলে দিল ডাস্টবিনে। তারপর আবার সেটা কুড়িয়ে এনে সযত্নে বুক পকেটে রাখল। ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া যায়, কিন্তু বুক পকেট থেকে তো আর স্মৃতি উপড়ে ফেলা যায় না।
দিনগুলো কাটার কথা ছিল না, কিন্তু কেটে গেল। মৈত্র বাড়িতে ধুমধাম করে চিত্রাঙ্গনার বিয়ের সানাই বাজতে শুরু করল। পাত্র সুগত, কানাডাপ্রবাসী ইঞ্জিনিয়ার। ভদ্র, মার্জিত, এবং মৈত্র পরিবারের আভিজাত্যের সাথে একদম মানানসই। সৌম্যদীপ পুরো বিয়ের তদারকি করছে। সে নিশ্চিত করেছে যাতে কোনোভাবেই ইউনিভার্সিটির কোনো 'অপ্রত্যাশিত' মানুষ এই বাড়ির আশেপাশে ঘেঁষতে না পারে।
চিত্রাঙ্গনা যেন একটা মাটির পুতুল। গায়ে হলুদ, আইবুড়ো ভাত—সব অনুষ্ঠানে সে হাসছে, ছবি তুলছে, কিন্তু সেই হাসির পেছনে কোনো প্রাণ নেই।
ঠিক একই সপ্তাহে শেরহামের বাড়িতেও উৎসবের আমেজ। জাহানারা বেগম রাইমার হাতে ওনার শাশুড়ির দেওয়া পুরনো হিরের আংটিটা পরিয়ে দিয়েছেন। রাইমা খুব খুশি। সে শেরহামের গম্ভীর স্বভাবটাকে তার 'অভিজাত ব্যক্তিত্ব' বলে ধরে নিয়েছে।
কিন্তু বিয়ের ঠিক দুদিন আগে রাইমা শেরহামের ঘরে এসেছিল ওনার একটা বই ধার নিতে। টেবিলের ওপর রাখা শেরহামের ডায়েরিটার পাতা উল্টাতে উল্টাতে তার চোখ আটকে গেল একটা শুকনো কৃষ্ণচূড়া ফুল আর তার নিচে লেখা কিছু চরণে:
"তুমি মৈত্র বাড়ির মেয়ে হয়েই রইলে চিত্রা, আর আমি সুলতান বংশের বড় ছেলে। মাঝখান থেকে আমাদের দুটো আত্মা যাযাবর হয়ে গেল।"
রাইমা স্তব্ধ হয়ে গেল। সে বুদ্ধিমতী মেয়ে। সে বুঝল, সে যে মানুষটাকে জয় করতে চলেছে, তার শরীরটা হয়তো পাওয়া যাবে, কিন্তু তার মনটা অন্য কারোর উপাসনা গৃহে চিরকালের জন্য বন্দি হয়ে আছে। রাইমা কোনো চিৎকার-চেঁচামেচি করল না। সে ডায়েরিটা বন্ধ করে শেরহামের ঘরের জানলা দিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে এক তীব্র জেদ চাপল—'বিয়ের পর এই চিত্রাঙ্গনার নাম আমি শেরহামের মন থেকে মুছে ফেলবই।'
আজ চিত্রাঙ্গনার বিয়ের রাত। মৈত্র বাড়ি আলোয় আলোকময়। বেনারসি শাড়ি, চন্দনের ফোঁটা আর সোনার গয়নায় চিত্রাঙ্গনাকে এক স্বর্গীয় অপ্সরার মতো লাগছে। কিন্তু তার চোখের কোণায় জল জমে আছে। প্রথা অনুযায়ী সবাই ভাবছে এটা মেয়ের বিদায়ের কান্না, কিন্তু কেউ জানল না এই কান্না এক অনন্ত শূন্যতার।
ঠিক একই রাতে, শেরহাম তাদের বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে একা একা সিগারেট খাচ্ছিল। নিচে মেহেন্দির গান বাজছে। শেরহামের ছোট বোন শায়লা ছাদে এসে দাঁড়াল। সে তার ভাইয়ের খুব আদরের।
"ভাইয়া, তুই এখানে? নিচে রাইমা আপু তোর খোঁজ করছে।"
শেরহাম আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘ ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছাড়ল। "আসছি রে। একটু বাতাস নিচ্ছি।"
"তুই খুশি তো ভাইয়া?" শায়লা আলতো করে জিজ্ঞেস করল। সে চিত্রাঙ্গনার কথা কিছুটা জানত।
শেরহাম শায়লার মাথায় হাত রাখল। "বড় ছেলেদের খুশি থাকতে নেই রে শায়লা। বড় ছেলেদের দায়িত্ব পালন করতে হয়।"
