19/02/2025
আজ পূর্ণিমা রাত! ব্যালকনি তে বসে চাঁদ দেখতে দেখতে নতুন একটা উপন্যাস এর কাহিনী ভাবছে নোভা। কলমের খোঁচায় জীবনের গভীরতম রহস্য কে উন্মোচন করতে ব্যস্ত সে। মাত্র বাইশ বছর বয়সেই সাহিত্য জগতে ঝড় তুলেছে সে। তার লেখনী আজ সকলের কাছে সমাদৃত।
নতুন উপন্যাসটিতে নতুন কিছু লিখতে চায় সে, কোনো এক অপরূপ সত্ত্বার অস্তিত্ব জানান দিতে চায়। ডায়েরিতে কলম বসাতে গিয়ে হঠাৎ তার অস্থির লাগতে শুরু করলো। আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ চাঁদ টা কে অন্যরকম মনে হতে লাগলো।
সে লেখায় মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করলো।
লিখতে গিয়ে সে দেখতে পেলো সেখানে লেখা,
" জানালার পাশের টবটি আমার জীবনের ন্যায় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলো"
নোভা চমকে উঠল।
তার হাত থমকে গেল, কলমটা আঙুলের ফাঁক গলে পড়ে গেল ডায়েরির পাতায়। সে কি এই লাইনটা লিখেছিল? নাকি আগেই লেখা ছিল?
তার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ ওঠে, অজানা এক আতঙ্কে সে ধীরে ধীরে জানালার দিকে তাকাল।
হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া!
জানালার পাশের টবটি সত্যিই মাটিতে পড়ে গুঁড়িয়ে গেল!
নোভা দ্রুত উঠে দাঁড়ায়। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসে। এটা কাকতালীয় কিছু? নাকি…?
তার হাত পাতা ঠান্ডা হয়ে এসেছে।
শুধু কিছুক্ষণ আগেই সে এই লাইনটা লিখেছিল। আর এখন সেটা বাস্তবে ঘটে গেছে!
তার ভেতর হালকা শিহরণ খেলে গেল।
নাকি সে কল্পনা করছে?
এক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকার পর সে ডায়েরির দিকে ফিরে এল। ধীরে ধীরে কলম তুলে নিয়ে নতুন একটা লাইন লিখল—
"বাতাস হঠাৎ এমন বয়ে গেল যেন কোনো অদৃশ্য সত্তা পাশ দিয়ে চলে গেল।"
ঠিক তখনই, একটা ঠান্ডা বাতাস এসে তার খোলা চুল এলোমেলো করে দিল।
নোভা ভয়ে আর অবাক হয়ে একদম নিশ্চুপ হয়ে গেল।
এবার তার মনে হলো, এটা আর কাকতালীয় কিছু নয়।
কিছু একটা হচ্ছে।
কিন্তু কী?
আজ আর লিখতে বসার সাহস পেলনা সে। বেড এ গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
সকাল ঘুম হতে উঠার পর অন্যরকম মনে হতে লাগলো নোভার। গতকাল রাতের কিছুই তার মনে নেই।
আজ শুক্রবার। তার উপন্যাসের ড্রাফট তার আজই শেষ করতে হবে। সকাল হতে সকল কাজ সেরে সে সন্ধ্যার দিকে আবার লিখতে বসলো।
কলমের খচখচ শব্দে কিছু লাইন লিখলো সে।
"আরহার আজ ভার্সিটি থেকে ফিরতে বড্ড দেরি হয়ে গেলো। নির্জন রাস্তা। তার ভয় হচ্ছে। হঠাৎ কে যেন পিছন থেকে ছুরি দিয়ে আঘাত করলো তাকে!"
হাত থেমে গেলো নোভার। এটা তো সে লিখতে চায়নি। এটা কেন লিখলো সে! তার এমন অস্বাভাবিক ঘটনা দেখে লেখার মনমানসিকতা শেষ হয়ে গেলো। ঘড়ির কাটায় ৮ টা বাজে। সময় কত দ্রুত যায়। সে ডিনার শেষ করে ঘুমাতে গেলো। শরীর টা বড্ড খারাপ লাগছে। পরদিন সকালে ভার্সিটি যাওয়ার জন্য যখন সে তৈরি হচ্ছিল তখন আরিয়ানের ফোন আসলো!
