18/08/2026
কতটা জমি দরকার – লিও টলস্টয়
How Much Land Does a Man Need? - Leo Tolstoy
মূল চরিত্রপাহম (Pahom):
একজন সাধারণ ও পরিশ্রমী কৃষক। সে দরিদ্র হলেও নিজের জীবন নিয়ে মোটামুটি সুখী ছিল, কিন্তু অতিরিক্ত জমির লোভ তার পতন ডেকে আনে।
গল্পের মূল কাহিনী
১. লোভের সূচনা:
একবার পাহমের বাড়িতে তার স্ত্রীর বড় বোন শহর থেকে বেড়াতে আসে এবং শহরের বিলাসবহুল জীবনের বড়াই করে। পাহমের স্ত্রী তখন গ্রামীণ ও কৃষক জীবনের পক্ষে কথা বলে। ঘরের কোণে বসে পাহম তাদের কথা শুনছিল। সে মনে মনে ভাবে, "আমাদের একমাত্র সমস্যা হলো আমাদের পর্যাপ্ত জমি নেই। যদি আমার কাছে প্রচুর জমি থাকত, তবে আমি স্বয়ং শয়তানকেও ভয় পেতাম না!" পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকা শয়তান এই কথাটি শুনে ফেলে এবং পাহমকে ফাঁদে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়।
২. প্রথম সাফল্য ও স্বভাব বদল:
কিছুদিন পর পাহম স্থানীয় এক জমিদার মহিলার কাছ থেকে ধারে কিছু জমি কেনে। কঠোর পরিশ্রম করে সে ঋণের টাকা শোধ করে দেয় এবং নিজের জমির মালিক হয়। কিন্তু জমির মালিক হওয়ার পর পাহমের আচরণ বদলে যায়। প্রতিবেশী কৃষকদের গবাদিপশু ভুলবশত তার জমিতে ঢুকে পড়লে সে তাদের ওপর জরিমানা করতে শুরু করে। এতে প্রতিবেশীদের সাথে তার শত্রুতা তৈরি হয়।
৩. আরো জমির খোঁজে:
পাহম আরো বেশি জমির জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। এক ভ্রমণকারী কৃষকের কাছ থেকে সে জানতে পারে যে, ভোলগা নদীর ওপারে উর্বর জমি খুব কম দামে পাওয়া যাচ্ছে। লোভের টানে পাহম তার ঘরবাড়ি, জমি বিক্রি করে সপরিবারে সেখানে চলে যায় এবং পাঁচ গুণ বেশি জমির মালিক হয়। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তার মনে হতে থাকে এই জমিও যথেষ্ট নয়; সে আরো বড় ও উন্নত মানের জমি চায়।
৪. বাশকিরদের দেশে আগমন:
একদিন এক ব্যবসায়ী পাহমকে জানায় যে, দূরবর্তী বাশকির (Bashkirs) উপজাতির এলাকায় নামমাত্র মূল্যে মাইলের পর মাইল চমৎকার জমি পাওয়া যাচ্ছে। বাশকিররা খুবই সরল প্রকৃতির লোক। পাহম প্রচুর উপহারসামগ্রী নিয়ে বাশকিরদের দেশে পৌঁছায়। তারা পাহমের উপহারে খুশি হয়ে তাকে ইচ্ছামতো জমি নেওয়ার অনুমতি দেয়।
৫. জাদুকরী ও মারাত্মক শর্ত:
বাশকিরদের প্রধান পাহমকে জমি বিক্রির এক অদ্ভুত নিয়ম জানান। নিয়মটি ছিল: ১,০০০ রুবলের বিনিময়ে পাহম একদিনে যতটুকু জমি হেঁটে প্রদক্ষিণ করতে পারবে, সেই পুরো জমিটার মালিক সে হবে।শর্ত একটাই—সূর্য ডোবার আগেই তাকে ঠিক যেখান থেকে হাঁটা শুরু করেছিল, সেখানে ফিরে আসতে হবে।যদি সে সূর্য ডোবার আগে শুরুর স্থানে ফিরতে না পারে, তবে তার ১,০০০ রুবল বাশকিররা বাজেয়াপ্ত করবে এবং সে কোনো জমিও পাবে না।
৬. সেই মারাত্মক দিন ও পাহমের শেষ পরিণতি:
পরদিন ভোরে বাশকির প্রধানের টুপি মাটিতে রেখে হাঁটা শুরু করে পাহম। তার সাথে ছিল একটি কোদাল (সীমানা চিহ্নিত করার জন্য) এবং সামান্য খাবার ও পানি।
সকাল: পাহম যত এগোচ্ছিল, তত চমৎকার ও উর্বর জমি দেখতে পাচ্ছিল। লোভে পড়ে সে সোজা অনেক দূর হেঁটে চলে যায় এবং ডানে মোড় নিতে দেরি করে ফেলে।
দুপুর: দুপুরের কড়া রোদে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু বেশি জমি পাওয়ার আশায় সে বিশ্রাম না নিয়ে হাঁটা জারি রাখে।
বিকাল: যখন সে বুঝতে পারে যে সে শুরুর স্থান থেকে অনেক দূরে চলে এসেছে এবং সূর্য ডুবতে আর বেশি সময় নেই, তখন তার মনে ভয়ের সঞ্চার হয়। সে প্রায় দৌড়াতে শুরু করে।
সূর্য যখন দিগন্তে প্রায় ডুবে যাচ্ছে, তখন দূর থেকে পাহম দেখতে পায় বাশকিররা পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে তাকে চিৎকার করে উৎসাহিত করছে। তার শরীর আর চলছিল না, ফুসফুস ফেটে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, বুটের ভেতর পা কেটে রক্ত বের হচ্ছিল। কিন্তু ১,০০০ রুবল হারানো এবং জমির লোভ তাকে থামতে দিচ্ছিল না।
একেবারে শেষ মুহূর্তে, সূর্যের শেষ আলোটি মিলিয়ে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে, পাহম দৌড়ে এসে বাশকির প্রধানের সেই টুপিতে হাত দেয়। সে সফল হয়! বাশকিররা খুশিতে চিৎকার করে ওঠে। কিন্তু অতিরিক্ত পরিশ্রমে ও উত্তেজনায় পাহমের মুখ দিয়ে রক্ত উঠে আসে এবং সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মারা যায়।
জীবনের পরম সত্য (উপসংহার):
পাহমের বিশ্বস্ত চাকরটি কোদাল হাতে এগিয়ে আসে। সে পাহমের মৃতদেহটি সৎকারের জন্য একটি কবর খোঁড়ে।
কবরটি ছিল মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঠিক ছয় ফুট (বা সাড়ে তিন হাত) লম্বা।
লোভের বশে হাজার হাজার একর জমির পেছনে ছুটে চলা পাহমের শেষ পর্যন্ত ঠিক ততটুকুই জমির প্রয়োজন হয়েছিল, যতটুকু তার মৃতদেহটি ঢাকতে লেগেছিল। লিও তলস্তয় এই গল্পের মাধ্যমে মানুষের চিরন্তন লোভ এবং জীবনের নশ্বরতাকে ফুটিয়ে তুলেছেন।