তখন রাত একটা। মৈত্র বাড়িতে সুগতর গলায় মালা পরিয়ে দিল চিত্রাঙ্গনা। অগ্নিসাক্ষী রেখে সাত পাক ঘুরল সে। মন্ত্রোচ্চারণের প্রতিটি শব্দ যেন চিত্রাঙ্গনার বুকে এক একটা তীরের মতো বিঁধছিল। সে চোখ বন্ধ করল। বন্ধ চোখে সে সুগতকে দেখল না, সে দেখল লাইব্রেরির পেছনের সেই কৃষ্ণচূড়া তলা, আর এক জোড়া শান্ত, গম্ভীর চোখ যা তাকে তীব্র অভিমানে বলছিল—'যে ভালোবাসায় সাহস নেই, তা বিলাসিতা মাত্র।'
চিত্রাঙ্গনা মনে মনে বলল, 'আমি আজ মুক্ত করে দিলাম তোমাকে শেরহাম। আমাদের এই না-বলা অভিমানী গল্পটা অন্য কোনো জন্মে পূর্ণতা পাক।'
সময় নদীটির মতো বয়ে যায়, কিন্তু স্মৃতির পলিমাটি বুকের ভেতরেই জমে থাকে।
পাঁচ বছর কেটে গেছে।
চিত্রাঙ্গনা এখন টরন্টোর এক চিলতে ফ্ল্যাটে থাকে। সুগত খুব ভালো স্বামী, সে চিত্রাঙ্গনাকে যথেষ্ট ভালোবাসে ও যত্নে রাখে। তাদের চার বছরের একটা ছোট্ট মেয়েও আছে—নাম 'অনিন্দিতা'। চিত্রাঙ্গনা এখন শাড়ি পরা ছেড়ে দিয়েছে বললেই চলে, কিন্তু কোনো এক অদ্ভুত কারণে তার আলমারির এক কোণায় এখনো সেই ছাই রঙের শাড়িটা যত্ন করে রাখা আছে। সে এখন আর কাঁদে না। সে বুঝতে পেরেছে, মানুষ সব নিয়েও বাঁচতে পারে, আবার সব হারিয়েও বেঁচে থাকা যায়।
এদিকে শেরহাম এখন সুলতান টেক্সটাইলসের ডিরেক্টর। রাইমার সাথে তার সংসার চলছে নিখুঁত নিয়মে। রাইমা শেরহামকে একজন আদর্শ স্বামী হিসেবে পেয়েছে, কিন্তু সে এখনো শেরহামের চোখের ভেতরের সেই অচেনা মানুষটাকে ছুঁতে পারেনি। শেরহাম প্রতিদিন বাড়ি ফেরে, রাইমার সাথে ডিনার করে, বাচ্চার খোঁজ নেয়—সবই ঠিকঠাক, শুধু তাদের মাঝে কোনো 'প্রেম' নেই। আছে একটা সামাজিক চুক্তি।
হঠাৎ করেই এক শীতের সকালে শেরহামকে একটা বিজনেস ট্রিপে যেতে হলো নিউ ইয়র্কে। আর ঠিক একই সময়ে সুগতর এক কনফারেন্সের সূত্রে চিত্রাঙ্গনাও এসেছে নিউ ইয়র্কে।
ম্যানহাটনের এক ব্যস্ত কফি শপে, বাইরে তখন হালকা তুষারপাত হচ্ছে।
শেরহাম একটা উইন্ডো সিটে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিল। কফির কাপে চুমুক দিতে যাবে, এমন সময় ক্যাফের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল এক বাঙালি মহিলা। পরনে ওভারকোট, গলায় একটা কাশ্মীরি স্কার্ফ জড়ানো।
শেরহামের হাতটা বাতাসে জমে গেল।
মহিলাটি আর কেউ নয়—চিত্রাঙ্গনা।
পাঁচ বছর পর। কোনো কৃষ্ণচূড়া নেই, কোনো পারিপার্শ্বিকতার চাপ নেই, কোনো পারিবারিক দেয়াল নেই। তারা আজ স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্ক এবং নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত।
চিত্রাঙ্গনা কাউন্টারের দিকে এগোতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। তার চোখ গেল উইন্ডো সিটের দিকে। শেরহামের চুলগুলো সামান্য পেকেছে দুপাশে, কিন্তু সেই চেনা চশমা, সেই চেনা বসার ভঙ্গি।
দুজনের চোখাচোখি হলো।
পুরো কফি শপের কোলাহল, চামচের টুংটাং শব্দ, সব যেন এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল। পাঁচ বছরের জমে থাকা মেঘ, হাজারো নির্ঘুম রাতের হাহাকার আর সেই পুরনো রাক্ষুসে অভিমান—সব যেন এক ধাক্কায় সামনে এসে দাঁড়াল।
শেরহাম আস্তে করে ল্যাপটপটা বন্ধ করল। সে কি উঠে দাঁড়াবে? সে কি বলবে—'কেমন আছ চিত্রা?'
