22/08/2025
গল্প: স্বপ্ন প্রহর💞
আযানের আগেই ঘুম ভেঙে গেল সুরাইয়ার। ঘুম ঘুম চোখে তাকালো ঘড়ির দিকে, এখনো আযানের সময় হয়নি। খুশি খুশি মনে পাশ ফিরে শুইলো। আজ উমায়েরের আযান শুনতে পাবে ও। প্রতিদিন ঘুমে মজে থাকে, স্বপ্ন দেখে উমায়ের আযান দিচ্ছে... মুগ্ধ হয়ে শুনছে হৃদয় কাড়া মন ভোলানো মধুর সুরের আযান। আর প্রতিদিনই আযানের শেষ শব্দটাতে ঘুম ভেঙে যায়। তখন ও বুঝতে পারে এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল। মন খারাপ হয়ে যায় সুরাইয়ার। এমন মন খারাপ নিয়ে দিনের শুরু হলে কারই বা ভাল লাগে? ভাবতে ভাবতেই আরও কয়েকবার ঘড়ি দেখলো.... হঠাৎ মাইকের আওয়াজ শুনে এক লাফে উঠে বসে সুরাইয়া। শুরু হয় উমায়েরের আযান। সে এক অবর্ণনীয় অনুভূতি। আল্লাহ্ তা'য়ালা এত মধু দিয়েছে ঐ কণ্ঠে...... কি করে কোন মানুষের কণ্ঠ এত মুগ্ধতা এনে দিতে পারে? সুরাইয়ার মনে হয় অনন্তকাল ধরে এই সুর শুনে শুনে জীবনের আর কোন প্রয়োজন অনুভব না করেই কাটিয়ে দিতে পারবে। আযান শেষে সুরের কোকিল নবীর শানে সুর তুললো তার মুখে "মুহাম্মাদের নাম যে আমার বুকে" সুরাইয়া একবার ভাবছে উঠে গিয়ে অযু করে আসবে কিন্তু পারলোনা, কিসের নেশায় যেন আটকে আছে সব। সংগীত শেষ করার পরেও ভাবনার জগৎ ছেড়ে বেরোতে পারেনি। কিছুক্ষণ আনমনা হয়ে বসে থেকে ফজরের নামাজ আদায় করলো। হাত তুলে দোয়া করলো, তার জীবনসাথী যেখানেই থাকুক না কেন সে যেন এমন কেউ হয়! ওর আর কোন চাওয়া নেই। ওকে যেন এমন ভাবে সুরে সুরে মুগ্ধ করে দিতে পারে। সে যেন আল্লাহর পথে থেকে জীবনকে রাঙিয়ে তুলতে পারে। এভাবেই প্রতিদিন মধুর সুরে ঘুম ভাঙে সুরাইয়ার। দিনগুলি ভরে যায় পূর্ণতায়। হঠাৎ একদিন পাল্টে গেল আযানের সুর। সুরাইয়ার বুকে যেন ছুরি বসালো কেউ। পর পর কয়েক ওয়াক্তে এমন আযান শুনে অস্থির হয়ে পরে সুরাইয়া। ভাবনায় পরে যায় কি এমন হল যে উমায়ের আযান দিচ্ছে না! কারো কাছ থেকে জানতেও পারছেনা কে কি মনে করে সে ভয়ে। ক্লান্ত বিকেলে ভারাক্রান্ত মনে বসে ছিল সুরাইয়া, ভাবছিল উমায়েরের কথা। ডাক শুনে চমকে উঠলো ওরই সমবয়সী এক চাচাতো ভাই ডাকছে, একটু ভরসা পেল মনে। বিভিন্ন কথার ফাঁকে জানতে চাইলো মুয়াজ্জিনের কথা, উসমান জানালো, উমায়ের দূরের কোন এক মাদরাসায় পড়তে গেছে; এখানে আর থাকবেনা। সুরাইয়ার চারপাশ যেন ঘন কালো অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে... কোন রকম ঘরে ফিরে গেল সে, এতদিন যা বুঝতে পারেনি আজ এক নিমিষেই তা বুঝে নিয়েছে ও। ওর জীবনের সবটুকু দিয়ে ভালবেসে ফেলছে উমায়েরকে। কিন্তু বুঝতে অনেক দেড়ি হয়ে গেল। উমায়ের এই গ্রামের ছেলে নয়, তাই এখানের কারো জানারও কথা নয় সে কোথায় আছে। অযু করে দু'রাকাত নামাজ আদায় করে প্রভুর দরবারে হাত তুললো সুরাইয়া। উমায়েরের জন্য দুয়া করলো প্রাণ খুলে। নিজে নিজেই ভাবলো "আমি যদি সৎ পথে থাকি আর