18/07/2025
লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাকারিয়া কামাল: জ্ঞান, দায়িত্ব ও আস্থার এক আলোকবর্তিকা
১৪ জুলাই ২০২৫, সকালবেলা—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি হৃদয়বিদারক বার্তা ভেসে উঠল। জাকারিয়া কামাল আর আমাদের মাঝে নেই। তার ভাইয়ের ফেসবুক পোস্টে জানা গেল, তিনি পাড়ি দিয়েছেন অনন্তের পথে। রাতে দেখা গেল সেনাবাহিনীর গার্ড অব অনার দিয়ে এই সাহসী, মেধাবী ও চিন্তাশীল মানুষটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে শেষ বিদায় জানানো হচ্ছে। চোখ ছলছল করে উঠল; কারণ তিনি শুধু একজন সেনা অফিসার ছিলেন না, ছিলেন এক জীবন্ত আদর্শ, এক যুগান্তকারী চিন্তার ধারক ও বাহক।
জন্ম ও কর্মজীবনের সংক্ষিপ্ত ছায়াচিত্র
জাকারিয়া কামাল ১৯৫৯ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন, স্বনামধন্য কামাল হোসেন ও হোসনে আরা বেগমের ঘরে। তাঁর ব্যক্তিত্বের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় পারিবারিক শিক্ষায়, যা তাকে একটি দায়িত্বশীল, প্রজ্ঞাবান ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগদানের মাধ্যমে তিনি দেশের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। শুধু দেশেই নয়, তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে—ইরাক-কুয়েত ও ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে—গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (BNCC) ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সে (BSF) তার অবদানও ছিল স্মরণীয়। এসব কর্মযজ্ঞ তাঁকে শুধু পেশাগত দিক থেকে নয়, বরং মানবিক ও কৌশলগত দিক থেকেও সমৃদ্ধ করে তোলে।
বিশ্বাস, বিজ্ঞান ও কুরআনের আলো
তাঁর চিন্তাজগৎ ছিল এক কথায় বিস্ময়কর। ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে তিনি বলতেন:
"কুরআন অন্ধ বিশ্বাস নয়, বরং জ্ঞানভিত্তিক আস্থার দলিল।"
এই একটি বাক্যে ফুটে ওঠে তার চিন্তার গভীরতা ও প্রগতিশীলতা। তিনি কুরআনকে একটি চলমান ও চিরসত্য বই হিসেবে গ্রহণ করতেন, যার ব্যাখ্যা প্রতিটি যুগের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করতে হবে। তিনি স্বীকার করতেন বিজ্ঞানের পরিবর্তনশীলতা, আবার বিশ্বাস করতেন যে ভবিষ্যতের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলো কুরআনের আরও গভীর অর্থ উন্মোচনে সহায়ক হবে।
তিনি নিজেই একজন চিন্তাবিদ হিসেবে ‘তাফসির’ বা কুরআনের ব্যাখ্যাকে যুগোপযোগী ও যুক্তিনির্ভর করার প্রয়াস চালিয়েছেন। ইসলামি চিন্তার ক্ষেত্রে এ এক অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও সাহসী অবস্থান, যা আমাদের যুগে বড়ই প্রয়োজন।
একটি নিঃশব্দ বিদায়, একটি উচ্চকিত শিক্ষা
সেনাবাহিনীর গার্ড অব অনারে বিদায় জানানোর দৃশ্যটি ছিল আবেগঘন, গৌরবময় ও চিন্তামগ্ন। দেশের জন্য যিনি বছরের পর বছর শৃঙ্খলা, ত্যাগ ও চিন্তার আলো জ্বালিয়ে গেছেন, তাঁর জন্য এটি এক প্রাপ্য সম্মান। কিন্তু বিদায় শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি আমাদের জন্য এক উপলব্ধি—আমরা একজন আদর্শ, একজন চিন্তানায়ক, একজন আলোর বাহককে হারালাম।
শেষ কথা
জাকারিয়া কামাল ছিলেন আধুনিক মুসলিম মননের এক অনন্য প্রতীক। একদিকে তিনি ছিলেন এক সুশৃঙ্খল সেনা অফিসার, অন্যদিকে ছিলেন বিজ্ঞানমনস্ক কুরআন-অনুসন্ধানী চিন্তাবিদ। তাঁর জীবন আমাদের শিখিয়ে দেয়—ধর্মের পথ কুসংস্কারমুক্ত ও যুক্তিনির্ভর হতে পারে, দেশপ্রেম হতে পারে মানবতা ও বিশ্বশান্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আমরা আজ গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করি তাঁকে। তার চিন্তা ও জীবনাদর্শ বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হয়ে উঠুক পথপ্রদর্শক।
আল্লাহ তাঁকে জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তর দান করুন। আমিন।
লেখক: মিযান আযিয