আর চিত্রাঙ্গনা? সে কি তার হাতের কফি কাপটা ফেলে ছুটে যাবে সেই চেনা মানুষটার দিকে, নাকি সুগত আর তার মেয়ের কথা ভেবে আবার এক তীব্র অভিমানে মুখ ফিরিয়ে চলে যাবে অচেনা ভিড়ে?
বাইরে তুষারপাতের বেগ বাড়ছে, আর কফি শপের ভেতরে দুই প্রাক্তন চেনা মানুষ একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল, মাঝখানে রয়ে গেল সেই ভাঙতে না পারা আত্মিক অভিমানের এক অদৃশ্য দেয়াল...
ম্যানহাটনের সেই কফি শপের কাচের দেয়ালের ওপারে তুষারপাতের গতি বাড়ছিল। নিউ ইয়র্কের তীব্র শীতের মাঝেও চিত্রাঙ্গনার মনে হলো, তার স্কার্ফের ভেতরের চেনা চন্দন আর বেনারসির গন্ধটা যেন আচমকা ফিরে এসেছে। পাঁচটা বছর সে এই গন্ধটা, এই অনুভূতিটাকে একটা রূপক কফিনে বন্দি করে রেখেছিল। আজ শেরহামের ওই দুটো চোখের মুখোমুখি হতেই সেই কফিনের ডালাটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল।
শেরহামের হাত দুটো কাঁপছিল। সে ল্যাপটপটা বন্ধ করলেও টেবিল ছেড়ে উঠতে পারল না। তার মনে হলো, সে যদি এখন উঠে দাঁড়ায়, তবে তার পায়ের নিচের মাটিটা সুদূর ঢাকার গুলশানের সুলতান বাড়ির ড্রয়িংরুমে গিয়ে আছড়ে পড়বে, যেখানে রাইমা হয়তো এই মুহূর্তে তাদের সন্তানের স্কুলের ডায়েরি সই করছে।
কাউন্টারের ওপার থেকে বারিস্তা মেয়েটি দুবার ডাকল, "ম্যাম? ইয়োর ক্যাফে লাত্তে ইজ রেডি।"
চিত্রাঙ্গনা চমকে উঠে পার্স থেকে কার্ডটা বের করল। বিল মেটানোর সময় তার হাত কাঁপছিল। সে কফির কাপটা হাতে নিয়ে শেরহামের টেবিলটার দিকে তাকাল। শেরহাম তখনো তার দিকেই চেয়ে আছে। সেই চেনা চশমার কাচের ওপারে এক জোড়া চোখ, যা পাঁচ বছর আগে কার্জন হলের অন্ধকারে তীব্র অভিমানে ভিজে উঠেছিল।
চিত্রাঙ্গনা ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন এক একটা যুগের সমান ভারী। সে শেরহামের টেবিলের ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল।
"এখানে? এই সিজনে?" চিত্রাঙ্গনার গলার স্বর টরন্টোর শীতের চেয়েও ঠান্ডা শোনাল, কিন্তু ভেতরে যে কতটা কম্পন ছিল, তা কেবল সে নিজেই জানত।
শেরহাম একটা শুকনো হাসি হাসল। সে ইশারা করল সামনের খালি চেয়ারটায় বসার জন্য। "একটা বিজনেস কনফারেন্স ছিল। তোমার সুগতরও তো আজ এখানে থাকার কথা, তাই না?"