নিজেকে সতি সাধ্বী নারী হিসেবে গড়ে তুলতে পারি তবে অবশ্যই আল্লাহ্ আমার দুয়া কবুল করবে, এবং যেভাবেই হোক উমায়েরের জীবনে আমার স্থান করে দিবে। ঠিক এভাবেই আল্লাহর কাছে কেঁদে কেঁদে উমায়েরের জন্য দুয়া করে কাটিয়ে দিল পাঁচটি বছর। এর মাঝে অনেক ছেলে আসতে চেয়েছে সুরাইয়ার জীবনে, কিন্তু তাদেরকে পাত্তা দেয়নি ও। মনেপ্রাণে শুধু মাত্র উমায়েরকেই ভালবেসে গেছে এবং একাকি নির্জন গভীর রাতে প্রভুর দরবারে হাত তুলে উপায় চেয়েছে তার কাছে, আশ্রয় চেয়েছে যেন উমায়ের ছাড়া অন্য কাউকে জীবনসাথী করতে না হয়। এদিকে উমায়ের দেশের গৌরবোজ্জল এক মাদরাসা থেকে পড়ালেখা শেষ করছে সবে। এরই মধ্যে মাদরাসা প্রধানের নিকট হতে চিঠি আসলো, তারা ওর আচরণে মুগ্ধ। মাদরাসা কর্তৃপক্ষ তাকে শিক্ষক হিসেবে রেখে দিতে চান ওখানেই। চিঠি পেয়ে আনন্দে আত্মহারা উমায়ের। গ্রামের সবাইকে মিষ্টি খাওয়ালো, কিছুদিন পরেই চাকরিতে যোগদান করতে হবে তাই ঘুরে ঘুরে সব আত্মীয় স্বজনদের বাসায় বেড়াতে লাগলো, তাদের সাথে দেখা করে দুয়া নেয়ার উদ্দেশ্যে। হঠাৎ মনে পড়লো সেই গ্রামের কথা যেখানে বছর খানেক মুয়াজ্জিনের চাকরি করেছিল সে। ওখানের লোকজন প্রচণ্ড ভালবাসতো তাকে, মুরাব্বিরা দুয়া দিত সব সময়। তাই এই খুশির খবরটি দিয়ে তাদের থেকে দুয়া নেয়া প্রয়োজন মনে করলো উমায়ের। মসজিদের সভাপতির ছেলে তার ভাল বন্ধু ছিল তাই সে বাসাতেই গিয়ে উঠলো। জোহরের নামাজে মসজিদে গিয়ে সবার সাথে দেখা হল, সবাই খুব খুশি। প্রত্যেকেই অনেক অনেক দুয়া দিল তাকে। দুপুরের খাবার খেয়ে ঘুরতে বের হল কয়েকজন মিলে। এতগুলো বছর পরে সেই পরিচিত পথ-ঘাট, পরিচিত- মাঠ ঘুরে বেশ আনন্দ-পেল আজ। কথায় কথায় বন্ধুরা বিয়ের কথা বললে উমায়ের জানালো ভাল মেয়ে না পেলে বিয়ে করার ইচ্ছে নেই তার। ঠিক তখন একজন সংবাদ দিল, সুরাইয়ার, জানালো তার স্বতীত্বের কথা। সবকিছু শুনে উমায়েরের ভাল লাগতে শুরু করলো। বাড়িতে গিয়ে বাবা মাকে সে এ কথা জানালো, তারা আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রস্তাব পাঠালো সুরাইয়ার বাড়িতে। কিন্তু সুরাইয়াকে কিছুতেই রাজি করতে পারলনা তার বাবা মা। কারন সুরাইয়া জানতোনা এটাই তার স্বপ্ন-পুরুষ উমায়ের। ছেলের সব কিছু জেনে সুরাইয়ার একটু অমত করার পরেও বাবা মা বিয়ের আয়োজন করলেন। এক প্রকার জোর করেই বিয়ে হয়ে গেল সুরাইয়ার। বিয়ের দিনেও অঝরে কাঁদছিল সে তার উমায়েরের জন্য। কিন্তু কেউ শুনলোনা তার কান্না। মহা-উৎসবে বরযাত্রী নিতে এলো তাকে। নতুন বউয়ের এমন কান্নায় অবাক হলো সবাই। কেউ কেউ বলাবলি করছে, এ মেয়ের নিশ্চয়ই কারো সাথে প্রেম আছে, সেখানে বিয়ে হয়নি বলেই এমন ভাবে কাঁদছে। খবরটা উড়তে উড়তে উমায়েরের কানেও গেল। উমায়ের মনে মনে ভেঙে পড়লো খুব। তবুও বুঝালো মনকে, তেমন কিছু হলে সরাসরি নতুন বউয়ের সাথে কথা বলবে সে। জানতে চাইবে সত্যিটা!!
