25/04/2026
বাংলার ষোলো ভূত - Banglar Sholo Bhoot ।। Bengali Animated Ghost Rhyme
--------------------------------------
পেত্নীটা ওই উলটা পায়ে,
বসে থাকে শ্যাওড়া গাছে।
গাছ তলাতে গেলে কভু,
হেঁটে চলে পাছে পাছে।
বেলগাছে এক ব্রহ্ম-দৈত্য,
টেকো মাথায় হাত বুলায়।
ধুতি দোলে, পৈতা দোলে,
ডালে বসে পা ঝুলায়।
শাঁকচুন্নির বিকট হাসি,
সুপারি গাছে বাস করে।
সবাই ডাকে ভূতের মাসী,
রাগলে সে এক-ঘা মারে।
মামদো বেটা ভেসে আসে,
দাঁত দেখি—সব মূলা রে!
অত্ত বড় দাড়ি বাবা,
দুইখানা কান—কুলা রে!
কুনি লুকায় গৃহ কোণে,
ময়লা ঘরে আস্তানা।
বুনি থাকে বাঁশ বাগানে,
একলা বনে যেও না।
বট গাছের আগায় বসে,
গেছো ভূতটা ডর দেখায়।
নদীর ধারে মেছো ভূতে,
কেড়ে নিয়ে মাছ খায়।
পুন্নিরাতে একলা ঘরে,
চোরাচুন্নি যায়-আসে।
কন্ধকাটা হেঁটে বেড়ায়,
মাথা ছাড়াই খুব হাসে।
কানাভুলো শিকার খোঁজে,
একলা পেলে ঘাড় মটকায়।
তাল গাছের ওই ডালে বসে,
একানড়েটা পা নাচায়।
খাল কিনারে দেও-জোকা,
বসে থাকে—খাড়া কান।
জটাধারী পুকুর তলে,
পা ধরে এক মারে টান!
বেঘো হাঁটে বনের মাঝে,
সুযোগ পেলেই মারে ঘা।
নিশি ডাকে নরম সুরে,
ডাকলে কভু যেও না।
------------------------------
বাাংলার ১৬ ভূত:
১. পেত্নী
পেত্নী হলো বাংলা লোককথার অন্যতম জনপ্রিয় মহিলা ভূত। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, যেসব নারী অবিবাহিত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন বা যাদের কোনো অতৃপ্ত ইচ্ছা থাকে, তারাই মৃত্যুর পর পেত্নী হন। এরা সাধারণত শ্যাওড়া বা গাব গাছে বসবাস করতে পছন্দ করে। এদের পা পেছনের দিকে ঘোরানো থাকে। এরা মাঝেমধ্যে মানুষের রূপ ধারণ করতে পারে, তবে তাদের পায়ের গঠন দেখে এদের চেনা যায়।
২. ব্রহ্ম-দৈত্য
এরা ভূত সমাজের মধ্যে বেশ সম্ভ্রান্ত ও পবিত্র হিসেবে গণ্য হয়। কোনো ব্রাহ্মণ যদি অপঘাতে মৃত্যুবরণ করেন, তবে তিনি ব্রহ্ম-দৈত্য হন। এরা সাধারণত পৈতা পরিহিত ধুতি পরা অবস্থায় বিচরণ করেন এবং পবিত্র বেল গাছে বাস করেন। এরা কারো ক্ষতি করে না, বরং অনেক গল্পে এদের মানুষের উপকার করতে দেখা যায়। তবে এদের রাগলে বা অপমান করলে এরা ভয়ংকর হতে পারে।
৩. শাঁকচুন্নি
শাঁকচুন্নি হলো বিবাহিত নারীদের প্রেতাত্মা। নামটির উৎপত্তি 'শঙ্খচূর্ণী' থেকে। এরা সাধারণত সাদা শাড়ি এবং হাতে শাঁখা-পলা পরিহিত অবস্থায় দেখা দেয়। এরা সুপারি গাছে বা বাড়ির আশেপাশের বড় গাছে বাস করে। এরা সংসার জীবনে ফিরে আসতে চায়, তাই মাঝেমধ্যে এরা জীবিত বিবাহিত নারীদের ভর করে বা তাদের রূপ ধারণ করে সংসারের সুখ ভোগ করতে চায়। এরা মাছ এবং মিষ্টি খেতে খুব পছন্দ করে।