চিত্রাঙ্গনা বসল। কোটের পকেটে সে তার দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরে রাখল, যাতে শেরহাম তার আঙুলের কাঁপুনি দেখতে না পায়। "তুমি সুগতর খবর রাখো?"
"ইশতিয়াক মাঝে মাঝে ফেসবুকে সুগতর প্রোফাইল দেখায়। ওখানেই দেখলাম তোমরা নিউ ইয়র্কে আসছ।" শেরহাম কফির কাপটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিল। "তোমার মেয়েটা খুব মিষ্টি হয়েছে, চিত্রা। একদম তোমার মতো চোখ দুটো।"
'চিত্রা'—শব্দটা শেরহামের মুখে শেষবার কবে শুনেছিল, চিত্রাঙ্গনার মনে নেই। এই একটা নাম ধরে ডাকার মাঝে যে অধিকারবোধ লুকিয়ে ছিল, তা আজ কতটা অনধিকার, সেটা ভেবে চিত্রাঙ্গনার বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। এক তীব্র অভিমান আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠল।
"তুমি তো বেশ ভালোই আছ, শেরহাম। সুলতান টেক্সটাইলসের ডিরেক্টর, সুখী পরিবার, রাইমা... সবার খবর তো আমিও পাই নীলাঞ্জনার কাছ থেকে। তাহলে সেদিন কার্জন হলের ওই নাটকটার কী দরকার ছিল? কেন প্রমাণ করতে চেয়েছিলে যে শুধু আমিই..!!! বাক্যটা সম্পূর্ণ করতে পারল না,কিছু একটা বিধেঁ গেল বুঝি বুকে। চিত্রাঙ্গনার কণ্ঠে এবার আর নিয়ন্ত্রণ রইল না, চাপা ফিসফিসে এক তীব্র ক্ষোভ আর অভিমান বেরিয়ে এলো।
শেরহাম চিত্রাঙ্গনার দিকে তাকাল। তার চোখ দুটো আচমকাই লাল হয়ে উঠল। সে টেবিলের ওপর ঝুঁকে এসে খুব নিচু স্বরে বলল:
"নাটক? ওটা তোমার কাছে নাটক ছিল চিত্রা? যে ছেলেটা তার বাবার হার্ট অ্যাটাকের পর আইসিইউর বাইরে বসেও পকেটে একটা সিঁদুরের কৌটো নিয়ে ঘুরছিল যে যদি তুমি একবার ডাকো, আমি বাবাকে মরতে বসিয়ে রেখে তোমার সাথে কোনো মন্দিরে গিয়ে দাঁড়াব—সেটা নাটক ছিল?"
চিত্রাঙ্গনা স্তব্ধ হয়ে গেল। সিঁদুরের কৌটো? শেরহামের পকেটে?
"তুমি তো কোনোদিন বলোনি..." চিত্রাঙ্গনার গলার স্বর বুজে এলো।
"বলার সুযোগ দিয়েছিলে?" শেরহামের ঠোঁটে এক চরম তিক্ততার হাসি ফুটে উঠল। "তুমি তো ধরে নিয়েছিলে মৈত্র বংশের আভিজাত্য বাঁচাতে তোমাকে কোরবানি দিতেই হবে। আর আমি? আমি শুধু চেয়েছিলাম আমার ভালোবাসার মানুষটা অন্তত একবার আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বলুক—'শেরহাম, আমি আছি।' তুমি সেই সাহসটা দেখাওনি চিত্রা। তুমি তোমার অভিমান নিয়ে বেনারসি পরে চলে গেলে, আর আমি আমার বাবার জেদ আর মায়ের কান্নার কাছে নিজেকে বিক্রি করে দিলাম।"
কফি শপের ভেতরে জ্যাজ মিউজিক বাজছিল। দুজন মানুষ একে অপরের মুখোমুখি বসে নিজেদের জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটাকে আবিষ্কার করছিল, অথচ সেই সত্যটা আজ সম্পূর্ণ নিরর্থক।
ঠিক এই সময় শেরহামের ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল রাইমার নাম। রাইমা হয়তো জানতে চায় শেরহাম দুপুরের খাবার খেয়েছে কি না, বা নিউ ইয়র্কের বরফ কেমন এনজয় করছে।
শেরহাম ফোনটা দেখল, কিন্তু রিসিভ করল না। সে ফোনটা উল্টো করে টেবিলের ওপর রেখে দিল।
"রাইমা ফোন করছে। ধরবে না?" চিত্রাঙ্গনা জিজ্ঞেস করল। তার নিজের ফোনেও হয়তো সুগত একটু পরেই মেসেজ করবে—'অনিন্দিতা ঘুমাচ্ছে, তুমি কোথায় চিত্রা?'