এমন ভাবনায় ডুবে সময় পার করলো উমায়ের, গাড়িতে সুরাইয়া আর সে পাশাপাশি বসলেও কথা বলেনি কেউ কারও সাথে। এদিকে সুরাইয়ার কান্না আরও বেড়ে গেল। সে ভাবনায় পরে গেল এ কেমন স্বামী পেল সে? আল্লাহ এত গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ লিখে রেখেছেন ওর কপালে! সময় গড়িয়ে যায় আপন মনে। দেখতে দেখতে রাত দশটা বেজে গেল। সুরাইয়া ভাবতে ছিল বসে বসে যা হবার হয়ে গেছে এখন এটাই তার সংসার এই তার স্বামী স্বপ্নের উমায়েরকে ভুলে যেতে হবে চিরদিনের জন্য। আমিতো কম কাঁদিনি আল্লাহর কাছে, তিনি যা দিয়েছেন এতেই হয়ত আমার মঙ্গল নীহিত। রাতের খাবারের পর হঠাৎ ভাবী-বোন সম্পর্কিয় কয়েকজন এসে আনন্দ ফুর্তি করে (যতটুকু শরিয়ত সম্মত) একই রুমে থাকতে দিল দু'জনকে। উমায়ের ঘরে ঢোকার পরে সুরাইয়া তাকে সালাম করলো ঠিকই কিন্তু একবারও তাকালোনা তার দিকে। আর উমায়ের ভাবলো তাকে যতক্ষণে মন থেকে গ্রহণ করতে না পারবে ততক্ষণে সেও সুরাইয়াকে গ্রহণ করবে না। তাই কিছুটা মন খারাপ আর রাগত স্বরেই সরাসরি প্রশ্ন করলো সুরাইয়াকে এত কান্না এবং ভেঙে পরার কারন কি? সুরাইয়া খুব ভয় পেল, ভাবলো মিথ্যা বলবে না, একে তো মহাপাপ তারপরে ইনি এখন তার স্বামী যা করে করুক তার কাছে সত্যিটাই বলবে। এসব ভাবতে ভাবতেই উমায়েরের দ্বিতীয় প্রশ্ন "আপনার কোন পছন্দ ছিল কি?" তাহলে আমাকে বলতে পারেন তাঁর কাছে আপনাকে পৌঁছে দেব আমি। সুরাইয়া আরও ভয় পেল এবং কেঁদে ফেললো। কাঁদতে কাঁদতে বলতে শুরু করলো সেই মুয়াজ্জিন উমায়েরের কথা। যাকে ছয় বছর ধরে দূর থেকে মনে প্রাণে ভালবেসে এসেছে সে। একটু একটু করে ভয়ে ভয়ে সব খুলে বললো সুরাইয়া, এটাও জানালো উমায়েরের সাথে তার কোন দিন কোনও কথাও হয়নি। ছল ছল নয়নে মুগ্ধ হয়ে সব কিছু শুনতে লাগলো উমায়ের। আর মনে মনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলো এবং ক্ষমা চাইতে লাগলো। এমন একটা মেয়েকে সন্দেহ করে এত কঠোর ব্যাবহার করার জন্য। তার আগেই ভাবা উচিৎ ছিল আল্লাহ্ তার মঙ্গল ছাড়া আর কিছু করতে পারেন না। কিছুক্ষণের জন্য সে ভরসা হারিয়ে ফেলছিল আল্লাহ্ তা'য়ালার উপর থেকে, সে ভেবেই নিয়েছিল সুরাইয়া একটা খারাপ মেয়ে এবং তার ভাগ্যে আল্লাহ্ এমন মেয়েই রেখেছেন। তাই বারবার এস্তেগফার পাঠ করতে ছিল উমায়ের। কথা শেষ করে ভয়ে জড়োসরো হয়ে বসে ছিল সুরাইয়া, উমায়ের গিয়ে তার খুব কাছে বসলো। সুরাইয়া ভয় পেয়ে গেল কাঁপা গলায় বললো আমি বিরাট বড় ভুল করে ফেলছি, কিন্তু আপনাকে তো সত্যিটাই বলেছি আর এখন আপনি আমার স্বামী তাই আমাকে যে শাস্তি দেন আমি খুশি মনে তাই ই নিব, এসব বলে কাঁদতে থাকে সুরাইয়া। সুরাইয়ার কান্না দেখে বুক ফেটে কান্না আসছিল খুশিতে। আল্লাহ্ তার জন্য এত বড় একটা নিয়ামত রেখেছে অথচ সে কতবড় ভুল