01/05/2026
একজন মায়ের সফল ক্যারিয়ার?
একজন মায়ের সফল ক্যারিয়ার কেমন হয়? সফল ক্যারিয়ার বলতে আমরা আসলে কি বুঝি? নারী প্রধানমন্ত্রী, ওয়াও! নারী রাজনীতিবিদ, ওয়াও! নারী শিক্ষক, ওয়াও! নারী গবেষক, ওয়াও!
এরকম হাজারো "ওয়াও" চলে আসে এরকম হাজারো "ওয়াও" হোয়ার জন্য আমরা প্রতিদিন প্রতি মূহুর্তে স্বপ্ন দেখি। যে যার অবস্থান থেকে ভাবি, ইস! আমি যদি ওরকম কিছু একটা যেখানে আমার পটেনশাল পুরোপুরি বিকশিত হবে! আমি স্বাধীন স্বাবলম্বী হয়ে উঠবো।
কিন্তু এরকম স্বপ্নের পিছনে ছুটতে গেলে আমাদের মাতৃত্ব এবং সন্তান ওদের স্হান কোথায়? যারা মা হননি বা হবেন না তাদের প্রতি সম্মান রেখে যারা মা হয়েছেন আর ক্যারিয়ার গড়ছেন তাদের একজন হয়ে এই প্রশ্ন করছি। শুধু অন্যের জন্য নয়। এই প্রশ্ন আমার নিজেকে। আসুন দুইটা চিত্র দেখি।
ব্রিসবেনের একটি বাসা। দাওয়াতে জড় হলো অনেক গুলো পরিবার। তার মধ্যে কিছুক্ষণ পর আমি লক্ষ্য করলাম দুজন ক্যারিয়ারে অসম্ভব সফল দুই নারী বাংলাদেশের একি জেলা থেকে উঠে আসা এবং স্কুল জীবনের বন্ধু। একজনের গোটা কয়েক বড় বড় বাচ্চা এবং অন্যজনের একটা ছোট বাচ্চা। তো দুজন প্রচুর আলাপ জুড়ে দিলেন এবং আমরাও সাথী হলাম। যার বাচ্চা বড় তিনি খাবার সময় বাচ্চাদের তদারকি করলেন। নিজে খেলেন। আরেকজনো তাই। নিজে খেলেন। বাচ্চা কে খাওয়ালেন।
এর কিছুক্ষণ পর দেখলাম ছোট বাচ্চাটি মায়ের কাছে ঘেঁষাঘেঁষি করছে। ওড়না টানাটানি করছে। কিসব আবদার বায়না ধরছে। আর মা তাকে, এই সর সর এই যাও যাও বলে চোখ রাঙিয়ে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন। তখন বড় বড় বাচ্চার মা কে তিনি উপদেশ দিচ্ছেন,
"আমি ঠিক এরকম। একদম ঘেঁষতে দিই না। খাইয়ে দিই সবকাজ করি, কিন্তু বেশি কাছে টানি না। অভ্যাস খারাপ হয়ে যাবে। এভাবে একা চলতে চলতে ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট হয়ে উঠবে। আর আমার অত সময় আছে নাকি! তুমিও এরকম করবা। খাইয়ে দাইয়ে ফালাই রাখবা। নিজের ক্যারিয়ারের দিকে মন দাও। তুমি এত ব্রাইট... এখন একটু ব্যাকফুটে আছো।"
কথাটা শুনে বন্ধুর ও মন খারাপ। ভাবতে লাগলো, আসলেই তো, আমি অসফল। ক্যারিয়ারে মন দিতে পারলাম না। এই বাচ্চারা আমার সব সময় নিয়ে নেয়।
তো বাচ্চা পালতে গিয়ে যিনি ওনার কথা মতো ব্যাকফুটে আছেন তার হাতেও সার্টিফিকেটের পাহাড় এবং তিনিও বছরে ৮০কে ইনকাম করেন। আর তার বন্ধুর একটু বেশি: ৬ ডিজিট।
এই ঘটনা আমার মনে দাগ কেটে যায় এবং বহুদিন আমি ভাবতাম, মায়ের ক্যারিয়ারে সন্তানের স্হান আসলেই কোথায়? মায়েরা আসলে কিভাবে বাচ্চা এবং ক্যারিয়ার নেভিগেট করবে? ডিসটেনস তৈরি করে না বুকে টেনে নিয়ে। সন্তানকে বুঝিয়ে, আমি তোমার সাথে আছি। সবসময়?