এবং সে বলল গতকাল রাতে তার কাজিন আরহার খুন হয়েছে। কেউ একজন তাকে ছুরি চালিয়ে হত্যা করেছে। এই খবর শুনে নোভার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা শিরশিরানি বয়ে গেলো।
সে পাগলের মতো তার ডায়েরির পাতা উল্টাতে লাগলো এবং কাঙ্ক্ষিত লেখা টি খুঁজে পেতেই সে নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
গতকাল রাতে সে যা লিখেছে তা আজ সত্যি হয়ে গেলো! এতটা কাকতালীয় কি করে হতে পারে? এমনকি তার লেখা এবং খুন হওয়া ব্যক্তির নামও একই!
নিজেকে সামলাতে পারল না নোভা।
সে ভয়ে ভয়ে কলম নিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে কিছু একটা লিখে দেখতে চাইলো।
কিন্তু সে কিছুই লিখতে পারছিল না। সে চোখ বন্ধ করে কিছু একটা ভাবলো এবং হঠাৎই লিখতে শুরু করলো,
" খবরের কাগজে আজ মিস্টার সিনহার মৃত্যুর খবর ছাপা হবে"
কলম থামাতে আরেক দফা অবাক হতে হলো নোভা কে। সে এবার ও মনের অজান্তে অন্য কিছু লিখে ফেলেছে।
হঠাৎ দরজার নিচ দিয়ে একটি খবরের কাগজ এলো। ভয়ে ভয়ে কাগজ টি তুলে মেলে ধরতেই ফ্রন্ট পেইজে মিস্টার সিনহার খুনের খবর ছাপা দেখতে পেলো। নোভা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার নিজেকে পাগল পাগল মনে হচ্ছে।
সে জ্ঞান হারালো। জ্ঞান ফিরতে সে নিজেকে বিছানায় আবিষ্কার করলো। এবং তার পাশে আরিয়ান কে বসা দেখতে পেলো।
সে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো এবং আরিয়ান কে জড়িয়ে ধরলো। একটু স্থির হতেই গড়গড় করে সে সব ঘটনা আরিয়ান কে বলে দিলো।
কিন্তু আরিয়ান এই ঘটনা মানতে নারাজ। সে নোভা কে বলল,
" নোভা, তোমার কোথাও একটা ভুল হচ্ছে। তুমি অনেক বেশি স্ট্রেস নিচ্ছো তাই হয়তো হেলুসিনেশন হচ্ছে! চিন্তা করো না, এই নাও ওষুধ খেয়ে আরেকটু ঘুমাও।"
নোভা কিছুতেই আরিয়ান কে এইসব বিশ্বাস করাতে পারল না
পর পর বেশ কিছুদিন একই রকম ঘটনা ঘটতে থাকলো। কখনও কারো মৃত্যু, কখনো কারো আহত হওয়া! নিজের উপর বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিলো সে। আরিয়ান ও তার কথা বিশ্বাস করতে চায়না।
এখন সে নিজের উপর এতটাই বিরক্ত যে সে লেখালেখিই বন্ধ করে দিতে চাইলো। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য শক্তি তাকে বার বার ডায়েরির কাছে নিয়ে যাচ্ছে, বারবার তার হাতে কলম তুলে দিচ্ছে এবং এমন কিছু লিখতে বাধ্য করছে যা সে লিখতে চাচ্ছে না। তবুও সে লিখছে।
এভাবে আর পারছে না সে।
কেউ ওকে বুঝতে পারছে না। আরিয়ান ও না।
গলা শুকিয়ে গেছে। পানি খেতে গিয়ে হঠাৎ টেবিলে আরিয়ানের ল্যাপটপ দেখতে পেলো সে। হয়তো আজ সকালে নোভা কে দেখতে এসে ভুলে ফেলে গেছে। নোভা ভাবলো ল্যাপটপ এ কিছু একটা লিখে দেখুক সে। হয়তো তার ডায়েরি টাই সকল নষ্টের মূল।
আরিয়ানের ল্যাপটপের পাসওয়ার্ড তার জানা। ল্যাপটপ খুলতেই সুদর্শন নিউরোসায়েন্টিস্ট আরিয়ানের ছবি ভেসে উঠলো। আনমনে মুচকি হাসলো নোভা। কি মনে করে ল্যাপটপের ফাইল গুলো ঘাটতে লাগলো সে। সেখানে একটি ফোল্ডার দেখতে পেলো যার নাম - " *নোভা* "!