৪. মামদো
মামদো ভূত হলো মুসলিম সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তির অপঘাতে মৃত্যুর পর তৈরি হওয়া আত্মা। এরা সাধারণত কবরস্থান বা নির্জন স্থানে বিচরণ করে। এদের চেহারা বেশ ভয়ংকর—দাঁত মুলার মতো লম্বা এবং কান কুলার মতো বড়। এদের স্বভাব কিছুটা রাগী এবং খামখেয়ালি হতে পারে।
৫. কুনি
গ্রামবাংলার ছড়ায় ও লোককথায় কুনি ভূতের উল্লেখ পাওয়া যায়। এরা সাধারণত গৃহস্থের বাড়ির ভেতরে বা পরিত্যক্ত ঘরের কোণে (কুন) ঘাপটি মেরে থাকে। এরা খুব বেশি শক্তিশালী না হলেও গৃহস্থের কাজে বা বাড়ির সদস্যদের ভয় দেখিয়ে বিরক্ত করতে পছন্দ করে। নোংরা বা অপরিচ্ছন্ন কোণ এদের প্রিয় জায়গা।
৬. বুনি
কুনির মতোই বুনিও এক ধরণের গ্রামীণ ভূত, তবে এরা ঘরের ভেতরে নয়, বরং বাড়ির বাইরের ঝোপঝাড় বা বাঁশ বাগানে থাকে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বাঁশ ঝাড়ের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এরা ভয় দেখায় বা অদ্ভুত শব্দ করে। এরা মূলত নির্জন জঙ্গল পছন্দ করে।
৭. গেছো ভূত
নামের অর্থ থেকেই বোঝা যায় এরা গাছে বসবাসকারী ভূত। সাধারণত বড় বটগাছ, অশ্বত্থ গাছ বা প্রাচীন কোনো গাছে এদের আস্তানা থাকে। এরা গাছে বসে পা দুলিয়ে থাকে এবং রাতে সেই গাছের নিচ দিয়ে কেউ গেলে তাকে ভয় দেখায়। কখনো কখনো এরা গাছ থেকে নেমে পথিকের ঘাড় মটকে দেয় বা তাকে গাছের মগডালে তুলে ফেলে।
৮. মেছো ভূত
বাঙালি ও মাছের সম্পর্কের মতোই এই ভূতেরও মাছের প্রতি তীব্র লোভ থাকে। এরা সাধারণত নদী, খাল, বিল বা পুকুর পাড়ে থাকে। কোনো জেলে বা সাধারণ মানুষ বাজার থেকে মাছ কিনে ফেরার পথে এরা পিছু নেয় এবং মাছ চায়। অনেক সময় এরা বিড়ালের রূপ ধরে রান্নাঘরে ঢুকে মাছ চুরি করে খায়। মাছ না দিলে এরা মানুষের ক্ষতি করতে পারে।
৯. চোরাচুন্নি
এরা হলো চোরদের আত্মা। জীবদ্দশায় যারা চুরি করত, মৃত্যুর পর তারা চোরাচুন্নি হয়। এরা অত্যন্ত দুষ্টু প্রকৃতির এবং পূর্ণিমার রাতে এদের উপদ্রব বাড়ে। এরা সরাসরি মানুষের ক্ষতি না করলেও, জিনিসপত্র চুরি করা বা মানুষকে বিভ্রান্ত করে বিপদে ফেলার মতো কাজ করে।
১০. কন্ধকাটা
এটি বাংলার অন্যতম ভীতিপ্রদ ভূত। 'কন্ধ' মানে ধড় বা শরীর। যাদের মাথা কেটে ফেলা হয়েছে বা রেলে কাটা পড়ে মাথা ও শরীর আলাদা হয়ে গেছে, তারাই কন্ধকাটা ভূত হয়। এদের মাথা নেই, শুধু ধড় থাকে এবং চোখের বদলে বুকে জ্বলজ্বলে চোখ থাকতে পারে বলে বিশ্বাস করা হয়। এরা সবসময় নিজেদের হারানো মাথা খুঁজে বেড়ায় এবং সামনে যাকে পায় তাকেই আক্রমণ করতে চায়।