করে বসেছিল। অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করলো "আলহামদুলিল্লাহ্ " এরপর এই প্রথম সুরাইয়ার হাতে আলতো করে হাত রাখলো সে, মিষ্টি সুরে ডাকলো পাগলী। সুরাইয়া তখনো কাঁদছিল ভয়ে। ডাকটা শুনে চমকে গেল সে, লোকটা এত সহজে সব মেনে নিল? ক্ষমা করে দিল তাকে? উমায়ের আবার ডাকলো পাগলী! কেঁপে উঠলো সুরাইয়া হৃদয়ের কোথায় যেন এক পশলা বৃষ্টির পরে এক টুকরা ভেজা রোদ উঁকি দিল। কোন কথা বলতে পারলোনা ও, শ্রদ্ধায় আবার সালাম করতে ইচ্ছে করলো তার। উমায়ের বুঝতে পারলো সুরাইয়ার জড়তা, দুই হাত দিয়ে সুরাইয়ার হাত আঁকড়ে ধরে বললো "আমার দিকে তাকাও" কিন্তু লজ্জা আর ভয়ে তাকাতে পারলো না সুরাইয়া। এবার আরও কাছে এসে এক হাতে জড়িয়ে নিল সুরাইয়াকে, কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো "আমি যদি তোমার সেই হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন উমায়ের হই তবুও কি আমায় দেখবে না? কথা শুনে ফিরে তাকালো সুরাইয়া আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছেনা মুখটা। হাত বাড়িয়ে আলো জ্বাললো উমায়ের, কেঁপে উঠলো সুরাইয়া। এ যে সেই মুখ, সেই প্রিয় মুখ! যদিও সরাসরি কোনদিনদেখেনি তবুও কি রকম পরিচিত লাগছে। এক মুহুর্তেই মেঘ কেটে সোনালি রোদে ভরে যায় সুরাইয়ার মুখ। মুখে কিছু বলতে পারছে না ও, শুধু পলকহীন ভাবে তাকিয়ে আছে উমায়েরের দিকে। উমায়েরও অনুভব করতে পারছে সুরাইয়ার কম্পন।
এভাবে দু'জন দু'জনার দিকে কতক্ষণ তাকিয়ে থাকে কেউ জানে না। উমায়েরই প্রথম কাছে টেনে নেয় সুরাইয়াকে। এতদিনের অপেক্ষার, প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে সুরাইয়া কাছে পায় তার স্বপ্ন পুরুষকে। নির্বিঘ্নে মাথা রাখে উমায়েরের কাঁধে। উমায়ের পরম যত্নে হাত বুলিয়ে দিল তার মাথায়। উৎফুল- কণ্ঠে বললো চলো দু'জন মিলে আল্লাহ্ শোকরিয়া আদায় করি। নামাজ এবং মোনাজাত শেষে দু'জন তাকিয়ে থাকে দু'জনার পানে। সারাদিনের ক্লান্ত শ্রান্ত সুরাইয়া সব বাঁধা আর ভয় কাটিয়ে সুখের আবেশে ঘুমিয়ে পরে উমায়েরের কোলে। কখন রাত ফুরিয়ে গেল সে বুঝতেই পারলো না। চোখ মেলে দেখলো উমায়ের নেই উঠে বসলো সুরাইয়া। হঠাৎ কাছেই কোন মসজিদ হতে ভেসে এলো ফজরের আযান! সেই সুর, সেই চেনা সুর!! নিজেদের মসজিদে আযান দিচ্ছে উমায়ের। আযান শেষে আযানের দোয়া পড়ে অযু করতে গেল সুরাইয়া দীর্ঘ সময় নিয়ে নামাজ আদায় করে হাত তুললো রবের দরবারে। কতক্ষণ শোকরিয়া আদায় করছে জানা নেই, টপ টপ করে অশ্রু পড়ছে চোখ থেকে। এ অশ্রু দুঃখের নয় লক্ষ কোটি শোকরিয়া জানানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা।
লেখক: (শব্দে আঁকা অনুভূতি)
শব্দে আঁকা অনুভূতি
゚viralシfypシ゚
#গল্প #গল্পের ゚viralfbreelsfypシ゚viral