আজ পর্যন্ত যতজন দেখছি, মা ক্যারিয়ারিষ্ট, একটা করতে গিয়ে একটা হারাচ্ছেন অথবা সব করতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলছেন। Stress out হচ্ছেন। Burn out হচ্ছেন। নির্ভরতা খুঁজছেন।
যেমন আমি, এই সময়ে এসে বয়স যখন মিড ফোরটি তখন খুব ক্লান্ত বোধ করি। প্রতিদিন কাজের লিষ্টে এত এত কাজ জমা হয়, নেভিগেট কিভাবে করবো ভাবলে মাথা ভনভন করে। বিশেষ করে সেমিষ্টারের ক্লাস এবং মার্কিং যখন একসাথে আসে। এই সময়ে একটি সপ্তাহ একটি দিনের কথা যদি বলি...
ধরুন শনিবার রবিবার কমিউনিটি দাওয়াত এবং দায়িত্বের ফাঁকে বাজার রান্না করা হয়নি
ধরুন সোমবার সকালে আপনি দেখলেন :
ইনসপেকশনে আসবে বাসা পরিস্কার করতে হবে
খাবার কিছু নেই রান্না করতে হবে
ময়লার ফালাতে হবে এবং বিন পরিস্কার করতে হবে
কিছু ডেইলি বাজার করতে হবে
গোটা তিনেক ক্লাস নিতে হবে
ক্লাসের পড়ায় চোখ বুলাতে হবে
গোটা দশেক খাতা দেখতে হবে
একগাদা ইমেইলের উত্তর দিতে হবে
একটি মিটিং এ যেতে হবে
দেশে ফোনে কথা বলতে হবে
বাচ্চাদের প্রয়োজন মেটাতে হবে
তখন আসলেই ২৪ ঘন্টা দিন ছোট মনে হয়। মনে হয় দিন ৪৮ ঘন্টা হলে সবকাজ ঠিকমতো করা যেতো। এবং সবচেয়ে দুঃখজনক লাগে এখানে প্রত্যেকটা কাজ সময় সাপেক্ষ। প্রত্যেকটা।
তো এরকম একটা দিনে মায়েরা খুব স্বাভাবিক ভাবেই বার্ন আউট হয়ে যায়। মনে হয় সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে থাকি। বিশেষ করে এই সময়ে বাচ্চাদের দেখাশোনা অনেক অনেক বেশি বারডেনসাম মনে হয়। মনে হয় তোদের জন্য আর কত দৌড়াবো! আর দৌড়ানো থেকে একটু থামতে যা করতে মন চায় তা হলো, সন্তানদের দেখাশোনায় মিনিমালিষ্ট (minimalist) হয়ে ওঠা। যা না করলেই নয় তা করা।
অথচ মিনিমালিজম কি এই জায়গায় হবার কথা? কারণ, একজন সন্তান সঠিকভাবে মানুষ করা (তার শারীরিক এবং ইমোশনাল প্রয়োজন পূরণ করে) একটা বিশাল কাজ। এটা একটা ইনভেস্টমেন্ট। একটা ফসলী জমি চাষ করার মতো। আমি আজকে যে যত্নে তাকে বড় করবো সে তা চোখ জুড়ানো বাগান করে উপহার দেবে। খাওয়ালে পরালেই কি দায়িত্ব শেষ হয়? তাদের সাথে প্রত্যেক দিনের কমিউনিকেশনের অভাবে যে গ্যাপ তৈরি হয়, তা একদিন খুব বড় ফাটল হয়ে চোখে পড়তে বাধ্য...
গতকালের লেখাটি এসব রিফ্লেকশনের ফল। নিজেকে সব সময় বোঝানোর উপর রাখি। নিজেকে চেকের উপর রাখি। ক্লান্তি এসে জীবনের উপর ভর করলে যেন ছোট ছোট মিষ্টি মানুষগুলোর প্রতি দায়িত্ব এবং কর্তব্য পালনে অবহেলা না করি এই জন্য নিজেকে রিমাইন্ডার দিই।
আর
আশেপাশে বিল্ডিং যখন বানানো হয় তাকিয়ে থাকি। কিছু ইট আস্ত, কিছু খন্ড খন্ড, কিছু গুঁড়া গুঁড়া। একজন ভীষণ ব্রাইট ভীষণ কর্মঠ মা দিনশেষে ঐ গুঁড়া গুঁড়া ইটের মতো, নিজেকে ভেঙে পরিবারের ভিত্তিপ্রস্তর গড়ে দিয়ে যাচ্ছে।
গুঁড়ো হয়ে যাওয়া ইটদের কষ্ট বাংলাদেশের সংস্কৃতির একটা অংশ।
উম্মে সালমা, টুঅং, ২ মে ২০২৬.
(সরি, বাবাদের কথা একটুও বললাম না। বাবাদের কথা বাবারা বলুক। তাদের পারস্পেকটিভ তাদের মুখ থেকেই না হয় শুনি!)