"না।" শেরহাম জানলার বাইরে তাকাল। "কিছু কথা অসমাপ্ত থাকাই ভালো। রাইমা খুব ভালো মেয়ে, চিত্রা। ও আমার সংসারের সব দায়িত্ব পালন করে। শুধু ও জানে, এই শেরহামের ভেতরে একটা মৃতদেহ বাস করে। ও চেষ্টা করা ছেড়ে দিয়েছে।"
চিত্রাঙ্গনা তার কফির কাপে চুমুক দিল। কফিটা ততক্ষণে জুঁইয়ের মতো ঠান্ডা হয়ে গেছে। সে ভাবছিল, মানুষের জীবনের এই এক অদ্ভুত ট্র্যাজেডি। যে মানুষটাকে সে ভালোবেসেছিল, তাকে সে পায়নি। আর যে মানুষটা তাকে ভালোবাসে তাকে সে নিজের সম্পূর্ণটা দিতে পারেনি।
কথা বলতে বলতে চিত্রাঙ্গনা তার পার্স থেকে একটা পুরনো, ভাঁজ করা কাগজ বের করল। কাগজটা একটু হলুদ হয়ে গেছে।
"এটা তোমাকে দেওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু কোনোদিন সুযোগ হয়নি।" চিত্রাঙ্গনা কাগজটা শেরহামের দিকে এগিয়ে দিল।
শেরহাম কাগজটা খুলে দেখল। ওটা একটা ডায়েরির ছেঁড়া পাতা। হাতের লেখাটা সৌম্যদীপের। সৌম্যদীপ গত বছর এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। মৃত্যুর আগে সে চিত্রাঙ্গনার কাছে একটা স্বীকারোক্তি রেখে গিয়েছিল।
শেরহাম পড়তে লাগল। চিঠিতে লেখা ছিল:
"চিত্রা, তুই হয়তো আমাকে সারা জীবন ঘৃণা করবি। কিন্তু আজ যখন আমি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, তখন আর সত্যিটা লুকিয়ে রাখতে পারছি না। তোদের সেই বিয়ের রাতে, শেরহাম তোদের বাড়ির পেছনের গলিতে মই দিয়ে ওঠার চেষ্টা করেছিল। ও তোকে শেষবার ডাকতে এসেছিল। আমি আর আমার বন্ধুরা ওকে আটকেছিলাম। আমরা ওকে মারধরও করেছিলাম। ও শুধু বলেছিল, ও তোকে নিয়ে যেতে চায়। আমি ওকে বলেছিলাম, তুই সুগতকে দেখে খুব খুশি এবং তুই নিজের ইচ্ছায় এই বিয়ে করছিস। শেরহামকে আমি তোর একটা জাল চিঠিও দেখিয়েছিলাম, যেখানে লেখা ছিল তুই ওকে আর দেখতে চাস না। আমি আমাদের বংশের মর্যাদা বাঁচাতে একটা জঘন্য কাজ করেছিলাম রে বোন। আমাকে ক্ষমা করিস।"
চিঠিটা পড়া শেষ করে শেরহামের হাত থেকে কাগজটা টেবিলের ওপর পড়ে গেল। তার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।
পাঁচ বছর ধরে সে যে তীব্র অভিমান, যে ঘৃণা বুকের ভেতর পুষে রেখেছিল—যে চিত্রাঙ্গনা তাকে ধোঁকা দিয়েছে, চিত্রাঙ্গনা সুগতর টাকা আর বংশ দেখে চলে গেছে—সেই অভিমানের পাহাড়টা এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে গেল।
"তার মানে... তুমি আমাকে ধোঁকা দাওনি?" শেরহামের গলার স্বর কাঁপছিল।
চিত্রাঙ্গনা জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে তখন টপটপ করে জল পড়ছে। "আমি সারারাত জানলার দিকে চেয়ে বসেছিলাম শেরহাম। আমি ভেবেছিলাম তুমি আসবে। তুমি এলে আমি সুগত, বাবা, সমাজ—সব কিছু পায়ে ঠেলে তোমার সাথে চলে যেতাম। কিন্তু তুমি এলে না। সকালে যখন সুগতর গাড়িতে উঠলাম, তখন ভাবলাম, শেরহাম সুলতানও শেষ পর্যন্ত তার বংশের অহংকারটাই বেছে নিল।"
