পুনশ্চঃ - Punoshcho

পুনশ্চঃ - Punoshcho The Art of Gentle Melancholy

সোডিয়াম বাতির নির্জীব আলোতে ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল প্রত্যেকটা মুখ। এখন সন্ধ্যা। বাতাসে বেগ পেতে শুরু করেছে। আকাশটাও মেঘে ঢাক...
30/11/2025

সোডিয়াম বাতির নির্জীব আলোতে ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল প্রত্যেকটা মুখ। এখন সন্ধ্যা। বাতাসে বেগ পেতে শুরু করেছে। আকাশটাও মেঘে ঢাকা। যেকোন সময় বৃষ্টি নামবে।

মোহিনী নামের মেয়েটা এসে দড়িয়েছিল বাসের প্রতিক্ষায়। সে দেখছিল ঝোড়ো বাতাসে এদিকে ওদিকে ধুলো উড়তে শুরু করেছে। সে প্রার্থনা করছিল বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগেই যেন তার বাসটা আসে। একদিকে বৃষ্টির তাড়া অন্যদিকে বাসের প্রতিক্ষা দুটো মিলে সে বেশ অস্থির হয়ে পরছিল। তার চোখের সামনে ঝুলছিল একগুচ্ছ দলছুট চুল। সে বার বার সেটাকে কানের পিছনে গুজে দিচ্ছিল আর বাতাসের ঝাপটায় সেটা আবার স্বস্থানে আসীন হচ্ছিল। তার বেশ বিরক্ত লাগছিল ব্যাপারটায়। সে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল কিন্তু সময় যেন কাটছেই না।

আশেপাশের প্রতিটি মুখেই বিরক্তি। কোথাও কোথাও সে বিরক্তি শাসনব্যবস্থার গুষ্টি উদ্ধারে মেতেছে। সে সেদিক থেকে কান সরিয়ে তাকিয়ে ছিল আকাশের দিকে। আকাশে চাঁদ উঠেছে। মেঘের সারির মাঝে একটু একটু দেখা যাচ্ছে চাঁদ। নাহ, ভালোলাগছে না। তার কেন যেন মনে হচ্ছিল সে আজ ভাল নেই।

প্রতিদিনই সন্ধ্যার এ সময়টা বড় বিরক্তির। বড় নাজেহালের। তবুও যতই একঘেয়েমির হোক মনের মধ্যে ঘরে ফেরার একটা দম থাকে। কিন্তু আজ কেমন যেন সবকিছু ওলট-পালট, ছন্নছাড়া। মনের মধ্যে কি হচ্ছে আজ? মোহিনী আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকায়। ঝিড়ি ঝিড়ি হিমেল বাতাসে বুকটা জুড়াতে গিয়েও জুড়াতে পারে না। কি হল আজ তার! মনের মধ্যে যে মানুষটার চেহারা ভাসছে সেই কি সমস্ত সত্তার অস্তিত্বের সংকট? মোহিনী কিছুই বুঝে ওঠে না। সে শুধু সৌমিকের কথা ভেবে যায় আনমনে।

হয়তো সৌমিক আর নিসার ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠাটা সে মানতে পারছে না। কিন্তু কেন? সে জানে না। সত্যিই জানে না।

মোহিনী চেয়ে আছে। সে দেখছিল আকাশের মেঘ কেটে যাচ্ছে। সে একটু স্বস্তিবোধ করছিল। সে খেয়াল করলো একটা কাগজের টুকরো বাতাসে ডিগবাজি খেতে খেতে তার পায়ের সামনে এসে পড়েছে। একটা একশো টাকার নোট। সে নুয়ে সেটাকে তুললো। সন্দিগ্ধ চোখে তাকাচ্ছিল এদিকওদিক। সে আশা করেছিল ভীর থেকে কেউ একজন চেঁচিয়ে উঠবে- এক্সকিউজ মি, টাকাটা আমার।

নাহ, কেউ চেঁচাল না। নতুন একটা একশো টাকার নোট। টাকার একপাশে ছোট্ট করে লেখা, "মোহিনী, খুব ভালবাসি তোমায়"। একটা মৃদু শিহরন খেলে গেল তার মধ্যে। তার হাসিও পেল অবশ্য। সে আশেপাশে তাকালো। না কেউ দেখছে না তার দিকে। "আশ্চর্য! এটা কোত্থেকে আসলো?"- সে আবার মাথা ঘুরিয়ে রাস্তার এপাশ ওপাশটা দেখলো। নাহ, সবাই যে যার মত দাঁড়িয়ে আছে।

সে আবার লেখাটার দিকে তাকালো। টাকার অন্যপাশে আর একটা লেখা,

"রঙধনু চাইনা,

যে বকুল ফুলের মালা তুমি দিয়েছিলে আমায়,

তাই দিয়ে সাজাবো আকাশ।

দামী আসবাব চাইনা,

তুমি থাকলে পাশে,

মেঝেতে শুয়েই কাটিয়ে দেব একশত বছর।"