১১. কানাভুলো
এই ভূতটি মানুষকে পথ ভুলিয়ে দেয়। গভীর রাতে বা নির্জন দুপুরে এরা মানুষের ওপর ভর করে বা মায়া তৈরি করে, যার ফলে মানুষ চেনা পথ হারিয়ে ফেলে এবং একই জায়গায় গোলকধাঁধায় ঘুরতে থাকে। এরা সাধারণত মানুষকে নির্জন কোনো স্থানে বা খাদের কিনারে নিয়ে গিয়ে বিপদে ফেলে। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এদের কবলে পড়লে চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা বা ভুল মনে হয়।
১২. একানড়ে
এই ভূতের মাত্র একটি পা থাকে। এরা সাধারণত তাল গাছে বসবাস করে। এদের শরীর বেশ বড় হলেও এরা এক পায়ে ভর দিয়ে তাল গাছের মাথায় দাঁড়িয়ে থাকে। গ্রামের মানুষদের বিশ্বাস, এরা বিশেষ করে দুষ্টু বাচ্চাদের ভয় দেখায় বা ধরে নিয়ে যায়। ঝোড়ো হাওয়ার সময় তাল গাছের নড়াচড়াকে অনেক সময় একানড়ের উপস্থিতি মনে করা হয়।
১৩. দেও-জোকা
'দেও' এবং 'জোকা' মূলত জলাশয় বা বিলের সাথে সম্পর্কিত শক্তিশালী অপদেবতা বা দানো। 'দেও' শব্দটি দেব বা দৈত্য থেকে এসেছে, যারা খালের কিনারে বা জলার ধারে থাকে। আর 'জোকা' (যক্ষ বা যক্ষী থেকে আগত) সাধারণত জলের তলে গুপ্তধন পাহারা দেয় বা মানুষকে জলের দিকে টানে। এরা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং রাগী প্রকৃতির হয়।
১৪. জটাধারী
এরা মূলত সাধু বা সন্ন্যাসীদের প্রেতাত্মা, যাদের মাথায় বিশাল জট থাকে। এরা সাধারণত প্রাচীন পুকুর, দীঘি বা গহীন জলের নিচে বসবাস করে। এরা সাধারণত শান্ত থাকে, কিন্তু কেউ যদি পবিত্রতা নষ্ট করে বা তাদের ধ্যানে ব্যাঘাত ঘটায়, তবে এরা তাকে জলের গভীরে টেনে নিয়ে যায়। এদের জলের নিচের ভূত বা 'জলপিশাচ'-এর একটি রূপ বলেও মনে করা হয়।
১৫. বেঘো ভূত
সুন্দরবন ও তার আশেপাশের এলাকায় এই ভূতের উপদ্রব বেশি শোনা যায়। বাঘের আক্রমণে যারা মারা যায়, তারা বেঘো ভূত হয়। এরা জঙ্গলে কাঠুরিয়া বা মধু সংগ্রহকারীদের বাঘের ডাক নকল করে বা মায়া তৈরি করে বাঘের ডেরায় নিয়ে যায়। এরা মূলত বাঘের অনুচর হিসেবে কাজ করে এবং নতুন শিকারের খোঁজে থাকে।
১৬. নিশি
বাংলার ভয়ের গল্পে 'নিশি' অত্যন্ত ভয়ংকর একটি সত্তা। এরা গভীর রাতে মানুষের নাম ধরে ডাকে। লোকবিশ্বাস হলো, নিশি কখনোই তিনবার ডাকে না, মাত্র এক বা দুবার ডাকে। চেনা মানুষের গলার স্বরে এরা নাম ধরে ডাকে, আর কেউ যদি সেই ডাকে সাড়া দিয়ে দরজা খুলে বাইরে আসে, তবে সে আর ফিরে আসে না। নিশি তাকে সম্মোহিত করে অজানার উদ্দেশ্যে নিয়ে যায়।
Bhoot Bangla
Banglar Bhoot