দুই প্রান্তের দুটো ভুল বোঝাবুঝি, দুটো ভিন্ন মানুষের তৈরি করা মিথ্যা আর অহংকারের দেয়াল তাদের মাঝখানের সেতুটা চিরতরে ভেঙে দিয়েছিল। আজ সত্যটা সামনে এসেছে, কিন্তু বড্ড দেরিতে। এই সত্য এখন আর কোনো ক্ষত নিরাময় করতে পারবে না, বরং ক্ষতটাকে আরও বেশি করে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করে দিল।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে ম্যানহাটনের বুকে। কফি শপের আলো নিভে হালকা নিয়ন আলো জ্বলে উঠেছে।
"এখন কী হবে চিত্রা?" শেরহাম চিত্রাঙ্গনার হাতের ওপর নিজের হাতটা রাখতে চাইল, কিন্তু মাঝপথে গিয়ে হাতটা গুটিয়ে নিল। এখন আর সেই অধিকার নেই।
চিত্রাঙ্গনা উঠে দাঁড়াল। সে তার কোটের বোতামগুলো আটকে নিল। স্কার্ফটা ভালো করে গলায় জড়াল।
"কিছুই হবে না শেরহাম। মানুষের জীবনে কিছু অভিমান কখনো ভাঙার নয়। আমাদের অভিমানটা যদি আজ থেকে পাঁচ বছর আগে ভেঙে যেত, তবে হয়তো আজ আমরা অন্য কোনো ক্যাফেতে বসে আমাদের বাচ্চার গল্প করতাম। কিন্তু আজ... আজ আমরা দুজন দুটো ভিন্ন নদীর স্রোত। নদী কখনো উল্টো বাঁকে চলে না।"
শেরহাম বসে রইল। সে চিত্রাঙ্গনার চলে যাওয়াটা দেখবে বলে মন শক্ত করল।
"আবার কি দেখা হবে?" শেরহাম জিজ্ঞেস করল।
চিত্রাঙ্গনা ক্যাফের দরজার দিকে এগোতে এগোতে থামল। সে পেছন ফিরে তাকাল না। শুধু বলল, "ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষ্ণচূড়াগুলো যখন আবার ফুটবে, তখন যদি পারো... লাইব্রেরির পেছনে যেও। আমাদের সেই তেইশ বছরের আমি আর তুমি এখনো ওখানে দাঁড়িয়ে আছে। এই নিউ ইয়র্কের বরফে আমরা কেউ বেঁচে নেই।"
চিত্রাঙ্গনা দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে গেল। ক্যাফের দরজার বেলটা টুং করে বেজে উঠল।
শেরহাম জানলা দিয়ে দেখল, চিত্রাঙ্গনা বরফঢাকা ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। দূর থেকে একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল, গাড়ি থেকে সুগত নামল। সুগত চিত্রাঙ্গনার মাথার ওপর ছাতাটা ধরল, আর চিত্রাঙ্গনা সুগতর হাত ধরে গাড়িতে উঠে গেল।
শেরহাম তার টেবিলের ওপর রাখা সেই কফির কাপটার দিকে তাকিয়ে রইল। কফিটা সম্পূর্ণ জমে বরফ হয়ে গেছে। সে তার ফোনটা হাতে নিল। রাইমার নাম্বারটা ডায়াল করতে গিয়েও সে থেমে গেল।
বাইরে তুষারপাত তখন আরও তীব্র হচ্ছে, যেন এই শহরের সমস্ত স্মৃতিকে সাদা চাদরে ঢেকে দিতে চায়। কিন্তু ভেতরের সেই দহন, সেই অলিখিত উপন্যাসের ট্র্যাজেডি... তা কি কখনো ঢাকা পড়ে?