"ন্যাকামি। একদম ফালতু" ভাবছিল মোহিনী। টাকার উপর কি প্রেম রে বাবা! যতসব কাজকারবারহীন ষণ্ডামার্কা লোকের কাজ এগুলো। সে ভাবছিল টাকাটা ফেলে দেবে। তারপর কি ভেবে আবার চোখবুলালো লেখাগুলোতে।

সে খুঁটিয়ে দেখছিল হাতের লেখাটা। সে খেয়াল করছিল "বলপেন" নাকি "জেলপেন"। জেলপেন। হুম। সৌমিক তো জেলপেন দিয়েই লেখে…..!

"আশ্চর্য! এগুলো কি ভাবছি আমি?- সে বুঝতে পারছিল না তার মনের এমন অদ্ভুত চাওয়াটা হঠাৎ মাথাতুলে দাঁড়াল কেন? সে বুঝতে পারছিল না কেন তার মন বলছে আজ সৌমিকের টাকা খোয়া গেছে এই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময়। কল্পনার কনকনে শীতের কোন জোছনা রাতে গ্রামের মেঠোপথে যে ছেলেটা নিজের চাদরটা খুলে জড়িয়ে দিত তার শরীরে সে ছিল সৌমিক। সে বুঝতে পারছিল না কেন সে এতদিন জানতে পারেনি। নাকি জেনেও মুখফুটে বলা হয়নি কখনো……."

কিন্তু কেন এই জড়তা, যে জড়তা জীবনের দিগন্তরেখাকে মুছে দেয়, স্বপ্নকে দুমড়ে মুচড়ে নিক্ষেপ করে অন্ধকার কারাগারে?সে বুঝতে পারছিল তার মধ্যে একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারছিল তার মনের রাজ্যের সব জড়তায় জড়ানো অপূর্ণ ইচ্ছেগুলো আজ কেমন পূর্ন হয়ে উঠতে চাচ্ছে। তার কেন যেন মনে হচ্ছিল খুব দেরি হয়ে গেছে। খুব।

সে ব্যাগ থেকে মুঠোফোনটা বের করলো। তারপর সোজা ফোন করে বসলো সৌমিককে।

-হ্যা মোহিনী বল।

মোহিনী কি বলবে বুঝতে পারছিল না। সে ঘামছিল। সে কোনোরকম মুখ খুলে বলল,

-সৌমিক।

-কিরে তোর কি হইছে? তোর কন্ঠ এমন লাগতেছে ক্যান?

-না, কিছু না। তুই একটু ধানমন্ডি আসতে পারবি?- মোহিনীর শ্বাসপ্রশ্বাস ঘন হয়ে উঠছিল।

-এখন? উ……সারে সাতটা বাজে, না? হুম পারবো। তবে একটু লেট হবে। এই ধর সারে নটা-দশটা।

-এতো লেট! এখুনি একটু আয় না।

-এখুনি? এখুনি তো পারছি না। নিসার শরীরটা একটু খারাপ। ওকে নিয়া হসপিটালে আসছি।

-ওহ। ওর মা নেই সাথে?

-আছে। ওর মা আর মামা আছেন। তবুও। বোঝই তো। একটু দৌড়ঝাঁপ লাগলে করা যাবে আরকি।

-ও আচ্ছা। তোর আসতে হবে না। বাই।

-হ্যালো মোহিনী। হ্যালো…….হ্যালো……

মোহিনী কাঁপছিল। ওর কন্ঠ ধরে আসছিল। ওর বাসায় ফেরার বাসটার হেল্পার চেঁচিয়ে যাচ্ছিল। মোহিনীর ভ্রুক্ষেপ নেই। সে যেন কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। আকাশে আবার মেঘ জমা শুরু করেছে। মোহিনী ফুটপাথের উপর উঠে হাটতে শুরু করেছে জ্যোৎস্নার আলোতে…..

সোডিয়াম বাতির আলো কেমন একরোখা। সেখানে সুখ আর দুক্ষকে আলাদা করা যায় না। সেখানে সবাই ফ্যাকাসে। হাসিরা ফ্যাকাসে, কান্নারা ফ্যাকাসে, অভিমানেরা ফ্যাকাসে। মোহিনীর চোখে জল নেই। মুখে হাসি নেই। তবে? মুখটা খুব শুকনো। বড্ড ফ্যাকাসে। অভিমান? কার উপর..!!

নিশূন্য জড়তা এবং হারিয়ে ফেলার গল্প
১৩/১০/২৫

#পুনশ্চ:


Address

Kirtonkhola River
Barisal
8200

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when পুনশ্চঃ - Punoshcho posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share

Category