আশ্চর্যের চরম শিখরে পৌছালো সে। ফোল্ডারটি তে ঢুকতেই কিছু ফাইল দেখতে পেলো সে,
১.সাবকনশাস ম্যানিপুলেশন
২.ড্রিম কন্ট্রোল থিওরি
৩.নোভা এক্সপেরিমেন্ট - স্টেজ থ্রি
হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে এলো তার। ফাইল গুলো রিড করতে করতে সকল কিছু যেন তার মাথায় একের পর এক ক্লিক করতে লাগলো
কয়েক মাস আগে আরিয়ান তাকে বলেছিল, নতুন এক নিউরোট্রান্সমিটার নিয়ে গবেষণা করছে। একটা ওষুধ যা মানুষের কল্পনাশক্তিকে তীব্র করে তুলবে।এতটাই তীব্র যে সে যা ভাববে তাই বাস্তবে রূপান্তর করবে। নোভা ভেবেছিল, এটা নিছক গবেষণা। কিন্তু না, সে ভুল ছিল। তার ওপরই চলছিল সেই গবেষণা! সেই ছিল এই এক্সপেরিমেন্ট এর আসল গিনিপিগ!
আরিয়ান তার মস্তিষ্কের নিউরোসিগন্যাল মডিফাই করছিল।
সে যা লিখত, তার অবচেতন মন সেটাকে বাস্তবায়িত করার ট্রিগার হিসেবে কাজ করত।
অর্থাৎ, নোভাই ছিল আসল অপরাধী! সকল খুনের পিছনে নোভারই হাত।
আরিয়ান তাকে ব্যবহার করে এতগুলা খুন করিয়েছে!
দেখতে দেখতে কখন রাত হয়ে এলো নোভার খেয়াল নেই। ল্যাপটপ থেকে চোখ সরাতেই হঠাৎ সামনে একটা আবছা কালো ছায়া মূর্তি দেখতে পেলো। ছায়ামূর্তি একটু কাছে আসতেই বুঝতে পারল সে, এটা আরিয়ান ই ।
নোভা অনেক ভয় পেতে লাগলো। তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো।
আরিয়ান তাকে বলল, "তুমি তাহলে সব জেনেই গেলে, কিন্তু কোনো লাভ নেই, তোমার কল্পনা, তোমার বাস্তবতা সব আমার কন্ট্রোলে!"
নোভা কি করবে কিছু বুঝতে পারল না। কিন্তু হঠাৎ তার চোখে এক ধরনের এক উন্মাদনা ঝলকে উঠলো। সে ধীরে ধীরে কাঁপা কাঁপা হাতে টেবিল থেকে তার ডায়েরি টা নিলো এবং লিখলো,
"আজ রাতে আমার ভালোবাসার মৃত্যু হবে," লিখেই নোভা কলম ফেলে দিলো। পরক্ষণেই আরিয়ান নিজের গলায় হাত রাখল, যেন দম আটকে আসছে। নোভা তাকিয়ে রইল—অবাক নয়, ভীত নয়, বরং একরকম প্রশান্তি নিয়ে। কারণ এবার, প্রথমবারের মতো, কলমটা তারই নিয়ন্ত্রণে ছিল।
~ Ramish Jahra