ম্যানহাটনের বরফঢাকা রাস্তা দিয়ে সুগতর গাড়িটা যখন গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল টার্মিনালের দিকে এগোচ্ছিল, চিত্রাঙ্গনা তখন গাড়ির জানলায় কপাল ঠেকিয়ে বসে ছিল। বাইরের নিয়ন আলোগুলো বরফের চাদরে প্রতিফলিত হয়ে এক অদ্ভুত পরাবাস্তব আবহ তৈরি করেছে।
"কী হলো চিত্রা? কফি শপ থেকে আসার পর থেকে একদম চুপ করে আছ যে? শরীর খারাপ লাগছে?" সুগত আলতো করে চিত্রাঙ্গনার বাঁ হাতটা ছুঁল। ওয়ান-ওয়ে গ্লাভস পরা সুগতর হাতটা খুব উষ্ণ, খুব নিরাপদ।
চিত্রাঙ্গনা চট করে হাতটা সরিয়ে নিল না, কিন্তু তার মনে হলো এই স্পর্শটা যেন কোনো এক অচেনা গ্রহের। সে একটা জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে বলল, "না, এমনি। নিউ ইয়র্কের এই ঠাণ্ডাটা ঠিক সহ্য হচ্ছে না। টরন্টোর শীত অন্যরকম, এখানকার বাতাসটা কেমন যেন বুক কাঁপিয়ে দেয়।"
সুগত হাসল। "আর দুটো দিন, তারপরই তো আমরা বাড়ি ফিরছি। অনিন্দিতা কিন্তু ওর নানুর বাড়ি থেকে রোজ ভিডিও কল করছে, মায়ের জন্য নাকি ওর মন খারাপ।"
'মা'—শব্দটা চিত্রাঙ্গনাকে এক ঝটকায় বাস্তবে ফিরিয়ে আনল। সে মৈত্র বাড়ির মেয়ে নয়, সে শেরহামের 'চিত্রা'ও নয়; সে এখন চার বছরের একটা মেয়ের মা, যে মেয়েটা হয়তো এই মুহূর্তে টরন্টোর কোনো এক সোফায় বসে কার্টুন দেখছে আর মায়ের ফেরার অপেক্ষা করছে। অথচ, তার ভেতরের নারীটি এখনো ম্যানহাটনের সেই কফি শপের উইন্ডো সিটে বসে আছে, যার চোখের সামনে একটা হলুদ হয়ে যাওয়া চিঠি সুতীব্র হাহাকার ছড়াচ্ছে।
অন্যদিকে, শেরহাম তখনো সেই কফি শপেই বসে। বারিস্তা মেয়েটি এসে টেবিলটা পরিষ্কার করতে চাইল, কিন্তু শেরহামের পাথরের মতো বসে থাকা দেখে সে-ও কেমন যেন থমকে গেল।
শেরহাম পকেট থেকে ফোনটা বের করল। এবার সে রাইমার নম্বরে ব্যাক করল।
"হ্যালো, শেরহাম? এতক্ষণ কী করছিলে? তিনবার রিং হয়ে কেটে গেল।" ওপার থেকে রাইমার শান্ত, সুগৃহিণী কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। ব্যাকগ্রাউন্ডে তাদের ছেলে আরিয়ানের কান্নাকাটি শোনা যাচ্ছে, সে হয়তো হোমওয়ার্ক করতে চাইছে না।
"একটা মিটিংয়ে ছিলাম রাইমা।" শেরহামের গলাটা কেমন যেন ভেঙে এলো।
"তোমার গলা এমন শোনাচ্ছে কেন? ঠাণ্ডা লেগেছে? আমি বলেছিলাম না ওখানকার ওয়েদার খুব খারাপ, মাফলারটা জড়িয়ে বের হবে।" রাইমার এই স্বাভাবিক, আটপৌরে উদ্বেগ শেরহামের বুকে তীরের মতো বিঁধল। যে মেয়েটি গত পাঁচ বছর ধরে তার এই নীরব, উদাসীন রূপটাকেই নিজের ভাগ্য বলে মেনে নিয়েছে, তার প্রতি শেরহামের এই মানসিক প্রতারণা যেন এক চরম অন্যায়।
"আমি ঠিক আছি রাইমা। পরশুই ফ্লাইটের টিকিট কেটেছি। চলে আসব।" শেরহাম আর কথা বাড়াতে পারল না। ফোনটা কেটে সে টেবিলের ওপর সৌম্যদীপের সেই ডায়েরির ছেঁড়া পাতাটার দিকে তাকাল।
উভয়ের মনেই এখন এক তীব্র অপরাধবোধ। এই অপরাধবোধ সমাজের বিরুদ্ধে নয়, পরিবারের বিরুদ্ধে নয়—এই অপরাধবোধ নিজেদের বর্তমানের বিরুদ্ধে। তারা দুজনেই আজ অন্য কারোর জীবনের কাণ্ডারী, অথচ তাদের নিজেদের নৌকোটা পাঁচ বছর আগেই মাঝনদীতে ডুবে গেছে।
কানাডায় ফেরার পর চিত্রাঙ্গনার জীবন আবার তার চেনা ছন্দে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ছন্দটা এবার পুরোপুরি কেটে গেল। সে সুগতর দিকে তাকালে এক তীব্র অপরাধবোধে ভুগত। সুগত তাকে কোনোদিন কোনো বিষয়ে জোর করেনি, তার নীরবতাকে সম্মান দিয়েছে। কিন্তু চিত্রাঙ্গনা এখন বোঝে, এই সম্মানের আড়ালে সে সুগতকে এক বিশাল ফাঁকি দিয়ে গেছে।
একদিন মাঝরাতে সুগত গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। চিত্রাঙ্গনা বিছানা ছেড়ে ড্রয়িংরুমে এসে বসল। বাইরে তখন টরন্টোর মাইনাস ডিগ্রি তাপমাত্রা। সে ল্যাপটপটা খুলে বসল। কোনো এক দুর্নিবার আকর্ষণে সে ফেসবুকে গিয়ে সার্চ করল—'Sherham Sultan'।
শেরহামের প্রোফাইলটা লকড নয়। সেখানে একটা নতুন ছবি আপলোড করা হয়েছে। শেরহাম, রাইমা আর তাদের ছেলে আরিয়ান কোনো এক পারিবারিক অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে হাসছে। শেরহামের পরনে একটা কালো শেরওয়ানি, রাইমার পরনে লাল জামদানি। ছবিতে শেরহামের মুখে হাসি আছে, কিন্তু চিত্রাঙ্গনা সেই হাসির ভেতরের মৃত চোখ দুটোকে চিনতে ভুল করল না। পাঁচ বছর আগে যে চোখ তাকে কার্জন হলের অন্ধকারে খুঁজে বেড়াত, সেই চোখ আজ এক কৃত্রিম সুখী পরিবারের ফ্রেমে বন্দি।
চিত্রাঙ্গনা স্ক্রিনটার ওপর হাত রাখল। তার চোখের এক ফোঁটা জল গিয়ে পড়ল ল্যাপটপের কি-বোর্ডের ওপর। সে মনে মনে বলল, "আমরা কেউ কাউকে ক্ষমা করতে পারলাম না শেরহাম। তুমি রাইমার হাসির মাঝে আমার কান্না খুঁজছ, আর আমি সুগতর ভালোবাসার মাঝে তোমার সেই তীব্র অভিমানটা হাতড়ে বেড়াচ্ছি।"
একই সময়ে, ঢাকার গুলশানের সুলতান বাড়িতে শেরহামও তার স্টাডি রুমে একা বসে ছিল। রাইমা তখন আরিয়ানকে ঘুম পাড়িয়ে নিজের ঘরে চলে গেছে। শেরহাম ড্রয়ার থেকে একটা পুরনো, জং ধরা চাবির গোছা বের করল। সেই চাবি দিয়ে সে তার টেবিলের একদম নিচের গোপন লকারটা খুলল।
ভেতরে রাখা আছে সেই সিঁদুরের কৌটোটা। পাঁচ বছর ধরে যেটা সে আগলে রেখেছে। আজ সত্যটা জানার পর এই সিঁদুরের কৌটোটা তার কাছে আর কোনো অভিমানের স্মারক নয়, এটা এখন এক জ্বলন্ত কয়লা, যা তার বুকটাকে পুড়িয়ে খাক করে দিচ্ছে।